প্রথম পাতা > গ্রামবাংলা, জীবনী, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ, সাহিত্য > লোকসাহিত্যের অন্যতম সংগ্রাহক অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন

লোকসাহিত্যের অন্যতম সংগ্রাহক অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন

monsuruddin-2হাসান মাহামুদ : বাংলা সাহিত্যে নগরজীবনের অন্তরালে চাপা পড়ে আছে বিশাল লোকসাহিত্য। সঙ্গে চাপা পড়ে গেছেন সেই সব মনীষীও। যারা জীবনটা উৎসর্গ করে গেছেন পথেপ্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা সাহিত্যরস তুলে আনতে। সে রকমই একজন লোকবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। যিনি বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম সংগ্রাহক। লোকগীতি সংগ্রহ, গবেষণা ও সংকলন, সমালোচনা সাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও শিশু সাহিত্যসহ বিভিন্ন শাখায় ছিল যার সদর্প পদচারণা। বাংলা, পালি, উর্দু ও ফার্সীসহ ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলাসে যিনি অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

. মনসুরউদ্দীনের জন্ম ১৯০৪ সালের ৩১ জানুয়ারি পাবনা জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি খলিলপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ ও বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলার্স) থেকে এমএ পাস করেন। ১৯২৯ সালে তিনি স্কুল সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

লোকবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদ থেকে ছয় হাজারের মতো লোকগান সংগ্রহ করেন। বাংলা লোকসাহিত্য সংগ্রহ করে তিনি ‘ভোরেরপাখি’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

মাত্র দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। লোকসাহিত্য সংগ্রহে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের আত্মনিবেদন ঘটে প্রবাসী পত্রিকা পড়ে। এটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটির ওই সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত লালনের গান ছাপা হয়। এটি কিশোর কবি মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনকে লালনের গান সংগ্রহে অনুপ্রেরণা জোগায়।

পরবর্তী সময়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণাও পেয়েছিলেন। এজন্য আহমদ শরীফ বলেছেনমনসুরউদ্দীন, নব যৌবনে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ও অবনীন্দ্রনাথের আদরপুষ্ট হয়েছিলেন

লালনের গান সংগ্রহে অনুপ্রেরণার পাশাপাশি তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন বাংলার লোকগাথা, লোকসংগীত, প্রবাদপ্রবচন ইত্যাদির প্রতি। আর সেসব সংগ্রহের জন্য তিনি চষে বেড়ান গ্রামবাংলার আনাচেকানাচে। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে অবসর জীবনে এসেও তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে ছড়া, গান, ধাঁধাঁ, প্রবাদ, প্রবচন ইত্যাদি লোকসাহিত্যের সকল উপাদান সংগ্রহ করে তার ভাণ্ডার পূর্ণ করেছেন।

তিনি বাংলা ভাষাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, যখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, সাথে সাথে তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ করেন। এমনকি সরকার বেতারটিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দিলে তিনি প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।

বাংলা সাহিত্যে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং লোকগাথালোকসংস্কৃতির এমন শেকড় সন্ধানী অনুরাগী প্রতিভা খুব অল্পই দেখা গেছে। বাংলার লোকসাহিত্য, যা ছিল অলিখিত, সাধারণের মুখের বুলি, সেগুলোর অন্যতম সংগ্রাহক হিসেবে সুপরিচিত তিনি। শুধু দেশেই নয়, ১৯৫২ সালে লন্ডনে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলনে যোগ দিয়ে ‘বেঙ্গলি ফোকলোর’ নামে প্রবন্ধ পাঠ করে প্রশংসা অর্জন ছাড়াও তাকে একজন উচ্চমানের ফোকলোর গবেষকের মর্যাদা দিয়ে ফোকলোর কাউন্সিলের সদস্যপদ প্রদান করা হয়। তার ফোকলোর বিষয়ক বহু লেখা প্রকাশিত হয় তৎকালীন প্রবাসী, ভারতী, ভারতবর্ষ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার মতো বিখ্যাত সব পত্রপত্রিকায়।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লোকসাহিত্য গবেষকদের মধ্যে রয়েছেনআব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, . মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র, . আশরাফ সিদ্দিকী, . মাযহারুল ইসলাম, শুকুর মহম্মদ, সুনীল কুমার প্রমুখ।

লোকসাহিত্যের শাখাগুলো হচ্ছেছড়া, প্রবাদ–প্রবচন, ধাঁধাঁ, গীতিকা, লোককথা এবং লোকসংগীত। এর মধ্যে চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার ও ড. দীনেশচন্দ্র সেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে স্থানীয় সংগ্রাহকদের সহায়তায় প্রচলিত পালাগান সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে গ্রন্থাকারে মৈমনসিংহ গীতিকা (১৯২৩) প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি বিষয় মাহাত্ম্য ও শিল্পগুণে শিক্ষিত মানুষেরও মন জয় করে।

শুকুর মহম্মদ রচনা করেন ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র সম্পাদনা করেন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। যদিও এটি মূলত একটি রূপকথা। সুনীল কুমার রচনা করেন ‘প্রবাদ সংগ্রহে’, . মাযহারুল ইসলাম করেন ‘কবি পাগলা কানাই’। তবে সবকিছু ছাপিয়ে লোকসাহিত্যে অন্যতম উচ্চতায় পৌঁছে যায় ড. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন রচিত ‘হারামনি’। মনসুরউদ্দীনের সবচেয়ে বড় এবং অক্ষয় কীর্তি হলো এই ‘হারামণি’। দীর্ঘ সময়ব্যাপী লোকসাহিত্য সংগ্রহের ফসল এটি। মোট ১৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয় এই লোকসঙ্গীত সংকলনটি। তার সম্পাদনায় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুগভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয়বাহী এ গ্রন্থখানি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে শিরনী, ধানের মঞ্জরি, আগরবাতি, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, ইরানের কবি প্রভৃতি অন্যতম।

১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

monsooruddin-3

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: