প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, ইসলাম, রাজনীতি, সমাজ > গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়ার অদ্ভুত ধাঁধা !

গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়ার অদ্ভুত ধাঁধা !

radicalism from ignoranceমশিউল আলম : ইসলামিক স্টেট বা আইএসের প্রচারণা ম্যাগাজিন দাবিক ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সিরিয়া ও ইরাকে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন প্রচুরসংখ্যক বিদেশি যোদ্ধা। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, আইএসের বিদেশি যোদ্ধাদের তালিকার একদম শীর্ষে রয়েছে তিউনিসিয়ার নাম। এটা অবাক হওয়ার বিষয়, কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও মাগরেব অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তিউনিসিয়ার সমাজ অপেক্ষাকৃত উদার, আধুনিক ও সেক্যুলার। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিউনিসিয়া এমন এক দেশ, যেখানে বেশ আশাপ্রদ এক রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে। কথিত ‘আরব বসন্তের’ মধ্য দিয়ে  মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে যে নৈরাজ্য ও জাতিগোষ্ঠীগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তিউনিসিয়া সেসব থেকে মুক্ত রয়েছে।

কিন্তু আরব বসন্তের সূচনা ঘটেছিল তিউনিসিয়াতেই। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সিদি বুজিদ শহরে মোহাম্মদ বুআজিজি নামে এক দরিদ্র ফল বিক্রেতাকে পৌর কর্তৃপক্ষ ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করলে তিনি এর প্রতিবাদে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলে রাজধানী তিউনিসসহ সারা দেশে যে তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়, তার মুখে দেশটির স্বৈরশাসক জয়নাল আবিদিন বেন আলী সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে যে স্বৈরাশাসক তিউনিসিয়া শাসন করেছেন, উত্তাল গণবিক্ষোভের মুখে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে সারা আরব দুনিয়ায়। মিসরে শুরু হয় সামরিক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে বিপুল গণবিক্ষোভ। কায়রোর তাহরির স্কয়ারের সেই গণবিক্ষোভের খবর আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন দেখেছি। ঐক্যবদ্ধ জনতার বিপুল শক্তি যে অতি পরাক্রমশালী স্বৈরশাসকের ক্ষমতার মসনদ উল্টে দিতে পারে, তা প্রত্যক্ষ করে আমরা উৎসাহ বোধ করেছি। অনেকেই ভেবেছি, দশকের পর দশক ধরে যে আরব দুনিয়া স্বৈরশাসকদের পদানত হয়ে আছে, এবার সেখানে সত্যিই মুক্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পালা শুরু হলো।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা ঘটেনি। মিসরে হোসনি মোবারকের পতন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তারপর সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল রক্ষণশীল ইসলামপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুড। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসির সরকার স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর দমন–পীড়ন চালায়, সরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে নিরঙ্কুশ দলীয়করণে তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধেও শুরু হয় জনবিক্ষোভ ও নৈরাজ্য। নৈরাজ্য ও সহিংসতার সুযোগে মিসরের সেনাবাহিনী ও তার জবরদস্ত সেনাপ্রধান আবারও ক্ষমতায় জেঁকে বসেন।

তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া আরব বসন্তের প্রভাবে লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ইরাক বিধ্বস্ত হয়েছিল তার আগেই; সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ইরাকের নৈরাজ্য ও সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। গজিয়ে ওঠে অজস্র সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তারা একদিকে ক্ষমতাসীন সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মেতে ওঠে, অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নিজেদের মধ্যেও যুদ্ধ ও সহিংসতায় লিপ্ত হয়।

কিন্তু তিউনিসিয়াকে এসবের কিছুই স্পর্শ করেনি। বেন আলীর দেশত্যাগ ও তাঁর স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে শুরু হয় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। কিন্তু সে দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো ঐতিহ্য ছিল না। ১৯৫৬ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই সেখানে স্বৈরশাসন চলেছে। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত টানা শাসন করেছেন হাবিব বুরগুইবা। তিনি ছিলেন তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের মতো সেক্যুলার সংস্কারপন্থী রাষ্ট্রনায়ক। বেন আলী তাঁরই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। বেন আলীও ছিলেন সেক্যুলার, কিন্তু প্রচণ্ড স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিবাজ। তিউনিসিয়াকে তিনি একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। অবশ্য বুরগুইবা ও বেন আলী উভয়েই শিক্ষাবিস্তারের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিউনিসিয়ায় শিক্ষার হার ৭৯ শতাংশ; নারী শিক্ষার হার ৭১ শতাংশ। তিউনিসিয়ার নারীসমাজ আরব দুনিয়ার অন্যান্য দেশের নারীসমাজের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর। বেন আলীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন মূলত শিক্ষিত তরুণতরুণীরা। তাঁদের সামনের সারিতে ছিলেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী উচ্চশিক্ষিত তরুণতরুণী, যাঁদের মধ্যে বেকারত্ব প্রকট।

তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসনের অবসান ঘটল, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক রূপান্তর হবে কীভাবে? দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক দলই ছিল না। শুধু ছিল স্বৈরশাসক বেন আলীর দল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক র‍্যালি (সিডিআর), গণ–অভ্যুত্থানের পর যেটাকে নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য দলটির অধিকাংশ নেতা–কর্মী নতুন একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেন, নিদা তুনিস (তিউনিসিয়ার আহ্বান) নামের এই দল গঠন করেন বেজি সাইদ এসেবসি নামে এক বর্ষীয়ান নেতা, যিনি বেন আলী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে মধ্যপন্থী একটি ইসলামি গ্রুপ এন্নাদাহ পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিউনিসিয়ায় এখন এ দুটি দলই প্রধান। এ ছাড়া আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে বেন আলীর পতনের পর। নিদা তুনিস নিজেকে একটি সেক্যুলার, সোশ্যাল, ডেমোক্রেটিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করে। আর এন্নাদা পার্টি ইসলামি পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁর কথা বলে। এই ইসলামপন্থী দল মিসরের ইসলামি ব্রাদারহুডের মতো রক্ষণশীল বা মৌলবাদী নয়। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে দাবি করে।

অর্থাৎ, তিউনিসিয়ার সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গন উগ্র, অনমনীয় বা কট্টরপন্থা থেকে মোটামুটি মুক্ত। তাই দেখা গেল, বেন আলীর স্বৈরশাসনের অবসানের পর সব রাজনৈতিক পক্ষ মিলে বেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে একটা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করল। তারপর সংবিধান সভা বা কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে। সেই নির্বাচনে ইসলামপন্থী এন্নাদা পার্টি সংবিধান সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করল, পরাজিত নিদা তুনিসসহ অন্য বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের ফল মেনে নিল। এসব ২০১২ সালের কথা।

কিন্তু এক বছরের মধ্যেই দেখা গেল ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী দল এন্নাদা পার্টি যেসব এজেন্ডা হাতে নিয়েছে, নিদা তুনিসসহ অন্য বিরোধী দলগুলো সেসব এজেন্ডাকে প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাৎমুখী হিসেবে দেখতে লাগল। প্রতিবাদবিক্ষোভ শুরু হলো। এর মধ্যে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে এক বামপন্থী নেতা গুপ্তহত্যার শিকার হলেন। ফলে বিক্ষোভ বেড়ে গেল এবং বছরের শেষ নাগাদ রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হলো।

কিন্তু বিস্ময়কর হলো, সেই অচলাবস্থা সহিংসতা ও নৈরাজ্যের দিকে গড়াল না। কারণ, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মনোভাব দেখা দিল। অচলাবস্থা নিরসনের জন্য গঠন করা হলো মধ্যস্থতাকারী একটি নাগরিক মঞ্চ—তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট। তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন, তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডক্র্যাফটস, তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগ ও তিউনিসিয়ান অর্ডার অব লইয়ার্স—এই চারটি সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের সমন্বয়ে গঠিত কোয়ার্টেটের মধ্যস্থতায় ক্ষমতাসীন এন্নাদা পার্টি স্বেচ্ছায়, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দিল। তারপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে পার্লামেন্ট নির্বাচন হলো এবং সেই নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটল। এবার সংসদে সখ্যাগরিষ্ঠতা পেল বিরোধী নিদা তুনিস দল ও তার কয়েকটি ছোট ছোট মিত্র দল। বিরোধী দলে গেল ইসলামপন্থী এন্নাদা পার্টি। আরব দুনিয়ায় এমন শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। তাই ২০১৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেল তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট নামের নাগরিক মঞ্চ।

সর্বশেষ খবর হলো, নিদা তুনিস ও কয়েকটি ছোট সেক্যুলার দলের যে জোট তিউনিসীয় পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল, সেই জোট থেকে কয়েকটি ছোট দল বেরিয়ে গেলে নিদা তুনিস থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হাবিব এসিদ পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে গেছেন। কিন্তু সে জন্য দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়নি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। ইসলামপন্থীরা আবারও শক্তি অর্জন করছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত অটুট রয়েছে।

এমন একটি দেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক তরুণযুবক, এমনকি নারীও আইএস নামের হিংস্র এক গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করতে সিরিয়ায় গেছেন—এটা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার। এর কারণ কী হতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিছু আগ্রহোদ্দীপক বিষয় নজরে এল।

এক. স্বৈরশাসন অবসানের পর তিউনিসিয়ায় যে গণতন্ত্রের মুক্ত হাওয়া বইতে শুরু করে, তার ফলে দেশটির শিক্ষিত তরুণ সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো কিছুটা সহজ হয়ে আসে। একনায়ক বেন আলীর পুলিশি রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে তাঁর নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বাড়াবাড়িও কিছুটা কমে যায়। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি বেশি মনোযোগী হয়, র‍্যাডিক্যালাইজেশন ও উগ্রপন্থা বাড়ছে কি না, সেদিকে বিশেষ নজর দেয়নি। পার্শ্ববর্তী লিবিয়া সীমান্তের কাছাকাছি অনেক জায়গায় যে সিরিয়া ও ইরাকে তৎপর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটি গড়ে উঠেছে এবং তিউনিসিয়া থেকেও যে অনেক তরুণযুবক বিভিন্ন প্রলোভনে, ভুল বিশ্বাসে কিংবা অবাস্তব স্বপ্নের টানে সীমান্ত পার হয়ে সেসব দলে যোগ দিচ্ছিলেন, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর ছিল না।

দুই. বেন আলী দুর্নীতিবাজ, স্বৈরশাসক হলেও শিক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছিলেন। তিউনিসিয়ায় উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল নয়, কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট। তাই শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রচুর। বেন আলীর পতনের পর এই শিক্ষিত বেকার সমাজ আশা করেছিল এবার তাদের বেকারত্ব ঘুচবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কর্মসংস্থান বাড়েনি, সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থারও কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা প্রবল হয়ে ওঠে। বেকারত্ব তিউনিসিয়ার উচ্চশিক্ষিত তরুণযুবকদের আইএসে যোগ দেওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ। যাঁরা আগে গেছেন, তাঁরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বন্ধুবান্ধবকে এই বলে প্রলুব্ধ করেছেন যে রাকায় গিয়ে তাঁদের বেকারত্ব ঘুচেছে তো বটেই, উপরন্তু তাঁরা প্রায় বিলাসী জীবন যাপন করছেন; সেখানে টাকাপয়সা ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই। ফলে হতাশাগ্রস্ত বেকার তরুণযুবকদের মধ্যে যাঁরা একটু বেশি বেপরোয়া, তাঁরা ছুটে গেছেন রাকায় কিংবা মসুলে।

তিন. তিউনিসিয়ায় চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়া যুবসমাজের অনেকে বেশ রাজনীতিসচেতন। তাঁদের একটা বড় অংশ রাজনৈতিক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট। বেন আলীর পতনের পর তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন তিউনিসিয়ায় ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠবে। তাই দেখা যায়, ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ইসলামপন্থী এন্নাদা পার্টি সংবিধান সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। কিন্তু তারা কট্টর ইসলামপন্থীদের খুশি করতে পারে না, কারণ তারা পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় গণতান্ত্রিক পথে এগোতে শুরু করে। তারা নিজেদের উদার, মধ্যপন্থী ইসলামি দল হিসেবে বর্ণনা করে। ফলে কট্টর ইসলামপন্থী তরুণযুবকেরা এন্নাদা পার্টির প্রতি হতাশ হয়ে চরমপন্থার দিকে ধাবিত হন।

চার. ২০১১ সালের মাঝামাঝি সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়; স্বৈরশাসক বাশার আলআসাদকে উৎখাত করতে জোট বেঁধে নামে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে। তিউনিসিয়ার র‍্যাডিক্যাল ইসলামিস্ট তরুণ সমাজের সামনে নতুন আশার আলো জেগে ওঠে: সিরিয়ায় আলকায়েদার সিরীয় শাখা আলনুসরা আর আইএস তখন একযোগে বাশারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল এবং সেই যুদ্ধে তাদের বীরত্বের কাহিনি আরব দুনিয়াসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছিল। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকা ইরাকে তাদের ‘সামরিক অভিযানের’ সমাপ্তি ঘোষণা করে সৈন্যবাহিনী ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ইরাকের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আইএসের আক্রমণের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দেশটির সুন্নিঅধ্যুষিত এলাকাগুলো তাদের দখলে আসতে শুরু করে।

ওই সময়েই তিউনিসিয়া থেকে প্রচুর তরুণযুবক সিরিয়া ও ইরাকে যাওয়া শুরু করেন। ২০১৪ সালের অক্টোবর নাগাদ ইরাক ও সিরিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে এবং সিরিয়ার রাকা শহরকে রাজধানী করে আইএস ‘খিলাফত’ ঘোষণা করার পরের দুতিন মাসের মধ্যে ২ হাজার ৪০০ তিউনিসীয় নাগরিক সিরিয়াইরাকে গিয়ে আইএসে যোগ দেন। এ তথ্য প্রকাশ করে তিউনিসিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তা ছাপা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরজানুয়ারিতে এসে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার।

স্বদেশে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নভঙ্গের বিপরীতে সিরিয়াইরাককে কেন্দ্র করে ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার নতুন স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন সফল হওয়ার কিছু আলামত দেখতে পান তিউনিসিয়ার সেই সব তরুণযুবক, যাঁরা সেখানে ছুটে গেছেন। স্বপ্ন সফল হওয়ার যেসব আলামত তাঁরা দেখতে পেয়েছেন, সেগুলো এ রকম: আইএসের মাত্র হাজার তিরিশেক জিহাদি যোদ্ধা সাড়ে তিন লাখ সদস্যের ইরাকি সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলসহ তিনটি প্রদেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছেন; মসুলের এক মসজিদে আবু বকর আল বাগদাদি নিজেকে নতুন খলিফা ঘোষণা করেছেন; সিরিয়ার রাকায় প্রথম রাজধানী ও ইরাকের মসুলে দ্বিতীয় রাজধানী করে ঘোষিত ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রের জিহাদি যোদ্ধারা ইরাক ও সিরিয়ার মাঝখানের সীমান্ত তুলে দিয়ে অখণ্ড খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই তরুণেরা বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রত্যক্ষ সহযোগিতার ফলেই আইএসের পক্ষে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে।

তাঁরা মনে করেন, ফরাসি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় আরব দুনিয়ায় কৃত্রিম সীমান্ত তুলে বিভিন্ন দেশে বিভক্ত করে দিয়ে গেছে। আইএস এসেছে সেই সব সীমান্ত তুলে দিয়ে পুরো আরব জাহানে অখণ্ড খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁদের আরও একটা বিশ্বাস, পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর স্বৈরশাসকেরা ইসলাম ও আরব জাহানের শত্রু, পশ্চিমা শক্তিগুলোর দাস। আইএস তাদের পরাস্ত সমস্ত সম্পদ খিলাফতের নিয়ন্ত্রণে আনবে এবং সেগুলো পুনর্বণ্টন করবে। ফলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূর হবে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা পাবে।

পাঁচ. ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ নির্বাচনে ইসলামপন্থী এন্নাদা পার্টি সেক্যুলার নিদা তুনিস দলের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তিউনিসিয়া থেকে তরুণযুবকদের আইএসে যোগ দেওয়া বেড়ে যায়। কারণ, নতুন সেক্যুলার জোট সরকার উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। ফলে দেশের ভেতরে গ্রেপ্তার হয়ে বর্বর পুলিশি নির্যাতনের মুখে পড়ার চেয়ে অনেক এন্নাদাসমর্থক তরুণযুবক আইএসে যোগ দিতে দেশত্যাগ করেন।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, তিউনিসিয়ার শিক্ষিত যুবসমাজের প্রকট বেকারত্ব তাঁদের একটা ক্ষুদ্র অংশকে প্রলুব্ধ করেছে আইএসের রোমান্টিক রাজনৈতিক উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হতে। আরব বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ধনীগরিবে ব্যাপক বৈষম্য, সরকারগুলোর পাশ্চাত্যনির্ভরতা, যে পাশ্চাত্যকে ওই তরুণযুবকেরা ইসলামের শত্রু ‘ক্রুসেডার’ বলে মনে করেন, তাঁদের দৃষ্টিতে এসব হতাশাব্যঞ্জক বাস্তবতার বিপরীতে ইরাক ও সিরিয়ায় একজন ‘খলিফা’র নেতৃত্বে তাঁদের স্বপ্নের যে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেটাই তাঁদের ইহকালপরকালের সব স্বপ্নের উৎস হয়ে উঠেছে। তাঁদের অনেকেই গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, আইএসের ওপর আসমানজমিনের মালিকের সুনজর আছে; তাঁরা অচিরেই বাগদাদ ও দামেস্ক দখল করে নিয়ে মুসলমানদের হারিয়ে যাওয়া গৌরবময় দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। আইএস এ ধরনের প্রচারণা চালায় দাবিক ম্যাগাজিন, আলনাবা নামের সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটা রেডিও স্টেশন ও বিভিন্ন জিহাদি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে।

কিন্তু আইএস ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরাকে সরকারি বাহিনীগুলোর হাতে তারা এখন প্রচণ্ড মার খাচ্ছে। তাছাড়া ইরাকি কুর্দিদের পেশমারগা বাহিনীও আইএসের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই শুরু করেছে। আইএস ইতিমধ্যে ইরাকের কিরকুক, রামাদি, ফালুজাসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে হটে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে মসুলের চারপাশে। এ বছর শেষ হওয়ার আগেই তারা সম্ভবত মসুল হারাবে। সিরিয়ায় আইএস অনেক এলাকা হারিয়েছে। সেখানে আইএসকে লড়াই করতে হচ্ছে একসঙ্গে অনেকগুলো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

ফলে তিউনিসীয় তরুণযুবকদের অনেকেই স্বদেশে ফিরে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে ফিরে গেছেন এমন শ চারেক তরুণযুবকের হিসাব দিয়েছে তিউনিসীয় কর্তৃপক্ষ। তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত কেউ কেউ বলেছেন যে তাঁরা সিরিয়ায় গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। অনেকে এই বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন যে সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করতে চায় বলে প্রচারণা চালিয়ে যুদ্ধ করছে, তাদের মধ্যে ঐক্য নেই। বিশেষত সিরিয়ার জাবহাত আলনুসরা ও আইএসের বিভক্তির কারণে ওই তরুণদের অনেকেই হতাশ হয়ে স্বদেশে ফিরেছেন।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২২ আগস্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: