প্রথম পাতা > তথ্যপ্রযুক্তি, বাংলাদেশ > দেশে জমে উঠছে কলসেন্টার সেবা

দেশে জমে উঠছে কলসেন্টার সেবা

সেপ্টেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

call-centre-workersমিন্টু হোসেন : হ্যালো, বলুন কীভাবে আপনার সেবা করতে পারি?’ কম্পিউটারের সামনে কানে হেডফোন লাগিয়ে মিষ্টি গলায় শুদ্ধ বাংলায় কথাগুলো বললেন তাসমীম নামের এক তরুণী। টেলিফোনে অচেনা এক ভোক্তার কাছ থেকে জেনে নিলেন পণ্যসংক্রান্ত অভিযোগ।

তাসমীম এই পেশায় যোগ দিয়েছেন মাত্র দুই মাস হলো। এরই মধ্যে দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। যে ধরনের প্রতিষ্ঠানে বসে তিনি এ কাজ করছেন, সেগুলোর সাধারণ নাম কলসেন্টার। তাসমীমের কলসেন্টারটির নাম উইন্ডমিল। তাঁর মতো আরও ৫০ জন নারী কর্মী সেখানে কাজ করছেন। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা গ্রহণকারীর অভিযোগ টেলিফোনে গ্রহণ করে সেটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়ে দেওয়াই কলসেন্টারগুলোর প্রাথমিক কাজ। আরও নানা ধরনের কাজ আছে।
রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় উইন্ডমিল কলসেন্টারটিতে পালা করে রাত আটটা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন নারী কর্মীরা। ২৫ জন পুরুষ কর্মী কাজ করেন কখনো দিনের পালায়, কখনো রাতে। রাতের পালা মানে সারা রাতের কাজ।

উইন্ডমিলের প্রধান নির্বাহী বুশরা আলমও একসময় গ্রামীণফোনের কলসেন্টারে চাকরি করেছেন। এখন নিজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। বুশরা আলম প্রথম আলোকে বলেন, কলসেন্টার সম্পূর্ণ নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নতুন ধরনের পেশা। তরুণদের জন্য খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ তৈরি করেছে কলসেন্টারগুলো। যোগ্যতার চাহিদা খুব বেশি কিছু নয়—শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে হবে। যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ এই পেশা বেছে নিতে পারে।

বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৯৬টি কলসেন্টার চালু আছে। এগুলোয় কাজ করছেন প্রায় ৩০ হাজার লোক। ২৬টি প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে। বাকি ৭০টি কলসেন্টার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেবা দেয়। বিটিআরসি ৩৭৭টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) সূত্র জানায়, আগে শুধু বিদেশ থেকে আসা আউটসোর্সিংয়ের কাজের ওপর ভরসা করতে হতো। এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে দেশীয় পণ্যসেবার প্রসারের কারণে। এখন অনেক দেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই কলসেন্টারকে কাজ দিচ্ছে। এমনকি রাজধানীর পানি সরবরাহকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসাও এখন তাদের সেবা আউটসোর্স করেছে। ওয়াসার গ্রাহকসেবার হট নম্বর ১৬১৬২তে ফোন করলে এখন অত্যন্ত আন্তরিক কণ্ঠের যে তরুণ বা তরুণী ফোন ধরেন, সেটি আসলে এক কলসেন্টার কর্মীর। প্রসারের এই গতি থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি বড় খাত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব।

call-centre-processরাজধানীর কয়েকটি কলসেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটিতে ৫০৬০ জন থেকে শুরু করে দেড় হাজার পর্যন্ত কর্মী কাজ করছেন। ৪০ শতাংশ নারী কর্মী। ১০০ বা তার কাছাকাছি কর্মী নিয়ে চালু থাকা কলসেন্টারগুলো থেকে বার্ষিক আয় আসছে পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি। আর দেড় হাজার কর্মীর একটি কলসেন্টারের বার্ষিক আয় ৩০ কোটি টাকার বেশি।

দেশের বাইরে থেকেও বিপুল কাজ আসছে। আটটি দেশ থেকে কাজ টেনে আনছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া শীর্ষে। কলসেন্টারের উদ্যোক্তারা বলছেন, এটির পরবর্তী বড় বাজার হতে পারে জাপান।

তবে শুধু ফোনে পণ্য ও সেবা গ্রাহকের অভিযোগ শোনাই কলসেন্টারের একমাত্র কাজ নয়। আরও নানা ধরনের কাজ আছে। সেই সব কাজের সঙ্গে ফোনের কোনো যোগ নেই। বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন ডেটা (উপাত্ত) প্রসেস করা, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করা, মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন (চিকিৎসকের হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র পড়ে সেটা থেকে ডেটাবেজ তৈরি করা) ইত্যাদি। এই সব কটি কাজকে একত্রে বলা হয় বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা বিপিও।

২০২১ সাল নাগাদ বিপিও খাতে এক বিলিয়ন ডলার বা আট হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিপিও একটি অগ্রসরমাণ খাত এবং এ খাতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক অনেকগুলো উপাদান আমাদের আছে। এ খাতে এক লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।’

বাক্যএর প্রেসিডেন্ট আহমাদুল হক বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই এখন কলসেন্টারে তাদের সেবা আউটসোর্স করেছে। এদিক থেকে বললে দেশে স্থানীয় বাজার বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ সেবা খাতে যুক্ত হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাত বিপিওতে যুক্ত হলে বিপিও খাত আরও বড় হবে।

২০১০ সালে আটজন কর্মী নিয়ে শুরু হয়েছিল কলসেন্টার ডিজিকন। এখন দেড় হাজার কর্মী কাজ করছেন রাজধানীর উত্তরা ও নিকুঞ্জে প্রতিষ্ঠানটির দুটি আউটলেটে। দেশি প্রতিষ্ঠানের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও সেবা দিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। এটির বার্ষিক আয় ৩০ কোটি টাকার ওপরে। এটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাক্যএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ শরীফ বলেন, দেশে কলসেন্টারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। মাত্র কয়েক বছরে স্থানীয় বাজারে চাহিদা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এখন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সেবাও কলসেন্টারে আসতে শুরু করেছে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের একটি কলসেন্টার হ্যালো ওয়ার্ল্ড। ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই কলসেন্টারে বর্তমানে ৫০০ কর্মী কাজ করছেন। এটির প্রধান নির্বাহী মেজবাহ উদ্দিন জানান, তাঁদের বার্ষিক আয় ৬ কোটি টাকার মতো। দ্রুত কর্মী বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।

প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কলসেন্টারে কাজ করে এখন সুপারভাইজার (পরিদর্শক) পদে উইন্ডমিল কলসেন্টারে কাজ করছেন নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, অফিসের চাহিদা অনুযায়ী দিনের যেকোনো শিফটে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে। প্রত্যেক কর্মীকে দিনে ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত কল গ্রহণ করতে হয়। আগে কলসেন্টারে গ্রাহক ও কর্মী ছিল কম। গত কয়েক বছরে কর্মী বেড়েছে। এখন দিনেরাতে সব সময় কাজ হচ্ছে। নারী কর্মীরা সাধারণত সারা রাতের ডিউটি করেন না। তবে নিরাপত্তা পেলে অনেকে হয়তো কাজ করতে রাজি হবেন।

সদ্য একটি কলসেন্টারে যোগ দেওয়া রাফসান রহমান বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি কলসেন্টারে কাজ করছি। এতে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি। এখানে যাঁরা কাজ করছেন, বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। সবার মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেছে।’

২০০৯ সাল থেকে ছাত্র অবস্থায় কলসেন্টারে কাজ করেছেন জায়েদ উদ্দিন। ২০১৪ সালে দাঁড় করান নিজের একটি প্রতিষ্ঠান। এএসএল নামের প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে ননভয়েস আউটসোর্সিং নিয়ে। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকের জন্য রিপোর্ট তৈরি করে দেন।

কলসেন্টার বা সার্বিকভাবে বিপিও খাতের বিপুল সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এ ক্ষেত্রটি নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। সম্প্রতি বিপিও খাতের সার্বিক চিত্র পেতে একটি গবেষণা শুরু করেছে বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম (বিআইজেএফ)। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তরিক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিপিও খাতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রথমবারের মতো কাজ হচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, এ খাত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০০৭ সালে যখন এর যাত্রা শুরু হয়, তখন মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন প্রায় ১০০ প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে এখন বিপিওর বাজার দাঁড়িয়েছে ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার।

ফিফোটেক নামের একটি কলসেন্টারের কর্মী সোনিয়া হাসান বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখন পড়াশোনা শেষ করে পূর্ণকালীন কাজ করছেন। ফিফোটেকের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫০। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন নারী। ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে একই পরিবেশে কাজ করেন বলে খুব ভালো সময় কাটে।

বিটিআরসির সচিব সরওয়ার আলম বলেন, এ খাত সামনে এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: