প্রথম পাতা > চিকিৎসা, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সমাজ > বড় মানুষদের দেশান্তরে [বড়] চিকিৎসা

বড় মানুষদের দেশান্তরে [বড়] চিকিৎসা

hospital2-art. এ কে এম শাহনাওয়াজ : সচেতন মানুষের মধ্যে এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে একটি হতাশা রয়েছে। নানা অব্যবস্থার কারণে সরকারি হাসপাতালগুলো অনেক আগেই আস্থা হারিয়েছে। এসব হাসপাতালে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা প্রদানে যা বড় রকমের অন্তরায়। সরকারি হাসপাতালের স্বল্পতা, সুযোগসুবিধার অভাবের কারণে দেশে এখন বড় বড় আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি হাসপাতাল হয়েছে। মাঝারি মানের বেসরকারি হাসপাতালও রয়েছে অনেক। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরও অভাব নেই। জেলা শহর থেকে শুরু করে মফস্বলেও এ ধারার সেন্টার প্রচুর। এ ধরনের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অপচিকিৎসা নিয়ে মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। ১৬ কোটি মানুষের দেশে গড়পড়তা চিকিৎসাসেবায় একটি বৈষম্য ও সংকট স্পষ্ট হয়েছে। যার প্রতিবিধানে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যেভাবে পালন করা উচিত, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তা লক্ষ্য করা যায়নি।

আমাদের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত ও জনকল্যাণমুখী করতে প্রধান ভূমিকা পালন করা উচিত রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের। বিশেষ করে সরকারি দল ও প্রভাবশালী বিরোধী দলের রাজনীতিকদের। কারণ এই দু’পক্ষই পালা করে ক্ষমতায় আসাযাওয়া করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের রাজনীতিকরা এলিট শ্রেণীতে অবস্থান করেন। তাই তারা সাধারণত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী হন। আমজনতার চিকিৎসাসেবার স্বরূপ নিয়ে তাদের তেমন ভাবনা নেই।

মানুষ হতাশ হবে না কেন! এই তো দিন কয়েক আগের ঘটনা। রাজধানীর রূপনগরে এক জঙ্গিকে ধরতে গিয়ে জঙ্গির গুলিতে ও ছুরিকাঘাতে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেলে তাদের ভর্তি করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক দাবি করেছেন, তাদের দক্ষ ডাক্তার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সবই আছে। তারা চিকিৎসা দিতে সক্ষম। তবুও পুলিশ কর্মকর্তারা আহতদের ঢাকা মেডিকেল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে রাজধানীর নামি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। অর্থাৎ সরকারি পুলিশ বাহিনীর কর্তাদেরও সরকারি মেডিকেলের প্রতি আস্থা নেই।

অন্যসব মৌলিক অধিকারের মতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে সব মানুষের। আমাদের বড় দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বারবার আসাযাওয়া করে। যে জনগণের দোহাই দিয়ে এসব দলের নেতারা রাজনীতির মাঠ গরম করেন, সেই গণমানুষের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা এসব ক্ষমতাধর নেতানেত্রীর দায়িত্ব। এ দেশে সাধারণ মানুষের জন্য যে সরকারি হাসপাতাল আছে তার অপ্রতুল ধারণক্ষমতা এবং নিুমুখী সেবামানের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। সেখানেও ভিআইপি বা ভিভিআইপি বলে চিহ্নিত এসব নেতানেত্রীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। দেশে বিত্তশালীদের জন্য বিলাসবহুল বেসরকারি হাসপাতালও কম হয়নি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশই বিত্তশালী। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তাদের অনেকের বিত্তের সীমাপরিসীমা নেই। এ বিত্তের মোটামুটি হিসাব পেতে হলে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদের রাজনীতিকরা রাজবন্দি বা দুর্নীতির দায়ে কারাবন্দি হওয়ার পর অনেকটা অলৌকিকভাবে দ্রুত বড় বড় রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন। জেল অবকাশে তারা চলে আসেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে। আর কিছুদিন পর বন্দির গুরুত্ব বিবেচনায় রাজনৈতিক চিকিৎসার দাবি উঠতে থাকে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে বা অন্য কোনো উপায়ে মুক্তি দেয়ার আবেদন আসে।

গ্রেনেড হামলার শিকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানের চিকিৎসা দেশে অসম্ভব বলে না হয় তার বিদেশে যাওয়ার যুক্তি আছে। সব রোগীর জ্ঞাত রোগ তো এ দেশের অসংখ্য মানুষেরই হয়ে থাকে। তবে কেন তারা দেশের মাটিতে, দেশের হাসপাতালে, দেশের ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করান না? ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গুজব ছিল, খালেদা জিয়া বিদেশ গেলে হয়তো সরকার আর তাকে দেশে ফিরতে দেবে না। তাই বিএনপি নেত্রী যথার্থ ‘দেশনেত্রীর’ মতোই বলছিলেন, তার চিকিৎসা দেশেই করাবেন। ভালো লাগত যদি একইভাবে বলতেন, তার পুত্রদের চিকিৎসাও দেশেই হবে।

এত বিদেশে চিকিৎসার দাবি শুনে মনে হয় এ দেশের ডাক্তাররা সব অপদার্থ। হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলো উন্নত চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ। অন্তত সাধারণ মানুষের মনে তো এ ধারণা হতেই পারে। তবে আমরা তো জানি এ দেশে অনেক গুণী ডাক্তার আছেন। চিকিৎসাসেবা দেয়ার মতো আধুনিক যন্ত্রপাতিরও এখন আর তেমন অভাব নেই। অপমানিত এ দেশের ডাক্তারগোষ্ঠী যে কেন এর প্রতিবাদ করে না তা বোধগম্য নয়।

অবশ্য নেতা আর নেতাপুত্ররা বলতে পারেন, বিদেশে চিকিৎসার মতো ট্যাকের জোর আছে বলেই আমরা যাচ্ছি। সাধ্য থাকলে তোমরাও যাও। এ একটি জায়গায় খুব অসহায় বোধ করবে সাধারণ মানুষ। সত্যি তো, আমাদের দেশের রাজনীতির বড় মানুষদের বেশিরভাগই রাজনীতি সূত্রে বড় বণিক আর ক্ষমতায় থাকার সূত্রে অগাধ সম্পদ সংগ্রহকারী। পিতামাতার ক্ষমতার উত্তাপে তাদের সন্তানরাও বিত্তশালী। সুতরাং ‘ন্যাস্টি দেশের ন্যাস্টি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে’ তাদের চিকিৎসা কেন! তাদের চিকিৎসা হবে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা সৌদি আরবে।

সবচেয়ে মুশকিলের বিষয় হচ্ছে, এখন সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক ডাক্তার, রাজনৈতিক উকিল কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। রাজনৈতিক তকমা জড়ানো থাকলে কেউ যেন আর বিবেক দিয়ে তাড়িত হন না। সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে এ বিষয়গুলোও মানুষ বিবেচনায় রাখবে। তাই ঢালাওভাবে বিদেশে রাজনৈতিক চিকিৎসা চলবে কিনা তা সরকারি মহলকেই সবার আগে ভাবতে হবে।

সরকারি হাসপাতালগুলোর আরেক সংকট আছে। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারদের সংগঠনগুলোরও ক্ষমতার রূপান্তর ঘটে। কখনও ড্যাব, আবার কখনও স্বাচিপ। হাসপাতালে ডাক্তার নিয়োগ ও পোস্টিং থেকে শুরু করে রোগীর খাদ্য সরবরাহ পর্যন্ত সবকিছুতেই নাকি সংগঠনভুক্ত নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ খবরদারি থাকে। চিকিৎসাসেবার অবনতির পেছনে ক্ষমতাসীন দলের ডাক্তার নেতাদের অশুভ নিয়ন্ত্রণকে অনেকে দায়ী করেন।

সরকার চিকিৎসা ব্যবস্থার লক্ষণীয় উন্নতিতে ভূমিকা রাখে না; কারণ সরকারপরিচালকদের বড় অংশই দেশের চিকিৎসা সেবা নেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের অন্য সদস্যরা বেশির ভাগ সময় বিদেশে থাকেন, তাই দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সেবা দেয়ার সুযোগ কোথায়! মাননীয় বিরোধী দলের প্রধানকে দেহ চেকআপ করতে হয় সৌদি আরব বা সিঙ্গাপুরে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে ছোট মন্ত্রী পর্যন্ত শরীরের রুটিন চেকআপ বা কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য বিদেশের দিকে ছোটেন। আসলে বড় মানুষদের চিকিৎসার অযোগ্য এ দেশের হাসপাতাল। তাই ভোক্তা না হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সংকট এরা সম্ভবত অনুধাবন করতে পারেন না। মাঝে মাঝে ভাবি, এলিট শ্রেণীর জন্য প্রতিষ্ঠিত দেশের ভেতরকার নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে শ্রেণী অবস্থানের কারণে দেশ ও রাজনীতি পরিচালকরা চিকিৎসা নিলে ভালো হতো। তা হলে হয়তো তারা বুঝতেন এসব হাসপাতালে কেমন গলাকাটা চিকিৎসা বিল রোগী বা রোগী পরিবারের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পরে বুঝতে পারলাম এতেও বিশেষ কাজ হবে না। কারণ বিল দেয়ার উত্তাপ অন্তত ক্ষমতাসীন বড় কর্তারা বুঝতে পারবেন না। গৌরীসেন রাষ্ট্রই তা পরিশোধ করবে। বড় বিরোধী দলের জন্যও নাকি দলীয় ফান্ড থাকে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও একই কথা বলা হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের বড় নেতাদের অধিকাংশের ছেলেমেয়েরা নাকি বিদেশে পড়ালেখা করেন। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকের উন্নয়ন নিয়ে গভীর ভাবনার অবকাশ তাদের নেই। নিকট অতীতে দেখেছি, বিরোধী নেতারা অহরহ মুড়িমুড়কির মতো হরতাল ডেকে শিক্ষাজীবন বিপন্ন করেন। কারণ তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি তাতে নেই। তাদের অধিকাংশের ছেলেমেয়ে নিরাপদে নিরুদ্বেগে বিদেশে লেখাপড়া করছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তার বক্তৃতায় ডাক্তারদের নসিহত করেন। গ্রামেগঞ্জেমফস্বলে তারা যেন চিকিৎসা সেবা দিতে কুণ্ঠিত না হন। কিন্তু সুবচন নির্বাসনে যায়। তাই প্রায়ই পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশন প্রতিবেদনে দেখা যায় গ্রামউপজেলার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারদের অনেকে কালেভদ্রে উপস্থিত থাকেন। আয়া, নার্স, ওয়ার্ডবয়রা ডাক্তারের ভূমিকা পালন করে। আর এসবই জায়েজ হয় সরকারি ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণে।

এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি নিয়ে বা চিকিৎসাকে সহজলভ্য করার জন্য কোন আধিকারিক ভাববেন? আমাদের রাজনৈতিক নেতারা ও রাষ্ট্রপরিচালকরা যদি চিন্তায় ও আচরণে গণতান্ত্রিক হতে পারতেন, তবে দেশাত্মবোধ আরও তীব্র হতো। দেশের মানুষকে অনিরাপদে রেখে কথায় কথায় বিদেশে চিকিৎসার জন্য ছুটতে থাকাটা যেদিন আমাদের নেতানেত্রীরা লজ্জাজনক মনে করবেন এবং মমতা দিয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি করে তা মানুষের নাগালের মধ্যে রাখবেন, সেদিন থেকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে হয়তো সুদিন ফিরে আসবে।

. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: