পুরুষের চোখে নারী

lovers-4 -artরাশেদা রওনক খান : আমাদের সমাজে তথাকথিত পুরুষের চোখে নারীআসলে কী? কোনও ভূমিকা না দিয়ে চলে যেতে চাই আলোচনায়:

. আমরা সারাক্ষণ নাটকসিনেমার নায়িকা কিংবা মডেলদের বাস্তবে, স্বপ্নে কিংবা টিভিসিনেমার পর্দায়ই দেখতে ভালোবাসি! কিন্তু তাদের নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হয়, তখন তাদের নিয়ে কী ধরনের আলোচনা হতে পারে, তার বহিঃপ্রকাশ আমরা বিভিন্ন নায়িকা কিংবা মডেলের ফেসবুক থেকেই অনুধাবন করতে পারি। বাংলাদেশের সম্ভবত এমন কোনও নায়িকা কিংবা মডেল নেই, যিনি ফেসবুকে বাজে এবং অশ্লীল মন্তব্য পাননি? কিন্তু কেন? যখন তাদের রূপালি পর্দায় বা টিভিতে দেখছে, তখন থেকেই তাদের প্রতি ওই বিকৃত মনমানসিকতার পুরুষগুলোর বিকৃত জৈবিক তাড়না তৈরি হয়। যেহেতু সেই তাড়না মেটাতে পারে না, তখনই তার ভেতরে একধরনের খেদ, না পাওয়ার হতাশা পেয়ে বসে। এই হতাশা, খেদ, না পাওয়ার যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এসব অশ্লীল মন্তব্য। ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আমাদের সহজেই এটা বুঝতে সাহায্য করে।

ফ্রয়েড বলছেন, সব ইচ্ছারই একটা করে বিপরীত ইচ্ছে আছে। যেমনভালোবাসাঘৃণা অর্থাৎ কাউকে যদি ব্যক্তির ভালো লাগে, কিন্তু তাকে যখন না পায়, তখন সে ব্যক্তি তার ভালোলাগার মানুষটির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে মনের ভেতরে। মনের অজান্তে কিছু মানুষ বাসনার তৃপ্তির জন্য বাস্তবতা বা সমাজকে অবজ্ঞা করে। সেক্ষেত্রে কেউ এসিড ছোড়ে, কেউ কেউ এই ডিজিটাল বাংলাদেশে তাদের চেতন কিংবা অবচেতনে সেই নারীর প্রতি যৌনতা এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ধরনের অশ্লীল মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে!

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা তথাকথিত ভদ্র শ্রেণির যারা এই মন্তব্যগুলো দেখে থাকি, কতজন এর প্রতিবাদে কিংবা সেই বিকৃত রুচির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পাল্টা মন্তব্য দেই? কেন দেই না—এর উত্তরও সম্ভবত ফ্রয়েডীয় ধারণা হতে পেতে পারি, যেখানে তিনি বলছেন, পালিয়ে বাঁচার কথা। নিজের মনের ইচ্ছে বা কথাকে সাপ্রেস করে রাখা, কোনও একটা কাজ করা বা বলার প্রয়োজন মনে না করা। ফলে এখানে চারটি দল আমরা দেখতে পাই। একপক্ষ, যারা সরাসরি নোংরা মন্তব্য লিখছে, আরেক পক্ষ আছে, যারা এসব মন্তব্য নিজে না করলেও পড়ে আত্মতুষ্টি লাভ করে, আরেক পক্ষ যারা মন্তব্য পড়ছে কিন্তু প্রতিবাদ করছে না, আর শেষ পক্ষ যারা একেবারেই সংখ্যায় নগন্য, যারা প্রতিবাদ করছে! আসুন সবাই আজ এই দিনে শপথ নেই শেষ পক্ষে যোগ দেওয়ার!
. এবার একটু ভাষা প্রসঙ্গে আসি! নিত্যদিনের ভাষা কতটা সরাসরি সহিংস শব্দাবলি কিংবা হয়রানিমূলক—তা একজন নারী তার কৈশোর কাল থেকেই জেনে যায়! একজন কিশোরীর চোখ এড়ায় না বাবামায়ের হাত ধরে কোথাও যাওয়ার পথে রাস্তার দেয়ালে আঁকা বিভিন্ন চিহ্ন, যেখানে নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে দেখানো হয়। সেই কিশোরী তার পুরো জীবনে নানান সময়ে নানাভাবে নানা পর্যায়ে এই ধরনের যৌনভাষা নিয়েই বেড়ে ওঠে। উদাহরণ টেনেই বলছি—কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে, আজও বিদ্যাশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাসরুমে, টয়লেটের প্রবেশপথে, নববর্ষের খেতাবে কিংবা নারী ক্লাসমেটদের পুরুষ সহপাঠীদের নামকরণে, ব্ল্যাকবোর্ডে, ক্লাস রুমের দেয়ালে, কাঠের টেবিলে নারীকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল বাক্য, ছবি, কার্টুন, চিহ্ন সংবলিত অশ্লীলতা চোখে পড়ে না? কেউ কি সাহস করে দাবি করতে পারবেন যে, এই ধরনের সহিংস, যৌন বিকৃত লেখা, ছবি, মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়তে আসা তরুণেরা করেনি? নাকি এক শ্রেণির ‘ভদ্র উচ্চশিক্ষিত পুরুষ’ ফেসবুকের মন্তব্যের মতো দোষ ছুড়ে দেবে যে, ‘নিন্মশ্রেণির‘, ‘অভদ্র‘, ‘মূর্খ‘, পিওনদারোয়ানরা এসব করেছে, আমরা নই! বরং সৎ সাহস নিয়ে পুরুষদের বলার সময় এসেছে, ‘হ্যাঁ আমরাই করেছি! এই আমরাই এখন বিসিএস ক্যাডার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সাংবাদিক তথা জাতির বিবেক! এই আমরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীদের বাবা, যারা তোমাদের জন্য এই পবিত্র জায়গা নষ্ট করে দিয়ে এসেছি, এবং এখনও সেভাবেই চলছেআমাদের ক্ষমা করে দাও!’ মনে রাখতে হবে, ‘ভাষা’ হলো চৈতন্যের প্রকাশিত একটা চেহারা বা রূপ! তাই ভাষার মাধ্যমে যেমন অপরাধ করা যায়, তেমনি সেই ভাষা দিয়েই ক্ষমা চাওয়া যায় আর কারও কাছে না হোক, অন্তত নিজের কাছে!

. এবার আসি, রাস্তাঘাটের চলা ফেরায় আমাদের নারীর প্রতি কেবল বৈষম্যমূলক আচরণের ধরন প্রসঙ্গে! একজন নারীর সেই কিশোরীকাল থেকে নিত্যদিনের পথ চলায় কী পরিমাণ তির্যক মন্তব্য শুনতে হয়, তা কেবল একজন নারীই জানেন। পুরুষরা জানেন না, তা নয়! নিপীড়ক শক্তি ঠিকই জানে তার নিপীড়নের মাত্রা কতটা ভয়াবহ। তাই সহজেই নিজের স্ত্রী কিংবা মেয়েকে হিজাবি বানিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী। ধারণাটা খুব ভুল! হিজাব যারা পরেন, এমন অনেক নারীর অভিজ্ঞতার কথা শুনে আমি চমকে উঠেছি রীতিমতো! বিকৃত মানসিকতার কাপুরুষেরা ঠিক ঠিক তাদের তির্যক মন্তব্য, বিশেষ অঙ্গভঙ্গি, প্রতীকী শব্দ উচ্চারণ, এমনকি শরীরে স্পর্শ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অনেকে ভাবতে পারে, উচ্চবিত্তের মেয়েদের গাড়িতে চড়ে বলে এই সমস্যা নেই। কিন্তু বিত্ত যে এক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে পারে না, তার উদাহরণ শাজনীন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। তাহলে ঘরের ভেতরেই আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রথম আলোর প্রকাশক লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হতেন না। তাই যেসব উচ্চবিত্ত উচ্চশিক্ষিত পুরুষ নিজেদের স্ত্রীমেয়ে সন্তানকে বিত্তের ভেতরে রেখে নিরাপদ ভাবছেন, আসলে বিষয়টি অতটা সহজসরল নয়। তাই এখনই সময় প্রত্যেকের সচেতনতার। যারা শুনছেন কোনও পথচারী নারীকে উদ্দেশ্য করে কেউ বাজে মন্তব্য করছে কিংবা অঙ্গভঙ্গি করছে, তার প্রতিবাদ না করে নিপাট ভদ্রলোকের মতো শুনে যাওয়াটা আসল মানুষ হিসেবে আপনার ‘পরাজয়’ ছাড়া কিছু নয়। কেন না, আজ আপনিআমি এর প্রতিবাদ না করলে কে জানে কাল আমারআপনার মেয়েকেও গাড়িথেকে নামার পর একই রকমভাবে বাজে মন্তব্য শুনতে হতে পারে। সমাজে হাতে গোনা গুটিকতক মানুষ ছাড়া বিশেষ করে আমরা যারা শহরে উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্তউচ্চবিত্ত সুবিধাভোগী শ্রেণি তারা খুব সহজেই বিপদঅপদকে পাশ কাটিয়ে নিজের স্বার্থকেই বড় করে দেখি। কিন্তু তাতে যে নিজের স্বার্থ সিদ্ধিতো হয়ই না, বরং নিজের ওপরই এসে বিপদ পড়ে, এমন হাজারো প্রমাণ আছে।

. এবার নারীর প্রতি সরাসরি সহিংসতা কিংবা নির্যাতন প্রসঙ্গে আসি। আমাদের সামাজিক দৃষ্টি কি আসলে নারী নিয়ে, তা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে বুঝতে পারি। এই সমস্যা তা কেবল আমাদের দেশের সমস্যা তা কিন্তু নয়, পাশ্চাত্যেও এটা প্রবলভাবেই আছে। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে কয়েকজন পুলিশ কর্তৃক কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে, এই ঘটনা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে। সেদিন অনেক গণমাধ্যমেই ইয়াসমিনকে পতিতাবানিয়ে ফেলেছিল!

কতটা নির্লজ্জ অমানবিক অসভ্যতা স্থান পায় সেইসব সংবাদ প্রকাশে। এই এরাই হয়তো শিরোনাম করবে ‘আজ ২৪ আগস্ট পালিত হচ্ছে: জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ’ দিবস। ‘তনুর ঘটনা তা খুব বেশিদিন আগের নয়। আমি একটা নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের মায়েদের আলাপ শুনছিলাম তনুকে ঘিরে! একজন বলছিলেন, ‘মেয়েটা তো ভালো ছিল না, নাটক করত, থিয়েটার করত, রাত করে বাড়ি ফিরত। এইজন্যই এমন হয়েছে।’ আরেকজন বলছে, ‘মেয়েদের এতো স্বাধীনতা দিতে নেই, বাবামা তনুকে যা ইচ্ছে তাই করতে দিয়েছে, তাই আজ এই পরিণতি’। আরেকজন বলছে, ‘হিজাব পরলে কী হবে, তার নাকি সব ছেলে বন্ধু, যারা মেরেছে তারা তো সব তার বন্ধুই। এভাবে অবাধে এক সঙ্গে মিশলে এক সময় তো বন্ধুদের মনে খারাপ ইচ্ছে জাগবেই, তনু দিতে চায়নি, জোরাজোরি করছে, তাই নাকি মেরে ফেলল!’ এবার যেন আমার ধৈয্যের বাঁধ ভেঙে গেল।

আমার অবাক প্রশ্ন, এগুলো কোথায় শুনলেন আপনারা? উত্তরে একজন বলল, ‘আমার স্বামী বলল, ও অফিসে শুনে এসেছে।’, একজন বলল, ‘কেন পত্রিকায় তো দিচ্ছে এসব। আপনি পড়েন নি?’ আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই নারী জগৎ তাই জানে, যা তার পুরুষ কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম যন্ত্র গণমাধ্যম জানায়। পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে টিএসসিতে কোনও এক নববর্ষের রাতে ‘বাঁধন’ নামের এক মেয়েকে হেনস্তা করার কথা! কেন উৎসব হবে লৈঙ্গিক বৈষম্যের, কেন রাষ্ট্র নারীকে উৎসব পালনে বাধা দেবে? কেন আমরা এমন একটা সমাজ তৈরি করতে পারিনি? শিক্ষাসংস্কৃতিরাজনীতির উৎকৃষ্ট স্থান টিএসসিতে পর্যন্ত কেন একজন নারী উৎসব করতে পারে না? সেই প্রশ্ন না ছুড়ে বরং মেয়েটি কেন এতো রাতে বের হলো, কেন এমন পোশাকে ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে—ইত্যাদি অপ্রাসঙ্গিক শব্দমালা দিয়ে কল্পকাহিনিগল্পে ভরে গেলো আমাদের গণমাধ্যমের পাতাগুলো! আফসানার মৃত্যু নিয়েই একই ধরনের বক্তব্য আমরা প্রায়শই গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি! কিভাবে মারা গেলো, কেন মারা গেলো, কে মেরে ফেলল, তার বিচার চাওয়ার চেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে, মেয়েটার কাপড়চোপড়, চেহারাচালচলন, বৈবাহিক স্ট্যাটাস, প্রেম, ইত্যাদি বিষয়ে নানাভাবে অশ্লীলতার গন্ধ খুঁজে পাওয়া। যারা বুঝেশুনেজেনে নিপীড়কহত্যাকারীকে বাঁচাতে চাচ্ছে তারা এই ধরনের ডিসকোর্স তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা! আর ফেসবুকে কেউ কেউ বুঝে কিংবা না বুঝে এসবের পুনরুৎপাদনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছি এবং অপশক্তিকে বাঁচিয়ে দেওয়ার পক্ষে পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছি, তাদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। তাই দ্বিতীয় দলের প্রতি অনুরোধ, গণমাধ্যমের রাজনৈতিক ফাঁদে পা দেওয়াটা ভয়ঙ্কর বিপদের। প্রত্যেকটি সংবাদ মাধ্যমেরই নিজস্ব কিছু এজেন্ডা থাকে, আমরা সাধারণ পাঠক তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ‘হাতিয়ার’ না হয়ে যাই, সেদিকটা আমাদেরই নজর দিতে হবে! যেমন সেদিন ইয়াসমিনকে পতিতাবলে আখ্যায়িত করতে পারলে পুলিশ এর কিছু পাষাণ্ড ধর্ষক বেঁচে যায়! কোনও কোনও গণমাধ্যমের সহায়তায় তার ‘পতিতা’ পরিচিতি আমাদের অনেকেরই মগজে আটকে গেলো এবং আমরা ছোটবেলা থেকেই ‘বাইনারিঅপজিশন’ ধারণা দ্বারা এতটাই আপ্লুত যে, ভালো মেয়ের বিপরীতে ‘খারাপ মেয়ে’ বলতে ‘পতিতা’কেই বুঝি! পতিতাবৃত্তি একটা পেশা এবং এই সেবা গ্রহণ করে আমাদের সমাজেরই পুরুষেরা, তা যেন আমাদের মগজ কিংবা ডিসকোর্সই নেই! যদিও ইয়াসমিন কোনোভাবেই এই পেশায় যুক্ত ছিল না। তবু যদি এই পেশার নাম বিক্রি করে নিপীড়ক দলকে বাঁচিয়ে দেওয়া যায়, সেই প্রত্যাশায় এই অপপ্রচার! এইসব অপপ্রচারে তলিয়ে যায় আসল ‘সত্য’। সত্যটা এই যে, ও আসলে ধানমণ্ডির এক বাসায় কাজ করত এবং একরাতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু বাস থেকে নামার পর দশমাইলের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইয়াসমিন পুলিশ সদস্যদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষক পুলিশের দল পরে ইয়াসমিনের লাশ দিনাজপুর শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ব্র্যাক অফিসের পাশে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।

শেষ করছি, মার্গারিটার সাফল্যগাথা গল্পকে যেভাবে আমরা গ্রহণ করছি, তা দিয়ে! আমাদের সমাজে কেউ কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মার্গারিটার সাফল্যকে নিজেদের রক্তের বলার জন্য,তিনি বাঙালি, তা প্রমাণের সর্বোচ্চ চেষ্টায় রত এখন তারা। কেবল যে কিছু পত্রিকা করছে তা নয়, কিছুদিনের মাঝেই শুরু হবে সব সভাসেমিনারে, প্রতিষ্ঠানে তাকে নিয়ে আলাপআলোচনা, বাঙালিয়ানার উচ্ছ্বাস প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠবেন তিনি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবার অভিনন্দনের বন্যায় ভাসবেন তিনি। এটাই তার প্রাপ্য সম্মান। তিনি যা দেখিয়েছেন, যা করেছেন, তা বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের জন্যই গর্বের এবং এর উপযুক্ত সম্মান অবশ্যই তার প্রাপ্য। কিন্তু এই ‘আমরা’, যারা এখন তাকে ‘আমাদের’ বলে দাবি করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী, তারা কি এই দেশ টাকে মার্গারিটার জন্য উপযুক্ত করতে পেরেছি? আমরা কি পারতাম এমন একটা পরিবেশ দিতে যেখানে মার্গারিটা এই জিমনাস্টিকসের ড্রেস পরিধান করে দিনের পর দিন অনুশীলন করতে পারেন? স্টেডিয়ামে দায়িত্বরত ঝাড়ুদার হতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—কার না চোখ আটকে থাকতো মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন বাঁকের দিকে? উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাঝে বিবাহিত সুখী সংসারের সফল স্বামী নামধারী কোনও একজন পুরুষ হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ত তার ওপর অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগদেওয়ার বিনিময়ে! এই তো আমাদের সমাজ! মনে আছে মাহফুজা খাতুন শিলার কথা? ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক এ সোনা জিতে বাংলাদেশের সাঁতারে ইতিহাস গড়ার সাথে সাথে ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে এসএ গেমসের রেকর্ড গড়ে দেশের জন্য সোনা জিতে এনেছেন! অথচ এই গেমস এ অংশ নেওয়ার টিকেট পেতে হয়েছিল অনেক ত্যাগের বিনিময়ে। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমরা সবাই জানি, ফেডারেশন তার সঙ্গে কি বৈষম্যমূলক আচরণই না করা হয়েছে! গণমাধ্যম এতটুকু বলেই তাদের দায়িত্ব সেরে ফেলেছেন! পত্রিকা কিংবা আমরা কেউ খুঁজে দেখি না, কেন সীমান্তশিলাদের মতো প্রতিভাবান মেয়েরা এভাবে বৈষম্যের স্বীকার হয়, কিসের জন্য আমাদের দেশে প্রতিভার অবমূল্যায়ন হয়? কারা সেই ভদ্রবেশী শয়তান? তাদের মুখোশ উন্মোচন করে ফেলতে পারি না আমরা?

মার্গারিটাকে নিয়ে আজ যেই অহঙ্কারী উচ্চারণ শুনি, সেই স্বর কেন শুনি না, যখন দেখি কোনও নারী এথলেটকে কর্মকর্তাদের ‘কথা মতো না চললে’ বা ‘বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব না মেনে নিলে’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়? কোথায় থাকে তখন আমাদের বাঙালিয়ানার গর্ব আর অহঙ্কার? নিজের জন্মভূমিতে একজন মার্গারিটা তৈরির জন্য আমরা প্রস্তুত কিনা, সেটা ভেবে দেখতে হবে সবাইকে। সীমান্তশিলার স্বর্ণজয়ের পর কিছুদিন তাদের নিয়ে হৈচৈ, তারপর হারিয়ে যায় এই সোনাজয়ী মেয়েরা। সমাজের বিত্তবান কিছু মানুষ কি এগিয়ে আসতে পারতো না তাদের আরও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য? পারিবারিকসামাজিকঅর্থনৈতিক চাপের কারণে তারা হারিয়ে যায় একসময় ‘বিয়ে’ নামক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। বিয়ের পর স্বামী কিংবা স্বামীর পরিবার আর এথলেট বউ চায় না, চায় একজন নম্রভদ্র ঘরণী, যার সাত চড়েও রা নেই! আমরা প্রতিবানদের যত্ন নিতে জানি না,কেবল কিছু দিন তাদের নিজস্ব চেষ্টায় প্রাপ্ত অর্জন নিয়ে লোক দেখানো আনন্দউল্লাসসভাসেমিনার করতে জানি। কিন্তু জানি না কিভাবে প্রতিভার যত্ন করতে হয়, রক্ষা করতে হয়! এভাবে অন্যায়অবিচারসহিংসতানির্যাতনবৈষম্যের কথা পদদলিত করে, আমরা যারা কেবল ‘অন্যে’র প্রাপ্তিকে ‘নিজের’ বলে আর্তনাদ করে শান্তি খুঁজে বেড়াই, নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে নামকাওয়াস্তে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস’ কিংবা ‘জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ পালন করি, পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শকেই আদর্শ মনে করি, সেই ভূমিতে আর যাই হোক, মার্গারিটা তৈরি হবে না। তার জন্য রাশিয়াতেই যেতে হবে!

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২৪ আগস্ট ২০১৬

প্রিয় পুরুষ, আপনাকেই বলছি

হাবীবাহ্ নাসরীন : পাঁচ বছরের একটি শিশু ধর্ষিত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। জীবনমৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করছে সে। অথচ এখন তার অ, , , খ বুঝতে বিদ্যালয়ে থাকার কথা ছিল। হয়তো শিক্ষকের কড়া চক্ষু ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠতো, এর কলম দিয়ে ওর ব্যাগে একটুখানি দাগ টেনে দিতো। সেই নিয়ে নালিশ করতো তার বন্ধুটি, `স্যার, পূজা আমার ব্যাগে দাগ দিয়েছে, দেখেন!` না।

পূজা বিদ্যালয়ে যায়নি। পূজা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাকে `ধর্ষণ` করা হয়েছে। পাঁচ বছরের পূজা এখনও ছেলে আর মেয়ের তফাৎটাই বোঝে না, সেই কি না ধর্ষণের শিকার! প্রিয় পুরুষ, আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন, পূজার কুঁচকে যাওয়া মুখখানা, ঘৃণাভরা চোখ দুটি? জানি, আপনি ধর্ষক নন। কিন্তু একজন পুরুষ হিসেবে এই লজ্জার দায় আপনি এড়াতে পারেন না। যেমন আমরা পারি না একজন মানুষ হয়েও মানুষের নিরাপত্তাহীনতার দায় এড়াতে।

এ রকম একটা ঘটনার পরে অনেকেই বলে থাকেন, `কী দোষ ছিল মেয়েটির? তার পোশাকে তো সমস্যা ছিল না!` অথবা কোনো হিজাব পরা মেয়ে ধর্ষিত হলে বলে, `মেয়েটি তো পর্দা করতো, তাহলে তাকে ধর্ষণ করা হলো কেন!` এখন, আমার কথা হচ্ছে, একটি মেয়ে হিজাব না পরলে বা অশালীন পোশাক পরলে তাকে ধর্ষণ করা যাবে? মেয়েটি শালীন পোশাক না পরে যদি ভুল করে থাকে, আপনি তার দিকে অসংযত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সমান অপরাধ করতে পারেন না নিশ্চয়ই।

ইসলাম শুধু মেয়েদেরকেই পর্দা করতে বলেনি বরং নারীপুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দাকে সমানভাবে ফরজ করেছে। পুরুষদেরকে তাদের গোপনাঙ্গের হেফাজত করতে এবং দৃষ্টি সংযত রাখতে বলা হয়েছে। এখন, আপনারা, পুরুষেরা সব মেয়ের দিকেই কামনা নিয়ে তাকাবেন আর মেয়েটি শালীন পোশাকে না থাকলে তাকে ধর্ষণ করা বৈধ হয়ে যাবে আর কালো বোরখায় আবৃত থাকলে আপনাদের লোলুপ দৃষ্টিসীমা থেকে বেঁচে যাবে, এই যুক্তি আপনারা কোথা থেকে এনেছেন?

নারীর পোশাকের প্রসঙ্গ এলেই আপনারা সবাই ইসলামী চিন্তাবিদ হয়ে যান। ইসলাম নারীকে যার যার সম্পত্তিতে যতখানি অধিকার দিয়েছে, একজন বোন হিসেবে, একজন মা হিসেবে, একজন স্ত্রী হিসেবে যতখানি অধিকার দিয়েছে, বুকে হাত রেখে বলুন, আপনি তার কতটুকু আদায় করতে পেরেছেন। একটু পিছনে তাকিয়ে দেখুন তো, আপনার পরিবারেই আপনার ফুফুকে অথবা বোনকে সম্পত্তির ভাগ ঠিকভাবে দেয়া হয়েছে কি না? ছেলে হিসেবে মায়ের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছেন? বিয়ের আগে এবং পরে আপনার স্ত্রীর হক কখনো নষ্ট করেছেন কি না! এখানে যেতে পারবে না, ওই পোশাক পরতে পারবে না, এটা বলে আপনি আপনার `পৌরুষ` টিকিয়ে রাখতে পারেন, কিন্তু এর বদলে নারীদের কাছ থেকে শুধু ঘৃণাই পাবেন।

পরিবার হচ্ছে আমাদের প্রথম বিদ্যালয়। আপনি যদি আপনার পরিবারে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন, তবে নিশ্চিত থাকুন, পরবর্তীতে সময়ে আপনার দ্বারা কোনো নারী অসম্মানিত হবেন না। যে তার মাকে ভালোবাসে, বোনকে ভালোবাসে, প্রিয়তমাকে ভালোবাসে সে কখনো অন্য একজন নারীকে উত্ত্যক্ত করতে পারে না। আপনি একজন পুরুষ। আপনি একজন মানুষ। আপনার নিজের কি এতটুকু ব্যক্তিত্ব নেই যে, যে কারো সামনে আপনি উলঙ্গ হয়ে যেতে পারেন!

নারীরা খারাপ তাই তারা ধর্ষিত হয়, এই আপনাদের যুক্তি। কিন্তু কথা হচ্ছে এই ধর্ষণটা করে কারা? যে পুরুষটি ধর্ষণ করলো, কতখানি মানবিক অবক্ষয়ের শিকার হলে সে এই কাজটি করতে পারে, তা আপনাদের চিন্তাতেও আসে না। বিভিন্ন সময় লোকাল বাসে চড়তে গিয়ে আমি একটি বিষয় দেখেছি। একজন পুরুষ সে হয়তো অশালীনভাবে কোনো নারীর গায়ে স্পর্শ করেছে। নারীটি যখন এই কথা বলতে যাবে, বাসের অন্য পুরুষরাও তখন একজোট হয়ে যায়। সবাই পক্ষ নেয় অপরাধীর। যেন একজন পুরুষ দায়ী হলে, সবাই দায়ী হয়ে যায়।

সব পুরুষ কখনোই ধর্ষক নয়। আমি আমার নিজের জীবনেই প্রচুর ভালো পুরুষের দেখা পেয়েছি। আমাদের পরিবারে নারীকে পরিপূর্ণ সম্মান করা হয়। তাই আমার ভাইয়েরা কখনো নারীকে উত্ত্যক্ত করে না বা রাস্তাঘাটে টিজিং করে না। এই শিক্ষাটা সব পরিবারেই জরুরি। আপনি যখন ধর্ষকের পক্ষ নেন বা মৌন থাকেন, তখন বুঝতে হবে আপনি তার নীরব সমর্থনকারী।

অপরাধ করা আর তাতে সমর্থন দেয়া সমান অপরাধ। খাদিজাকে যখন কোপানো হলো, তখন অনেক পুরুষকেই দেখেছি মনে মনে খুশি হতে। যেন তারা তাদের প্রেমিকাদের প্রতি দীর্ঘ দিনের আক্ষেপ বদরুলের মাধ্যমে পূর্ণ করতে পেরেছেন! আমাদের সম্পর্কগুলো নারী কিংবা পুরুষের গণ্ডিতে আটকে না থেকে মানবিক হোক। আমাদের শিশুরা উঠোনজুড়ে নিরাপদে খেলা করে বেড়াক। আর কোনো নরপশু যেন ওদের শৈশব কেড়ে নিতে না পারে। শিশু না বাঁচলে আগামী বাঁচবে না, নারী না বাঁচলে পৃথিবী বাঁচবে না। একটি শিশুর জন্য, একজন নারীর জন্য, একজন

পুরুষের জন্য এককথায় বলতে গেলে একজন মানুষের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হলে সবার আগে সচেষ্ট হতে হবে আপনাকেই। কেউ কোনো ভুলের মধ্যে থাকলে আপনি তাকে পরামর্শ দিতে পারেন সঠিক পথের। কিন্তু আপনি তাকে আক্রমণ করতে পারেন না। আপনি একজন পুরুষ, আপনি এই মুহূর্ত থেকে প্রতিজ্ঞা করুন, আপনার দৃষ্টি সংযত রাখবেন, লুকিয়ে অশ্লীল ভিডিও দেখবেন না, ইনবক্সে মেয়েদের নোংরা মেসেজ পাঠাবেন না, আপনি আপনার লজ্জাস্থানের হেফাজত করবেন, অশ্লীল বাক্য বিনিময় থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন, অফিসে আপনার সহকর্মী নারীটি আপনার দ্বারা কোনোভাবেই নিপীড়িত হবে না, আপনার গৃহকর্মী মেয়েটির সামনে আপনি সুযোগ বুঝে হায়েনা হয়ে উঠবেনা না; আপনার বোন, আপনার মা, আপনার স্ত্রীর অধিকার আপনি নিশ্চিত করবেন। তাহলেই দেখবেন, আগামীকাল থেকে আর কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে না।

লেখক : সাংবাদিক।

উৎসঃ জাগো নিউজ

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: