মোগল সম্রাটদের জীবন

সেপ্টেম্বর 20, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

mughal-akbarমোগল সম্রাটরা নিজ নিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধ সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। সম্রাট বাবর থেকে শুরু করে সোনালী যুগের সব সম্রাটই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। সুবিচারের দিকে তাদের বিশেষ নজর ছিল। মোগল সম্রাটদের সবাই সাম্রাজ্যে সুবিচারের ব্যবস্থা করতেন। তারা ঘনিষ্ঠজনদেরও কোনো অন্যায় প্রশ্রয় দিতেন না। তারা সরাসরি আবেদনকারীদের কথা শুনতেন। দরবারে বাদশাহের উপস্থিতিতেই ফৌজদারি ও দেওয়ানি মোকদ্দমার শুনানি হতো। এছাড়া সপ্তাহে একটি দিন সম্রাট বিশেষভাবে বরাদ্দ রাখতেন বিচারের জন্য। আকবরের সময় প্রতি বৃহস্পতিবার, জাহাঙ্গীর মঙ্গলবার, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেব বুধবার এসব বিচারের ফায়সালা করতেন।

বাবর ভারত অধিকার করার পর বেশিদিন জীবিত ছিলেন না। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীর বাহিনীকে হারানোর পর তিনি সাম্রাজ্য সুসংহত করতেই বেশিরভাগ সময় পার করে দেন। মাত্র চার বছর পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জীবনের প্রায় পুরোটাই ছিল যুদ্ধবিগ্রহ। সম্রাট হুমায়ুনও সম্রাট হিসেবে বেশিদিন সুযোগ পাননি। ১৫৩০ থেকে ১৫৩৯ সাল পর্যন্ত শাসক হিসেবে থাকলেও নানা যুদ্ধে তার সময় কেটেছে। অবশেষে শেরশাহের কাছে হেরে তাকে যাযাবর জীবন বেছে নিতে হয়েছিল। ১৫৫৫ সালে ভারতবর্ষের একটি অংশে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠার পরের বছরই তিনি মারা যান।

মূলত সম্রাট আকবরের থেকেই মোগলদের আসল রাজত্ব শুরু হয়। তিনি রুটিন মাফিক কাজ করতেন। তিনি সূর্যোদয় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন। মাত্র একবেলা পরিপূর্ণ খাবার খেতেন। বলাবাহুল্য সেটি ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের অব্যবহতি পরেই তিনি প্রজাদের দর্শন দানের জন্য ঝরোকায় উপস্থিত হতেন। তিনি দেড় প্রহর পর্যন্ত ঝরোকা দর্শনে থাকতেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের আমলেও এই প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে সম্রাট আওরঙ্গজেব তা হিন্দুভাবাপন্ন বিবেচনা করে তা বাতিল করেন।

ঝরোকাদর্শনের পর অনেক দিন আকবর হাতির লড়াই উপভোগ করতেন। হাতি ছিল আকবরের অত্যন্ত প্রিয় পশু। তার বিকেলের কর্মতালিকা ছিল অনেক বড়। এ সময় তিনি সরকারি জীবজন্তু তত্ত্বাবধান, সরকারি কারখানার উৎপাদন ব্যয় পরীক্ষা, নতুন নতুন নিযুক্তপত্র সই করা ছিল তার প্রধান কাজ। তাছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ি অন্যান্য সরকারি কাজও এ সময় করতেন। বিভিন্ন রাজ্যের দূতরা, গণ্যমান্য প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজ্যের শাসকদের সাথে বাদশাহ সাধারণত বিকেলেই সাক্ষাৎ ও আলোচনা করতেন। আবুল ফজল, বাদয়ুনি প্রমুখ উপদেষ্টা এ সময়েই বাদশার সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে পারতেন। পরাজিত ও বন্দী শত্রু, বিদ্রোহী প্রভৃতিদের বিকেলেই বাদশার সামনে হাজির করা হতো। সম্রাট জাহাঙ্গীরের কর্মতালিকার পরিপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে তিনিও তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

সম্রাট শাহজাহানের আমলে ঝরোকাদর্শন বেশ জাঁকজমক ছিল। তার ঝরোকাদর্শন দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। তারপর তিনি বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে বসতেন। তিনি প্রতিদিন জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। মোগল সম্রাটদের মধ্যে আওরঙ্গজেব ছিলেন সবচেয়ে কর্তব্যনিষ্ঠ, পরিশ্রমি ও ন্যায়পরায়ণ। তিনি মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমাতেন, বাকি সময় তিনি রাষ্ট্রের কাজে ব্যয় করতেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রীয় কাজ সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত। এটি বিশ্বস্ততার সাথে পালন করতে হবে। তিনি আনন্দবিনোদনে সময় নষ্ট করতেন না। তিনি তিনি খাবারও খেতেন অতি সামান্য। তিনি রুটিন অনুযায়ি সব কাজ করতেন। তার কোনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি নিজেই পুরো কাজ করতেন। এমনকি ব্যক্তিগত খরচও তিনি করতেন নিজের তহবিল থেকে। রাজকোষ থেকে তিনি নিজের জন্য কোনো অর্থ গ্রহণ করতেন না।

স্বর্ণযুগের সব মোগল সম্রাটই জনস্বার্থে অনেক কাজ করে গেছেন। মোগল সম্রাটরা ওই সময়ে যে প্রশাসন গঠন করে যান তা ছিল সে সময় বিশ্ব সেরা। মোগল সম্রাটরা প্রায় সব কাজেই পারদর্শী ছিলেন। তাদের শিল্পকলা জ্ঞানও ছিল কিংবদন্তিতুল্য। এতেই বুঝা যায় মোগল সম্রাটরা স্রেফ ভোগ বিলাসে মগ্ন ছিলেন না, বিচার ব্যবস্থায়ও তারা বেশ দক্ষ ছিলেন।

সূত্রঃ দৈনিক পূর্বকোণ, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: