প্রথম পাতা > ইতিহাস, ইসলাম, রাজনীতি > সুলতান মাহমুদ গজনী’র সামরিক অভিযানসমূহ

সুলতান মাহমুদ গজনী’র সামরিক অভিযানসমূহ

sultan-mahmoodএম এস শহিদ : পিতা সবুক্তগীনের মৃত্যুর পর ৯৯৭ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ গজনীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ভারতে সামরিক অভিযান তার রাজত্বকালের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বীরোত্তম সুলতান মাহমুদ ভারতবর্ষে সর্বমোট ১৭ বার যুদ্ধাভিযান করেন এবং এতে তার তেত্রিশ বৎসর রাজত্বকালের ২৭ বৎসর ব্যয় হয়। ভারতবর্ষে তার বীরোচিত সামরিক অভিযানগুলো নিম্নে আলোকপাত করা হলোঃ

সীমান্তের দুর্গ দখল : ১০০০ খৃস্টাব্দের দিকে সুলতান মাহমুদ সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে অভিযান করে সীমান্তের দুর্গগুলো অধিকার করেন। এই সীমান্ত দুর্গনগরগুলো নামদান ও পেশাওয়ারের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।

জয়পালের বিরুদ্ধে অভিযান : ১০০১ খৃস্টাব্দের দিকে সুলতান মাহমুদ জয়পালের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন এবং পেশোয়ারের নিকট দশ হাজার অশ্বারোহীসহ তাঁবু ফেলেন। সবুক্তগীনের নিকট দু’বার পরাজিত হয়েও জয়পাল মুসলিম আক্রমণের বিরোধিতা ও সন্ধিশর্ত ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। ১০০১ খৃস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর জয়পাল বার হাজার অশ্বারোহী, ত্রিশ হাজার পদাতিক এবং তিনশত হস্তীবাহিনী নিয়ে মাহমুদের গতিরোধ করেন। তুমুল যুদ্ধে সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর কাছে জয়পাল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং পুত্রপরিবার পরিজনসহ জয়পাল বন্দী হন। কতিপয় শর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এ পরাজয়ের ফলে জয়পাল হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং স্বীয়পুত্র আনন্দপালের ওপর রাজ্যভার ন্যস্ত করে মুসলমানদের কাছে পরাজয়ের গ্লানি মোচনের জন্য অগ্নিশিখায় প্রজ্বলিত হযে আত্মাহুতি দেন। মাহমুদ জয়পালকে পরাজিত করে সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরবর্তী শহর উন্দ দখল করে গজনীতে প্রত্যাবর্তন করেন।

ভীরার রাজার বিরুদ্ধে অভিযান : ১০০১ থেকে ১০০৪ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ পশ্চিমাঞ্চলে ব্যস্ত থাকায় ভারতবর্ষে সামারিক অভিযান করতে পারেন নাই। কিন্তু ১০০৪৫ খৃস্টাব্দে ঝিলামের পশ্চিম তীরের রাজ্য ভীরার রাজা বিজয় রায়ের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা ভঙ্গ করেন। তাই বিশ্বাসঘাতক ভীরার রাজার বিরুদ্ধে মাহমুদ সামরিক অভিযান করেন। সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর সাথে ভীরার রাজা বিজয় রায়ের নেতৃত্বাধীন হিন্দু বাহিনীর তিন দিন ধরে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জয়পরাজয় অনিশ্চিত থাকে। কিন্তু চতুর্থ দিনে মুসলিম বাহিনীর মুহুর্মুহু প্রচন্ড আক্রমণে ভীরার দুর্গ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং হিন্দু বাহিনী পরাজয় বরণ করে। ভীরার রাজা বিজয় রায় মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং বন্দী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। ভীরা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা সুলতান মাহমুদের পদানত হলো।

মুলতান বিজয় : সুলতানের শাসনকর্তা আবুল ফাত্তাহ দাউদ গজনীর সুলতান মাহমুদের অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করার জন্য জয়পালের পুত্র আনন্দপালের সাথে সখ্যতা স্থাপন করেন। তাছাড়া তার অনৈসলামিক কার্যকলাপ, বিদ্বেষ ও বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আচরণে সুলতান মাহমুদ ক্রুদ্ধ হয়ে ১০০৫৬ খৃস্টাব্দে পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে মুলতানের দিকে অগ্রসর হলেন। কারামাতী নেতা দাউদের প্ররোচনায় আনন্দপাল তার গতিরোধ করলে তিনি পরাজিত হয়ে কাশ্মীর উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। অতঃপর মুলতানের শাসনকর্তা কারামাতী নেতা দাউদকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য মাহমুদ সুলতান অবরোধ করেন। সাত দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দাউদ সুলতান মাহমুদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কতিপয় শর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। দাউদ তার ইসলাম বিরোধী ধর্মমত কারামতী পরিত্যাগ করে শরীয়ত মোতাবেক ধর্মীয় অনুশাসন পালন এবং বাৎসরিক ২০ হাজার দিরহাম প্রদানের অঙ্গীকারে বশ্যতা স্বীকার করেন। মুলতান হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে মাহমুদ আনন্দপালের পুত্র সুখপালের ওপর শাসনভার অর্পণ করেন এবং মোঙ্গল নেতা ইলাক খানের হঠাৎ গজনী রাজ্য আক্রমণের সংবাদে তিনি দ্রুত রাজধানীতে ফিরে যান। সুখপাল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেওয়াশা শাহ উপাধি গ্রহণ করেন।

সুখপালের বিরুদ্ধে অভিযান : সুলতান মাহমুদ ও মোঙ্গল নেতা ইলাক খানের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ চলবার সুযোগে সুখপাল ১০০৭ খৃস্টাব্দে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ইলাক খানের বিরুদ্ধে বলখের যুদ্ধ শেষে সুখপালের ধৃষ্টতার জন্য মাহমুদ মুলতান অভিযান করেন। কিন্তু সীমান্তে পৌঁছে সংবাদ পেলেন যে, ইতোমধ্যে তার আমীরগণ সুখপালকে পরাজিত ও বন্দি করেছে এবং সেইসাথে ৪ লাখ দিরহাম জরিমানা ও যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছে।

আনন্দপালের বিরুদ্ধে অভিযান : কারামতী নেতা আবু দাউদকে সাহায্যের জন্য ১০০৮৯ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে ভাতিন্দা রাজ্যের রাজা আনন্দপালের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন। সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আনন্দপাল ভারতবর্ষের অন্যান্য হিন্দু রাজন্যবর্গের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উজ্জয়িনী, কনৌজ, কানিজর, দিল্লি ও আজমীরের হিন্দু রাজন্যবর্গ সৈন্য সামন্ত নিয়ে এগিয়ে আসেন। সম্মিলিত বিশাল হিন্দু বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে মাহমুদের গতিরোধের জন্য আনন্দপাল পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, হিন্দু রমনীগণ তাদের স্বর্ণালংকার বিক্রি করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের নিমিত্ত অর্থ প্রেরণ করেন। উপরন্তু দুর্ধর্ষ এবং নীতিজ্ঞানশূণ্য খোক্কার উপজাতি হিন্দু বাহিনীতে যোগদান করে। হিন্দু রাজাগণ এবং খোক্কার উপজাতি মুসলিম বাহিনীর ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করলেও সুলতান মাহমুদ পেশাওয়ার এবং ওয়াইহিন্দের মধ্যবর্তী স্থানে হিন্দু বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করেন। মুসলিম বাহিনীর দক্ষতা এবং যুদ্ধকৌশল, অন্যদিকে হিন্দু বাহিনীর অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা মুসলিম বিজয়কে নিশ্চিত করে। বিজয়ন্মুক্ত মাহমুদ বীর বিক্রমে নগরকোট, ভীমনগর ও কাংড়া দুর্গ অবরোধ করে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ লাভ করেন। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুলতান মাহমুদ একমাত্র নগরকোট দুর্গ থেকেই ৭ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, ৭০০ মণ স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত তৈজসপত্র, ২০০০ মণ খাঁটি সোনা, ২০০০ মণ অপরিশোধিত রূপা এবং ২০ মণ বিভিন্ন ধরণের রত্নাদি লাভ করেন।

mahmud_ibn_sebuktegin_attacks_the_fortress_of_zarangপ্রতিরোধমূলক অভিযান : ১০০৯১০ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ সপ্তমবারের মতো ভারতবর্ষ অভিযান করেন। তবে তার এ অভিযানের উদ্দেশ্য দেশ জয় ছিল না, বরং পরাজিত হিন্দু রাজাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা। হিন্দু সংঘের পতনের ফলে হিন্দু রাজাদের মনোবল ভেঙে যায়। বিশেষ করে আনন্দপালের পরাজয়ের ফলে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে অভিযানের প্রতিবন্ধকতা রইলো না। নগরকোট বিজয় ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্য জয়ের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

দাউদের বিরুদ্ধে অভিযান : ১০১০ খৃস্টাব্দে দুর্ধর্ষ ঘোর উপজাতিদের পরাজিত ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে সুলতান মাহমুদ বিশ্বাসঘাতক মূলতানের শাসনকর্তা দাউদের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান করেন। বিশ্বাসঘাতক কারামতী তো দাউদ পরাজিত হলে তাকে ঘোরের দুর্গে কারারুদ্ধ করা হয়।

ত্রিলোচন পালের বিরুদ্ধে অভিযান : আনন্দপাল পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করলেও গোপনে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং আনন্দপাল লবনগিরি অঞ্চলে মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আনন্দপালের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র ত্রিলোচনপাল নন্দনায় রাজধানী স্থাপন করে সেনাবাহিনীকে সুসংবদ্ধ করেন। ১০১৪ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ নবম বারের মতো অভিযান শুরু করলে ত্রিলোচনপাল কাশ্মীরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ত্রিলোচনপালের পরাজয়ের পর তার পুত্র ভীমপাল মারগালা গিরিপথে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে সুলতান মাহমুদের গতিরোধ করেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে ভীমপাল নন্দনার দুর্গে আশ্রয় নেন। ভীমের শক্তি ধ্বংসকল্পে মাহমুদ সমগ্র পাঞ্জাব দখল করে কাশ্মীর অভিমুখে যাত্রা করেন। ভীম প্রাণভয়ে আত্মগোপন করেন। ১০২৬ খৃস্টাব্দে ভীমপালের মৃত্যু হলে হিন্দুশাহী বংশের অবসান ঘটে।

থানেশ্বর বিজয় : সুলতান মাহমুদের যুদ্ধাভিযানের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল থানেশ্বর বিজয়। ১০১৪ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ হিন্দু ধর্মের নগরী থানেশ্বরে অভিযান করলে স্থানীয় হিন্দু রাজা বশ্যতা স্বীকার করেন এবং বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদসহ থানেশ্বর দুর্গ মুসলমানদের হস্তগত হয়। কথিত আছে, এই শহরের প্রাচীন মন্দিরে রক্ষিত ব্রোঞ্জ দেবতা চক্রস্বামীকে গজনীতে নিয়ে যাওয়া হয়।

কাশ্মীর অভিযান : ১০১৫১৬ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয়বারের মতো কাশ্মীরে অভিযান করেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকুল পরিস্থিতির কারণে এ অভিযান সফল হয়নি।

কনৌজ অভিযান : ১০১৮ খৃস্টাব্দের সুলতান মাহমুদ তার বহুদিনের লালায়িত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে কনৌজের এ অভিযান ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। সুলতানের সাথে এক লক্ষ সৈন্যের একটি বাহিনী ছিল। উপরন্তু তার বাহিনীর সাথে খোরাসান ও তুর্কিস্তান থেকে আগত কয়েক সহস্র স্বেচ্ছাসেবক ছিল। পথে সকল প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে ঝিলাম নদী পার হয়ে সুলতান মাহমুদ বুলন্দ শহরের দিকে ধাবিত হন। বুলন্দ শহরের অধিপতি হরদত্ত বশ্যতা স্বীকার করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর সুলতান মাহমুদ মাহওয়ানের হিন্দু রাজাকে পরাজিত করে মথুরার দিকে ধাবিত হন। সমৃদ্ধশালী ও হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দু মথুরা মুসলমানদের অধিকারে আসে। মথুরা পদানত করার পর মাহমুদ বৃন্দাবনের দিকে অগ্রসর হলে সেখানকার হিন্দু নগরপাল পলায়ন করেন। এর ফলে সুলতান মথুরা বৃন্দাবন হতে প্রচুর ধনসম্পদ হস্তগত করেন। বীর বিক্রমে সৈন্য পরিচালনা করে সুলতান মাহমুদ ১০১৯ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কনৌজের ফটকের সম্মুখে উপস্থিত হন। হর্ষবর্ধনের রাজধানী খুবই সমৃদ্ধ ছিল এবং এর রক্ষনাবেক্ষণের জন্য সাতটি দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল। সুলতানের আবির্ভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে প্রতীহার রাজা বিনা শর্তে বশ্যতা স্বীকার করেন। একই দিনে তিনি সাতটি দুর্গ দখল করে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ লাভ করেন। কনৌজ বিজয় সুলতান মাহমুদের বীরত্বের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং এর ফলে গঙ্গার পরপারে তিনি অভিযান করতে সমর্থ হন। ধনসম্পদ লাভের দিক থেকে এ অভিযানের স্থান সোমনাথ বিজয়ের পরেই। কনৌজ অভিযানে সুলতান মাহমুদ ৩০,০০,০০০ দিরহাম, ৫৫,০০০ দাস এবং ৩৫০ টি হস্তি লাভ করেন।

চান্দেলা রাজার বিরুদ্ধে অভিযান : কনৌজের নৃপতি রাজ্যপাল সুলতান মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করলে অনান্য পরাক্রমশালী রাজপুত অধিপতিগণ অপমান বোধ করেন। কালিঞ্জারের চান্দেলা রাজা গোন্ডা গোয়ালিয়রের রাজপুত রাজার সহিত চুক্তি সম্পাদন করে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সমরাভিযান করেন এবং যুদ্ধে রাজ্যপালকে পরাজিত করে যুদ্ধ ক্ষেত্রেই তাকে হত্যা করেন। নৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করে সুলতান মাহমুদ তার মিত্র হিন্দু রাজা রাজ্যপালের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ১০১৯ খৃস্টাব্দে চান্দেলা রাজার বিরুদ্ধে অভিযান করেন। চান্দেলা রাজা গোন্ডা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেন। সুলতান বীরবেশে চান্দেলা রাজার রাজধানীতে প্রবেশ করেন। গোয়ালিয়র অভিযান : ১০২১২২ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ গোয়ালিয়র রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। গোয়ালিয়রের হিন্দু রাজা বশ্যতা স্বীকার করলে তিনি গজনীতে প্রত্যাবর্তন করেন।

কালিঞ্জর বিজয় : ১০২২২৩ খৃস্টাব্দের দিকে সুলতান মাহমুদ পঞ্চদশ বারের মতো ভারতবর্ষের কালিঞ্জরের বিরুদ্ধে অভিযান করেন। কালিঞ্জরের রাজা নন্দা পর্যাপ্ত উপঢৌকন প্রদান করে সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করে।

সোমনাথ বিজয় : সুলতান মাহমুদের ভারতবর্ষের অভিযানসমূহের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল সোমনাথ বিজয়। তিনি উত্তর ও মধ্য ভারতে উপর্যুপরি কয়েকবার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। গুজরাটের দক্ষিণে কথিওয়ারের সমুদ্র উপকূলে বিশাল এলাকাজুড়ে সোমনাথ দেব মন্দির অবস্থিত ছিল। এ মন্দিরই ছিল তদানীন্তন ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির। সোমনাথ বিগ্রহের খ্যাতি সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেবায়েৎ ব্রাক্ষণগণ বিশ্বাস করতেন, সোমনাথ বিগ্রহের অসীম অলৌকিক ক্ষমতাবলে মাহমুদের পক্ষে এ মন্দির ধ্বংস করা সম্ভব নয়। সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিতগণের ধারণা ছিল যে, সোমনাথ বিগ্রহের অধীনস্থ ভারতবর্ষের অন্যান্য ক্ষুদ্র বিগ্রহসমূহের ওপর সোমনাথ দেবনাথের অসন্তুষ্টি ও রোষানলের ফলে মাহমুদের পক্ষে ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান সফল হয়েছে। সোমনাথ মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য তদানীন্তন ভারতের হিন্দু রাজাগণ দশ হাজার গ্রাম এ মন্দিরের সম্পত্তিরূপে দান করেন। এ মন্দিরের পূজাপার্বন ও অনুষ্ঠানাদি পালনের জন্য সর্বদা এক সহস্র ব্রাক্ষণ নিয়োজিত থাকত। দেবতার সন্তুষ্টির জন্য দুইশত গায়িকা ও পাঁচশত নর্তকী সর্বক্ষণ নৃত্যগীত করতো তীর্থ যাত্রীদের মস্তক মুন্ডিত করার জন্য তিনশত নাপিত সর্বদা নিয়োজিত ছিল। হিন্দুদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, চন্দ্রদেবতালিঙ্গ এতই ক্ষমতা ও প্রভাবশালী যে, তা মাহমুদের আক্রমণে তা কখনো ধ্বংস হবে না। সমুদ্র সৈকতে বিশাল এলাকাজুড়ে পাথরে নির্মিত মন্দিরটিতে ৫৬টি অলংকৃত স্তম্ভ ছিল। তারিখজাইনুল মা’সীর’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যে কক্ষে পাথরের লিঙ্গবিগ্রহটি রক্ষিত ছিল তা অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং ঝুলন্ত ঝাঁড়বাতি সংলগ্ন উজ্জ্বল রত্ন আভায় গৃহকক্ষটি আলোকিত ছিল। বিগ্রহটি পাঁচ গজ লম্বা ছিল। এর মধ্যে দু’গজ মাটির নিচে এবং তিন গজ মাটির ওপরে ছিল। প্রস্তর লিঙ্গটি ফাঁপা ছিল এবং এর মধ্যে মূল্যবান ধনরত্ন জমা ছিল। হিন্দু রাজাগণ তাদের কুমারী মেয়েকে এ মন্দিরের সেবিকা নিয়োজিত করে নিজেদের ধন্য বলে মনে করতেন। ১০২৫২৬ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ কাথিওয়াড়ের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দিরের বিপুল পরিমাণ ধনরত্নের সংবাদ পেয়ে গজনী হতে সুসজ্জিত নিয়মিত বাহিনী এবং ত্রিশ হাজার স্বেচ্ছাসেবকসহ গুজরাটের দিকে ধাবিত হলেন। তিনি মুলতান ও রাজপুতনার মধ্য দিয়ে আজমীরের উপস্থিত হলেন এবং সেখান থেকে সোমনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই মাহমুদ তার বিশাল বাহিনী নিয়ে সোমনাথ মন্দিরের নিকটে পৌঁছেলেন। এ মন্দিরের প্রাচীর গাত্রের সম্মুখে তিনি তার বিশাল বাহিনী সন্নিবেশিত করলেন। হিন্দু রাজপুত নৃপতিগণ সম্মিলিতভাবে মাহমুদের গতিরোধ করলেন। তুমুল যুদ্ধে সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী সম্মিলিত হিন্দু বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। অদম্য সাহস, তেজস্বীতা, যুদ্ধস্পৃহা ও উন্নত রণকৌশল মুসলিম বাহিনীকে বিজয়ী হতে সাহায্য করে। ১০২৬ খৃস্টাব্দের ৬ জানুয়ারী সোমনাথ মন্দিরের দুর্গ প্রাচীর ভেঙ্গে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ‘মুসলিম বাহিনী’। এ মন্দির থেকে সুলতান মাহমুদ অসংখ্য ধনসম্পদ লাভ করেন।

বলা বাহুল্য, সোমনাথ বিজয় ছিল সুলতান মাহমুদের অভিযানগুলোর মধ্যে আর্থিক দিক থেকে সর্বাপেক্ষা সফল বিজয়। এর ফলে রাজকোষ ২,২০,০০,০০০ দিনার মূল্যে ধনসম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মন্দিরের বিগ্রহ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিকগণ একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। কথিত আছে যে, প্রধান পুরোহিত মাহমুদকে বলেন, হুজুর আমাদের বিগ্রহটি আপনি রক্ষা করুন, এর বিনিময়ে আমরা আপনাকে অসংখ্য ধনরত্ন দেবো। মাহমুদ কোষ থেকে তরবারি বের করে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, আমি বিগ্রহ বিক্রেতা অপেক্ষা বিগ্রহ ধ্বংসকারী হিসেবে বেশি পরিচিত হতে চায়। এই বলে তিনি তরবারি দিয়ে প্রস্তর নির্মিত ফাঁপা [মতান্তরে নিরোট] লিঙ্গবিগ্রহটির মাঝ বরাবর আঘাত করেন। এর ফলে লিঙ্গ বিগ্রহটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং এর মধ্য থেকে অসংখ্য ধনরত্ন বেরিয়ে আসে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ঘটনা বিশ্বাস করেন না। ঐতিহাসিক হাবিরের মতে, এটি একটি অবিশ্বাস্য গল্প। কেননা মাহমুদ স্বহস্তে বিগ্রহটি ভাঙ্গেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। দুর্গ বিজিত হলে মাহমুদের সৈনবাহিনীও বিগ্রহটি ভেঙ্গে ফেলতে পারে।

জাঠদের দমন : ১০২৭ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ সপ্তদশ ও সর্বশেষ বারের মতো দুর্ধর্ষ জাঠ উপজাতিদের শায়েস্তা করার জন্য এ যুদ্ধাভিযান করেন। তার এ অভিযান ছিল বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। চৌদ্দশত নৌকার একটি নৌবহর নিয়ে সুলতান মাহমুদ মুলতান হতে জাঠদের বিরুদ্ধে অভিযান করেন। প্রতিটি নৌকায় বিশজন তীরন্দাজ এবং অগ্নি নিক্ষেপণের সরঞ্জামও ছিল। বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক জাঠদের তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এ যুদ্ধে অসংখ্য জাঠ নিহত হয়। সবশেষে বলা যায়, সুলতান মাহমুদ ছিলেন দূরদর্শী এবং প্রত্যেকবার তিনি বিজয়ী হন। ভারত অভিযানে তিনি যে রণদক্ষতা ও বীরত্ব প্রদশন করেছিলেন তাতে তার নাম ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: