প্রথম পাতা > তথ্যপ্রযুক্তি > স্মার্টফোন বাজারে অ্যানড্রয়েড কেন এতো জনপ্রিয়?

স্মার্টফোন বাজারে অ্যানড্রয়েড কেন এতো জনপ্রিয়?

android advantagesএস এম তাহমিদ : স্মার্টফোন বাজারে অ্যানড্রয়েড ও আইওএসের ইঁদুরবিড়াল খেলা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। শুরুতে অনেক পিছিয়ে থাকলেও খুব দ্রুতই অ্যানড্রয়েড ফিচার এবং জনপ্রিয়তার দিক থেকে শীর্ষ তালিকায় নিজের স্থান করে নেয়। এ বছরও মোবাইল বাজারের ৮৪.৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে অ্যানড্রয়েড, কিন্তু কেন? ঠিক কী কারণে অ্যানড্রয়েডের সঙ্গে আইওএস পেরে উঠছে না? সেসবের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে।

বিশাল সংখ্যক ডিভাইস : নিজেদের মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ‘আইওএস’কে একপ্রকার কুক্ষিগতই করে রেখেছে অ্যাপল। আর তাই ‘আইওএস’ অপারেটিং সিস্টেমের ফোন বলতে ওই ‘আইফোন’ই শেষ কথা। সিকিউরিটি, ফিচারের নির্দিষ্টতা, গুণগত মান—এসব ঠিক রাখতে অ্যাপল কখনোই অন্য কাউকে আইওএসচালিত ডিভাইস বানানোর অনুমতি দেয়নি, এমনকি অন্য কেউ আইওএসে নতুন ফিচার যোগ করুক সেটাও চায় না তারা। অন্যদিকে অ্যানড্রয়েড নিয়ে গুগলের ভাবনা একেবারেই অ্যাপলের বিপরীত। নিজেরা তো কখনোই ফোন বানানোর দায়িত্ব নেয়নি, বরং ছেড়ে দিয়েছে সবার হাতে। ফলে বাজারে সবার জন্যই কিছু না কিছু রয়েছে। ৩ থেকে ৬ ইঞ্চি স্ক্রিনের ডিভাইস, কিবোর্ড, ডুয়েল সিম, ডুয়েল ক্যামেরা, রোটেটিং ক্যামেরা, মেমরি কার্ডের ব্যবহার, ফাইল ট্রান্সফার সুবিধা—যার যা প্রয়োজন প্রায় সব কিছুই নিজের মতো করে বানিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে ক্রেতার বাজেট যাই হোক, তার সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় করাটা অসম্ভব কিছু নয়। অথচ আইফোন কিনতে হলে সর্বোচ্চ দামি মডেল ছাড়া গতি নেই, নেই ফিচার বেছে নেওয়ার সুযোগও। আর কিছু কিছু ফিচার যেমন—ডুয়েল সিম, মেমরি কার্ড ব্যবহারের সুবিধা, ফাইল পাঠানো, ডুয়েল ক্যামেরা—এসব তো এখনো যোগ হয়নি আইফোনে। এমনকি অনেকে জেনে আশ্চর্য হবে, আইফোনের ডিসপ্লের রেজল্যুশনও অ্যানড্রয়েডের সমপরিমাণ মূল্যের ডিভাইসের চেয়ে বহুগুণে কম।

সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় : আগে এ বিষয় নিয়ে কথা বলা হলেও এখানে আনুপাতিক উদাহরণসহ আলোচনা করলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হওয়া যাবে। কিছুদিন আগেও মোটামুটি বড়সড় বাজেটের ফোন না কিনলে ভালো ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা পাওয়া যেত না। তবে সেটি পুরোপুরি বদলে গেছে আজ, মূলত প্রথমসারির চায়নিজ মোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই সেটা সম্ভব হয়েছে। এখন তো ১১ হাজার টাকার মধ্যেই ২ গিগাবাইট র‌্যাম, অক্টাকোর প্রসেসর এবং এক দিন বা তার বেশি সময়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য ব্যাটারি সংবলিত ফোন পাওয়া যাচ্ছে সহজেই। আর ১ গিগাবাইট র‌্যামের ফোন পাওয়া যাচ্ছে এর অর্ধেক দামে। কিন্তু অ্যাপলের ক্ষেত্রে সেটি মোটেও বদলায়নি। আইফোনের দাম সেই ২০০৭ সালে যা ছিল, এখনো একপ্রকার তাই আছে, যোগ হয়েছে শুধু ফিচার। তবে ব্যয় করা অর্থের হিসাবে সেসব ফিচারও ব্যবহারকারীদের জন্য কম হচ্ছে। স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৭ এজআর আইফোন ৬এসের মধ্যে তুলনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

মনের মতো ফোন : অ্যানড্রয়েডের মূলমন্ত্রই হচ্ছে—‘সবার মাঝে আমি, তবে সবার মতো নই’। একই মডেলের ডিভাইস দুজন ব্যবহার করলেও দেখা যাবে হয়তো কিছুই এক নেই। কিবোর্ড, থিম—এ রকম ছোটখাটো জিনিস থেকে শুরু করে পুরো সিস্টেমকেই ব্যবহারকারী বদলে ফেলতে পারে। প্রতিটি ফোন নির্মাতাই অ্যানড্রয়েডকে তাদের মতো করে সাজিয়েই বাজারে এনে থাকে। অনেকের মতেই, আইওএস ব্যবহারকারীরা নাকি এসব ফিচারের প্রয়োজনবোধ করে না, যা মোটেও সত্যি নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অ্যাপল প্রথম যখন আইফোনের কিবোর্ড বদল করার সুযোগ দেয় তখন  ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিশাল সাড়া পড়ে গিয়েছিল। ফোনের বাহ্যিক লুক পরিবর্তনের সুযোগও থাকে অ্যানড্রয়েডে। মটোরোলা, শাওমি, এলজির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেতাদের সুযোগ দিচ্ছে ফোন কেনার পরও কভার বদলে ফেলার সুযোগ। এই সুযোগ নিজেদের ব্যবহারকারীদের অ্যাপল কখনোই দেয়নি আর দেওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

উইজেট : আইওএস ব্যবহারকারীদের কাছে উইজেট জিনিসটিই অপরিচিত। অথচ আইওএস ও অ্যানড্রয়েডেরও আগে আরেক অপারেটিং সিস্টেম সিম্বিয়ানেই এটি বিশাল জনপ্রিয়তা লাভ করে। সব অ্যাপ্লিকেশনের সব কন্ট্রোল প্রতিবার ব্যবহার না করে শুধু বিশেষ অংশ ডেস্কটপে বা হোমস্ক্রিনে আটকে রাখার বিষয়টির কোনো গুরুত্বই যেন অ্যাপলের কাছে নেই! অথচ মিউজিক প্লেয়ারের শুধু প্লেপজ ও ট্র্যাক বদলানোর বাটন, মেইলম্যাসেজের সর্বশেষ পাঁচটির শিরোনাম, ফেইসবুকে স্টেটাস দেওয়ার বার, আবহাওয়ার তথ্য—শুধু এই কয়টি উইজেটই ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলে দেয়। ফোনের স্ক্রিন অন করে একঝলকে এটুকু দেখার সুবিধাই অনেক সময় ফোন কেনার সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

মাল্টিটাস্কিং : পিসিতে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে স্ক্রিনে একসঙ্গে অনেক অ্যাপ্লিকেশন চালু রাখা যায়। শুরুতে দুর্বল হার্ডওয়্যার, র‌্যাম ও স্ক্রিনের জায়গার স্বল্পতার কারণে ফোনে সেটি করা যেত না। স্যামসাং ও এলজি অনেক আগেই তাদের ফোনে এ সুবিধা এনেছে। অ্যানড্রয়েড ৭ চালিত সব ফোনেই এই সুবিধা চালু হতে যাচ্ছে; কিন্তু পিছিয়ে রয়েছে আইওএস। অনেক বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়েও বলা যায়, আইওএস আজও মাল্টিটাস্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

লঞ্চার বদলানোর সুবিধা : হোমস্ক্রিন ইন্টারফেস বদলানোর বা সম্পূর্ণ নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া ব্যাপারটা আইফোনে এককথায় অসম্ভব। আইফোনের ইন্টারফেস দেখতে ঠিক একই রকম, যা অনেকের কাছে ভালো না লাগারই কথা। সবাই যদি এক পোশাক না পরি, একইভাবে ঘর না সাজাই, তাহলে আমাদের ফোনটাই বা কি দোষ করল? অ্যানড্রয়েডে এই প্রকারের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইচ্ছামতো একের পর এক লঞ্চার বদলে নেওয়া যায়। এরপর যেভাবে ইচ্ছা উইজেট, আইকন, ফোল্ডার, এমনকি অ্যানিমেশনও বদলে নেওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। অনেক লঞ্চারে অ্যাপ্লিকেশনের আইকনও বদলে ফেলা যায় খুব সহজেই। এ ছাড়া লঞ্চারের সঙ্গে বদলানো সম্ভব জেসচারও। স্ক্রিনে ডান থেকে সরল দাগ টানা বা স্ক্রিনে বৃত্ত এঁকে সংক্ষেপে কোনো অ্যাপ চালু করে কাজ সম্পাদন করা আইফোনে এককথায় অসম্ভব।

কাস্টম রম : যদিও বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়, তবে যারা একটু খাটাখাটনি করতে প্রস্তুত, তারা চাইলে ফোনের অপারেটিং সিস্টেমটাকেই পুরোপুরি বদলে ফেলতে পারবে। যেহেতু অ্যানড্রয়েড পুরোপুরি ওপেন সোর্স, চাইলেই ফোনের জন্য নতুন আপডেট নিজেই বানাতে পারবে, যা আইওএসের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর মাধ্যমে পুরনো ফোনে সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে। অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে অ্যানড্রয়েডকেই যদি ভালো না লাগে, বদলানো যাবে সেটিও। অনেক ফোনেই উবুন্টু মোবাইল, সেইলফিশ অপারেটিং সিস্টেম, ফায়ারফক্স ওএসও চালানো যাবে।

গুগলের সুবিধা সমন্বয় : মেইল, সার্চ, ডকুমেন্টস, ড্রাইভ, ইউটিউব—এসব সেবার কথা চিন্তা করলে প্রথমেই গুগলের কথা মাথায় আসবে সবার। এক জিমেইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সব সেবা দেওয়ার দিক থেকে গুগল অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে। অ্যাপল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এত ধরনের সেবা পাওয়া যায় না, তাই দেখা যায় আইওএস ব্যবহারকারীরাও গুগল সেবাই নিয়ে থাকে বেশি। তবে এক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সহজেই সব অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহার করা যায় না। প্রতিটি আলাদা আলাদা সেবার জন্য আলাদা আলাদাভাবে লগইন করতে হয়, যা কিছুটা বিরক্তিকর বটেই। তবে অ্যানড্রয়েডে এ ধরনের ঝামেলা নেই।

গুগল নাউ : ফোনে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট সেবাটি প্রথম জনপ্রিয় করে অ্যাপল তাদের ‘সিরি’র মাধ্যমে, সেটি নিয়ে কোনো তর্ক নেই। সিরি আর দশটি প্রোগ্রামের মতো নয়, তার একটি ব্যক্তিত্ব রয়েছে। তবে দিনশেষে ব্যবহারকারীদের কাছে সেবা ও সুবিধার প্রয়োজনীয়তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যার প্রমাণ ‘গুগল নাউ’। গুগল নাউয়ের সিরির মতো কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। এটি একটি সাধারণ ভয়েস সার্চ ও কন্ট্রোল ইন্টারফেস, কিন্তু সিরির চেয়ে বেশি ফিচার ও অ্যাকুরেসি সমৃদ্ধ। যেখানে সিরি ব্যবহার করতে বারবার বাটন চাপতে হয়, সেখানে গুগল নাউএ ‘ওকে গুগল’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে। এমনকি ফোন স্লিপ মোডে থাকলেও এটি ব্যবহার করা যায়। শুধু তাই নয়, গুগল নাউ এখন স্ক্রিনে থাকা লেখা (যেমন ইমেইল, মেসেজ) পরে সম্ভাব্য সব সার্চ ও কমান্ড নিজ থেকেই ঠিক করে নিতে পারে, প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় তথ্য সার্চ করার আগেই হাজির করে রাখে। সেদিক থেকে অ্যানড্রয়েড আজ অনেক এগিয়ে।

ফ্রি অ্যাপ ও গেইমের সমাহার : মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজও আইওএসে গেইম ও অ্যাপের পরিমাণ অ্যানড্রয়েডের চেয়েও বেশি। তবে অ্যানড্রয়েডে অ্যাপ্লিকেশনে বিজ্ঞাপন বসানোর সুবিধা এবং অ্যাপ মার্কেটে ছাড়ার ফি অনেক কম হওয়ায় বিনা মূল্যে ব্যবহারযোগ্য অ্যাপের পরিমাণ অ্যানড্রয়েডেই সর্বাধিক। ফ্রি ট্রায়াল অ্যাপ, ফ্রি অ্যাপ থাকার ফলে অ্যানড্রয়েড ব্যবহার অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে অ্যানড্রয়েডে অ্যাপ পাইরেসি বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই আইওএসের জন্যই অ্যাপ বানাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। স্মার্টফোন, ট্যাব—এ দুটি ডিভাইস খুব দ্রুত বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে কম্পানিগুলোকে দ্রুত নিজেদের বদলাতে হয়, যার প্রমাণ স্মার্টফোন বাজার থেকে মাইক্রোসফট ও নকিয়ার প্রস্থান। গুগলের অ্যানড্রয়েড খুবই মুক্ত ঘরানার হওয়ার ফলে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে তেমন একটা কঠিন হয় না, আবার ডিভাইস কম হওয়ার ফলে আইওএসও দ্রুতই তাল সামলে নেয়। তবে বিগত কয়েক বছরে বেশ পিছিয়ে গেছে অ্যাপল। এই ধারা বোধ হয় ভবিষ্যতে চালু থাকবে।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৭ আগস্ট, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: