প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি > সিরিয়ায় গোপন মার্কিন ভূমিকা জনগণ থেকে আড়ালে

সিরিয়ায় গোপন মার্কিন ভূমিকা জনগণ থেকে আড়ালে

aleppo-45জেফরি ডি স্যাকস : পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন বিপদ ও ধ্বংসাত্মক সঙ্কটের নাম সিরিয়া সঙ্ঘাত। ২০১১ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ সিরিয়ান নিহত হয়েছে। এক কোটির মতো মানুষ ভিটাশূন্য হয়েছে। ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয়েছে ইউরোপ। উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে হিমশিম খাচ্ছে তারা। বিপর্যস্ত রাজনীতি। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো আরেকবার ন্যক্কারজনকভাবে সরাসরি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ল রাশিয়ার সাথে।

দুর্ভাগ্যজনক হলো প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা মার্কিন জনগণের কাছ থেকে এবং বিশ্ব জনমত থেকে গোপন করে বিরাট বড় বিপদের বোঝা চাপিয়েছেন। সিরিয়া যুদ্ধ সমাপ্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কতগুলো বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কার্যক্রমসহ ২০১১ সাল থেকে সেখানে তাদের গোপন ভূমিকা, কারা সেখানে অর্থায়ন করছে, অস্ত্র কারা জোগান দিচ্ছে এবং কারা বিভিন্ন দিক থেকে সহায়তা করছে এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে হবে।

ব্যাপকভাবে যেটা প্রতিষ্ঠিত তা হলো ওবামা যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়া সঙ্ঘাতের বাইরে রেখেছে। আসলে এ ধারণা মিথ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থীরা ব্যাপকভাবে ওবামার সমালোচনা করে চলছে রাসায়নিক অস্ত্র বিষয়ে সিরিয়ার মরুভূমিতে প্রেসিডেন্ট বাসারের জন্য একটি লাইন টানার জন্য; কিন্তু যখন আসাদের বিরুদ্ধে এ রেখা অতিক্রমের অভিযোগ আসল তখন আবার যুক্তরাষ্ট্র পেছনে সরে আসল। ফাইন্যানসিয়াল টাইমসের শীর্ষ এক কলামিস্ট বারবার সেই ভ্রান্ত ধারণার কথা উল্লেখ করে যাচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সাইডলাইনে রয়েছে এ ক্ষেত্রে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মর্মে যে খবর ফাঁস হয়েছে ওবামা তা অস্বীকার করছেন।

তারপরও মাঝে মধ্যে পর্দা দুলে উঠেছে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করা বিষয়ক ২০১৩ সালে সিআইএ’র প্রতি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক এক গোপন আদেশের খবর গত জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব যাবতীয় আর্থিক সহায়তা করেছে। আর ওবামার আদেশ অনুযায়ী সিআইএ সাংগঠনিক ও প্রশিক্ষণগত সহায়তা প্রদান করেছে বিদ্রোহীদের; কিন্তু যেটা দুর্ভাগ্য সেটা হলো এ খবর বিষয়ে পরে আর কোনো আলোচনা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও চুপচাপ নীতি অবলম্বন করা হয়েছে আর নিউ ইয়র্ক টাইমসও কোনো ফলোআপ রিপোর্ট করেনি। বর্তমান সিআইএসৌদি অপারেশন কত বিশাল হবে? যুক্তরাষ্ট্র বছরে কত ব্যয় করছে সিরিয়ায়? যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার এবং অন্য দেশগুলো সিরিয়ান বিদ্রোহীদের কোনো ধরনের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করছে? কোনো গ্রুপ এসব অস্ত্র পাচ্ছে? মার্কিন সৈনিক, বৈমানিক এবং অন্যরা সেখানে কী ভূমিকা পালন করছে? যুক্তরাষ্ট্র সরকার এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিচ্ছে না। প্রধান জাতীয় দৈনিকগুলোও এ বিষয়ে চুপচাপ।

ডজনখানেকেরও বেশি বক্তৃতায় ওবামা মার্কিন জনগণকে বলেছেন, মার্কিন কোনো বুট সিরিয়ার মাটি স্পর্শ করবে না। তবু প্রায় প্রতি মাসে সংক্ষিপ্ত সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে জানানো হয় বিশেষ মার্কিন অপারেশন ফোর্স সিরিয়ায় নিয়োগ করা হচ্ছে। পেন্টাগন নিয়মিত বলে যাচ্ছে তারা সামনের কাতারে নেই। কিন্তু সম্প্রতি যখন রাশিয়া ও আসাদ বাহিনী মিলে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটিতে বিমান হামলা এবং কামান দাগানো শুরু করল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রেমলিনকে সতর্ক করে বলল, এ হামলা সিরিয়ায় মার্কিন স্থলবাহিনীর জন্য হুমকিস্বরূপ। সিরিয়ায় মার্কিন মিশন, খরচ, প্রতিপক্ষ কারা সে সম্পর্কে জনগণকে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে না সরকারের পক্ষ থেকে।

gas-supply-demandমাঝে মধ্যে ফাঁস হওয়া কিছু তথ্য, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিভিন্ন দেশের বিবৃতি এবং কদাচিত মার্কিন কর্মকর্তাদের কিছু বিবৃতি থেকে আমরা যেটা বুঝতে পারি তা হলো যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সিরিয়া যুদ্ধে জড়িত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসাদকে হটাতে চায় আর একই সাথে আইসিসের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে। আর এর সমন্বয় করছে সিআইএ। আসাদবিরোধী সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার এবং অন্যান্য দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে জোটগত হয়ে কাজ করছে (অবশ্য সম্প্রতি এরদোগানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর এ হিসাবনিকাশ অনেকটা পাল্টে গেছে)। অস্ত্রশস্ত্র জোগান, প্রশিক্ষণ, বিশেষ অপারেশন ফোর্স, বিমান হামলা এবং বিদ্রোহী বাহিনীগুলো এমনকি আন্তর্জাতিক ভাড়াটে সৈনিকদের আনুষঙ্গিক সহায়তা দেয়ার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি টাকা খরচ করছে সেখানে। আমেরিকার মিত্র দেশগুলোও একইভাবে খরচ করে চলছে। মোট খরচ কখনো প্রকাশ করা হচ্ছে না।

এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মার্কিন জনগণের কিছুই বলার সুযোগ নেই। অনুমতির জন্য বা বাজেটের জন্য কখনো কংগ্রেসেও পেশ করা হয়নি ভোটাভুটির জন্য। সিআইএ’র ভূমিকা কখনো ব্যাখ্যা করা হয়নি অথবা এটা যে ন্যায্য সেটাও প্রমাণের চেষ্টা করা হয়নি। সিরিয়ায় মার্কিন অপারেশন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ কি না সে বিষয়ে মার্কিন জনগণ অথবা বিশ্বকে কখনো বুঝিয়ে বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়নি।

মার্কিন সমর শিল্প কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে যারা বসে আছেন, তাদের কাছেও গোপন রাখা হয়েছে যেমন মাত্রায় রাখা দরকার। নাইনইলেভেন হামলার পর ১৫ বছর আগে কংগ্রেস কর্তৃক ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক বাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় গোপন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য। আজো ব্যবহার করা হচ্ছে সেই অনুমতি। কী করা হচ্ছে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কেন জনগণকে ব্যাখ্যা দেয়া উচিত? তাদের ধারণা এটা করা হলে তা কেবল অপারেশনকে বিপন্ন করবে এবং শত্রু শক্তিশালী হবে। কাজেই তাদের মত হলো জনগণের জানার দরকার নেই।

আমার মতে, মার্কিন সংবিধান এবং জাতিসঙ্ঘ সনদ উভয় দিক দিয়ে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যুদ্ধ অবৈধ। কেবল কংগ্রেসকে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যুদ্ধ ঘোষণার। সিরিয়া মার্কিন এই দ্বিধারী যুদ্ধ ব্যঙ্গাত্মক এবং বেপরোয়া জুয়া। সিরিয়ার জনগণকে রক্ষার জন্যই তারা আসাদকে হটাতে চায়। সেটাই বারবার বলে আসছেন ওবামা এবং ক্লিনটন। আসলে এটা হচ্ছে ইরান ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি যুদ্ধ। সিরিয়া হচ্ছে এ প্রক্সিযুদ্ধের ক্ষেত্র।

এ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক, যতটা অনুমান করা হয়েছিল তার তুলনায়। যুক্তরাষ্ট্র আসাদকে হটাতে চাইছে। আর রাশিয়া আসাদকে রক্ষায় সেখানে যুদ্ধ শুরু করেছে। মার্কিন মিডিয়া বিস্ময় প্রকাশ করেছে, কত বড় সাহস! আসাদকে হটাতে গোপন যুদ্ধে রত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেমলিন? এর ফল হতে পারে অতি মারাত্মক। প্রথমে মার্কিনরাশিয়া কূটনৈতিক যুদ্ধ। তারপর সামরিক সঙ্ঘাত।

আমার বিশ্বাস এসব বিষয় আইনগত এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত। আমি আরো বিশ্বাস করি, সিরিয়া চলমান মার্কিন যুদ্ধকে জনগণ ‘না’ বলবে। মার্কিন জনগণ নিরাপত্তা চায়। একই সাথে আইসিসেরও উৎখাত চায়; কিন্তু তারা মার্কিন নেতৃত্বে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মধ্য আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের দীর্ঘ যুদ্ধের ইতিহাস ভুলে যায়নি। আর সে কারণেই মার্কিন প্রশাসন জনগণের কাছ থেকে বর্তমানে সত্য আড়াল করে রেখেছে।

ভাষান্তর : মেহেদী হাসান
লেখক : প্রফেসর, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

syria-centric-big-war

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: