প্রথম পাতা > ধর্মীয়, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সমাজ > ধর্ম ও রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে অসহায় গরু !

ধর্ম ও রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে অসহায় গরু !

সেপ্টেম্বর 11, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

cow-9বদরুদ্দীন উমর : আমার বন্ধু প্রয়াত ডক্টর মোশাররফ হোসেন এক সময় বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও পুষ্টির ওপর গবেষণামূলক কাজ করছিলেন। সে সময় আমি তাকে ঠাট্টা করে বলতাম, দারিদ্র্যের ওপর কাজ করে আপনি বড়লোক হওয়ার চেষ্টায় আছেন। যেভাবে এসব গবেষণা করা হয়, জনগণের দারিদ্র্য দূরীকরণে তার কোনো কার্যকারিতা বা ভূমিকা আছে, এটা আমি কোনো সময়েই মনে করিনি। এটাও আমার উপরোক্ত মন্তব্যের একটা কারণ ছিল। তার এই গবেষণা চালানোর সময়কার একটা গল্প তিনি বলেছিলেন। কুমিল্লার এক গ্রামে এজন্য কাজ করার সময় তিনি একজন কালো দাড়িওয়ালা কৃষককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি রোজা রাখেন? সেটা ছিল রমজান মাস। এর জবাবে কৃষকটি বলেন, ‘রোজা রাখার জন্য খেতে হয়।’ তিনি যে রোজা রাখেন না বা রাখতে পারেন না, একথাটি তিনি যেভাবে বলেছিলেন, এটা যেমন ছিল গভীর উপলব্ধির ফল, তেমনি তার মধ্যে ছিল এক ধরনের বিদ্রূপ। ডক্টর মোশাররফের কাছে একথা শুনে আমি তাকে বললাম, ওই কৃষক নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তিনি এ ধরনের মন্তব্যে পারদর্শী ভলটেয়ারকেও (ফরাসি দার্শনিক) হারিয়ে দিয়েছেন!

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা’ তাদের আবার রোজা কী? আসলেই কুমিল্লার উপরোক্ত কৃষক মোশাররফ সাহেবকে যা বলেছিলেন তার মধ্যে যে রূঢ় সত্য ছিল সেটাই নজরুল ইসলাম তার শিল্পীসুলভ কায়দায় ব্যক্ত করেছিলেন। গরিব মানুষদের অধিকাংশকেই জীবিকার সংগ্রামে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। এ কারণে তাদের পক্ষে উপোস করে সে পরিশ্রম সম্ভব হয় না। অনেকের ইচ্ছে থাকলেও তারা সেটা শারীরিক কারণেই পারেন না। আমি রোজার সময় রিকশাচালকদের অনেককেই জিজ্ঞেস করে এসেছি তিনি রোজা রাখেন কিনা। অসংখ্য রিকশাচালকের মধ্যে একজনকেই আমি পেয়েছিলাম যিনি বলেছিলেন, তিনি রোজা রেখেছেন। অন্যেরা রোজা না রাখার কথাই সব সময় বলেছেন। কারণ ‘রোজা রাখার জন্য খেতে হয়’। সে খাবার তো তাদের থাকে না। বিশেষ করে রোজা রাখলে সে খাবার সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে আরও মুশকিলের ব্যাপার। এটা শুধু রিকশাচালকই নয়, সব ধরনের গরিব শ্রমজীবীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

রোজার সময় উপোস থাকা নিয়ে যত কথাই বলা হোক, খাওয়ার বিষয়টি, বিশেষ করে ভালো খাওয়ার বিষয়টি যে অধিকাংশ রোজাদারের চিন্তায় কত প্রবল থাকে এটা রমজান মাসে সংবাদপত্রে ইফতারের সমারোহের নানা ধরনের সচিত্র প্রতিবেদনের মধ্যেই দেখা যায়। এ সময় বড়লোকদের মধ্যে ইফতার পার্টির যে ধুম দেখা যায়, তার মধ্যেও এর পরিচয় পাওয়া যায়।

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের সময়ও দেখা যায় খাদ্য চিন্তার প্রভাব। ঈদুল ফিতরের সময় যেখানে মিষ্টির প্রাধান্য থাকে, তেমনি কোরবানির ঈদের সময় থাকে গোস্তের প্রাধান্য। এ সময় যাদের সামর্থ্য আছে তারা কোরবানির গরু নিয়ে যত মাথা ঘামায় তার সবটাই যে ধর্মচিন্তা থেকে আসে এটা বলা যায় না। আজকাল তো কোরবানি দেয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা সামাজিক মর্যাদার ব্যাপার। আগে কখনও এটা দেখা যেত না; কিন্তু আজকাল দেখা যায়, লোকে অন্যদের জিজ্ঞেস করে কী কোরবানি দিচ্ছেন? কোরবানির সময় লোকজন যেভাবে উচ্চমূল্যে পশু কেনে, বিশেষত গরু, সেটা আগে দেখা যেত না। আগে এত বেশি কোরবানি দেয়াও হতো না। যত দিন যাচ্ছে ততই বেশি করে কোরবানির বিস্তার ঘটছে।

কোরবানির সময় গরুর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক গরু আমদানি করা হয়ে থাকে। এটা আগে যত বেশি হতো, এখন তা অনেক কমে এসেছে। ভারত সরকার গরু রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার কারণেই এটা হয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আসছে। তা সত্ত্বেও দেখা যাবে বাংলাদেশের খামারি গরুর সংখ্যা এখন কোরবানির গরুর হাটে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা হওয়ারই কথা। কারণ বাংলাদেশে শুধু কোরবানির জন্য নয়, এমনিতেই গরুর চাহিদা যথেষ্ট। এখানে গরুর একটা বিশাল চাহিদা আছে। যেখানেই চাহিদা সেখানেই বাজার তৈরির শর্ত। কাজেই ভারতীয় গরু আমদানি কমে আসার ফলে বাংলাদেশে গরু ব্যবসা বেশ দ্রুত ব্যাপকভাবে গড়ে উঠছে। এ বছরও পত্রিকার রিপোর্টে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ এখন গরুর ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই হয়নি, এমন সব মোটাতাজা গরু বাংলাদেশে কোরবানির হাটে আসছে যা আগে দেখা যেত না। গরুকে নানা ধরনের ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থ খাইয়ে যেভাবে মোটা করা হয়, সেটা গরুর স্বাস্থ্যের জন্য তো ক্ষতিকর বটেই, মানুষের জন্যও এসব গরুর গোস্ত ক্ষতিকর। কিন্তু মুনাফাই যেখানে লক্ষ্য এবং তার জন্য বাজার যেভাবে তৈরি, তাতে এই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া সহজ নয়। যদিও এ ধরনের গরুর বিষয়ে ক্রেতাদের সাবধান হওয়ার জন্য পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে।

গরু নিয়ে ভারত সরকার এখন যা করছে এটা হাস্যকর তো বটেই, এমনকি তাদের নিজেদের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ক্ষতিকর। যেসব হালের বলদ ও গাই গরু আর উৎপাদনক্ষম থাকে না, তাদের বসিয়ে খাওয়ানো আর্থিকভাবে ক্ষতির ব্যাপার। এজন্য এ ধরনের গরু বিক্রি করে দেয়া হয়, যা খাদ্য হিসেবে বাজারে আসে। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলরা ভারতে গরু জবাই বন্ধের দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে এলেও অর্থনৈতিক কারণেই তা কার্যকর করা সম্ভব হয় না। এখন ভারত সরকার কার্যক্ষেত্রে গরু জবাই যত না বন্ধ করতে চায়, তার থেকে বেশি তারা চায় এ নিয়ে তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জোরদার করতে। ধর্মীয় হুজুগ তুলে তারা গরু জবাই বন্ধের কথা বললেও ভারত বিদেশে বেশ বড় আকারেই গরুর মাংস রফতানি করে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলে। এটা সরকারি লাইসেন্সের অধীনেই হয় এবং এজন্য সরকার গরুর খামারিদের সহায়তাও দিয়ে থাকে! শুধু তাই নয়, ভারতে আছে এক বিশাল জুতা শিল্প। এর কাঁচামালও হল প্রধানত গরুর চামড়া!! কাজেই গরুর জবাই বন্ধ এবং মৃত গরুর চামড়া ছাড়ানোর জন্য এখন বিভিন্ন জায়গায় মুসলমান, বিশেষ করে নিম্ন বর্ণের হিন্দু, দলিতদের হত্যা ও নির্যাতন করা সত্ত্বেও এটা বন্ধ হচ্ছে না। এটা বন্ধের জন্য সরকারের থেকে গরু গণনার কাজ চলছে! এসব বিষয়ের উল্লেখ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এখন গরু গণনা নিয়েই ব্যস্ত, মানুষ গণনার সময় তাদের নেই! তাছাড়া তিনি আরও বলেছেন, গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা হলেও গরুর চামড়ার জুতো পরতে তাদের অসুবিধা নেই!!! সমগ্র পশুর মধ্যে গরুই এখন আরএসএস এবং বিজেপিসহ বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা ইত্যাদি গেরুয়া ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর মাতামাতির বিষয়। কিন্তু তাদের এই চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও ধান্ধাবাজি কাজ যে অর্থনৈতিক কারণেই বেশি দূর এগিয়ে নেয়া যায় না, এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই।

ভারতে গরু নিয়ে যে ধান্ধাবাজির রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে, সেটা বন্ধের একটা উপায় হিসেবে এখন ভারতীয় ইতিহাসবিদদের জরুরি প্রয়োজন ভারতে কখন থেকে হিন্দুরা গরু খাওয়া বন্ধ করল এবং কেন করল এ নিয়ে গবেষণা করা। এ কাজ আজ পর্যন্ত হয়নি এবং তারা কেউই মনে হয় এ নিয়ে মাথা ঘামাননি। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই এটা দরকার। কারণ প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে পাওয়া যায় আর্য মুনিঋষিদের গরুর মাংস খাওয়ার কথা। মুনিঋষিরা যখন এটা খেতেন তখন সাধারণভাবেও যে গরু খাওয়ার ব্যাপার ছিল এটা অস্বীকার করতে যাওয়া মূঢ়তা ছাড়া আর কী?

এই অবস্থায় নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা গরু নিয়ে যে রাজনীতি করছে, তা বন্ধের জন্য ঐতিহাসিক গবেষণার মাধ্যমে দেখানো দরকার যে, গরুর মাংস খাওয়া না খাওয়ার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণে এক সময়ে গরু খাওয়া নিষিদ্ধ করতে হয়েছিল এবং যেহেতু ধর্মের নামে ছাড়া এ ধরনের কাজ বন্ধ করা সম্ভব ছিল না, কাজেই ধর্মের নামেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। হতে পারে হাজার হাজার বছর আগে ভারতে বিশাল আকারে গরুর মড়ক হওয়ার ফলে হালের বলদ ও গাইগরুর সংখ্যা সংকটজনকভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কারণেই গরু খাওয়া বন্ধ করতে হয়েছিল। এ বিষয়ে তথ্যনিষ্ঠ গবেষণার প্রয়োজন এবং এ কারণে ভারতীয় ইতিহাসবিদদেরই এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

১০.০৯.২০১৬

মূল প্রবন্ধের শিরোণামঃ ‘গরু সমাচার’

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: