প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ধর্মীয়, রাজনীতি > যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি রাজতন্ত্রের সম্পর্কে টানাপড়েন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি রাজতন্ত্রের সম্পর্কে টানাপড়েন

salman-obamaএম আবদুল হাফিজ : সৌদি রাজতন্ত্রের বিদ্যমানতার ক্লেশ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, যা জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশটি নিজেই ডেকে এনেছে। কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের ক্রমহ্রাসমান ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি তাই প্রমাণ করে। এই পতন শুরু হয়েছিল সৌদি রাজপরিবারের ধর্মীয় গোষ্ঠীগত বিবাদবিদ্বেষকে আরব মধ্যপ্রাচ্যে এক নির্বোধ কৌশলে জিইয়ে রাখার সিদ্ধান্ত ও লিপ্সায়। তাদের উদার হাতে উত্থান বা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে অর্থ বিতরণ পরবর্তী সময়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সন্ত্রাসের জন্ম দেয়। ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধ যা সৌদি অর্থেই ফুঁসে উঠেছে, সৌদি আরবের লক্ষ্য পূরণে কোনো কাজে আসেনি। এবং তা অনভিপ্রেত ফলাফল বয়ে এনেছে।

দামাস্কাসের সেক্যুলার সরকার শুধু পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে টিকেই থাকেনি, এখন তারা সেখানে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। উপরন্তু সৌদি সেনাবাহিনী গত বছর থেকে ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। জয়পরাজয়ের স্পষ্ট চিহ্ন দৃষ্টিগোচর না হলেও আরব বিশ্বের দরিদ্রতম দেশটিতে হাজার হাজার বেসামরিক লোক এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে। সৌদি সেনারাও ইয়েমেনে তাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনে এ পর্যন্ত তারা তাদের বন্ধুভাবাপন্ন কোনো সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে পারেনি। দেশটির অবকাঠামোর হয়তো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু সৌদি ও তার মিত্ররা সেখানে একটি চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি। এদিকে সৌদিরা যুক্তরাষ্ট্রেরও বিরাগভাজন হয়েছে এ জন্য যে মার্কিনিরা সৌদিদের সাহায্যে আলকায়েদার অবদমন চেয়েছিল, ইয়েমেনে বেসামরিক নাগরিকদের অযথা রক্তপাত নয়।

মার্কিনিরা ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির পথে এগোচ্ছে এবং তা স্পষ্ট হওয়ার পরই সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া উত্থানকে ঠেকাতে উঠেপড়ে লেগেছে। প্রয়াত সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলেও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ছিল বিধায় আমেরিকানদের প্রদত্ত নির্বাচনে বর্তমান ইরাক সরকারের ভারসাম্য যথারীতি শিয়াদের পক্ষেই গেছে এবং সৌদিদের মর্মবেদনা সেখানেই।

ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সৌদি সরকার চরম অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ রূপে একজন নেতৃস্থানীয় শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ নিমরআল নিমরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে আরো ৪৬ জন শিয়া যাজকসহ। এই সৌদি পদক্ষেপে ইরান অসন্তোষে ফেটে পড়ে। আন্তর্জাতিক জনমত বিপক্ষে যায়। সৌদিতে জনপ্রিয় শিয়া যাজকের হত্যায়, যিনি সৌদি আরবে সংখ্যালঘুদের নেতাও ছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো সালাফি ও ওয়াহাবি মতাবলম্বী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এতদসত্ত্বেও সৌদি আরব পাশ্চাত্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নাগরিকরা সালাফি ও ওয়াহাবি সৌদি আরবের উত্থানে উদ্বিগ্ন এই কারণে যে তাদের বিশ্বাস মতে আইএসের প্রধান পৃষ্ঠপোষকই সৌদি আরব। ৯/১১এর বিধ্বংসী অভিযানে ১৯ জন অংশগ্রহণকারীর ১৫ জনই ছিল সৌদি নাগরিক। আলকায়েদা সৌদি রাজতন্ত্রবিরোধী হলেও তারা আলকায়েদায় সৌদি নাগরিকদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে পারেনি।

বাদশাহ সালমানের ক্ষমতারোহণের পর পুত্র ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানই প্রশাসনিক ক্ষমতার নাটাই নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। রাজপরিবারের সাবেক সদস্যদের মতো না হয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে মনে হয় ত্বরায় আছেন এবং এই মুহূর্তেও ক্ষমতার দণ্ড তাঁরই হাতের মুঠোয়। তিনিই নাকি রণক্ষেত্রে, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সৌদি আরবকে ফ্রন্টের অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছেন। ইয়েমেনে যুদ্ধের প্রেরণাও তিনিই। তিনি বারবার জ্বালানি উৎপাদনকারীদের কার্টেলকে অধিক তেল উত্তোলনে বিরত ও নিরুৎসাহ করে চলেছেন, যাতে জ্বালানির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বগামীই থাকে। তিনি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে অন্তত উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (GCC) দেশগুলোকে তাঁর জ্বালানিনীতির সঙ্গে সহমত পোষণে বাধ্য করেছেন। গত এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জ্বালানিমন্ত্রীরা বর্তমান পরিমাণে তেল উত্তোলনে রাজি হলেও সৌদিরা শেষ মুহূর্তে সম্ভবত রিয়াদ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশানুযায়ী জ্বালানি উৎপাদনকারীদের সমবেত সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায়।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানিবাজারের বৃহদাংশকে কুক্ষীগত করতে সৌদি আকাঙ্ক্ষা এবং ইরান ও রাশিয়াকে সিরিয়ার আসাদ সরকারকে সমর্থন দেওয়ার শাস্তি হিসেবে সৌদি প্রণীত এই শাস্তি। বিগত ২৫ এপ্রিলে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা দেন যে সৌদি আরব আর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, ২০২০ সালের মধ্যে তাঁর দেশ তেলের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত হবে। প্রায় একই সময়ে সৌদি সরকার রূপকল্প ২০২০এর ঘোষণা দেয় এপ্রিলের সমাপ্তি নাগাদ। ক্রাউন প্রিন্স, যিনি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বটে, তিনি সৌদি আরবের অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতির নিয়ন্ত্রকও। তিনি চান যে সৌদি রাজতন্ত্র দেশের সেবা খাতও নিয়ন্ত্রণ করুক। সরকারের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী বেসরকারি খাতের ২০২০ সাল নাগাদ প্রবৃদ্ধি ও পরিমাণ ৪০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছবে। সৌদি আরব বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রতিরক্ষা অমিতব্যয়ী। দেশটি এ মুহূর্তে তার প্রতিরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মাত্র ২ শতাংশ দেশে প্রস্তুত করে।

cr-kerry-salmanঅনেক বিশ্লেষকের মতে, ক্রাউন প্রিন্সের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণ সুকঠিন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সৌদি আরামকোর অংশবিশেষ বিক্রয়ের সিদ্ধান্তের কথা বলেছিলেন; যদিও তাঁর রাজ্য তেলের ওপর অতি নির্ভরশীল এবং আরামকো হচ্ছে রাজ্যের প্রধান সম্পদ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী কম্পানি। ক্রাউন প্রিন্সের উক্তিতে যে আরামকোর বিক্রয়লব্ধ অর্থ যার পরিমাণ হবে আনুমানিক দুই ট্রিলিয়ন ডলার, তা গচ্ছিত থাকবে রাজ্যের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট তহবিলে। যুবরাজ দৃঢ়কণ্ঠে নিশ্চিত করেন যে এমন পদক্ষেপ সৌদি সরকারের রাজস্ব স্বার্থের উৎস হয়ে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হতে থাকবে, যা পরোক্ষভাবে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবে।

যুবরাজের এমন অর্থনীতিচর্চা সৌদি এলিটের প্রভাবশালী অংশের শখ। তাদের আরো শখ ইয়েমেনে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। প্রথমবারের মতো সৌদি আরব বিদেশ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার দেনাও করতে যাচ্ছে। আফটার অল সিরিয়া ও ইয়েমেনে সৌদিদের জন্য যুদ্ধে জড়ানো খুব একটা সস্তা ও সহজ হয়নি। বিগত মার্চ মাসের শেষ দিকে ওই অঞ্চলে তাঁর বিদায়ী সফরে রিয়াদ গিয়েছিলেন। তাঁকে অভ্যর্থনায় সৌদি আরবের কোনো উষ্ণতা ছিল না, সৌদি বাদশাহ মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভ্যর্থনায় বিমানবন্দরেও যাননি। ওবামার রিয়াদে আগমন এমনকি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও প্রদর্শিত হয়নি।

অবশ্য সৌদি বাদশাহর বেশ কিছু কারণ আছে ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে শীতল হওয়ার। সৌদিরা ভাবে যে ওবামা মার্কিন কংগ্রেসকে সৌদিবিরোধী একটি বিল পাস করা থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেননি। উল্লেখ্য, ওই বিলটিতে ৯/১১এর জন্য সৌদি আরবকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে। তা ছাড়া ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে প্রাপ্ত ইসলামিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও রাজপরিবারের ব্যক্তিবিশেষের কোনো তহবিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আলকায়েদা কার্যক্রমকে উসকে দিয়েছে ৯/১১এর আগে বা পরে তাদের মূল্যবান তথ্যউপাত্ত মার্কিন প্রশাসনের হাতে।

প্রত্যুত্তরে সৌদি সরকার মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলে যে ‘এসব’ নিয়ে বেশি এগোলে সৌদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রে সৌদিদের যে ৭৫০ বিলিয়ন ডলার ট্রেজারি অ্যাসেট হিসেবে গচ্ছিত আছে, তা বিক্রি করতে বাধ্য হবে। সৌদিদের ভয় যে যদি এরই মধ্যে কংগ্রেসে আলোচ্য বিলটি পাস হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালত ওই অ্যাসেটকে (Asset) যুক্তরাষ্ট্রেই FREEZE করে রাখতে পারে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ আল জুবাইর বিগত মার্চ মাসে ব্যক্তিগতভাবে এই সৌদিভয়ের বার্তা ওয়াশিংটনে পৌঁছিয়েছেন।

সৌদিমার্কিন সম্পর্ক বর্তমান টানাপড়েন সত্ত্বেও কৌশলগত, যা টিকিয়ে রাখার জন্যই করা হয়ে থাকে। তাই সে সময়েই প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে কংগ্রেস যদি বিলটি পাসও করে তিনি তাতে ভেটো দেবেন। উপরন্তু সৌদি আরবে তাঁর বিদায়ী সফরের সময়ে ওবামা নতুন করে সৌদি বাদশাহকে তাঁর রাজ্যের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির পুনঃপ্রতিশ্রুতি দেন।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: