প্রথম পাতা > পরিবেশ, বাংলাদেশ, ভ্রমণ > বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোর পর্যালোচনা

বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোর পর্যালোচনা

সেপ্টেম্বর 27, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

নিসর্গের সৌন্দর্যের আধার বান্দরবান

bandarban-1মনু ইসলাম : দেশিবিদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় সৈকত নগরী কক্সবাজারের পরেই স্থান করে নিয়েছে বান্দরবান। তবে কক্সবাজারে বর্ষা মৌসুমে পর্যটক টানতে হোটেলমোটেলে ‘বিশাল ছাড়’ দিতে হলেও বান্দরবানে বছর জুড়ে থাকে পর্যটকের চাপ। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় তহজিন ডংক্যওক্রাডংগোল পাহাড়নীলগিরিচিম্বুক, নীলাচল পাহাড়চূড়া, দেশের সবচেয়ে উঁচু অবকাশকেন্দ্র নীলগিরি রিসোর্ট, সবচেয়ে উচ্চতার সড়কপথ থানচিআলীকদম সড়ক বান্দরবানে। দেশের নিজস্ব নদী শঙ্খ ও মাতামুহুরী, অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্না, পাহাড় চূড়ার বগালেক, নাফা খুম এবং শঙ্খ নদীপথে যেতে চোখে পড়বে রি সং সং ঝর্না, রেমাক্রি ঝর্না ও তিন্দুর পাথুরে জলপথ। আরো আছে ১১টি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ও রাখাইন জনজাতির বসবাস। তাঁদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির আস্বাদ পেতে বান্দরবানে ছুটে আসেন দেশিবিদেশি হাজারো পর্যটক।

বর্ষার রিমঝিম শব্দে পাহাড় চূড়ার কোনো রিসোর্টে সময় কাটানো, কিংবা রেস্টুরেন্টে চায়ের পেয়ালায় চুমুক, গা ছুঁয়ে মেঘের ভেসে যাওয়া অথবা শেষ বিকেলে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত পর্যবেক্ষণ কী যে অপার অনুভূতি! তা যাঁরা দেখেননি, তাঁদের কাছে অনুভবেরও অতীত। জুনঅক্টোবর প্রান্তিকে জুম ঘরে রাত কাটানো কিংবা জুমের ধানের ভাতে মধ্যাহ্ন কিংবা রাতের ভোজন কী যে মধুর! তা বুঝতে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হেঁটে অনেকে চলে যান দূরের আদিবাসীপাড়ায়।

পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে ইতোমধ্যে বান্দরবান শহরের আশেপাশে বেশ কটি বিলাসী হোটেল, অরণ্যস্পর্শী কয়েকটি রিসোর্ট এবং সহনীয় ব্যয়ের কিছু ভালো হোটেল কিংবা কম খরচের হোটেলও গড়ে ওঠেছে। এছাড়া উপজেলা শহর কিংবা দূরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আশপাশে রয়েছে আদিবাসীদের ঘরোয়া কটেজ ও খাবারদাবারের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা প্রাইভেট সেক্টরে। স্থানীয় প্রশাসনও এদিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে। জেলা শহরের নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, নাইক্ষ্যংছড়ির উপবন লেক কমপ্লেক্স, লামার মিরিঞ্জা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘নীলগিরি রিসোর্ট’ তো এখন বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ‘আইকন’।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক পর্যটনও এখানে সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। স্বর্ণমন্দির, রামজাদি মন্দির, শহরের চারদিকে মালার মতো অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির দেখতে আসছেন লাখো মানুষ। বান্দরবানের পরিচিতি এখন যেন স্বর্ণমন্দিরের স্বর্ণাভ প্যাগোডার ছবি। রামজাদি মন্দিরের আকাশ ছোঁয়া শুভ্র রঙের স্থাপনা বারবার দেখেও যেন তৃপ্ত হওয়া যায় না।

শঙ্খ এবং মাতামুহুরী নদীতে নৌভ্রমণ, খোলা জিপে (চাঁদের গাড়ি) চেপে পাহাড় চুড়ো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলা কিংবা থানচিআলীকদম সড়ক দিয়ে ‘লং ড্রাইভ’ হতে পারে অতুলনীয় অভিজ্ঞতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরো গতিশীল করতে সরকারও সচেষ্ট। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়িরাঙামাটিবান্দরবান হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ একটি পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ছোটবড় অনেক উদ্যোগ পাহাড়পাড়ায় সংযোগ স্থাপন করে আরো বেগবান করে যাচ্ছে বিদ্যমান পর্যটন সম্ভাবনাকে। বান্দরবানের সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর আপ্রাণ চেষ্টা করছেনএই জেলাকে পর্যটনবান্ধব জেলায় রূপ দিতে। এতোকিছু সত্ত্বেও শুধু আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠকরা অভিযোগ করেছেন, এতবড় সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চলে ২৫ কক্ষের একটি মাত্র হোটেল ছাড়া আর কোনো কিছুই নেই ওই মন্ত্রণালযের। মেঘলায় স্থাপিত পর্যটন হোটেলটিও পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। গত কয়েক বছর আগে এই হোটেল স্থাপিত হলেও জেলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পর্যটন করপোরেশনের কোনো অফিস বা তথ্যকেন্দ্রও নেই জেলার কোথাও। গত বছরে অন্যদের সাথে মিলে পর্যটন কার্নিভাল কিংবা মাঝে মাঝে কিছু উদ্যোগ নিলেও বছরের ৩৬৫ দিনে পর্যটন করপোরেশন থাকে নির্বিকার। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলেছেন, সরকারিপ্রাইভেটব্যক্তিগত উদ্যোগের সাথে ওই বিষয়ে অভিজ্ঞ পর্যটন করপোরেশন এগিয়ে এলে বান্দরবান হয়ে ওঠতে পারে পর্যটন খাতে দেশের প্রধানতম অর্থনৈতিক অঞ্চল।

সাজেকে মেঘের ভেলা

shajek-3আবু দাউদ : পাহাড় ঝর্না নদী ও সমতলের মেলবন্ধন খাগড়াছড়িতে দিন দিন বাড়ছে পর্যটক। আর মেঘের ভেলায় ভেসে থাকা রাঙামাটির সাজেকও দেখতে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। সাজেকের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং খাগড়াছড়ির প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করতে ছুটে আসেন সবাই।

তবে সম্ভাবনাময় ওই দুই পর্যটন এলাকার উন্নয়নে যুগোপযোগী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি পর্যটকদের। বিদেশি পর্যটকদের জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা দরকার বলে মনে করেন তাঁরা।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজুরী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে পর্যটকদের জন্য সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। শান্তিচুক্তির শর্তানুযায়ী পর্যটনখাত জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর হওয়ার পর বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এছাড়া আলুটিলাসহ সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে রয়েছে অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্র। আলুটিলা রহস্যময় গুহা, রিছাং ঝর্না, দেবতা পুকুর, দীঘিনালার তৈদুঝর্না, পানছড়ির অরণ্যকুটির এবং মানিকছড়ির মং রাজবাড়িতে পর্যটকের মেলা বসে প্রায় প্রতিদিন। গুহায় ঢুকতেই সবার শরীর শিহরিত হয়। আর পাহাড়ের সুখদুঃখের অশ্রুসিক্ত পানিতে প্রাকৃতিক ছড়া থেকে সৃষ্ট রিছাং ঝর্না এককথায় অসাধারণ। তবে সেখানে যেতে কিছুটা কষ্ট স্বীকার করতে হলেও ঝর্না দেখার পর সব কষ্ট উবে যায়। আলুটিলায় বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের তীর্থস্থান ধাতুচৈত্য বৌদ্ধ বিহারও নির্মাণশৈলীর কারণে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। শহর লাগোয়া জেলা পরিষদ পার্ক ও ঝুলন্ত সেতু পর্যটকে ঠাসা থাকে প্রায়ই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেক লীলাভূমি রাঙামাটির সাজেক। তবে সড়কপথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। পথেই দেখা মেলে বাঘাইহাটের হাজাছড়া ঝর্না। আর যেতে যেতে প্রকৃতি আর বর্ণিল জীবনধারা দেখে পর্যটকরা বিমোহিত হন। সাজেকের সবশেষ উঁচু পাহাড়ে উঠতেই পর্যটকের মনপ্রাণ ভরে যায়। মেঘ যেন ঢেকে রেখেছে সাজেক। ভেসে ওঠে অনন্য অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্য। রুইলুই থেকে কমলাক পর্যন্ত পাংখো, লুসাই, ত্রিপুরাদের জীবনযাত্রার দর্শক হতে পারেন যে কেউ। আরো আছে চাকমা আর চাকদের বসবাস।

সদ্য বিয়ে হওয়া দম্পতি ইমতিয়াজ রহমান ও আদিবা রহমান খুলনা থেকে বেড়াতে এসেছেন খাগড়াছড়িতে। তাঁরা আলুটিলায় ঘুরে মজা পেলেও মানসম্মত খাবারের দোকান এবং থাকার জন্য রিসোর্ট না থাকায় হতাশ। তাঁদের মতে, রিছাং ঝর্না ও রহস্যময় গুহা দেখার সময় নতুন পর্যটকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা থাকা দরকার।

স্থানীয় পর্যটক আবু হায়দার বলেন, ‘বিশেষত রিছাং ঝর্নায় অসতর্কতাবশত মাঝে মাঝে দুর্ঘটনাও ঘটছে। তাই পর্যটকদেরকে ঝর্নায় ঘুরতে আগেভাগে নিয়ম বলে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।’

একটি করপোরেট কম্পানির চাকুরে আমজাদ আলী বলেন, ‘মনের খোরাক মেটাতে বার বার ছুটে আসি এখানে। তবে দুর্গম সড়ক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা হলেও দুর্ভাবনায় রাখে সবাইকে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পাহাড়ের বাসিন্দা অরিন্দম চাকমা বলেন, ‘সাজেকে রিসোর্টগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া, খাবার মূল্য বেশি এবং যানবাহনগুলোর পকেটকাটা ভাড়ায় বিরক্ত হয়েছি। এজন্য প্রশাসনের আরো নজরদারি দরকার।’ তিনি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আরো আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন।

হোটেল গাইরিংএর মালিক এস অনন্ত ত্রিপুরা ও হোটেল অরণ্যবিলাসের স্বপন দেবনাথ জানালেন, পর্যটকদের স্বাগত জানাতে তাঁরা সব সময় প্রস্তুত। পর্যটকদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন এখানকার হোটেলমোটেলের সবাই। তাঁরা জানান, বিভিন্ন উৎসব ছাড়াও বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার সব কটি হোটেলের বেশির ভাগ কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে যায়। গত দুই বছরের তুলনায় এখন খাগড়াছড়িতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি তাঁদের।

মেরিন সড়ক পাল্টে দেবে পর্যটনচিত্র

marine-rdআসিফ সিদ্দিকী : ভারতের মুম্বাই শহরে সাগরের তীর ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা মেরিন ড্রাইভ সড়ক। ছয় লেনের সড়কটির পাশেই গড়ে ওঠেছে পাঁচ থেকে দুই তারকা মানের ১১২টি হোটেল। সব হোটেলই সাগরমুখী।

সড়কে গাড়ি চলাচলের পাশাপাশি সৈকত ঘিরে বিনোদনের জন্য রয়েছে আরো দুই লেনের ফুটপাত। জোয়ার এলেই আরব সাগরের ঢেউ উপচে পড়ে ফুটপাতে। আর রাতে সড়কটি হয়ে ওঠে আলোকসজ্জায় আরো অপরূপ।

আর মুম্বাইয়ের চেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বিনোদনের সব উপাদান রয়েছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও কক্সবাজার উপকূলে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে পর্যটক টানা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দেরিতে হলেও পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে দক্ষিণ কাট্টলীর রাসমনি ঘাট পর্যন্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সাগর তীর ঘেঁষে ৯০ ফুট চওড়া একটি আউটার রিং রোড নির্মাণ করছে। ওই সড়ক ঘিরে দেশিবিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া হলে পুরো এলাকার চিত্রই পাল্টে যাবে।

এছাড়া কক্সবাজার কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আরেকটি মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। ওই সড়কে একদিকে সাগর ও আরেকদিকে পাহাড়। যা মুম্বাইয়েও নেই। এই সড়ককেও কাজে লাগালে পর্যটক আকর্ষণে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

এ প্রসঙ্গে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট নিয়াজ মোর্শেদ এলিট কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি সৈকত জনপ্রিয় হওয়ার সব উপাদান রয়েছে পতেঙ্গা ও কক্সবাজারে। সেই উপাদানগুলো পর্যটকের কাছে ঠিকভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় জনপ্রিয়তা পায়নি। মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ পর্যটক আকর্ষণের একটি বড় সুযোগ। তবে মুম্বাইয়ের মতো সাগরের ঢেউ থেকে বাঁচতে সিমেন্টের টাইএঙ্গেল দিয়ে সড়কটিকে রক্ষা করতে হবে প্রথমে।’ তরুণ এ ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘সাগরের পাশে ব্র্যান্ডেড হোটেল রেস্টুরেন্ট তৈরি করা এবং সৈকতকেন্দ্রিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা গেলে অনায়াসে মুম্বাই ও দুবাইয়ের মতো জনপ্রিয়তা পাবে পতেঙ্গা ও কক্সবাজার।’

মুম্বাইয়ে পর্যটকদের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এর নাম দেওয়া হয়েছে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু সড়ক। সিমেন্ট কংক্রিট ঢালাইয়ে নির্মিত সড়কটির বড় সৌন্দর্য হচ্ছে বিশাল ফুটপাত। ফুটপাত ঘিরে খাবার থেকে শুরু করে বিনোদনের সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে সড়কের সৌন্দর্য, রাখা আছে গাড়ি পার্কিং সুবিধা। পাঁচতারা গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেল থেকে যেমন দেশিবিদেশি পর্যটক ফুটপাতে আসছেন, তেমনি স্থানীয় নাগরিকদের কেউ সেখানে গিয়ে ব্যায়াম করছেন আবার কেউ বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বাদ নিচ্ছেন। হাজার হাজার মানুষের আড্ডার মাঝখানে হয়তো সাগরের ঢেউও গায়ে আছড়ে পড়ছে।

একই সৌন্দর্য চোখে পড়ে চট্টগ্রামের নেভাল একাডেমি এলাকায়। সামান্য সুযোগসুবিধা নিয়ে অনেক আগে থেকে এটি চট্টগ্রামের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয়। কিন্তু সেখানে গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই, নেই কোনো ফুটপাত। ফলে গাড়ি রাখা, বসে খাওয়া, ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্ট সবই সড়কের উপর। তবে সেখানে অনন্য সৌন্দর্য হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর পাশ দিয়ে বড় জাহাজ চলাচল অবলোকন।

শহুরে কোলাহল থেকে একটু দূরে আরেকটি জনপ্রিয় স্থান হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের টোল সড়ক। এই সড়ক ঘিরে দুপাশে গড়ে ওঠেছে প্রচুর পিকনিককেন্দ্র। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ সেখানে যান। কিন্তু একজন বিদেশি পর্যটকের এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ নেই। কারণ সেখানে থাকা খাওয়া এবং বিনোদনের সুযোগ নেই।

সাগরপাড়ের অপরূপ সেই সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে একটি ‘স্মার্ট সিটি’ গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু সেখানে জাহাজ ভিড়ার জন্য নতুন বেটার্মিনালের কারণে সেই উদ্যোগ থমকে যায়।

তবে বেটার্মিনাল চালু হলে সেখানে দেশিবিদেশি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বাড়বে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সবচেয়ে কাছের দূরত্বে হওয়ায় ওই স্থানে গড়ে ওঠতে পারে পাঁচতারা হোটেল। আর তাহলে একজন বিদেশি বিমানবন্দরে নেমে সরাসরি সাগরপাড়ের হোটেলে থাকতে পারবেন। চাইলে কর্ণফুলী টানেল দিয়ে পার হয়ে

আনোয়ারাবাঁশখালীর উপকূল দেখতে দেখতে চকরিয়ার চিংড়ি প্রজেক্ট ও লবণমাঠে যাবেন। সেখান থেকে ঈদগাঁওয়ের চৌফলদণ্ডী থেকে খুরুসকুল পার হয়ে কক্সবাজার কলাতলী পৌঁছবেন। এরপর চাইলে হিমছড়ি ইনানী হয়ে উখিয়া টেকনাফ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন। একজন পর্যটকের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে দেশের দীর্ঘতম ‘মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে’ নির্মাণ প্রকল্প।

গাড়ি ব্যবসায়ী মাহবুবুল হক বাবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে একজন পর্যটক গাড়ি নিয়ে সাগর দেখতে দেখতে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পৌঁছবেন এটা ভাবতেই তো অন্য রকম ভালো লাগছে। সড়কটি নির্মিত হলে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের পর্যটনে বৈচিত্র্য আসবে, পাবে নতুন মাত্রা।’

জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে সমুদ্র তীর ঘেঁষে পতেঙ্গা হয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেল দিয়ে আনোয়ারাবাঁশখালী এবং সেখান থেকে চকরিয়া ও খুরুসকুল হয়ে কক্সবাজার কলাতলী হয়ে টেকনাফের সাবরাংয়ের বিশেষ পর্যটন অঞ্চল পর্যন্ত একটি ‘মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়কটি নির্মাণে সড়ক মন্ত্রণালয় থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে পৌনে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশি ২৪ হাজার কোটি টাকা। আগামী ১৪ অক্টোবর চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে সফরে এই সড়কের জন্য অর্থায়ন চাওয়া হবে। দেশটি রাজি হলে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।

অপরূপা কুয়াকাটা

kuakata_picএমরান হাসান সোহেল : সূর্যাস্তেও কুয়াকাটা, সূর্যোদয়েও কুয়াকাটা। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়সূর্যাস্তের অবলোকন শুধু অপরূপা কুয়াকাটায় সম্ভব। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ, জেলের জালে তাজা মাছের লম্ফঝম্ফ—এ ছবি সৈকতজুড়ে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে সোনারচরের হরিণের পাল, আছে শুঁটকিপল্লীর কর্মব্যস্ততা। আকাশের রঙে নীললাল হয় সাগরজল।

সৈকতের পড়শি রাখাইনপল্লী। রাখাইনদের তৈরি তাঁতকাপড় আর শামুকঝিনুকের বাহারি অলংকার চোখ জুড়াবেই। আছে ঐতিহাসিক কুয়া, সেটিও রাখাইনপল্লীতে। পাশেই বৌদ্ধ বিহার। বছরে কার্তিকের পূর্ণিমায় বসে রাস উৎসব। সবই পর্যটক টানার জন্য। এই যে এত সব আয়োজন, তবু কি পর্যটক টানতে পারছে কুয়াকাটা? শুধু পরিকল্পনার অভাবে ভেস্তে যাচ্ছে সব। হোটেলমোটেল যাই আছে, সেখানে লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। কুয়াকাটার আশপাশের রূপ ঘুরে দেখতে নেই আধুনিক কোনো যান। রয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তার অভাব, বেলাভূমির ভাঙন রোধসহ সব কিছুতেই যেন অপূর্ণতা। ফলে যেমনটা টানার কথার ছিল, তেমন পর্যটক টানতে পারছে না কুয়াকাটা। পর্যটকের অভাবে মাঝেমধ্যে শূন্য কুয়াকাটা কাঁদে।

সোনারচর : কুয়াকাটাকে ঘিরে সোনারচর। নামই বলে দেয় প্রকৃতি কতটা সৌন্দর্য বিলিয়েছে এখানে। রুপালি বালির ওপর এখানে সারাক্ষণ ছুটছে লাল কাঁকড়া। বিশাল বনাঞ্চলে সুন্দরবনের আমেজ। সোনারচরের অভ্যন্তরে খালের দুই পাশের বন যেন সবুজের নিশ্ছিদ্র দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ছোটাছুটি করছে হরিণের পাল। দেখা মেলে বুনো মহিষ, মেছোবাঘ, বুনো গরু, মোরগ ও শিয়ালের। দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির নিরাপদ বসতি এখানে। শীতে আসে অতিথি পাখি। দিনের আলোয় সোনারচরকে দূর থেকে দেখে মনে হয় কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা নিপুণ ছবি।

ক্র্যাবল্যান্ড : শীত শুরু হলেই যোগাযোগের বৈরিতা কেটে যায় ক্র্যাবল্যান্ডের। পর্যটকরা ছুটে আসে কুয়াকাটা থেকে এখানে। প্রকৃতিপ্রেমীরা সৌন্দর্যের তৃষ্ণা মেটাতেই এখানে আসে। ঘুরে বেড়ায় ক্র্যাবল্যান্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কুয়াকাটা থেকে ট্রলারযোগে এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এখানে।

ফাতরারচর : শাল, সেগুন, কেওড়া, গজারি, সুন্দরীসহ নানা বনবৃক্ষ। একই সঙ্গে দেখা মেলে হরিণ, বানরসহ নানা প্রাণীর। গাছ থেকে মধু আহরণ করছে বাওয়ালি। কতই না সৌন্দর্যের খেলা কুয়াকাটা থেকে এক ঘণ্টার দূরে ফাতরারচরে। এ ছাড়া কুয়াকাটাসংলগ্ন তুফানিয়া, চর ফরিদ ও শিবচরের সৌন্দর্য উপভোগ্য।

সমস্যার সাতকাহন : সমস্যার গ্যাঁড়াকলে পড়ে সম্ভাবনাময় কুয়াকাটার রূপসৌন্দর্য দেশিবিদেশি পর্যটকদের কাছে আজো নাড়া দিতে পারছে না। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু এবং পায়রা সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি বিভিন্ন মহলের। বিদেশি কিংবা দেশি অভিজাত পর্যটকদের থাকাখাওয়ার জন্য পাঁচ কিংবা তিন তারকা হোটেলমোটেল গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটন পুলিশ কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও রয়েছে জনবল সংকট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কুয়াকাটায় আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র এবং বেলাভূমির ভাঙন রোধে কর্তৃপক্ষকে কয়েক দফায় আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

কুয়াকাটার সৌন্দর্য বাড়ানো ও ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নিলেও তা টেবিলে টেবিলে ঘুরছে। ২০০৫ থেকে ২০০৯ অর্থবছরে কুয়াকাটায় একটি উদ্যান গড়ে তোলে বন বিভাগ। কিন্তু সাগরের অব্যাহত ভাঙনে তা এখন বিলীনপ্রায়। তবে বর্তমানে পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় কুয়াকাটা সৈকতের পূর্ব প্রান্ত গঙ্গামতি থকে শুরু করে পশ্চিম প্রান্ত লেম্বুর বন পর্যন্ত এলাকা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের ন্যাশনাল পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ওই প্রকল্প এখনো দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি।

এছাড়া কুয়াকাটার সঙ্গে সারা বিশ্বের যোগাযোগ সহজতর করতে পটুয়াখালী বিমানবন্দর পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে সম্প্রসারণ কাজ চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ওই বিমানবন্দর সক্রিয় হলে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সঙ্গে দূরত্ব ঘুচবে দেশবিদেশের।

কুয়াকাটা হোটেলমোটেল সমিতির সম্পাদক মো. মোতালেব শরীফ জানান, সন্ধ্যা হলে গোটা সৈকত অন্ধকার হয়ে যায়। নিরাপত্তায় ভোগে পর্যটকরা। কুয়াকাটার মূল পয়েন্টসহ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে প্রায় এক কিলোমিটার বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া এমিউজমেন্ট পার্ক, সিনেপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন জরুরি।

কুয়াকাটার পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লা জানান, আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রের কোনো সুবিধা নেই এখানে। একটি পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করা জরুরি। পর্যটন শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলা হলে পাল্টে যাবে কুয়াকাটা। আর্থসামাজিক অবস্থার পরির্বতন ঘটবে এ অঞ্চল জুড়ে। আসবে বৈদেশিক মুদ্রাও।

জেলা প্রশাসক এ কে এম শামীমুল হক সিদ্দিকী জানান, সৈকতের ভাঙনরোধে ইতিমধ্যে পাউবো একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পর্যটন উন্নয়ন করপোরেশন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য ওয়াচ টাওয়ার এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ২০০ একর জমির ওপর একটি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব বাস্তবায়িত হলে দেশিবিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। পাশাপাশি সোনারচর, ক্র্যাবল্যাল্ড ও ফাতরারচর আরো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

পর্যটক টানছে তৈদুঝর্না

পর্যটকদের কাছে টানছে দীঘিনালার তৈদুঝর্না। এটি রাঙামাটির সুভলং ঝর্না এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলার রিছাং ঝর্নার চেয়েও বড়। ওই ঝর্না ঘিরে রয়েছে আরো তিন ঝর্না এবং দুটি জলপ্রপাত। সব মিলিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠেছে পর্যটনকেন্দ্রটি। এছাড়া বাঘাইহাটের পাশে রয়েছে শুকনাছড়ি নামে আরেকটি ঝর্না। জানা গেছে, তৈদুঝর্নায় যেতে হাঁটাপথ প্রায় ৫০ মিনিটের। আর বাঘাইহাটের ঝর্নায় যেতে হাঁটতে হয় মাত্র ১০ মিনিট। তৈদুঝর্না দেখতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত পর্যটক আসেন। তবে যাতায়াত সুবিধা না থাকায় প্রায় এক ঘণ্টার পথ হাঁটার কারণে কিছুটা ভোগান্তিও পেতে হয় সমতল এলাকা থেকে আসা পর্যটকদের। ইতোমধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থাসহ ঝর্না এলাকাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ঝর্নার অবস্থান। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী ঝর্নাটির নাম দিয়েছে ‘তৈদুঝর্না’। ত্রিপুরা ভাষায় তৈ অর্থ পানি আর দু অর্থ ধারা। তৈদুপাড়ার অজিত ত্রিপুরা (৩৮) জানান, গ্রামের লোকজন পাহাড়ে জুমচাষ করতে গিয়ে এ ঝর্না আবিষ্কার করেন। তাঁরা ঝর্নার নাম দেয় ‘তৈদুঝর্না। সরেজমিনে দেখা যায়, তৈদুঝর্নায় পৌঁছার আগে তৈদুছড়াতে প্রায় এককিলোমিটার পর্যন্ত পড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতির বড় বড় পাথর। কিছু পাথর দেখলে মনে হয় একপাল হাতি বাচ্চা নিয়ে ছড়ার পানিতে শুয়ে আছে। পাশেই মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। পানির নিচে প্রাকৃতিকভাবে পাথর দিয়ে ঢালাই করা! পরিষ্কার পানির স্রোতে উপচে ছিটে ওঠা পানির ফোয়ারা দেখলে সেখানে ভিজে গোসল করার লোভ সামলানো কারো সম্ভব নয়। সম্প্রতি ঝর্না দেখতে এসেছিলেন দিনাজপুর থেকে মো. আসাদুজ্জামন অনিক এবং লালমনির হাট থেকে এইচ এস এম আল ছালিহ সাব্বির। তাঁরা জানান, রাঙামাটির সুভলং ঝর্না এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলার রিছাং ঝর্নায় গিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু দুজনের কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তৈদুঝর্না। তাঁদের মতে, তৈদুঝর্নায় পড়ন্ত পানির মাঝখানে বসার জন্য তিন স্তরে তিনটি জায়গা রয়েছে। যে সুবিধা অন্য ঝর্নাগুলোতে নেই। এছাড়া তৈদুঝর্নার পাশের জলপ্রপাতগুলো আরো বেশি আকৃষ্ট করে পর্যটকদের। তাই দুর্গম এলাকায় হলেও কয়েকবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে তৈদু ঝর্নাায় গিয়েছেন তাঁরা। কীভাবে যাবেন : খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে গাড়িতে নয় কিলোমটাির দূরে নয়মাইল নামক স্থানে নামতে হবে। সেখান থেকে যেতে হবে সীমানাপাড়া। এর পর হাঁটাপথ শুরু। প্রায় এক ঘণ্ট হাঁটার পর দেখা মিলবে তৈদুঝর্না।

মিরসরাইএর ছয় পর্যটনকেন্দ্রের হাতছানি

এনায়েত হোসেন মিঠু : অপার সম্ভাবনা আছে মিরসরাই উপজেলার পর্যটন স্থানগুলোর । দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ মহামায়া প্রকল্প এলাকা ছাড়াও এখানকার ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প, বঙ্গোপসাগর উপকূলের ১৮ কিলোমিটার সবুজ বনায়ন, ওয়াহেদপুরের বাওয়াছড়া প্রকল্প, খৈয়াছড়া ঝর্না ও নাপিত্তার ঝর্না পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে। বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি না পেয়েও ওই ছয় স্থানে ভ্রমণপ্রিয় মানুষের ঢল নামে।

মহামায়া লেক : ২০১০ সালের ডিসেম্বরে মহামায়া সেচ প্রকল্পের উদ্বোধনের পর থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক আসতে শুরু করে। সেই সময় পাহাড়ি ঝর্না অভিমুখে মহামায়া ছড়ায় বাঁধ দেওয়া হলে ১১ বর্গকিলোমিটার হ্রদের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এর পরিধি বেড়ে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার অতিক্রম করেছে। যা ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকৃষ্ট করে।

মুহুরী প্রজেক্ট : ১৯৮৪ সালে বাস্তবায়িত হয় মুহুরী প্রকল্প। মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সীমানা চিহ্নিতকারী ওই প্রকল্প এলাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে পর্যটকদের মাঝে। এখানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ বেড়াতে আসেন।

উপকূলীয় বনায়ন : উপজেলার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর উপকূলকে রক্ষা করতে ১৯৮৪ সালে নির্মাণ করা হয় একটি বেড়িবাঁধ। বাঁধের পার্শ্ববর্তী ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সরকারের উপকূলীয় বনবিভাগ হাতে নেয় বনায়ন প্রকল্প। বর্তমানে বাঁধের পার্শ্ববর্তী এলাকাজুড়ে সবুজের সমারোহ। এখানে প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় নানা প্রজাতির দেশিবিদেশি পাখির কুজনে মুখরিত হয় সবুজ এ বনায়ন এলাকা। রয়েছে পর্যটকদের আনাগোনা।

ওয়াহেদপুর ভাওয়াছড়া প্রকল্প : উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের পাহাড়ি ঝর্না অভিমুখে কৃষি সেচের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল ভাওয়াছড়া সেচ প্রকল্প। মধ্যম ওয়াহেদপুর গ্রামে কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয় ছোটাকারের একটি লেক। বেসরকারি একটি সংগঠন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এলাকাটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠেছে। সেখানেও ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় জমে।

খৈয়াছড়া ঝর্না : খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ে এ ঝর্নার অবস্থান হওয়ায় পর্যটকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘খৈয়াছড়া ঝর্না’। কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ওই ঝর্নার সৌন্দর্য আর বিশালত্ব প্রকাশ পায়। এরপর দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে আসতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে দুর্গম এলাকায় ঝর্নার অবস্থান হওয়ায় বেশ কয়েকজন পর্যটক ছিনতাইয়ের শিকার হন। উঁচু পাহাড় বেয়ে উঠার সময় কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটে।

নাপিত্তার ছড়া ঝর্না : প্রপাতের মতোই স্বচ্ছ জলরাশি গড়িয়ে পড়ছে পাথরের পর পাথরে। নির্জন শান্ত পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে পানির ধারা আছড়ে পড়ছে নেমে আসছে সমতলে। মনে হবে যেন লতাপাতাগুল্ম, বাঁশবন, বুনোফুল আর পাহাড়ি সবুজ পরম মমতায় আগলে রেখেছে ওই ক্যানভাস। পর্যটকদের কাছে যা ‘নাপিত্তার ঝর্না’ নামেই পরিচিত। ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের নয়দুয়ারিয়া এলাকা থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বের গহিন পাহাড়ে এর অবস্থান। এখানেও খুব ঝুঁকি নিয়ে দেশের নানা জায়গা থেকে ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকেরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: