প্রথম পাতা > কবিতা, চিকিৎসা, জীবনী, বাংলাদেশ, Uncategorized > রহস্যাবৃত নজরুলের ‘অসুস্থতা’

রহস্যাবৃত নজরুলের ‘অসুস্থতা’

nazrul-89 -artশফি চাকলাদার : নজরুল অসুস্থ হয়েছিলেন। এ খবরটা সকলেই জানেন। কারোই নাজানার কথা নয়। কিন্তু ‘অসুস্থ’ শব্দটা নিয়ে রহস্যাবৃত তথ্য নতুন করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঘিরে রাখছে। এখন তারিখ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয় কি করে অসুস্থ হলেন সেই ‘অসুস্থ’ শব্দটিরও নতুন তথ্যে রহস্যাবৃত হয়ে গুঞ্জন তুলছে। এই নতুন তথ্যটি উঠে আসার পর নজরুলের অসুস্থতার সাথে জড়িত সকল ডাক্তারি রিপোর্টকেই সন্দিহান করে তুলেছে। নতুন তথ্যটি পূর্বের সকল তথ্যকে সন্দিহান করে তুলেছে। নজরুলের অসুস্থতার তারিখটাও এখন সন্দেহে পরিণত হয়েছে। কেউ বলছে ৯ই জুলাই ১৯৪২, আবার কেউ বলছে ৯ই অক্টোবর ১৯৪২ সালে। মহালয়ার দিন। সবকিছুই যেন এলোমেলো মনে হচ্ছে। আলঝেইমার রোগ কেউ বলছেন। কেউ বলেন, ব্রেইনের কোন এক পর্দা ভারি হয়ে গেছে। অর্থাৎ যে যেমন বলার সে তেমনই বলেছে। এই বলাটাই যেন দায়িত্ব ছিল তাদের। কারণ নজরুল ছিলেন দরিদ্র। টাকাপয়সা নেই বললেই চলে। কপর্দকহীন। পাশে থাকলে হয়তো এটাওটা লাগতে পারে। তাই সরে দাঁড়ানোই শ্রেয়। এই ছিল নজরুলের সুহৃদ।

নজরুলের সুহৃদ বলতে কেউ ছিল না। বাংলা সাহিত্যের এমন একজন কবি হারিয়ে গেল মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। তবে নজরুলের যে ধরনের অনিরাময় অসুস্থতা প্রচারিত হয়ে এখন পর্যন্ত সকলের মনে গেঁথে রয়েছে, নতুন নতুন তথ্য কিন্তু অন্য কথা বহন করে সামনে এসে দাঁড়াল। সকল কিছুর অর্থাৎ অসুস্থতার তথ্যাদি যা জানা ছিল তাকে কনফিউশনে নিয়ে এলো। এই নতুন তথ্য অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে এলো। অনেককিছুই যেন স্পষ্ট হয়ে দেখা দেবার সুযোগ পেল। সংক্ষেপে কিছু তথ্যাদির আলোচনার মধ্যে এটাও বলতে বাধ্য হতে হয় যে, এতদিন এই তথ্যটা গোপন ছিল কেন? এমন ন্যাক্কারজনক কর্মটি রাতের অন্ধকারে ঘটে গেল, একজন মহাকবিকে জীবনমৃত্যুর মাঝখানে এনে দাঁড় করাল সেই ঘটনাটি এত সহজেই ধামাচাপার শব্দে আশ্রয় পেল কেমন করে? সাংস্কৃতিক অঙ্গন কলুষিত হলো যাদের কারণে তারা কি করে ছাড় পেয়ে গেল?

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেছেন মাত্র একবছর। কোলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গন মরিয়া হয়ে উঠল হিংসায়একজন মুসলমান ডোমিনেট করবে? সাহিত্যসঙ্গীত অঙ্গন? অকেনদিন থেকেই একটা গুঞ্জন চলছিল যে, নজরুলকে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দেয়া হবে। ডা. বিধান রায় অলিখিত নির্দেশ দিয়েছিল নজরুলের সকল ইসলামী অবদানগুলোকে ধুলিস্মাৎ করতে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রথিতযশা অভিনেতার নামও গুঞ্জনে শোনা যায়। মানসিকতা তখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নজরুল বিরোধিতায় এগিয়ে চলছিল। বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসীর ‘পুড়িব একাকী’ থেকে উদ্ধৃত করছি। সেখানে কে. মল্লিক আর নজরুলের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল এবং অংশটি পড়লে বুঝা যায়, নজরুল নিজেও জানতেন তার উপর আক্রমণ হবে। তবে নজরুল হয়তো ভাবতেই পারেননি যে, এ ধরনের নোংরা কাজ কখনোই ঘটতে পারে। অংশটি উদ্ধৃত করছি পড়ুয়াদের অবনতির জন্য
কে মল্লিক, নজরুলের মালু মিয়া, রোজই এসে বসে থাকে। একদিন বলল, কাজীদা, ওদেরকে চেননা, বিষধর সর্পের চেয়েও কুটিল ওরা। ওদের সঙ্গে মিশি, কিছু কথা আমার কানে আসে। তারা জানে আমি শ্যামাসংগীতের গায়ক, আমি ওদের ধর্মেরই। তোমাকে সাবধান করা আমার ফরজ। তুমি আমাকে প্রায় বলো যে, এগুলো আমার অমূলক সন্দেহ, তুমি বলে থাক যে, কোনদিনই এই গ্রুপটি তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। সে অনেক কথা

: আমি জানি মানু মিয়া, সব জানি। আমার ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খান বাবাজী নিজে বলেছেন, পানের সাথে সিঁদূর মিশিয়ে ভাস্তে কাদের জমিরিকে চির জীবনের জন্যে সঙ্গীতের জীবন থেকে বিদায় নিতে হয়। ওর কণ্ঠটি ছিল সবচেয়ে মিষ্টি। পানই তার কাল হলো। তার আগে আবদুল করিম বলল। তাকেও নানা রকম অন্যায় পানীয় খাইয়ে কণ্ঠটি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়েছিল।

: তোমাকে বলতে আমার কোনো সংকোচ নেই, ওরা বলাবলি করেছে যে, তুমি যে সারাদিন পান খাও, তার মধ্যে মেশান হবে কাঁচা কল্কির রস।

: আর আমার জিহ্বা অবশ হয়ে যাবে। আমি হব উন্মাদ, এই তো?

: এ চিন্তায় আমি রাতে ঘুমুতে পারিনি। আল্লাহর নামে শপথ করছি যে, এর একটি বাক্যও বানান নয়। রেডিও স্টেশন থেকে রাতে যখন দেরি ফের, করে, তোমার প্রতি হবে এ আক্রমণ।

: আমার কোনো শত্রু নেই, তা হতে পারে না। ওদেরকে আমি আগে থেকেই ক্ষমা করে দিচ্ছি। ওদের দেয়া বিষ আমি আগেও হজম করেছি। সেটা কী রকম?

: হুগলি জেলে দেখি একটি সাপ আমাকে কামড়াতে আসছে। পর পর দু’বার। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় খবরটি বের হবার পর বৃটিশ সাবধান হয়ে যায়। তাদের ইচ্ছা ছিল জাতশত্রু উঠতি কবিকে জ্যান্ত কবরে পাঠান। সেদিন যেমন পারেনি, এই ষড়যন্ত্রকারীরাও ব্যর্থ হবে। আমার ব্লাডপ্রেসার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাড়িতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারদের তাগাদা, তার উপর লেখার ফরমায়েশ, নবযুগের চাকরি, আমার নার্ভ আর কিছুই নিতে পারছে না। আমাকে মেরে ফেলা সহজ।

: ওদের সবাইকে চিনি না। কয়েকজনকে চিনি। তোমার উপর ক্ষ্যাপা নানা কারণে।

: কারণগুলো আমার অজানা নয়। এছাড়া নিউথিয়েটার্সে যে ঘটনা ঘটেছিল একমাত্র তা জানত আবদুল কাদির ও সুকি জুলফিকার হায়দার। সে অনেক লম্বা ঘটনা। কেউ বলত ভদ্রলোকের হিন্দু মেয়েদের বাদ দিয়ে আমি কাননবালা, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, আশ্চর্যময়ী, কমলা ঝরিয়া এমনি আরও গানওয়ালিদের দিয়ে রেডিও সরগরম করছি। রেকর্ডেও ওরাই জমিয়ে আছে। তাই ওদের তথাকথিত ছাত্রছাত্রীরা রেডিও ও গ্রামোফোনে সুযোগ বঞ্চিত।

: সামনে সাংঘাতিক ভদ্র, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু ওদের কাছে আছে সর্বনাশা গুন্ডাদের মতোই ছুরি লুকোনো।
:
মনে হয় মানু মিয়া, তুমি ওদের ছুরি দেখে ফেলেন। ওদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবে আমিও সর্বমুহূর্তে একটি ছুরি লুকিয়ে রেখেছি।
:
ওরা তোমাকে ছাড়বে না, মুসলমানদের মধ্যে প্রথম জ্বলন্ত প্রতিভা তুমি। এ প্রতিভা তাদের কাছে অসহ্য ঠেকেছে।

: তোমার কথা সত্যি নয়, মানু মিয়া। যাদের কথা বলছ সে গ্রুপকে আমি চিনতে পারছি না। ওদের কোনো ক্ষতি করিনি। ওদের ধর্মের ক্ষতি করিনি। যারা সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে তাদেরও শত্রু নই আমি। শুধু চাই তারা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাক, এইটুকু। প্রমিলা স্বেচ্ছায় আমাকে বিয়ে করেছে। আমার সঙ্গে সে মুসলমানের মতোই ঘর করছে। আমার শাশুড়ি ও বিরজা মা আমাকে সর্বক্ষণ সহায়তা করছেন। আমি হিন্দুদের বিরোধী শক্তি নই।

: তা সবাই জানে। প্রতিভাই তোমার শত্রু। তোমার বড় হওয়া সহ্য করতে পারছে না কেউ কেউ। হিন্দু মুসলমানের ব্যাপারটা তো আছেই। ওটাই তো সবচেয়ে বড় প্রবলেম সংস্কৃতির লাইনে। ওরা ভাবে এটা তো আমাদের লাইন। কোথা থেকে এক মোসলা সব তছনছ করে দিয়ে গেল। বিশেষ করে, তুমি ‘নবযুগে’ যা লিখেছ, তা ওদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

: তুমি কোন লেখার কথা বলছ, তা আমি জানি। সেটা হলো এক আল্লারে ভয় করি মোরা কারও করি না ভয়এটার কথা বলছ তো?

: হ্যাঁ, এই কবিতার চরণ পড়ার পর তারা স্থির করে যে যেভাবেই হোক, বিষকাঁটা সরাতেই হবে।

: সরিয়ে দেব বললেই দেয়া যায় না, মানু মিয়া। আমি আর কাউকে ভয় পাই না। অনেক রাতে আমার উপর আক্রমণ হলেও, মুখ বুঁজে তা আমি সয়ে নেব, প্রতিবাদ করব না, রাস্তায় পড়ে থাকব। সম্ভব হলে, তুমি আমার মানিনিনিকে খবর দেবে। তারা আমার কবরের ব্যবস্থা করবে। মৃত্যুর জন্যে আমি প্রস্তুত।”

দিনটি ১৯৪২ সালের ৯ই জুলাই। কয়েকজন ব্যক্তি নজরুলকে সে দিন গভীর রাতে পেছন দিক থেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। কণ্ঠনালি সংযুক্ত পেছনের হাড় ও মাথায় ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। সম্বিত হারিয়ে ফেলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে এসেছিল, মাথার যে অংশে স্মৃতি তা হয় পর্যুদস্ত। এরপরও কথা বলতে পারতেন, সামান্য কিন্তু লিখতেও, রাঁচিতে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। এরপর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত। বিদেশে নিয়ে গিয়েও তার চিকিৎসা শুরু হয়, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

এই হৃদয় বিদারক ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ হল নজরুলের অসুস্থতার কারণটি কি ছিল। বিদেশের চিকিৎসায় পর্যন্ত এ আঘাতের প্রসঙ্গ বেমালুম উল্লেখ করা হয়নি। শোনা যায় ডা. বিধান ব্যক্তিগতভাবে বিদেশে নজরুলের চিকিৎসা স্থলে গিয়েছিলেন তার প্রভাব খাটাতে। হয়তোবা রিপোর্টে তারা রোগের নাম উল্লেখ করেছেন কিন্তু ‘কারণ’গুলোতে রোগের উৎসতে ‘আঘাত’ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন কিম্বা রিপোর্টে থাকলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। এখানে নজরুল গবেষক শেখ দরবার আলম রচিত “নজরুলের অসুস্থতা ও চিকিৎসা” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করছি “ঘটনাটি যেখানেই ঘটুক, ঘটনার কারণ কিন্তু দৈনিক নবযুগ এবং ঘটনার তারিখ ১৯৪২ সালের মহালয়ার রাতে। অর্থাৎ ৯ই অক্টোবর ১৯৪২। (২২ আশ্বিন ১৩৪৯) তারিখ শুক্রবার। প্রথম তথ্যটির সার্কামস্টানসিয়াল এভিডেন্স পেয়েছি খোদ দৈনিক ‘নবযুগ’ এর ফাইল ঘেঁটে। খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনের ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’এর সংযোজন অংশে।” এখানে আমি আরও একটু অগ্রসর হতে পারি “১৯৭৭ সালের দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সম্পর্কে আমি প্রথমে শুনেছিলাম তৎকালীন দৈনিক বাংলার বিশিষ্ট সাংবাদিক হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ সাহেবের কাছে কবি তালিম হোসেন সাহেবের বাসায়। উনি বলেছিলেন : ঢাকার মেডিকেল বোর্ডের ফাইন্ডিংএ কবির ঘাড়ে কঠিন আঘাতের কথা বলা হয়েছে। পরে উনি আমাকে বলেছিলেন : কবি তালিম হোসেন সাহেবও এটা জানেন। অনেকেই জানেন।” (শেখ দরবার আলম)

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদএর স্ত্রীর থেকেও জানা যায়, মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু লোকও এই হীন কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। ভালো কথা কিন্তু নজরুলের উপর এমন হৃদয়বিদারক আঘাত করা হল সেটা এত বছর পর লেখালেখি হল কেন? সকলেই জানে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন আকাশবানীর কোনো এক অনুষ্ঠানে। সে সময়ের অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ কবিকে পাঁচশত টাকা সাহায্য করেন। কিন্তু কবির অতিপ্রিয় সুহৃদ ঘুণাক্ষরেও এই জঘন্য ঘটনার উল্লেখ করেন নাই তাদের লেখালেখিতে। কার ভয়ে? কেন এতোবড় জঘন্য কর্মকান্ড চেপে থাকল। কবির এই অসুস্থতার মেডিকেল বোর্ডের ফাইন্ডিন্সে নেই, রিপোর্ট সম্পূর্ণ নয়, হারিয়ে যায়। সবদিক দিয় বিবেচনা করে এটাই বলতে হয় হে আল্লাহ এমন মানুষকে কেন এখানেই পাঠালে?

১৯৫৩ সালের ১০ই মে কবি সন্ত্রীক এবং ছোটপুত্র অনিরুদ্ধকে নিয়ে লন্ডন রওনা হন। ৭ই ডিসেম্বর ভিয়েনায় এরপর দেশের উদ্দেশ্যে। সেখানে পরীক্ষায় প্রকাশ পায় নজরুলের রোগটি ‘পিকস ডিজিট’। যাই হোক কবির রোগ নির্ণয়ের দিন তারিখ নিয়েও মতবিরোধ স্পষ্ট। কেউ বলছে ০৯ই জুলাই ১৯৪২, কেউ বলছে ৯ই অক্টোবর ১৯৪২ মহালয়ার দিন। কোন কিছুর রেকর্ডই যেন ঠিকভাবে আসছে না। কনফিউসন শব্দটি নজরুলের অসুস্থতার পর বেশ শক্তভাবেই স্থান করে নিয়েছিল। সমস্ত কিছুর পরও বলতে হয় নজরুলের ঘাড়ে আঘাতএর তথ্যটি এভাবে কী করে কারো লেখনীতেই উল্লেখ হল না? দ্বিতীয়ত উল্লেখ করতে হয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এহেন কদর্য মানসিকতা বিরাজ করত যা ভাবনাতেই কেমন যেন লাগে। নজরুলের মত এমন উদার প্রাণোচ্ছল আদর্শবান ব্যক্তি যে সময় সমাজ আলোকিত করছিল ঠিক সে সময়তেই অনুদার হৃদয়হীন অনাদর্শিক সম্প্রদায়ও সমাজে বিরাজ করত?

আজও নজরুল বিরোধী অঙ্গন সক্রীয়। এখানে নজরুলকে যথাযোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে মিডিয়াকুল দ্বিধান্বিত। এখনো নজরুল জয়ন্তী হয় সারাদিন কটা গান বাজিয়ে। ‘দারিদ্র্য’ নিয়ে আলাদা অনুষ্ঠান হতে পারে। আলোচনা অনুষ্ঠান হতে পারে একটি কবিতা ঘিরেই এককভাবে ‘চাঁদনি রাতে’ কিম্বা ‘শাখনবাও’ নিয়ে কিম্বা ‘দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়’ নিয়ে কিম্বা ‘সাম্যবাদী’ নিয়ে। গল্পউপন্যাসপ্রবন্ধাদি নিয়ে। চিঠিপত্র নিয়ে। এমন শত শত অনুষ্ঠান করে নজরুলকে, নজরুল সাহিত্যকে, নজরুল সঙ্গীতকে ছড়িয়ে দিতে পারে। নজরুল এবং মানবতা। নজরুলের ‘হেনা’ গল্পের ‘মানুষ এত ছোট হলো কি করে? তাদের মাথার ওপর অমন উদার অসীম নীল আকাশ, আর তারই নিচে মানুষ কি সঙ্কীর্ণ। কি ছোট।” নিয়ে সেমিনার হতেই পারে। কিন্তু করবে কারা? কোন মিডিয়া? শুধু ‘সঙ্গীত অনুষ্ঠান’। নজরুলরচনাবলী তো পড়তে হবে। আমার তো মনে হয় ঢাকার মিডিয়াকূলের পত্রিকাসমূহের পাঠাগারে ‘নজরুলরচনাবলী’ আছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ হয়। তাই বলতেই হয় আমাদের ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গন’ নজরুলকে ঘিরে সকল সময় ‘অবাক’ হতভম্ব’ পথে এগিয়ে চলে।

সেদিন এক নজরুলঅনুষ্ঠানে এটিএনএর আলোচনায় দুটো গান ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে উঠন ফুটে মন’ এবং ‘নবী মোর পরশ মনি, নবী মোর সোনার খনি’ গান দুটো নজরুলের। রেকর্ডের গায়ে তাই লেখা আছে। উল্লেখ করলাম কারণ এ দুটি গান এখনো বাজারে প্রচলিত। শ্যামা সংগীতটি পান্নালাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এবং নাতরাসূলটি আবদুল আলীমএর কণ্ঠে প্রায়ই শোনা যায় কিন্তু কার গান তা জানা ছিল না গান দুটোই নজরুলের।

শাহরিয়ার নামে একজন সুহৃদ নজরুলের কাছে প্রায়ই আসতেন। একবার তিনি নজরুলকে প্রশ্ন করেন, আপনার তো এখনো কোন পুরস্কার এলো না? নজরুর উত্তর দিলেন মৃত্যুর আগে এবং পরেও আমি একটি পুরস্কার পেতে মনে প্রাণে আগ্রহী। সেই পুরস্কারটি কী বলবেন কি? হ্যাঁ সেই পুরস্কারটি হচ্ছে নবীর হাতের শিরণী এবং তার হাতের আবে কাওসারের পানি। সত্যি এমন ধরনের প্রত্যাশার জন্যই তো তিনি নজরুল। তিনি নজরউলইসলাম। ইসলামের দৃষ্টি। ইসলামী গানের এমন ধারা তাই তারই মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলএ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অমলিন। চিরদিনের।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ আগষ্ট ২০১৬

. সুশীল ভট্টাচার্য ও নজরুল প্রসঙ্গ

nazrul-sick.আশরাফ পিন্টু : . সুশীল ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৪২) কলিকাতার একজন খ্যাতনামা গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তিনি নজরুলের জন্মভূমিতে অবস্থিত নজরুল একাডেমির দীর্ঘদিন সভাপতি ছিলেন। তিনি একজন নজরুল গবেষক ও নজরুল সাধক। নজরুলের জীবদ্দশায় তিনি কবির পরিচর্যা করেছেন এবং অত্যন্ত কাছে থেকে তাকে দেখেছেন। তার সাথে আমার পরিচয় ঘটে ‘উত্তরবাংলা সংস্কৃতি পরিষদ (পাবনা)’ আয়োজিত দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্মেলন ১৪১৮এ। মহান বিজয় দিবসের ৪০ বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানটির তারিখ ছিল ইংরেজি ২৩ ডিসেম্বর ’১১। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. সুশীল ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি আমাদের জাতীয় কবি ‘কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য দেন যা আমার কাছে উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছে। তবে তার আগে ওনার সাথে পরিচয় পর্বের উপলব্ধি ব্যক্ত করছি।

অনুষ্ঠান শেষে ড. সুশীলের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমরা একটি নিরিবিলি রুমে যাই। ওখানে গিয়ে আমার প্রকাশিত ৭টি গ্রন্থ ৩টি সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী তাকে উপহার দেই। প্রথমেই ‘থ’ নাম গ্রন্থটি উনি নেড়েচেড়ে দেখেন (হয়ত ব্যতিক্রমধর্মী নামের কারণেই)। ছোট ছোট গল্পগুলো দেখে জিজ্ঞেস করেন এগুলো কি ? আমি জবাব দেই এগুলো অণুগল্প। এখানে ১৫০টি অণুগল্প আছে। এ গ্রন্থের জন্যই ‘উত্তর বাংলা সংস্কৃতি পরিষদ’ আমাকে গুণীজন হিসেবে মনোনীত করেছে। যাহোক, তিনি বইগুলো ব্যাগের মধ্যে রাখতে যাবেন এমন সময় তার আরো দু’জন সহযাত্রী পাশে এসে দাঁড়ায়। তখন তিনি তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ইনি একজন সাংবাদিক, দুর্গাপুর থেকে প্রকাশিত ‘মূখ্যবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক নারায়ণ মজুমদার। আর একজন হলো রাজীব কুমার ঘাঁটী; গল্প কবিতা লেখেন এবং ‘শিল্পসাহিত্য নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন।

আমরা যে প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম এখন সে প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ড. সুশীল ভট্টাচার্য তার প্রধান অতিথির ভাষণে নজরুল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য দেন: আমরা জানি কবি নজরুল ১৯৪০ সাল থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন তিনি বাকশক্তিহীন অবস্থায় শিশুর মতো অনুভূতি নিয়ে জীবন যাপন করেন। বাল্যকাল থেকেই আমরা নজরুল পরিবারের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। একই গ্রামের (চুরুলিয়া) বাসিন্দা হওয়ার কারণে তার বাড়িতে আমাদের পরিবারের অবাধ যাতায়াত ছিল। তখন আমি চুরুলিয়া নজরুল একাডেমির সভাপতি হইনি (নজরুল একাডেমি গঠিত হয়নি) ১৯৫৫৫৬ সালের কথা হবে। আমি প্রায় সব সময় কবির বাড়িতে থাকি, কবির পাশে থেকে তার সেবা যত্ন করি। একদিনের ঘটনা: কবি রেগে গেলে কাগজ ছিঁড়তেন, কাগজ কুটিকুটি করে ছিঁড়ে হয়ত রাগ কমাতেন। আমরা তার পাশে (বিছানার বালিশের কাছে) কাগজ জমা করে রাখতাম। একদিন তিনি হঠাৎ রেগে গেলেন এবং পাশের জমাকৃত কাগজ তিনি ছিঁড়তে লাগলেন। তখন কবির পুত্র কাজী সব্যসাচী (যার ডাক নাম সানি) আমার হাতে একটি ছবি ধরিয়ে দিয়ে বললেন এটি দাও। ছবিটি ছিল কবির স্ত্রী প্রমীলা দেবীর। ছবিটি হাতে নিয়ে কবি তাতে কিছুক্ষণ নিরিখ দৃষ্টি দিলেন; এরপর ছবিটি তিনি বালিশের তলায় রেখে দিলেন। আবার তিনি কাগজ ছিঁড়তে লাগলেন। কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে এক সময় গচ্ছিত কাগজ শেষ হয়ে গেল; কবি কোথাও আর কাগজ খুঁজে পাচ্ছেন না; আমরা দুজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছি তার কার্যকলাপ, আমরা ইচ্ছে করেই তাকে কোন কিছু এগিয়ে দিচ্ছি না; হঠাৎ তিনি বালিশের তলা থেকে প্রমীলা দেবীর ছবিটি হাতে নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। সানি তখন আমাকে বললেন জানি এমনটিই হবে।

কবি যখন অত্যন্ত রেগে যেতেন তখন তাকে কিছুতেই থামান যেত না; তখন কবির রচিত গ্রামোফোন গান বাজানো হতো। অবাক ব্যাপার তখন তার রাগ ধীরে কমে আসত এবং এক সময় শিশুর মতো নিষ্পাপ চেহারা ছবি ফুটে উঠত তার মুখাবয়বে। আমরা তার জোতির্ময় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম অবাক দৃষ্টিতে, ভাবতাম এই সেই বৃটিশ ভারত কাঁপানো বিদ্রোহী কবি যিনি এখন নির্বাক হয়ে শিশুর মতো আচরণ করছেন, কিংবা আমরা যা জানি না তাই করছেন হয়ত বা অন্য জগতে ধ্যানস্থ হয়ে সময় কাটাচ্ছেন।

কবির চিকিৎসা হয়েছে কিন্তু আমরা তার সুচিকিৎসা করতে পারিনি। কবিকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। ডাক্তাররা সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় না করতে পারলেও কবির মস্তিষ্কে সমস্যা হয়েছিল এটা তারা বুঝতে পেরেছিলেন। এজন্যে তারা ব্রেনের অপারেশন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কবির স্ত্রীর প্রবল আপত্তির কারণে তা হয়নি; তার ধারণা ছিল অপারেশন করলেই কবি মারা যাবেন। তাছাড়া পর্যাপ্ত টাকাও কবির ছিল না। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কবির চিকিৎসার জন্য ৪০০ টাকা এবং ভারত সরকার ২০০ টাকা করে কবিকে ভাতা দিত। যাহোক আমি কবির পাশে থাকতে পেরে, নিজ হাতে কবির সেবাযত্ন করে নিজেকে বড়ই ভাগ্যবান মনে করছি। পরবর্তীতে চুরুলিয়া নজরুল একাডেমি হলে ওই প্রতিষ্ঠানের আমি সভাপতি হই। আমি এখনও নজরুল সাধনায় মত্ত আছি, থাকব আমৃত্যু।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: