প্রথম পাতা > অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, পরিবেশ, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সমাজ > জনমত গড়ে তোলাঃ প্রসঙ্গ ট্রানজিট ও রামপাল

জনমত গড়ে তোলাঃ প্রসঙ্গ ট্রানজিট ও রামপাল

সেপ্টেম্বর 29, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

. রেজোয়ান সিদ্দিকী : গত সপ্তাহে আমরা লিখেছিলাম আরও যেসব বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা দরকার। সম্প্রতি কানাডা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডায় বসবাসকারী শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার জন্য সেখানে অভিবাসী আওয়ামী লীগারদের প্রতি ঐ দেশে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে প্রেক্ষিতে আমরা লিখেছিলাম আলোচ্য কলাম। আর লিখেছিলাম আরও যেসব বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। তা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলাম। তার একটি ছিল ট্রানজিট করিডোর প্রসঙ্গ।

transit-for-tk192করিডোর : ভারত সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের এক রাজ্য থেকে অপরাপর রাজ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য আবদার জানিয়ে আসছিল। কিন্তু পাকিস্তান আমলের কোনো সরকারই তাতে রাজি হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদের আগে কোনো সরকারই তাতে রাজি হয়নি। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন। অপর দিকে এ ধরনের ব্যবস্থা কোনো দিনই বিনামূল্যে বা একতরফা হতে পারে না। এর মধ্যে অবশ্যই দেয়ানেয়ার প্রসঙ্গ জড়িত। কিন্তু ভারত কখনও এর বিনিময়ে কিছু দেয়ার কথা উল্লেখ করেনি। সব সময়ই ভারত কেবল একতরফাভাবে নিতেই চেয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান মেয়াদের অনির্বাচিত সরকার একমাত্র ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায়ে ভারতের সঙ্গে করিডোরের চুক্তি করে বাংলাদেশকে ভারতের চারণভূমিতে পরিণত করে ফেলেছে। বাংলাদেশের নৌ, সড়ক ও রেলপথ ভারত ব্যবহার করছে বলতে গেলে একেবারে বিনামূল্যে এবং কোনো বিনিময় ব্যবস্থা ছাড়াই। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও আমলে নেওয়া হয়নি। ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যে প্রায় ৬০ বছর ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। সেখানে মোতায়েন বিশাল ভারতীয় বাহিনী স্বাধীনতাকামীদের হাতে অবিরাম পর্যুদস্ত হচ্ছে। ঐ স্বাধীনতাকামীদের দমনে ভারত যখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পরিবহণ শুরু করবে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ তাদের টার্গেটে পরিণত হবে।

আবার এসব চুক্তির বিষয়ে সরকার এমন গণবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে যে, বাংলাদেশকে গোপন চুক্তির মাধ্যমে ভারতের অঙ্গরাজ্য করে ফেললেও জনগণ তা জানতেও পারবে না। কারণ বর্তমান আইন অনুযায়ী সরকার কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে চাইলে তা গোপনে সম্পন্ন করতে পারবে। এমনকি সে চুক্তির বিষয়ে জাতীয় সংসদ সদস্যদেরকে জানানো বা আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। চুক্তির বিষয়ে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতিকে কানে কানে অবহিত করলেই যথেষ্ট হবে। এ রকম ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আর জনগণের থাকে না। কোনো ব্যক্তি বিশেষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এখন হয়েছেও তাই।

ভারতকে এই করিডোর দেয়া নিয়ে অনেক আলাপআলোচনা হয়েছে। কিন্তু সরকার তার কোনো কিছুকেই আমলে নেয়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’ ও ‘দ্য ইনস্টিটিউট ফর পলিসি, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (আইপিএজি)’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশভারত সম্পর্ক : অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় এই মতই উঠে আসে যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে যে কাঠামোতে ট্রানজিট সুবিধা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা অসম। বাংলাদেশের জন্য এটা সহায়ক নয়। আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান অধিবেশনে বলেন, ‘ট্রানজিট চুক্তি এমন ব্যাপক পরিসরে হওয়া উচিত, যেখানে অবকাঠামো থেকে শুরু করে ট্রানজিটের মাসুল সমন্বিতভাবে নির্ধারিত হয়। ট্রানজিটের মাসুল নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বচ্ছতা দরকার। বর্তমান কাঠামোয় কিসের ভিত্তিতে মাসুল নির্ধারণ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা সুস্পষ্টভাবে কিছুই জানি না।’

এর আগে আলোচনার উদ্বোধনী পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, ট্রানজিট ও পরিবহণের ফি ও চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক খরচ বিবেচনায় নিয়ে যতটা সম্ভব বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিএ) নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় কর্ম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান মসিউরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, যেখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামোই গড়ে ওঠেনি, সেখানে প্রান্তিক খরচের ভিত্তিতে মাসুল নির্ধারণের যৌক্তিকতা কতটা? তিনি বলেন, ট্রানজিটের প্রয়োজনে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। ট্রানজিটের মাসুল ও সারচার্জের মাধ্যমে আদায় হওয়া অর্থেই সেই অবকাঠামো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্রানজিট ট্রান্সপোর্টেশন প্রটোকলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে সারচার্জ, দূষণ চার্জ, রক্ষণাবেক্ষণ চার্জসহ নানা ধরনের মাসুল রয়েছে।

নৌ প্রটোকলের আওতায় মাসুল আরোপ করে জুনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত ট্রানজিট শুরু হয়েছে। ট্রানজিট সুবিধার আওতায় ভারতের কলকাতা থেকে একটি চালান বাংলাদেশের নৌ ও সড়ক পথ ব্যবহার করে আশুগঞ্জ হয়ে আগরতলা গেছে। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে টনপ্রতি পণ্যের জন্য মাসুল নির্ধারিত হয় ১৯২ টাকা মাত্র। এর মধ্যে ১৩০ টাকা পাবে শুল্ক কর্তৃপক্ষ, ৫২ টাকা পাবে সড়ক বিভাগ, ১০ টাকা পাবে নৌ মন্ত্রণালয়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে গঠিত ট্রানজিট সংক্রান্ত কোর (মূল) কমিটি নৌপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১ হাজার ৫৮ টাকা মাসুল নির্ধারণের প্রস্তাব করেছিল। সরকার গঠিত ঐ কোর কমিটির একজন সদস্য ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। শেষ পর্যন্ত যে মাসুল নির্ধারণ করা হয়েছে তা কোর কমিটির প্রস্তাবিত হারের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কীভাবে, কিসের ভিত্তিতে এবং কারা ট্রানজিটের মাসুল নির্ধারণ করেছেন, আমরা কেউ তা জানি না। অথচ এ ক্ষেত্রে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’ রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা অতীব জরুরি।

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প : বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতায় এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। এ উদ্যোগ গ্রহণের একেবারে শুরু থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে দেশের পরিবেশবাদীরা ও সমাজের সচেতন মহল। সমাজে সচেতন এমন কোনো শ্রেণী নেই যারা এর প্রতিবাদ করেননি। কিন্তু সরকার তাতে মোটেও কর্ণপাত না করে রামপালেই এই প্রকল্প স্থাপনে এগিয়ে যাচ্ছে। বরং যারা এমন দাবি তুলছেন তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিষোদ্গার করতেও ছাড়ছে না সরকার ও তার তল্পিবাহকরা।

rampal_projectকিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে ইউনেস্কো বলেছে রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আর সে কারণে প্রকল্পটি অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা প্রতিবেদন, প্রকল্পের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশভারত মৈত্রী পাওয়ার কোম্পানির বক্তব্য এবং দরপত্রের নথির মধ্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ইউনেস্কো প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশ সফরের সময় সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলার যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল, তা কোম্পানির লোকেরা সংগঠিত করে। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ইউনেস্কোর সুপারিশ বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। তবে আপাতত রামপাল প্রকল্পের কাজ বন্ধ করা হচ্ছে না।

এই প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে প্রতিবছর ৭৪ লাখ টন করে অধিক সালফারযুক্ত ভারতীয় কয়লা, যা মারাত্মকভাবে পরিবেশের ক্ষতি করবে। এই কয়লা ভারত নিজেও ব্যবহার করে না। রামপাল ক্ষতি যে করবে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে চট্টগ্রামে অ্যামোনিয়া এক কারখানা বিস্ফোরণের পর। সেই বিস্ফোরণে অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে বহু দূরের গাছপালাও মরে হলুদ হয়ে গেছে। তা ছাড়া এই ৭৪ লাখ টন কয়লা আনা হবে ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার বার্জে করে। এ ধরনের বার্জ প্রতিদিন সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচল করবে। এতে সুন্দরবনের প্রতিবেশ এবং বন্য প্রাণীর নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে দূষিত হবে।

রামপাল প্রকল্পের চিমনির উচ্চতা হবে ৯০০ ফুট। এই উঁচু চিমনির কারণে বিশাল এলাকার বাতাস দূষিত হয়ে পড়বে। প্রকল্পটি চালু রাখলে প্রতি ঘণ্টায় ৫ হাজার কিউবিক লিটার পানি পশুর নদ থেকে তোলা হবে। আর সেই দূষিত পানি ছেড়ে দেয়া হবে সুন্দরবনের নদীতে। রামপালের শহর ও প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মিত হবে। এসব কাজে ব্যবহৃত পানি সুন্দরবনের পশুর নদ থেকে তোলা হবে। কয়লাবাহী জাহাজ চলাচলের পথটি সুগম রাখতে ৩৫ কিলোমিটার নদী পথ খনন করতে হবে। এতে ৩ কোটি ২১ লাখ ঘনমিটার মাটি নদী থেকে উত্তোলন করতে হবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কারণগুলো উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই ম্যা, গ্রোভ বনের বৈচিত্র্য বিশ্বে অনন্য ও অসাধারণ। এখানে একই সঙ্গে মিষ্টি ও লোনা পানির মিশ্রণে ব্যতিক্রমী এক প্রাণসম্পদের আধার তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রাণী বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা এই বনেই সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ও বিপন্নপ্রায় ২টি ডলফিন প্রজাতি গাঙ্গেয় ও ইরাবতি ডলফিন এবং বাটাগুড় বাস্কা কচ্ছপও এখনও সুন্দরবনেই টিকে আছে। আর সে কারণেই ২০১৪ সালের বার্ষিক অধিবেশনে সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে প্রথম উদ্বেগ জানায় ইউনেস্কো এবং বাংলাদেশ সরকারকে তারা এই ব্যাপারে ২টি চিঠিও দেয়। কিন্তু সরকার এই ঘাতক প্রকল্প নিয়ে এগিয়েই যাচ্ছে।

rampal-mercury-disposalকয়লা পুড়ানোর কারণে রামপাল প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ সালফার ডাইঅক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মার্কারি নির্গত হবে। সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইড মেঘের সঙ্গে মিশে ওই এলাকায় এসিড বৃষ্টি ঘটাবে। এই এসিড বৃষ্টি সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে হুমকিতে ফেলবে। এতে সুন্দরবনের নদীর পানিতে এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং মাটিতে এলুমিনিয়াম প্রবেশ করবে, যা সুন্দরবনের বৃক্ষরাজি ও বন্য প্রাণীদের মৃত্যুর কারণ হবে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পে বছরে ১০ লাখ টন কয়লার ছাই তৈরি করবে। এসব ছাইয়ের মধ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক যেমন আর্সেনিক, সীসা, পারদ, নিকেল, ডেলাডিয়াম, বেরিলিয়াম, বেরিয়াম, কেডমিয়াম, ক্রমিয়াম, সেলেনিয়াম ও রেডিয়াম থাকবে। বিশেষভাবে পারদ সুন্দরবনের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলবে। এখানকার পানিতে মিশে মাছ, অন্যান্য প্রাণীর দেহে ছড়িয়ে পড়বে, যা খাদ্য হিসেবে মানুষের শরীরে গিয়ে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও উন্নতি স্তিমিত করবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রামপাল কয়লা বিদ্যুতের ২য় পর্যায়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার। রামপালের প্রথম পর্যায়ের জন্যই সুন্দরবনের মিষ্টি পানি কমে আসবে। প্রকল্পের ২য় পর্যায় নির্মিত হলে সেটির ক্ষতি আরো বাড়াবে। এ প্রকল্পের জন্য কয়লা আসবে পশুর নদ দিয়ে। এই পথটি সুন্দরবনের লাগোয়া। তাতেও প্রতিবেশ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নদীপথ সচল রাখতে প্রতিবছর ৩ কোটি ২১ লাখ ঘন মিটার মাটি নদী থেকে তোলা হবে। এই বিপুল পরিমাণ পলিমাটি কোথায় রাখা হবে এবং তা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের উপর কিরূপ প্রভাব ফেলবে তার পর্যালোচনা সঠিকভাবে করা হয়নি।

এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বন্যপ্রাণী অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী অধ্যাপক রেজা খান বলেছেন, ‘আমি অনেকবার বলেছি, আবারও বলছি যে, রামপাল প্রকল্প থেকে যে দূষিত উত্তপ্ত পানি পশুর নদে ফেলা হবে তাতে নদের পানির তাপমাত্রা দু’ডিগ্রী সেলসিয়া বেড়ে যাবে। এর ফলে বনের প্রাণীদের প্রাথমিক খাদ্য উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্যচক্র ধ্বংস হবে, যা সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের বিপদে ফেলবে।’ : এখন আমাদের দরকার এর বিরুদ্ধে সোচ্চার জনমত ও আন্দোলন গড়ে তোলা।

সূত্রঃ দৈনিক দিনকাল, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬

কিছুই করা’ মানে কি জ্বালাওপোড়াও?

golam-mortozaগোলাম মোর্তোজা :কিছুই তো করতে পারলেন না’মাঝেমধ্যেই কথাটি শুনতে হয়। ‘সরকার তো রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করেই ফেলল, আনু মুহাম্মদরা তো ঠেকাতে পারলেন না’সুনির্দিষ্ট করে এমন কথাও বলেন কেউ কেউ। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন, কিছু করতে পারা, না পারা বিষয়ে কিছু কথা।

. ‘কিছুই করতে পারলেন না’বলতে আসলে কী বোঝানো হয়? আন্দোলন করছে ‘তেলগ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’। ‘কিছু করা’ বলতে তাদের কাছে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে আর জাতীয় কমিটি কী করছে? জাতীয় কমিটি তথ্য প্রমাণ দিয়ে বলছে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হলে, সুন্দরবন ভয়ঙ্কর ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা সভাসমাবেশ করেছেন, লংমার্চ করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সুন্দরবনের গুরুত্ব, রামপালের ভয়াবহতার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, দেশের এত বড় ক্ষতি করবেন না। সবই করেছেন, করছেন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। দেশের প্রায় সকল স্বীকৃত শ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞ জাতীয় কমিটির বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। যাদের অনেকে সরাসরি জাতীয় কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সুপরিচিত পরিবেশ ও বণ্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান থেকে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম পর্যন্ত।

. জনমানুষ, যারা রামপালের ক্ষতি বিষয়ে জানতেন না, তারা জেনেছেন বুঝেছেন। আন্দোলনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। দেশব্যাপী রামপাল বিরোধী একটি গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। জনসম্পৃক্ত বিষয় থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা বিএনপি অনেক দেরিতে হলেও রামপাল বিরোধী অবস্থান নিয়েছে বা নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে সরকারিভাবে যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, তিনি তার ভিত্তিতে কথা বলেছেন। ফলে জনমানুষের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেনি তার কথায়। প্রধানমন্ত্রী জনমানুষের কথা না বললেও, জনমানুষের অবস্থান যে রামপালের বিপক্ষে তা প্রমাণ হয়েছে। তাহলে কি বলা যায় যে, জাতীয় কমিটি ‘কিছুই করতে পারল না’?
জাতীয় কমিটি জনমানুষের সামনে ভয়ংকর ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরতে চেয়েছে এবং পেরেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসী বাঙালিরাও বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রতীকী প্রতিবাদ করছেন। এই অর্জন কি ‘কিছু করা নয়’? সরকারের দেওয়া প্রতিটি তথ্য, তথ্য দিয়ে অসত্য প্রমাণ করেছেন জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। এটা কি ‘কিছু করা নয়’?

. ‘কিছু করা’ বলতে যদি বোঝানো হয়ে থাকে যে জাতীয় কমিটি আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পদ ধ্বংস করেনি, গাড়ি পোড়ায়নি, ভাঙচুর করেনি, স্কুলকলেজে ধর্মঘট ডাকেনি। তাহলে মানতেই হবে যে, ‘কিছু করেনি’ বা ‘কিছুই করতে পারল না’!

বাংলাদেশে সাধারণত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির আন্দোলন হয় ধ্বংসাত্মক, জ্বালাও পোড়াও পদ্ধতিতে। জাতীয় কমিটি তো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো রাজনৈতিক দল নয়। যদিও জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ সবাই কোনও না কোনওভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাম ধারার রাজনৈতিক কর্মীরা তাদের আন্দোলনের শক্তি। জাতীয় কমিটি তো জ্বালাওপোড়াও আন্দোলনের নীতিতে বিশ্বাস করে না। তারা যুক্তিতর্কবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করেন। সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে অসত্যের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলনের হাতিয়ার তথ্যপ্রমাণ, লাঠিপেট্রোল বোমা নয়।

. বলা হবে, এশিয়া এনার্জি বিরোধী ফুলবাড়ী আন্দোলনের কথা। সেই আন্দোলন একটা পর্যায়ে গিয়ে সহিংস হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, সহিংস হয়ে উঠেছিল তৎকালীন বিএনপিজামায়াত সরকার গুলি করে মানুষ হত্যার পর।  ফুলবাড়ী আন্দোলনের এলাকাভিত্তিক শক্তি প্রবল ছিল। এলাকার মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সরকারি জুলুমের বিরুদ্ধে। একইভাবে রাজশাহীর কানসাট আন্দোলন, আড়িয়াল বিলের বিমানবন্দর বিরোধী আন্দোলন করেছিল মূলত এলাকার জনমানুষ। সে কারণে এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধটা দৃশ্যমান হয়েছিল। কারণ ফুলবাড়ী, কানসাট, আড়িয়াল বিল এলাকায় মানুষ বসবাস করেন। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল মানুষ।

রামপালে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দবন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য স্থলজলজপ্রাণী। এর প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ।
সুন্দরবনের গাছবাঘহরিণকুমিরভোদরমাছকাঁকড়াসাপ তো মানুষের মতো প্রতিবাদ করতে পারে না। তাদের পক্ষ হয়ে জাতীয় কমিটি প্রতিবাদ করছে। জাতীয় কমিটির আন্দোলন বিষয়ে এক সাংবাদিক বড় ভাই লিখেছেন, হিংস্র বাঘ, বিষাক্ত সাপেরপক্ষে আন্দোলন, মানুষের পক্ষে নয়। বড় ভাই বিনয়ের সঙ্গে বলি, বাঘসাপ হিংস্র নয়। তারা মানুষের সম্পদ ধ্বংস করে না। হিংস্র বিষাক্ত হচ্ছে মানুষ। তারা বাঘসাপের জীবন ধ্বংস করে। বাঘসাপকে দেখে মানুষ যতটা ভয় পায়, মানুষ দেখে বাঘসাপ তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ভয় পায়। তাহলে হিংস্র কে? বাঘসাপ বাঁচিয়ে রাখলেই মানুষ উপকৃত হয়, তাদের ধ্বংস করলে ক্ষতি মানুষেরই হয়।

মানুষ যাতে বৃহত্তর ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে কারণেই জাতীয় কমিটির প্রতিবাদকে দেশের মানুষ সমর্থন করছেন। সরকার ক্ষমতার দাপটে সেই প্রতিবাদ গ্রাহ্য করতে চাইছেন না। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যে জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের চরিত্রহননের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষজ্ঞ ভাড়া করে এনে সুবিধা করতে পারেননি। জনগণের অর্থে জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অসত্য তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন। তাতেও খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। ‘বিশ্বাস’ এবং ‘আস্থা’ রাখতে বলছেনকোনও যুক্তি দিতে না পেরে। আস্থা তো দূরের কথা, জনগণ তাদের কোনও কথা ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। ক্ষমতার জোরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে ফেলতে চাইছে সরকার।

. দেশের মানুষপ্রবাসীদের ছাড়িয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোও সুনির্দিষ্ট করে বলছে, রামপালের কারণে ক্ষতি হবে সুন্দরবনের। ইউনেস্কো বলেছে সরকার যে তথ্য দিচ্ছে তা সঠিক নয়, সত্য নয়। এতদিন ধরে দেশের মানুষ এবং সরকারের উদ্দেশ্যে জাতীয় কমিটি যা বলেছে, ইউনেস্কোও তাই বলছে। সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্টরা খেপেছেন ইউনেস্কোর প্রতি। তাদের কথায় মনে হচ্ছে, ইউনেস্কো সম্ভবত জাতীয় কমিটির অঙ্গ সংগঠন! এখন ইউনেস্কো খুব খারাপ সংগঠন!! কেন তারা আমাদের সুন্দরবন নিয়ে কথা বলবে, তারা কথা বলার কে? ইত্যাদি প্রশ্ন তুলছেন। এই বাংলাদেশে জাতিসংঘ বা ইউনেস্কোর গুণগান কারা করেছেন, কারা করেন? ইউনেস্কো যখন শান্তি পুরস্কার দেয়, তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। জাতিসংঘের দেওয়া পুরস্কারও আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরস্কার দেওয়া অনুষ্ঠানে ‘জাতিসংঘের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন’ তাও আমরা গর্বের সঙ্গে বলি, প্রচার করি। হঠাৎ করে জাতিসংঘ, ইউনেস্কো এতটা খারাপ হয়ে গেল কেন? কারণ তারা সত্য বলছে। যা সরকারের পক্ষে যাচ্ছে না। সরকার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুধু খারাপ বলার মধ্যেই সীমিত থাকছে না! ইউনেস্কোর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের তুলনাও করা হচ্ছে!!

. আইয়ুব খানের ‘গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন’র ভূত বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপেছে। আইয়ুব খানদের বিরুদ্ধে বাঙালি সশস্ত্র আন্দোলন করে স্বাধীন হয়েছে। এখন দেশ পরিচালনা করেন বাঙালিরা। তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বা ধ্বংসাত্মক আন্দোলন করা উচিত নয়। জাতীয় কমিটি তা বিশ্বাস করে, নেতৃবৃন্দ হৃদয়ে তা ধারণ করেন। সেই বিশ্বাসের থেকেই নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি অনন্য নজীর তৈরি করেছেন জাতীয় কমিটি। দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন। সরকার জেগে ওঠা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রামপাল থেকে ফিরে আসবে, না ক্ষমতার দাম্ভিকতায় দেশ ও সুন্দরবন ধ্বংসের উদ্যোগের দিকে এগিয়ে যাবে? আগুন না জ্বালালে, সম্পদ ধ্বংস করে বাধ্য না করলে, সরকার জনগণের নায্য দাবির প্রতি কর্ণপাত করবে নাএই কী সরকারের নীতি? সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। ইতিহাস সেভাবেই মূল্যায়ন করবে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: