গল্পঃ কঠিন প্রেম !

tough-loveজিনিয়া জাহিদ, অ্যাডিলেড (অস্ট্রেলিয়া) থেকে : ঋতু আর রিফাত ছিল আমার ইউনিভার্সিটির খুব কাছের বন্ধু। ঋতু বেশ সুন্দরী আর স্মার্ট। দুই ভাইয়ের একটিমাত্র বোন। ঢং আর আহ্লাদী একটু বেশি হলেও কোনো ধরনের অহংকার ওর মাঝে কখনো দেখিনি।

অন্যদিকে, রিফাতের একাডেমিক রেজাল্ট ফার্স্ট ক্লাস না হলে কী হবে, রিফাত বেশ মেধাবী ও স্মার্ট ছিল। আমাদের ভার্সিটির কাছেই রিফাতদের বাসা। কাজেই ওর ফ্যামিলির সবার সঙ্গেও আমাদের খুব ভালো পরিচয় ছিল। আংকেলআন্টি আমাদের ভীষণ আদর করতেন। যেহেতু আমরা হলে থাকতাম, তাই আন্টি প্রায়ই আমাদের ডেকে পাঠাতেন। মজার মজার রান্না করে খাওয়াতেন।
রিফাত যে ঋতুকে ভীষণ পছন্দ করত আমরা বন্ধুমহলের সবাই টের পেতাম। ঋতুও বুঝে না বোঝার ভান করত। সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে আমরা ক্লাসের সবাই বিরিশিরি পিকনিকে গিয়েছিলাম। সেখানেই রিফাত ঋতুকে ফরমালি প্রোপোজ করে। ঋতুও অনেক ঢং রং করে রিফাতের প্রপোজালে হ্যাঁ বলে দিয়েছিল।

বিরিশিরি থেকে ফিরে আসার পর ক্যাম্পাসে, এমনকি রিফাতের বাসাতেও ওদের প্রেমের কথা জানাজানি হতে বেশি সময় নিল না। ঋতুর সঙ্গে রিফাতের প্রেমের সম্পর্কতে ওর বাবামাকে বেশ খুশি হতে দেখেছিলাম। ওদের বাসায় বেড়াতে গেলেই প্রায়ই রিফাতের মা বলতেন, অনার্স শেষ করে রিফাত আর ঋতুর বিয়ে দিয়ে কানাডাতে পাঠিয়ে দেবেন। রিফাতের বড় বোন কানাডাতে থাকেন। আংকেলআন্টি নিজেরাও কানাডাতে ছিলেন অনেক দিন। কাজেই ঋতু আর রিফাতের সম্পর্কটার মধুর পরিণতি নিয়ে আমাদের মনে কোনো কিন্তু ছিল না। ওরাও নিশ্চিন্ত মনে পড়াশোনা, ঘোরাঘুরি করত।

এভাবেই থার্ড ইয়ার শেষ হয়ে এল। সেবার ফাইনাল পরীক্ষা শেষে আমাদের মাত্র দুই মাসের ছুটি ছিল। কিন্তু রিফাত আর ঋতুর মন খারাপ দেখে মনে হচ্ছিল ওদের কাছে যেন এই দুই মাস দুই যুগের সমান। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আমি আর ঋতু বাসস্ট্যান্ডে ছুটলাম। রিফাত এসেছিল ঋতুকে সিঅফ করতে।

দুই মাস পর আমরা সবাই ক্যাম্পাসে ফিরলাম। ঋতু তখনো ফেরেনি। রিফাতেরও পাত্তা নেই। রিফাতের বাসায় গিয়ে শুনলাম আংকেলআন্টি কানাডাতে গেছেন তাঁদের মেয়ের কাছে।

ক্লাস পুরোদমে শুরু হলো। রিফাতকে তেমন একটা ক্লাসে দেখতাম না। ও অবশ্য কখনোই ক্লাসে নিয়মিত ছিল না। কয়েক দিন পর রাস্তায় একদিন রিফাতের সঙ্গে দেখা। ওর ভাব দেখে মনে হলো, ও যেন আমাদের তিন বন্ধুকে চিনতে পারছে না। আমরা ওকে এত ডাকলাম, কিন্তু না শোনার ভান করে চলে গেল। আমাদের প্রেস্টিজ পুরাই পাংচার। এত মেজাজ খারাপ হলো যে, আমরা সেদিন প্রোমিজ করলাম এই ব্যাটার সঙ্গে জীবনেও কথা বলব না। বন্ধুর লিস্ট থেকে ওর নাম আমরা কেটে দিলাম। এখন শুধু ঋতুর জন্য অপেক্ষা করছি আমরা। দেখি যদি ঋতুকে দেখলে বদমাশটার ‘খোয়া হুয়া ইয়াদ ফেরত আসে।’ কিন্তু ঋতু কেন এখনো ফিরছে না এটা নিয়ে আমরা মারাত্মক টেনশনে পড়ে গেলাম। তখন মোবাইল ফোন এত এক্সপেনসিভ ছিল যে, নিজেদের মোবাইল থাকার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না।

একদিন ক্লাস থেকে হলে ফিরছি। হলের গেটেই গার্ড মামা খবর দিলেন যে ঋতু এসেছে। আমরা তিন বন্ধু নিজেদের রুমে না ফিরে ঋতুর রুমে দৌড় দিলাম। ওরে বাবা, ওর রুমে দেখি সিনিয়রজুনিয়র সব মেয়েদের ভিড়। সবাই হামলে পড়ে কী যেন দেখছে আর হাসাহাসি করছে। ভিড়ের ভেতর বহু কষ্টে উঁকি মেরে দেখি ঋতু মহা উৎসাহে অ্যালবাম দেখাচ্ছে। বিয়ের অ্যালবাম!
ওহ কাহিনি তাহলে এই। আমাদের দেখে ওই সবার আগে হড়বড় করে বলতে লাগল যে, পাত্র আমেরিকা থেকে ব্যাচেলর করেছে টেলিকমিউনিকেশনের ওপর। নামকরা একটি মোবাইল কোম্পানিতে কাজ করছে সেখানেই। ওর কোনো এক আন্টির বান্ধবীর ছেলে। ওদের বাসায় বেড়াতে এসে ওকে এত পছন্দ হয়েছিল যে পাত্রপক্ষ সেদিনই আংটি পরিয়ে দিয়েছেন। পাত্রের হাতে মোটেও সময় ছিল না। হোটেল সোনারগাঁয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পাত্র দুদিন পর আমেরিকায় চলে গেছে। পাত্রের ছবি দেখে তো আমরা পুরাই তাজ্জব! এত হ্যান্ডসাম!

রাতে হলের ছাদে বসে আমরা ঋতুকে ওর বিয়ের রাতের গল্প বলার জন্য চেপে ধরলাম। কিন্তু আমাদের সব আগ্রহে পানি ঢেলে ও জানাল, কিছুই হয়নি। বিয়ের রাতেও না, পরদিনও না। আর তারপর দিন তো উনি চলেই গেলেন। আমরা চিৎকার দিয়ে বললাম মানে কি? ও হেসে বলল, ভালোই হয়েছে। কয়দিন পর আমেরিকা যাব, ইস আমার কত শখ দেশবিদেশ ঘুরব। এমন আনন্দের মুহূর্তে হঠাৎ করেই লিজা ফোঁস করে বলে বসল, তুই তো রিফাতকে বিয়ে করলেও বিদেশে যেতে পারতিস। ওকে চিট করলি কেন? উত্তরে ঋতু বলল, জানিস আমার গায়েহলুদের দিন রিফাত আমাদের বাসায় এসেছিল। ও ভাবতেও পারেনি যে আমারই গায়েহলুদ হচ্ছিল। আসলে সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল, রিফাতের সঙ্গে যে আমার প্রেম ছিল এটাই ভুলে গিয়েছিলাম। রিফাত আমাকে বলেছিল ওর সঙ্গে চলে আসতে। কিন্তু আমি ওকে ফিরিয়ে দিলাম। নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর ঋতুকে দেখে বুঝলাম সেদিন কেন রিফাত আমাদের অ্যাভোয়েড করেছিল।

homoসময় কেটে যাচ্ছিল দ্রুতগতিতে। দেখতে দেখতে ফাইনাল শেষ। পড়াশোনা শেষে যে যার মতো আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম। ঋতু আমেরিকা উড়াল দিল। কিছুদিন পর আমিও হায়ার স্টাডির জন্য ইউরোপে। ফেসবুকে না থাকার জন্য সবার সঙ্গেই আমার যোগাযোগ আস্তে আস্তে ছিঁড়ে যেতে লাগল।

অনেক দিন পর স্কাইপএ দেখি ঋতুর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকসেপ্ট করেই কল দিলাম। অনেক কথা হলো। কথায় কথায় খেয়াল হলো ওর ওখানে অনেক রাত হয়েছে। দুষ্টুমি করে বললাম, তোর বর তো মনে হয় আমার ওপর রেগে যাচ্ছে, পুরান প্যাচাল পেড়ে তোদের রোমান্টিক রাতের বারোটা বাজাচ্ছি।

হঠাৎই দেখি ঋতুর হাসি হাসি মুখে বিষাদের ছায়া। প্রায় ফিসফিস করে বলল, সেই যে বলেছিলাম আমাদের মাঝে কিছু হয়নি, জানিস আমাদের মাঝে আজ এত দিন পরেও কিছু হয়নি। আমি একরাশ বিস্ময় নিয়ে বললাম, মানে কি? তোর মতো সুন্দরীতেও অরুচি? উনি তোকে ভালোবাসেন না? তোকে কি টর্চার করেন নাকি? ঋতু তাড়াতাড়ি বলল, না না ও আমার ভীষণ যত্ন করে। আমার কখনো অভাব রাখেনি। যা করতে চাই, নিষেধ করেনি কখনো। যেখানে বেড়াতে যেতে চাই, সেখানেই নিয়ে যায়। আমি কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বললেই ও অসুস্থ হয়ে যায়। আমি ওকে ছেড়ে চলে গেলে ও সুইসাইড করবে বলে জানিয়েছে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তাহলে সমস্যা কোথায়? একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ঋতু জানাল, আমেরিকাতে ব্যাচেলর করার সময়ই ওর এক বন্ধুর সঙ্গে প্রেম হয়। সে প্রেম এখনো আছে। কঠিন প্রেম। আমি রেগে গিয়ে বললাম, তাহলে ওই বন্ধুকেই তো বিয়ে করতে পারত, তোকে কেন? আর পরকীয়া জেনেও তুই তার সঙ্গে আছিস কেন? ম্লান হেসে ঋতু বলল, এই দামি ঝকমকে জীবনের মায়ায় পড়ে গেছি রে। ঋতুর মুখে চরম সত্যি কথাটা শুনে এত রাগ লাগল আমার! বললাম, তোর হাজব্যান্ড অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে, তার সঙ্গে কঠিন প্রেম, এসব জেনেও তুই তার সঙ্গে আছিস? ছি, ছি! তুই কি রে? আমাকে অবাক করে দিয়ে ঋতু বলল, উনি যাকে ভালোবাসেন, যার সঙ্গে ওনার কঠিন প্রেম তিনি মেয়ে নন, একজন ছেলে। মানে কি? মানে হলো আমার হাজব্যান্ড হোমোসেক্সচুয়াল। মানে সমকামী।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: