প্রথম পাতা > কবিতা, জীবনী, সমাজ, সাহিত্য > ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস

ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস

nazrul-88 -artআবদুল মান্নান সৈয়দ : ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কবিজীবনের পরম সার্থকতা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮৭৪) নজরুলবিবেচনায় একটি অস্থিরতা ছিল। ১৯৪৪ সালে ‘কবিতা’ পত্রিকার (কার্তিকপৌষ ১৩৫১) নজরুলসংখ্যার সম্পাদকীয়ে বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছিলেন : ‘আজকাল যে সাম্যের বাণী লোকের মুখে মুখে বুলিতে পরিণত হয়েছে, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে নজরুলই তার প্রথম উদগাতা। রাজনীতিকে তিনি এড়িয়ে চলেননি, তার মধ্যে নিজেকে হারিয়েও ফেলেননিতা থেকে বের করেছেন সুরঝঙ্কার এবং সেটাই তো কবির কাজ। এখনকার রাজনৈতিক আড্ডায় শুধু এ জন্যই তার সম্মান হতে পারতো, সেটা হয়নি এই কারণে যে, প্রগতিশীল পরিভাষায় নজরুলের কবিতা ‘রোমান্টিক’। বিশ্বাস, উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা এ সমস্ত জিনিসকে যারা রোমান্টিক বলে এক পাশে সরিয়ে রাখেন, তাদের পক্ষে সাহিত্যচর্চা নিতান্তই অবৈধ।’ ১৯৫২ সালে বুদ্ধদেব বসুই ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ প্রবন্ধে লিখছেন : ‘নজরুল ইসলাম নিজে জানেননি যে, তিনি নতুন যুগ এগিয়ে আনছেন; তার রচনায় সামাজিকরাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই।’

মাত্র ছ’বছরের ব্যবধানে এই দুই বিরোধী উক্তি করেছেন বুদ্ধদেব বসু। এর একটি কারণ ছিল। বাংলা সাম্যবাদী কবিতার জনপ্রিয় নজরুল ইসলাম (১৮৯৯১৯৭৬) বুদ্ধদেব বসুও ১৯৪৪ সালে সেকথা বলেছেন। চল্লিশের দশকে সামাজিকরাজনৈতিক প্রভাবেই বাংলা সাম্যবাদীসমাজতন্ত্রী কবিতার ভরা জোয়ার গেছে; আর কোনো দশকে এমন হয়নি; নজরুলের কবিতার প্রভাব এক দশক (তিরিশের) পেরিয়ে প্রবল বলীয়ান হয়ে ওঠে, তাতেই নতুন করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলা কবিতায় নজরুলের ভূমিকা। অগণন বামপন্থীসমাজতন্ত্রী কবির উদ্ভব ঘটে এক দশকে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, দিনেশ দাস, জগন্নাথ চক্রবর্তী, সানাউল হক, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মণীন্দ্র রায়, রাম বসু, চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায়, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, রামেন্দ্র দেশমুখ্য, মৃগাঙ্ক রায়, সিদ্ধেশ্বর সেন, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (পরে সমালোচক), সৈয়দ নূরুদ্দীন, সিকানদার আবু জাফর, আবুল হোসেন, ফররুখ আহমদ (পরে পরিবর্তিত), আহসান হাবীব, গোলাম কুদ্দুস, অসীম রায় (পরে ঔপন্যাসিক) প্রমুখ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ছেচল্লিশের হিন্দুমুসলমান দাঙ্গা, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলনের উত্তুঙ্গতা এবং পরিণামে স্বাধীনতা কিন্তু একই সঙ্গে দেশভাগএইসবই চল্লিশের নবোত্থিত কবিকথাশিল্পীদের প্রভাবিত করেছিল। তবে জীবনের মতই শিল্পেরও কোনো সরলীকৃত বা বাঁধা রূপ নেই। ঐ সময়েরই সন্তান একদল কবি (নরেশ গুহ, অরুণ কুমার সরকার, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ) ব্যক্তিগত এক রোমান্টিক প্রেমপ্রকৃতির আরাধনা করেছেন। এই কবিদের প্রায় সকলেই বুদ্ধদেব বসুসম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার আশ্রয়েপ্রশ্রয়ে বর্ধিত। আবার তিরিশের ব্যক্তিবাদী প্রধান কবিরাও অনেকে পরিবর্তিত হয়েছেন; ক্ষণকালের জন্যে হলেও। অমীয় চক্রবর্তী লিখেছেন ‘অন্ন দাও’, বিষ্ণু দে লিখেছেন ‘সন্দ্বীপের চর’, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন ‘সংবর্ত’ বা ‘১৯৪৫’, জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘১৯৪৫৪৬’। বুদ্ধদেব বসু এই সময়েও তার ব্যক্তিগত বৃত্তের বাইরে আসেননি, এমনকি জীবনানন্দের অন্তঃপরিবর্তনে অসন্তুষ্ট হয়ে তার বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখেছিলেন এবং মহাপৃথিবী ও সাতটি তারার তিমির সম্পর্কে ‘কবিতা’ পত্রিকায় বিরূপ সমালোচনা বেরিয়েছিল।

কবিতা’ পত্রিকার নজরুলসংখ্যার সম্পাদকীয়ে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ‘আজকাল যেসব রচনা রাজনৈতিক কবিতা বলে ধরা হয়, তার ধূসর নীরসতার সঙ্গে নজরুলের উদ্দীপ্ত আনন্দের প্রতি তুলনা সহজেই মনে জাগে।’ একথা পরবর্তীকালে অনেকখানি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হয় : বুদ্ধদেব রাজনৈতিকসামাজিক কবিতাকে অন্তর থেকে কখনো স্বীকার করেননি। এই উক্তির প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিল চল্লিশের দশকের সামাজিকরাজনৈতিক কবিতাকে আক্রমণ করা, নজরুল সম্পর্কে সপ্রশংস থেকে। কয়েক বছর পরে নজরুল সম্পর্কেও সেই প্রশংসা থাকল না, লিখলেন নজরুলের কবিতায় ‘সামাজিকরাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই।’

আজ পরিষ্কার, এই উক্তি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বিষয়ের কারণে কবিতা খারিজ হয়ে যায় না। যেমন প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা হতে পারে, তেমনি হতে পারে সমাজ ও রাজনীতি। মোরগ নিয়ে উত্তীর্ণ কবিতা লিখেছেন আধুনিক একজন কবি : সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (‘কুক্কুট’)। ঘাস বিষয়ে মর্মস্পর্শী এক কবিতা লিখেছেন আধুনিক একজন কবি : জীবনানন্দ দাশ (‘ঘাস’)। বাংলা ভাষায় নজরুল ইসলামই ব্যাপকভাবে দেখালেন সামাজিক বোধ ও রাজনৈতিক চেতনা থেকেও সমুত্তীর্ণ কবিতা লেখা সম্ভব। হিন্দুমুসলমানদের মিলন, এ ছিল এতকাল প্রবন্ধের বিষয়; ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা লিখে নজরুল প্রমাণ করলেন এই সামাজিক সমস্যাকেও অসাধারণ কবিতায় রূপান্তরিত করা যায়। ইংরেজের দখল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে হবে : এই চেতনা এদেশের রাজনীতিবিদ থেকে জনসাধারণের অনেকেরই ছিল। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখে নজরুল দেখালেন কী করে রাজনৈতিক চেতনাকে অসাধারণ কবিতায় পরিণত করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রাচ্ছন্ন কবিদের রচনায় যখন অবিরলভাবে প্রেম ও প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা ব্যবহারে অপরিচিত হয়ে গিয়েছিল, তখন নজরুল ইসলাম নিয়ে এলেন সামাজিকচেতনা ও রাজনৈতিকচেতনা। কিন্তু এই সামাজিকরাজনৈতিক চেতনা ও দ্রোহ যদি কবিতায় কেলাসিত না হতো, তাহলে নজরুল সম্পর্কে আমরা নীরব থাকতাম। কিন্তু কবিতার উপচারগুলোশব্দ, ছন্দ, উপমা, চিত্রকল্প, সংগঠন ইত্যাদি ছিল নজরুলের হাতে জাদুকরের মতো। ফলে সমাজ ও রাজনীতি কবিতায় এক শিল্পসম্মত রূপ নিয়েছে। এটা ঠিক যে, নজরুল রবীন্দ্রউৎসারিত প্রেম ও প্রকৃতি আধ্যাত্ম ধারায়ও কিছু কিছু উৎকৃষ্ট কবিতা লিখেছেন; কিন্তু নামেনে উপায় নেই, সমাজ ও রাজনীতিক ভাবনাবেদনার উদ্বোধন নজরুলের কবিতায় যেভাবে ঘটেছে, অন্য কোনো ক্ষেত্রে তা হয়নি। আর তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহই তার সাহিত্যিক বিদ্রোহ। বাংলা কবিতার ইতিহাসেঅন্তত প্রধানভাবে যা ছিল না, নজরুল ইসলাম সেটি যোগ করেছেন।

হিন্দুমুসলমানের মিল কামনা আধুনিক সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের আবির্ভাবের পর থেকেই ক্রমাগত ঘোষিত হচ্ছিল। মীর মশাররফ হোসেন লিখেছিলেন একটি প্রবন্ধপুস্তকগোজীবন (১৮৮৯)। কায়কোবাদ লিখেছিলেন মহাকাব্য মহাশ্মশান (১৯০৫)। মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর) সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ (১৯২০) পত্রিকার প্রথম সংখ্যার (বৈশাখ ১৩২৭) সম্পাদকীয়ে বলা হয়েছিল : ‘বর্তমানে আমাদের সাহিত্যিক সমাজ’ বলিলে কেবল মুসলমান সমাজকে বুঝাইবে। হউক হিন্দুর ধর্ম ভিন্ন আর মুসলমানের ধর্ম অন্য, কিন্তু জন্মভূমিগত এবং ভাষাগত হিসেবে হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই এক উভয়েই একই প্রকৃতির নিয়ম নিড়ে নিবন্ধ।’ শুধু ‘মোসলেম ভারত’ কেন তার বহু আগে থেকেই মুসলমানসম্পাদিত পত্রিকায় হিন্দুমুসলমানের মিলবাণী ধ্বনিত হচ্ছিল। রওশন আলী চৌধুরীসম্পদিত মাসিক ‘কোহিনূর’ (১৮৯৮) পত্রিকার প্রথম সংখ্যার (আষাঢ় ১৩০৫) সম্পাদকীয়ে উচ্চারিত হয় : ‘হিন্দুমুসলমানে সম্প্রীতি, জাতীয় উন্নতি, মাতৃভাষার সেবাকল্পে এবং কলিকাতার অনাথআশ্রমের সাহায্যার্থে ‘কোহিনূর’ প্রচারে ব্রতী হইয়াছি।’ সৈয়দ এমদাদ আলীসম্পাদিত ‘নবনূর’ (১৯৩০) পত্রিকার প্রথম সংখ্যার বৈশাখ ১৩১০) সম্পাদকীয়ে ঘোষিত হয় : ‘ভারতবর্ষের অদৃষ্টফলকে হিন্দুমুসলমানের সুখদুঃখ এখন একই বর্ণে বিচিত্র; বিজয়দৃপ্ত মুসলমান এখন হিন্দুর ন্যায়ই বিজিত। এই দুই মহাজাতির সম্মিলনের উপরেই ভারতের শুভাশুভ নির্ভর করে। সাহিত্যই এই মিলনের প্রশস্ত ক্ষেত্র।’ মুসলমানের নিজস্বতা হারাতে চায়নি কেউ। যাঁরা হিন্দুমুসলমানের মিলনের কথা বলেছেন তাঁরাও নন, কিন্তু হিন্দুমুসলমানের মিলনের কথা অনেকেই বলেছেন। নজরুল ইসলাম এঁদেরই উত্তরসাধক। তিনি কোনো নতুন কথা বলেননি এদিকে থেকে, বৈষ্ণব পদ ও শ্যামাসংগীত নজরুলের আগেও অনেক মুসলমান গীতিকারকবি রচনা করেছেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম যেভাবে হিন্দুমুসলমান (এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে) তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন, তেমন আর কেউ নন। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই দেশত্মবোধক গান ও কবিতা লেখা হচ্ছে আর লিখেছেন বিখ্যাত ও অখ্যাত লেখকেরা তারই বেশকিছু কবিতায়গানে মর্মরিত হয়েছে প্রত্যক্ষপরোক্ষ স্বাধীনতার কামনা। কিন্তু এক্ষেত্রেও অন্যদের অতিক্রম করছেন নজরুল। অর্থাৎ নজরুলের রাজনীতিচেতনা ও সমাজচেতনা এমন একটি শিখর জয় করেছে, যেখানে আর কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

নজরুল ইসলাম এত সৎ অপকট অভীক ছিলেন যার কোনো তুলনা নেই। তাঁর ব্যক্তিজীবনে ও সাহিত্যজীবনে ফারাক ছিল না কোনো। হিন্দুমুসলমানের মিলন কামনা যিনি করেছেন, তিনি মুসলমান হয়ে হিন্দু নারী বিয়ে করেছেন; প্রচলন ভেঙে ছেলেমেয়ের নাম রেখেছেন কৃষ্ণ মুহম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ। সামাজিক জীবনে যেমন তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও নজরুল ছিলেন নিরাপোষ, ইংরেজের বিরুদ্ধে লেখায় তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে, একবার জেল খেটেছেন, আরএকবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন।

ব্যক্তিজীবনের এসব ঘটনা হয়তো কোনো কিছু প্রমাণ করে না, কিন্তু এসব থেকে নজরুলের সৎ অখন্ড আমরা বুঝে নিতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অভীন্সার ক্ষেত্রে কোনো ভেজাল ছিল না, ছিল এক সৎ অকপট আশ্চর্য চারিত্রশক্তি। সাহিত্যিক সাফল্যের সবটাই বিষয় আর আঙ্গিকের দখলের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে যার উপর সেই আত্মার শক্তি ছিল সমস্তের উৎস।

অথচ কী ভুলইনা বুঝেছেন তাঁর সমকালীন সমালোচকদের অনেকে। ইসলামি বিষয় নিয়ে লিখেছেন যখন নজরুল, তখন সজনীকান্ত দাস ‘শনিবারের চিঠি’তে শেল হেনেছেন। আবার মুন্সী মোহাম্মদ বেয়াজুদ্দীন আহমদ ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩২৯) লিখেছেন… ‘ধূমকেতু প্রত্যেক সংখ্যায় পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে গরল উদগীরণ করিতেছে। এই উদ্দাম যুবক যে ইসলামি শিক্ষা আদৌ পায় নাই, তাহা ইহার লেখার পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাইতেছে। হিন্দুয়ানী মাজ্জায় ইহার মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ।’

নজরুল শুধু হিন্দুমুসলমানের মিলনের সাহিত্য রচনা করেননি যে কথাটি সব সময়ই বলা হয়, কিন্তু যা সাধারণভাবে বলা হয় না তা হচ্ছে এই যে, তিনি প্রথম থেকেই মুসলিম ঐতিহ্যভিত্তিক এবং হিন্দু ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখে আসছেন। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় যখন তিনি মুসলিম ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখছেন, তখনই হিন্দু ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখছেন ‘উপাসনা’ পত্রিকায়। এসব তিরিশের দশকে এক বিরাট মোহনায় গিয়ে পড়ে যখন তিনি একই সঙ্গে ইসলামি গান এবং শ্যামাসংগীত (বা অন্য হিন্দু ঐতিহ্যভিত্তিক গান) লিখেছেন অঝোরে। সেই লেটোদলের যুগ থেকে শেষ পর্যন্ত নজরুলের একটি আবহমানতা ছিল তাঁর পূর্বাপর সৃষ্টিশীলতায় ছিল এক ছেদহীন বিদ্বেষহীন ধারাবাহিকতা। নজরুল যেন সারা মধ্যযুগের হিন্দু সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সারা মায় মধ্যযুগের মুসলিম সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সারবত্তা নিজের ভিতরে শোষণ করে নিয়েছিলেন। বাংলার হিন্দু এবং বাংলার মুসলমান আধুনিককালের কেন চিরকালের আরকোনো একক কবিকে কি এমনভাবে পেয়েছে? পায়নি। বাংলা সাহিত্যের হিন্দুমুসলিম ঐতিহ্যের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আত্তীকৃত করেছিলেন নজরুল। অথচ তাঁর দৃষ্টি কখনো পশ্চাদমুখী ছিল না, তাঁর গতি সবসময় সম্মুখবর্তী : জিঞ্জির গ্রন্থের কবিতার পর কবিতায় দেখা যাবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচয়িতা কবিকে সমগ্র নজরুলই তাই।

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০০৬০), নজরুলের সমসাময়িক কবি, তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অসাধারণ কবিতাগ্রন্থ আর্কেস্ট্রার (১৯৩৫, দ্বি সং ১৯৫৪) ভূমিকায় (ভূমিকার রচনাকাল : ১৯৫৩) লিখেছিলেন, ‘ইলিয়ট কবিকে ঘটক আখ্যা দিয়েছেন; এবং আমিও মনে করি যে ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কবিজীবনের পরম সার্থকতা।’ জীবনের উপান্তে এসে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই উপলব্ধি। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে নজরুল ইসলামের তিলতম সাযুজ্য নেই এমনকি জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯৫৪) সঙ্গে সুধীন্দ্রনাথের যেটুকু সাদৃশ্য আছে তাও নেই। নজরুল রোমান্টিক ঘরাণার কবি, সুধীন্দ্রনাথ, ক্লাসিক ঘরাণার। নজরুল আবেগেউচ্ছ্বাসে প্লাবিত, সুধীন্দ্রনাথের লক্ষ্য আবেগমুক্তি। ফলত নজরুল একটি মাত্রও সনেট লেখেননি, সুধীন্দ্রনাথ অল্প কয়েকটি সনেট লিখলেও তার প্রত্যেকটিই মূল্যবান। কিন্তু যিনি লিখেছিলেন ‘আমি ব্যক্তিবাদী’, পরিণত বয়সে এসে তিনি উপলদ্ধি করেন ব্যক্তিগতের সঙ্গে মেশাতে হয় জাতিগত মানস। সুধীন্দ্রনাথপ্রযুক্তি ‘মনীষা’ সম্পর্কে এখানে আমি ‘প্রতিভা’ বা ‘ব্যক্তিপ্রতিভা’, এলিয়ট যাকে বলেছিলেন ‘‘Individual talent’ বলে মনে করছি। তাছাড়া যদি ‘মনীষা’ই ধরি তা কি কেবল অধ্যয়নের ফল? পরিগ্রহণের ক্ষমতা, বিশ্লেষণের ক্ষমতা এসবও কি নয়? ভারতবর্ষের কোটি জনসাধারণ বিশেরতিরিশের দশকে যা আকাঙ্খা করেছিল, কবি নজরুল ইসলামের কণ্ঠে তো সেই জাতিগত আকাঙ্খাই ভর করেছিল। বাংলার তথা ভারতবর্ষের জনসাধারণ যে দুই ধর্মমতে দীক্ষিত তাদের মিলন কামনা বা তাদের স্বতন্ত্র বাসনা ও আচারআচরণের জাতীয় প্রকাশ তো নজরুল ইসলামের কবিতাতেই সবচেয়ে তীব্র ও সার্থকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। তাই কি মাত্র ৩০০ বছরের যুবক কবিকে, রবীন্দ্রনাথযতীন্দ্রনাথমোহিতলাল এবং আরো অজস্র কবি জীবিত থাকলেও, ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ১৯২৯ সালে সংবর্ধিত করা হয়েছিল? সুধীন্দ্রনাথের উক্তি অনুসারে আমরা বলতে পারি, কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিপ্রতিভা জাতীয় মানস ফুটিয়ে তুলে পরম সার্থকতা ও চতিতার্থতা অর্জন করেছে।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: