প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, রাজনীতি > নব্য সুলতান তুরস্ককে কোথায় নিয়ে যাবেন?

নব্য সুলতান তুরস্ককে কোথায় নিয়ে যাবেন?

সেপ্টেম্বর 20, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

sultan-erdoganএম আবদুল হাফিজ : রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের ক্ষমতালিপ্সার কোনো খ্যাতি নেই। ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত তুরস্কের এ প্রেসিডেন্ট কারও সঙ্গে তার মতদ্বৈধতাকে কদাচিৎ সহজে গ্রহণ করেন। নিন্দুকেরা বরং তাকে প্রতিহিংসাপরায়ণতার অপবাদ দেয়। এ প্রতিহিংসায় তিনি তার বিরাগভাজনের বয়স, লিঙ্গ বা জাতীয়তার কোনো বাছবিচার করেন না। যদিও তুরস্কে তার ভক্ত ও সমর্থকের সংখ্যা কম নয়। আবার সমসংখ্যক তুর্কিরা তাকে বিদ্বেষের চোখেও দেখে। লোকে তাকে অনৈক্যের হোতা এবং একজন স্বৈরশাসক হিসেবেই জানে।

বিগত ১৩ বছরে তার শাসনের মেয়াদে ১১ বছর তিনি ছিলেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গত ২ বছর ধরে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরদোগানের রসায়ন এমনই যে, তিনি একজন ১৬ বছর বয়স্ক কিশোরকেও জেলে ঢুকিয়েছেন। শুধু এ কারণে যে, সে এরদোগানের ছবি সংবলিত একটি পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছিল। এরদোগান তুরস্কেরই এক সাবেক বিউটি কুইনকেও কারারুদ্ধ করেছিলেন। হতভাগ্য ওই সুন্দরীর অপরাধ ছিল তিনি ফেসবুকে প্রেসিডেন্টের নিন্দাজ্ঞাপনমূলক একটি কবিতাকে ভালো লাগার কথা বলেছিলেন।

এছাড়া দেশের সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার নিন্দুকেরা কারান্তরালে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে একই ভাগ্যবরণ করেছেন। এরদোগান সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিভাবান সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করে নিজস্ব এজেন্টদের নিয়োগ দিয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন। এরদোগান প্রেসিডেন্ট পদ অলংকৃত করা ছাড়াও ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির কর্ণধারও বটে। কোনো কোনো সময়ে তার প্রতিহিংসাপরায়ণতার আওতা তুর্কি সীমান্তও ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশী যারাই তাকে সাক্ষাৎকারে অথবা সাংবাদিক মিথস্ক্রিয়ায় অপ্রস্তুত করতে চেষ্টা করেছেন, এরদোগানের গোয়েন্দা এজেন্টরা প্রেসিডেন্টের হয়ে সেসবের জবাব দিতে সদা প্রস্তুত থেকেছে।

সে যাই হোক, তুরস্কের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানচেষ্টার নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেশটির পর্যবেক্ষকরা। আপাতদৃষ্টিতে দেখা গেছে, সামরিক বাহিনীর একটি অংশ পার্লামেন্ট ভবন, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলের চেষ্টা করেছিল অভ্যুত্থানকারীরা। স্পষ্টতই তারা একই সঙ্গে এরদোগানকে উৎখাতের লক্ষ্যও হাসিল করতে চেয়েছিল। অভ্যুত্থানের সময়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান রাজধানীর অদূরে অবকাশযাপন করছিলেন।

তুরস্কে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ষাটের দশকের শুরুর দিকে তুরস্কের সেনাবাহিনী চারবার বেসামরিক সরকার উৎখাত করে অভ্যুত্থান ঘটাতে রাজনৈতিক সহযোগীদের সাহায্য করে। প্রতিবারই লক্ষ্য ছিল তুরস্কের মৌলভিত্তি সেক্যুলারিজম, যার ওপর কামাল আতাতুর্ক অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক তুরস্ককে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তুরস্কের জাতির পিতা কামাল আতাতুর্ক নিজে সৈনিক ছিলেন, যার ফলে সেনাবাহিনী সব সময়ই একটি বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির অবস্থানে থেকেছে। তবে এ সত্ত্বেও ১৯৯৭ সালের পর সেনাবাহিনীকে আর সেই অবস্থানে দেখা যায়নি।

২০০৭ সালে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একেপি) পার্টির একজন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আবদুল্লাহ গুল প্রেসিডেন্ট হতে চেষ্টা করলে দেশের জনগণ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং সামরিক শাসনের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট করে। এরপর তুরস্কে সেনাবাহিনী আরও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। তাই সাধারণ তুর্কিদের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি বিরূপ মনোভাবে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু এখানেই এ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে না। এরদোগানের সমর্থকদের রাজপথ দখল, বিদ্রোহী সৈনিকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা এবং পরে বিদ্রোহীদের দর্পচূর্ণএ সবই এ অধ্যায়েরই অংশ। শত শত শীর্ষ সেনাকর্মকর্তা এবং হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক, বিচার বিভাগীয় পদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণের পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট এবং তার অনুগামীরা অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শেকড় উৎপাটন না করে ক্ষান্ত হবেন না। ইতিমধ্যে ৫০ হাজার রাষ্ট্রীয় কর্মচারীকে বরখাস্ত অথবা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অনেক সন্দেহভাজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণও স্থগিত। বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে ৩৪ জন সাংবাদিককে প্রদত্ত সরকারি সনদ বাতিল করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বোঝাই যায়, আপাতত ৩ মাসের জন্য আরোপিত জরুরি অবস্থাকে এরদোগানের ক্ষমতা আরও সংহত করতেই ব্যবহার করা হবে। এ সময়কালে যে কোনো সন্দেহভাজনকে আটক এবং প্রয়োজনে তাদের বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ নেয়ার পথ আগের চেয়ে প্রশস্ত হবে।

এরদোগান ইতিমধ্যে আভাস দিয়েছেন, অপরাধীর শাস্তি প্রদানে আবার মৃত্যুদণ্ডও বিবেচিত হবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৃত্যুদণ্ড রোহিতের নীতি এ সংস্থায় তুরস্কের প্রবেশের অভিলাস বাধাগ্রস্ত হবে। যে একাগ্রতার সঙ্গে এরদোগান তার প্রতিপক্ষদের নৃশংস ক্র্যাক ডাউনের শিকার করেছেন, তা সব পর্যবেক্ষককে হতবাক করেছে। এত নৃশংসতার পরও একজন অনুতপ্ত স্বৈরাচারীর মতো এরদোগান সরকার জরুরি অবস্থার আচ্ছাদনে তার শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখবে। দুর্ভাগ্যক্রমে বিশৃংখলার ভাইরাস ক্যান্সারের মতো দেশকে সংক্রমিত করেছে। ৬১ বছর বয়সী এরদোগান তুর্কিদের উদ্দেশে বলেছেন, তাকে বাধ্য হয়ে কিছু অনভিপ্রেত পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, যা অবশ্যই গণতন্ত্রবিরোধী নয়।

শুধু তুরস্কে নয়, দেশটির বাইরেও এমন সন্দেহ দানা বাঁধছে যে, আগামী দিনগুলোতে বর্তমান তুরস্কে বিরাজমান পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে নিজ ক্ষমতা আরও সংহত করবেন এরদোগান। তুর্কিদের ওপর ইসলামকে বিভাজনের অস্ত্ররূপে ব্যবহার করতে এক ‘ইসলামী শাসন ব্যবস্থা’ চাপিয়ে দেয়ার এখনই সুবর্ণ সময় তার জন্য। অবশ্য বহির্বিশ্বে তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণ অন্য। তুরস্কের ভূরাজনৈতিক অবস্থান, দেশটির ইতিহাস, ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের ভৌগোলিক সংলগ্নতা, দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই চাইলেই দেশটি এবং তার শাসকরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধার অনুকূলে যথেচ্ছাচার করতে পারে না। তুরস্ক কোন পথে হাঁটবে সেটা কৌতূহলোদ্দীপক হলেও এখন পর্যন্ত তা চূড়ান্ত হয়নি। তাই দেশটিকে নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে ও বহির্বিশ্বে এত উদ্বেগউৎসাহ। তুরস্কের অবস্থান এমন এক স্পর্শকাতর অঞ্চলে যে শক্তিধররা চাইলেও তুরস্ক থেকে দৃষ্টি হটাতে পারে না। অকারণে নয়, বিশেষ গুরুত্ব আছে বলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তার প্রেসিডেন্সির অন্তিম সময়ে সম্প্রতি তুরস্ক সফরে বাধ্য হয়েছেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম আবদুল হাফিজ (অব.) : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: