প্রথম পাতা > জীবনযাপন, সমাজ > হিংসার ঘোরপ্যাঁচে আমি ও আমরা

হিংসার ঘোরপ্যাঁচে আমি ও আমরা

সেপ্টেম্বর 11, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

envy2সামিয়া রহমান প্রতি বছরের মতো এবারও ঘুরেফিরে ঈদ এলো। ঈদ মানে ত্যাগ, সংযম আর ভালোবাসার দিন। সবার জন্য উৎসব আনন্দের দিন। গত রোজার ঈদটি এসেছিল শোকাবহ ভয়াবহ কষ্ট নিয়ে, আতঙ্ক নিয়ে। আশা করা যায় জঙ্গিবাজরা এবার অন্তত এই ঈদটি আমাদের ছাড় দেবে। ঈদ আসবে এবার উৎসবের আমেজ নিয়ে। আশা করতে দোষ কি। আশা নিয়েই তো আমরা বেঁচে আছি। সেটি হিংসা কাতরতায় অন্যের ক্ষতির আশা? নাকি পরশ্রীকাতরতার বেদনায় নিজের অযোগ্যতা ঢাকার প্রচেষ্টায় অতি যোগ্যকে হেয় করার আশা— সেটি না হয় ভবিষ্যতের খেরোখাতায় লিখে রাখি। আগে আনন্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণ শুরু করছি একটি জোক দিয়েই। অবশ্য সেটিও পরশ্রীকাতরতার জোক।

ডাক্তার রোগীকে জানালেন, আপনার অসুখ তো সিরিয়াস পর্যায়ে চলে গেছে। এতদিন কোথায় ছিলেন? আগে আসেননি কেন আমার কাছে?

রোগীর উত্তর : আপনার কাছে আসার আগে আমি আরেকজন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।

ডাক্তার : তো সেই স্টুপিড ডাক্তার কী উপদেশ দিল?

রোগী : সে আমাকে আপনার কাছে আসার পরামর্শ দিল।

আরও একটি জোক বলি। ক্লাসে পরীক্ষা চলছে। খুব মনোযোগ দিয়ে সবাই লিখছে। একটি মেয়ের প্রস্তুতি ছিল খুব খারাপ। মাথায় কিছুই আসছিল না। শিক্ষকের চোখ এড়িয়ে সামনে বসা বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করল— এই, হিংসুটে আর স্বার্থপরের ইংরেজি কি রে? বান্ধবী বিরক্ত হয়ে পাত্তা না দিয়ে নিজের লেখায় মগ্ন। রেগে মেয়েটি বলল, তোর মতো জেলাস সেলফিস বন্ধু আমি জীবনে আর দেখিনি।

স্বার্থপরতা আর ঈর্ষা কি এক? নাকি ঈর্ষা থেকে স্বার্থপরতার জন্ম? হিংসাকে আরবিতে হাসাদ বলা হয়। অন্যের সুখশান্তি ও ধনসম্পদ বিনষ্ট বা ধ্বংস করে নিজে এর মালিক হওয়ার কামনাবাসনাই হচ্ছে হিংসা। ঈর্ষা ও হিংসা প্রায় একই রকম আবেগ, তবে হিংসাকে বলা হয় ঈর্ষার চরম বহিঃপ্রকাশ। ঈর্ষাকাতরতা হিংসার পর্যায়ে চলে গেলে আক্রোশবশত মানুষ হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনে হিংসার বহুবিধ কারণ যেমন পারস্পরিক ঈর্ষাপরায়ণতা, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা, দাম্ভিকতা, নিজের অসৎ উদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, নেতৃত্ব বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, অনুগত লোকদের যোগ্যতাবান হয়ে যাওয়া এবং কোনো সুযোগসুবিধা হাসিল হওয়া, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নীচুতা বা কার্পণ্য প্রভৃতি দৃশ্যমান। নানা কারণে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির প্রতি হিংসা প্রকাশ করে থাকে।

হিংসা থেকে ঈর্ষার পার্থক্য দেখাতে গিয়ে বাইবেলের একটি তথ্যগ্রন্থ বলে : ‘ঈর্ষা’ অন্যের মতো ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে আর হিংসা শব্দটি অন্যের যা আছে, তা কেড়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে।’ একজন হিংসুটে ব্যক্তি কেবল অন্যদের যা আছে, সেটা দেখে অসন্তুষ্টই হন না, সেই সঙ্গে তিনি তাদের কাছ থেকে সেগুলো কেড়েও নিতে চান।

হজরত লোকমান (.) একবার স্বীয় পুত্রকে বললেন : হিংসুকের তিনটি চিহ্ন রয়েছে : পিঠপেছনে গীবত করে, সামনাসামনি তোষামোদ করে এবং অন্যের বিপদে আনন্দিত হয়। (আল খেসাল, পৃষ্ঠা ১২১, হাদিস নং ১১৩)

হিংসা, ঈর্ষা, স্বার্থপরতা কোনটি যে কার আগে বলা মুশকিল। অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগের মতো।

কোথায় যেন দেখেছিলাম লেখাটি

ঈর্ষাতেই ভালো ঈর্ষাতেই মন্দ।

হে মানুষ ঈর্ষা কর তারে

যে তাকে সবাই ভালো বলে।

আমরা মনুষ্য জাতি কি ভালো হওয়ার জন্য, আত্মশুদ্ধির জন্য, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার জন্য ঈর্ষা করি? না কি অন্যের যোগ্যতায় নিজের অযোগ্যতার কথা ভেবে পরশ্রীকাতরতায় দগ্ধ হই! জীবন মানেই অনিশ্চিত ভ্রমণ। আমাদের মনের ধর্মশালায় দুই অন্তরের বসবাস। একটি অভিজাত আর একটি ছোটলোক। না, শ্রেণি বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করতে বসিনি। তর্কশাস্ত্রবিদ মনের জটিলতার জটটি খোলার চেষ্টায় আছি। অনেকেই বলেন, জীবন মানেই সাফল্য আর সাফল্য মানেই দুর্ভোগ। সফলতা কিংবা বিফলতা নয়, মানুষ হওয়াটাই বড় কথা। কিন্তু পরশ্রীকাতরতার দগ্ধে জর্জরিত আমরা সাফল্য আর মনুষ্যত্বের তফাৎ করতে পারি কি?

বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, ঈর্ষা থেকে আত্মরক্ষা করা উচিত। কিন্তু যে ঈর্ষার আত্মশুদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, তা কিছুতেই পরিত্যাগ করা উচিত নয়। ঈর্ষার আত্মশুদ্ধি! দার্শনিকদের কথা অবশ্যই শিরোধার্য। কিন্তু ঈর্ষা কি আসলেই আত্মশুদ্ধি ঘটাতে পারে? পারে কি আত্মোন্নয়ন করতে? ব্যাপারটি আমার মতো ক্ষুদ্র নগণ্যের পক্ষে বোঝা দায়।

হেরোডেটাস বলেছেন, মানুষের অনুকম্পা পাওয়ার চেয়ে মানুষের ঈর্ষা পাওয়া শ্রেয়। সব ধর্ম মতে হিংসা মহাপাপ। হিংসা থেকে নিষ্ঠুরতাবর্বরতা জন্ম নেয়।

সেই আমলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সমালোচক ছিলেন অনেকেই। কিছুটা ঈর্ষা থেকে। কিছুটা প্রচলিত ধারাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধারা তৈরির জন্য অথবা তার জনপ্রিয়তার জন্য। এমন কি মোহিতলাল মজুমদার, দীজেন্দ্রলাল রায়সহ বেশ কয়েকজন সমালোচনাও করেছিলেন বলে জানা যায়। তাতে কি রবীন্দ্রনাথের কবি প্রতিভার প্রকাশ ঘটেনি। তিনি কি বিশ্বকবির স্বীকৃতি পাননি? নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা সভায় যোগদান করেছিলেন তার সমালোচকরাই।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা গল্প উপন্যাস ছাপেনি যে পত্রিকাগুলো, সেসব পত্রিকার সম্পাদকরাই মার্কেজের লেখার প্রশংসা করেছেন পরবর্তীতে। মার্কেজ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তারাই অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

সংস্কৃতে হিংসা মানে বধ, প্রাণীপীড়া, অন্যের হানি বা ক্ষতি করার প্রবৃত্তি। কিন্তু বাংলায় হিংসা মানে ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা পরিপূর্ণ।

বিষাক্ত এই নগরে অন্যের সৌভাগ্য আমাদের দারুণ ঈর্ষা জাগায়। অন্যের সুখবরে, উন্নতিতে আমরা চোখকান উল্টে রাখি। কিন্তু তার ক্ষতির আশঙ্কা বা সম্ভাবনা যাই বলি না কেন, দেখলে হিংসাকে পরম ধর্ম বলে মান্য করি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নারী চরিত্রগুলোর কথা মনে আছে? উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো যেমন আবেগ ও উচ্ছ্বাসে অসাধারণ ঔজ্জ্বল্যে উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনি উনিশ শতকের শেষ দুই দশক এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতবর্ষের গ্রামীণ সমাজের সামাজিক রীতিনীতি ও সমস্যা, কলহ, দলাদলি, রক্ষণশীলতা, প্রথানুগত্য, আবার তার মধ্যে প্রগতিশীলতার স্ফূরণ, পরশ্রীকাতরতা সব মিলিয়ে বাংলার সমাজ জীবনের জটিল ক্ষুব্ধ রূপের প্রতিচ্ছবি তার নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রভাব পড়েছে প্রত্যক্ষভাবে। একদিকে নারীর জীবনের স্বাভাবিক সুখদুঃখকে অপরিসীম সহানুভূতি ও দরদে রাঙিয়ে তুলেছেন। আবার পরশ্রীকাতরতার মোড়কে সাধারণের সুখদুঃখকেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। শরৎচন্দ্র থেকে আজ এ যুগে এসেও মানব অন্তরের পরশ্রীকাতরতা বা ঈর্ষার চুল পরিমাণ আচরণ বদলায়নি।

যে নারীর হিংসা নেই তাকে এক কথায় বলে অনুসূয়া। কিন্তু হিংসা কি শুধু নারীর ভূষণ? কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই তো এই বিষে বিষাক্ত। অনেক বেশি গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে লেখাটি কি? বরং কয়েকটি মজার জোকস বলি।

এক মহিলা বহুক্ষণ ধরে তার স্বামীকে ফোনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে ফোনের টাকাও প্রায় শেষ। শেষমেশ মহিলা তার ছেলেকে বললেন তার বাবাকে জরুরি ভিত্তিতে ফোন দিতে। বাচ্চা ছেলেটি বাবাকে ফোন দিয়ে তার মাকে জানাল, মা আমি তিন বার বাবাকে ফোন দিয়েছি। তিন বারই একটি মহিলা বাবার ফোন ধরছে। মহিলা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। স্বামী বাড়ির গেটে আসা মাত্রই মহিলা দৌড়ে বের হয়ে এসে সপাটে স্বামীর গালে চড় কষিয়ে দিল। একটি চড়েই ক্ষান্ত না হয়ে চড় দিতেই লাগল। হৈ চৈ চিৎকার শুনে পাড়াপ্রতিবেশীরা দৌড়ে এলো। মহিলা রাগে ক্ষোভে বলল, আপনারা আমার ছেলের কাছ থেকেই তার বাবার কীর্তিকাহিনী শোনেন। ছেলেকে ডেকে আনা হলো। ছেলের উত্তর ছিল, যতবার আমি ফোন দেই এক মহিলা বলেন, এই নম্বরটি এখন ব্যস্ত আছে, কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন।

নাহ, সব লেখাতে নারীর ঈর্ষাই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু ঈর্ষা বলি, হিংসা বলি আর পরশ্রীকাতরতাই বলি নারীপুরুষ কেহ ছাড়ে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। বরং আর একটি জোকস বলি।

এক স্বামীস্ত্রী তাদের কন্যার কাছ থেকে একটি চিঠি পেলেন। মেয়েটি দেশের বাইরে পড়াশোনা করে এবং খুব শিগগিরই তার দেশে ফেরত আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই। মেয়েটি জানাল, আমার প্রিয় বাবামা আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি, অনেক মিস করি। আমি জানি না কবে দেশে ফিরতে পারব। কিন্তু যেহেতু সেটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তাই সেটা আমার মনকে ভেঙে দিচ্ছে। আর যখন আমি দেশে ফিরতে পারব হয়তো ততদিনে তোমরা অনেক বৃদ্ধ হয়ে যাবে। তাই তোমাদের কাছে আমার আবিষ্কার করা একটি বোতল পাঠাচ্ছি। এর মধ্যে যে ওষুধটি আছে, এটি খেলে তোমাদের বয়স বাড়বে না। আমি যখন ফিরে আসব তোমরা এই বয়সেই থাকবে। তবে সাবধান এক ফোঁটার বেশি খাবে না। স্বামীস্ত্রী বোতলটি খুলল। স্বামী প্রথমে অবিশ্বাসের দিকে স্ত্রীর দিকে তাকাল এবং বলল, প্রথমে তুমি খাবে। তারপর আমি। স্ত্রী বোতলটি খুলে ওষুধটি খেল এবং স্বামী দেখল তার স্ত্রীর বয়স প্রায় পাঁচ বছর কমে গেল।

বেশ কয়েক বছর পর মেয়েটি তার বাবামা’র সঙ্গে দেখা করতে এলো। দেখল তার মা খুব সুন্দরী হয়ে গেছে এবং বয়স অনেক কমে গেছে। আর মায়ের কোলে রয়েছে একটি ছোট শিশু। মা উচ্ছ্বসিত হয়ে জানাল ওষুধ কীভাবে কাজ করেছে এবং তার বয়স কমে গেছে। মেয়েটি শুনে খুব খুশি হলো আর বাবার কথা জানতে চাইল। মায়ের উত্তর, আমার সুন্দর হয়ে যাওয়াতে আর বয়স কমে যাওয়াতে তোমার বাবার এতই হিংসা হলো যে, পুরো বোতলের বাকি ওষুধ সে একাই সাবাড় করল। বাবা এখন কোথায় মা, মেয়েটির প্রশ্ন। এই যে আমার কোলে, মায়ের উত্তর।

জোকস জোকসই। এতে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অনেকেই বলে থাকেন দুর্বলকে করুণা কর। আর ঈর্ষা এমন এক প্রাপ্তি যা অর্জন করতে হয়। অনেকটা কগনিটিভ ডিজোনেন্সের মতো। শেয়ালের গল্পটা মনে আছে? ওই যে আঙ্গুর ফল টক। শেয়াল বেচারা কিছুতেই আঙ্গুরের নাগাল পাচ্ছিল না। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ঘোষণা দিল, ধুর এ ফল খায় কে। আঙ্গুর ফল তো টক।

আমাদের মস্তিষ্কও তেমন। যখনই কোনো বিভ্রান্তির মধ্যে আমরা থাকি, বিশেষ করে আমাদের মধ্যে যখন কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তখন ঘটনার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক যুক্তি খুঁজতে থাকে। এমন যুক্তি যা তার দ্বন্দ্বকে সমর্থন করে। সাধারণভাবে এটাই কগনেটিভ ডিজোনেন্স। হঠাৎ করে কগনেটিভ ডিজোনেন্সের কথা তুললাম কেন? মনে করুন আপনি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। খুবই ভালো কাজ করেন, খুবই যোগ্য আপনি। অন্তত নিজের কাজের ব্যাপারে আপনি ষোল আনা আত্মবিশ্বাসী। আপনারই আশেপাশে আপনার কিছু সহকর্মী আছে যারা কাজের দিক দিয়ে আপনার যোগ্য নন, আবার আপনার কাজের খুঁত খুঁজে বের করাও তাদের যোগ্যতার বাইরে। কিন্তু আপনার প্রতি সবার প্রশংসা তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে, তারা আপনার কাজের ক্ষেত্রে দোষ খুঁজে না পেলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপনার সমালোচনায় মুখর হয়। কারণ তাদের মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব আপনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অস্থিরতা তৈরি করেছে। এ অস্থিরতাকে দূর করার জন্য, ডিজোনেন্সকে ব্যালান্স করার জন্য তারা অবশেষে জেলাসির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং সে অনুযায়ী আচরণ করে।

তবে আজ যদি দ্বন্দ্ব না থাকে, বিশ্ব চরাচরে কোনো চিন্তাশীল প্রাণী থাকবে না। বলা হয় ডিজোনেন্স ড্রাইভস দ্য ওয়ার্ল্ড। গণমাধ্যম, শিক্ষা, ব্যবসা সব কিছু আজ পরিচালিত হচ্ছে চিন্তা ও দ্বন্দ্বের জোরে। তবে দ্বন্দ্বকে বাড়াব না কমাব সেটাই মূল বিষয়। যদি পরশ্রীকাতরতার দ্বন্দ্বকে ভালো প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করতে পারি, নিজের উন্নয়ন ঘটাতে পারি, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, সর্বোপরি সমাজের স্বার্থে কাজ করতে পারি তবে অবশ্যই সেটি কল্যাণকর। আর যদি সেটি হয় নিজের অযোগ্যতাকে ঢেকে রাখার স্বার্থে হিংসামী ও নীচহীন কাজ, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত দ্বান্দ্বিক পৃথিবীর আর দশটি বাসিন্দার মতোই হবে আমাদের ক্ষুদ্র জীবন। আমরা প্রত্যেকে যার যার প্রেক্ষাপটে থেকে নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি খুঁজি, সেটি ভালো হোক আর মন্দই হোক। যেটিকে আমরা তাত্ত্বিকরা বলি কনফার্মেশন বায়াস।

১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত বক্তৃতার কথা নিশ্চয়ই সবারই ঠোঁটস্থ। আড়াই লাখের বেশি মানুষের সামনে তিনি যা বলেছিলেন তা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র বিশ্বকে। মার্টিন লুথার কিং তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমি জানি, কিছু মানুষ তোমাকে পছন্দ করে না। ব্যাপারটা এমন নয় যে, তুমি তার কোনো ক্ষতি করেছ। তবু তুমি তার কাছে স্রেফ অপছন্দের মানুষ। তোমার হাঁটাচলা, কথাবার্তা অনেকের কাছেই ভালো লাগবে না। কেউ হয়তো তোমাকে অপছন্দ করে, কারণ তুমি তার চেয়ে ভালো কাজ জান। তুমি জনপ্রিয়, তোমাকে লোকে পছন্দ করে, সেটাও অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ হতে পারে। তোমার চুল তার চেয়ে সামান্য বড় বা ছোট, তোমার গায়ের রং তার চেয়ে খানিকটা উজ্জ্বল কিংবা অনুজ্জ্বল— হয়তো কারণটা এমন! কেবল কারও কোনো ক্ষতি করলেই তুমি তার অপছন্দের পাত্র হবে, তা নয়। অপছন্দ ব্যাপারটা আসে ঈর্ষাকাতরতা থেকে। মানুষের সহজাত চরিত্রেই এ অনুভূতির প্রভাব আছে।

আমি বহুবার বলেছি, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এক ধরনের সিজোফ্রেনিক চরিত্র আছে। আমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছি। আমাদের সবার মধ্যেই এমন কিছু আছে, আমি দেখি এবং সমর্থন করি ভালো কাজ, কিন্তু করি খারাপ কাজ। আমাদের সবার মধ্যেই এমন কিছু আছে, যার কারণে আমরা প্লেটোর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, মানুষের চরিত্র হলো একটা রথের মতো। রথটা টেনে নেয় দুটো শক্তিশালী ঘোড়া। দুটোই একে অপরের বিপরীত দিকে যেতে চায়। আমরা গ্যেটের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, আমার মধ্যে ভদ্র এবং অভদ্র দুটো হওয়ার মতোই যথেষ্ট রসদ আছে।

শত্রুকে ভালোবাসার আরও একটা উপায় হচ্ছে, যখন তাকে পরাজিত করার মোক্ষম সুযোগ আসবে, তুমি সেটা কর না। হ্যাঁ, সে তোমার কাছে হারবে, কিন্তু একটু ভিন্নভাবে।

যে মানুষটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে, যে মানুষটা তোমার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দুর্ব্যবহার করে, যে পেছনে তোমার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি খারাপ কথা বলে, যে তোমার নামে মিথ্যা গুজব ছড়ায়; একদিন সেই হয়তো কোনো প্রয়োজনে তোমার সামনে দাঁড়াবে। হতে পারে চাকরির জন্য তার কোনো সুপারিশ প্রয়োজন, হতে পারে তোমার কাছে তার এমন একটা সাহায্য দরকার, যেটা তার জীবন বদলে দেবে। এটাই হলো তোমার জয়লাভ করার মোক্ষম সময়! কেন শত্রুকে ভালোবাসব? আরও একটা কারণ হলো, তুমি যখন কাউকে ঘৃণা কর, তখন তোমার চরিত্রটাও বিকৃত হয়ে যায়। তুমি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু কর। ঘৃণা তোমার চোখে লেগে থাকলে তুমি সোজা তাকাতে পার না। সোজা হাঁটতে পার না। একজন মানুষের হৃদয় ভরা ঘৃণা, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না!

ওই যে কথায় বলে না, কখনো তাদের ঘৃণা কর না যারা তোমাকে হিংসা করে। বরং তাদের হিংসাকে সম্মান কর। কারণ তারাই সেই মানুষ, যারা বিশ্বাস করে তুমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

ঈদ মৌসুমে আর হিংসা নয়, পরশ্রীকাতরতা নয়, বরং ভালোবাসার শপথ নেই। কিন্তু জোকস তো জোকসই বটে। তাই শেষ করছি যথারীতি জোক দিয়েই।

এক মহিলা তার স্বামীর ব্যাপারে খুবই ঈর্ষান্বিত এবং স্বামী ঘরে ফেরা মাত্রই তার স্বামীর পকেট শার্ট, ফোন সব চেক করে দেখত মেয়েদের কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। এক রাতে স্বামীর শার্টের পকেটে কিছুই খুঁজে না পেয়ে মহিলা চিৎকার করে উঠলেন, ওহ তাহলে তুমি এখন টাক মাথা মেয়েদের কাছে যাচ্ছ, তাই না?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: