প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ইতিহাস, রাজনীতি > পৃথিবী বদলাচ্ছে, সেই মানবপ্রেম আর কতদিন?

পৃথিবী বদলাচ্ছে, সেই মানবপ্রেম আর কতদিন?

map-major-conflictsজয়া ফারহানা : আনন্দ আশ্রম ছবির একটি গানের কথা মনে পড়ে। ফিটন গাড়িতে বসে আছেন উত্তম কুমার। বেশ ফুরফুরে মেজাজ তার। হওয়ারই কথা। কারণ কাঁধে মাথা এলিয়ে আছেন প্রেমিকা শর্মিলা ঠাকুর। তিনিও চনমনে। ১৯৫৩ সালে কলকাতার জনবিরল রাস্তা ধরে ফিটন গাড়ি চলছে। উত্তম ঠোঁট মেলাচ্ছেন গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানে। প্রতি মুহূর্তে নানা কারসাজি বা ঘুঁটির চাল দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিকে যারা মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে দিচ্ছেন তাদের যে প্রেমিক উত্তম মোটেও পরোয়া করেন না, তাই নিয়ে গান-‘পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে, তুমি আমি একই আছি, দুজনে যা ছিলাম আগে..।’ বদলে যাওয়া পৃথিবী প্রেমিকপ্রেমিকা কারও মনেই যে কিছুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি, গানের দৃশ্যে দুজনের নির্ভার ভঙ্গি তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

বিশ্ব রাজনীতির তোয়াক্কা না করে দুনিয়ায় নিজেদের মতো থাকতে পারা খুবই সুখকর অনুভূতি। তাও যদি হয় আবার প্রেমের দুনিয়া তাহলে সেই সুখানুভূতির তুলনা সত্যিই নেই। কিন্তু ১৯৫৩র পৃথিবী আর ২০১৬র পৃথিবীও আবার এক নয়। মাঝে ছয় দশকেরও বেশি সময় পৃথিবী যত দ্রুত, যেভাবে বদলেছে তাতে দুনিয়ার কোনো প্রেমিকপ্রেমিকার পক্ষেই আর ওরকম চনমনে মেজাজে পৃথিবীকে থোড়াই কেয়ার করে গৌরিপ্রসন্নের ওই ফুরফুরে গান গাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া সেই প্রসন্ন নির্জন রাস্তাও আর নেই, আর সেই অ্যান্টিক ফিটন গাড়িই বা পাওয়া যাবে কোথায়? এখন চলমান অদৃশ্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বসবাসকারী হতভাগ্য প্রেমিকপ্রেমিকাদের সাঁজোয়া যানে বসে প্রেমের গান গাওয়ার দিন। এ ক্ষেত্রে বর্তমানের প্রেমিক যুগলদের জন্য চাইলেও আমরা হতাশা বা দীর্ঘশ্বাসের বেশি আর কিছু দিতে পারছি না। বিশ্বযুদ্ধের কলকাঠিও আমাদের হাতে নেই যে, আমরা চাইলে তা থামিয়ে দিতে পারি। শহীদ কাদরির মতো কোনো প্রেমিক কবি হয়তো প্রেমের তীব্রতায় প্রেমিকাকে আশ্বাস দিতে পারেন, প্রেমিকার জন্য তিনি এমন ব্যবস্থা করবেন যেন সাঁজোয়া যান বা প্যারাট্রুপার থেকে বোমা নয়, কেবল চকলেট পড়বে। যাক সে ইউটোপিয়ার কথা।

তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় দাপটে পৃথিবী যেভাবে, যত দ্রুত ছোট হয়ে আসছে তাতে বিশ্বের কোনো দেশই আর তা সে যত ছোট এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় যত অগুরুত্বপূর্ণই হোক, কোনো রাষ্ট্র তার যুদ্ধবিগ্রহ অথবা যুদ্ধবিগ্রহের হুমকি কেবল অঞ্চল বিশেষের মধ্যে সীমিত রাখতে পারছে না। আইএসের মতো আঞ্চলিক হুমকিকেও কেবল আঞ্চলিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি। ২০১১ সালে সিরিয়ায় শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে আইএসের একটি অংশকে যখন বিদ্রোহীদের সাহায্য করতে সিরিয়ায় পাঠানো হয় তখনও আজকের আইএস আইএস হয়ে ওঠেনি। কে জানত, সালাফি ও ওহাবি তত্ত্বে বিশ্বাসী এ সংগঠনটি উত্তর ও পশ্চিম ইরাক এবং পূর্ব ও উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব অঞ্চল দখল করে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার অবিশ্বাস্যরকম ঘোষণা দিয়ে বসবে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি আইএস হয়ে উঠবে উত্তর সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন। এখন এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া এবং আমেরিকায় আবার যখন সেই স্নায়ুযুদ্ধকালীন অথবা তারও চেয়ে বেশি উন্মাদনা নিয়ে পরস্পর মুখোমুখি তখন মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথিবী বদলেছে কই, পৃথিবী সেই একইরকম যুদ্ধ মনোভাবাপন্নই রয়ে গেছে। মাঝের কিছু দিন খালি দুই পরাশক্তির মুখোমুখি অবস্থান ছিল না। এখন রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের পর স্নায়ুযুদ্ধপরবর্তী সেই প্রশান্তির কাল কেটে গেছে, ন্যাটোর সদস্যভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্র সীমান্তে তাদের নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। বেড়ে গেছে ন্যাটোভুক্ত প্রত্যেক দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয়। ওবামাপুতিন এবং কেরিলাভরভ বৈঠকের ফলাফল দেখে মনে হয়েছে এ দুই পরাশক্তি আমৃত্যু যুদ্ধ ইস্যুতে একমত হতে পারবে না।

হ্যাঁ, তবে মাঝে মধ্যে পৃথিবী যে বদলায় না, তাও নয়। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে দ্বন্দ্ব ছিল সেই দ্বন্দ্বের জায়গায় রাশিয়ার বদলে এসেছে চীন। বরং পরিস্থিতি সেই সময়ের পৃথিবীর তুলনায় আরও খারাপ। এখন ক্রিমিয়ার রাশিয়াভুক্তি এবং ন্যাটোর শক্তি বৃদ্ধির কারণে রাশিয়ার সঙ্গে যেমন আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ, তেমন দক্ষিণ চীন সমুদ্র নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক রাশিয়ার চেয়ে আরও খারাপ। মাঝের ছয় দশকে পরমাণু শক্তির বিপজ্জনক চরিত্রের কারণে বিশ্বকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে উত্তর কোরিয়া আর ইরান। বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারির বার্তাবাহী শান্তির দূতরা দেশে দেশে বিফল হয়ে দুয়ার থেকে ফেরত আসছে। সিরিয়া, তুরস্ক, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদানসহ সংঘাতময় দেশের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সম্প্রতি কাশ্মীরের বারমুল্লা জেলার উরির সেনাছাউনিতে ১৮ ভারতীয় সেনা নিহতের ঘটনা পৃথিবীকে আরও সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইঙ্গিত শব্দটিকে অতিরঞ্জন মনে করার কারণ নেই। ভারতপাকিস্তান সম্পর্কের অভিজ্ঞতার পুরোটাই তিক্ত। দুই দেশের সম্পর্ক নমনীয় স্তরে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে দশকের পর দশক ধরে। ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ী বাসে চেপে অমৃতসর থেকে লাহোর গিয়ে লাহোর ঘোষণায় স্বাক্ষর করে বলেছিলেন, দু’পক্ষের স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য এখন থেকে চেষ্টা চলবে। কিন্তু তার কিছু সময় বাদেই শুরু হয়েছিল কারগিল যুদ্ধ। ২০১৫তে নরেন্দ্র মোদি অতি অনানুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে নওয়াজ শরিফের গ্রামের বাড়ি গেলেন বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তার সপ্তাহ খানেক পরই হল পাঠানকোট হামলা। মুশকিল এই যে, ভারতপাকিস্তান যুদ্ধের আবহ তৈরি হলে তার আঁচ বাংলাদেশের গায়ে পড়বে সবচেয়ে বেশি। যেমন নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল সবচেয়ে বেশি।

বিশ্বের এক প্রান্তের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলাফল দ্রুত অন্য প্রত্যন্ত প্রান্তেও সিদ্ধান্ত বদলে ভূমিকা রাখে। অথবা বিশ্ব রাজনীতির চরিত্রই দাঁড়িয়ে গেছে এমন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক থাকছে না। মোদ্দাকথা পৃথিবীর যে কোনো দেশে যুদ্ধের জন্য কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তাতে জড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্ব। যে কারণে সিরিয়ার সমস্যা আর কেবল সিরিয়ার মধ্যে থাকে না, সেই একই কারণে কাশ্মীরকেন্দ্রিক ভারতের সমস্যাও কেবল ভারতের মধ্যেই সীমিত থাকবে না। ইতিমধ্যেই এ হামলার জন্য ফ্রান্স ও রাশিয়া পাকিস্তানকে সরাসরি দায়ী করেছে এবং প্রথমবারের মতো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন জঙ্গি দমনে ভারতকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

পৃথিবী বদলে গেছে বৈকি! তবে এমন হলে মন্দ হতো না, যদি সিরিয়া ইস্যুর সমাধান আইএস, আল কায়দা, আসাদ আল বাশার, ইরান, ইরাক আর হিজবুল্লাহ মিলে করে ফেলতে পারত। কিন্তু তা হওয়ার নয়। যে কোনো দেশের যুদ্ধবিগ্রহের সামান্য পরিমাণ ইঙ্গিত দেখা গেলেও সেখানে বিশ্ব মাতব্বর সেই যুদ্ধের মাঝখানে জড়িয়ে পড়বে এবং সেসব যুদ্ধ ধীরে ধীরে প্রায় বিশ্বযুদ্ধের আবহে মোড় নেবে। এবং আরও পরে সেসব যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে শতগুণ জটিল চেহারা নেবে। সিরিয়া ইস্যুর কথাই ধরা যাক। এখানে এক পক্ষে রাশিয়া আর ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠী, অন্য পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সিরিয়া দখল করে বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করুক তুরস্ক। আর তুরস্ক সিরিয়া আক্রমণ করতে চায় ঠিকই; কিন্তু সেটা বাশারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে নয়। তুরস্কের সিরিয়া আক্রমণের কারণ প্রধানত কুর্দি সমস্যার সমাধান। আবার আইএস গোষ্ঠীর সঙ্গে আমেরিকার লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্র সিরীয় কুর্দিরা। রাশিয়া, ইরান ও হিজবুল্লাহ আইএসের বিরুদ্ধে ঠিকই; কিন্তু বাশারকে তারা ক্ষমতা থেকে সরাতে চান না। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র যারা, তাদের দাবি বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। উদ্দেশ্য ইরানকে দুর্বল রাখা। তুরস্কের প্রধান লক্ষ্য আবার সিরিয়ান কুর্দি, আইএস নয়।

এ জটিল প্যারাডক্সের কালে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিষন্ন। কোথাও এসবের একটা শেষ হোক এ চাওয়া এ কালের প্রেমিকপ্রেমিকাদের থাকতেই পারে। তাদেরও উত্তম, শর্মিলার মতো প্রসন্ন রাস্তায় প্রসন্ন মনে গাইতে ইচ্ছে করতে পারে, পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে, তুমি আমি একই আছি, দু’জনে যা ছিলাম আগে..। কিন্তু বিশ্বনেতারা না সেই প্রেমপূর্ণ পৃথিবীর সুযোগ দেন না তাদের কাছে পৃথিবীজুড়ে এরকম একটি প্রেমের রাস্তায় প্রেমের আবহ প্রতিষ্ঠার দাবি করা যায়।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: