প্রথম পাতা > কৌতুক, বাংলাদেশ, বিনোদন > ফরিদ আলী আর দুবাই যাবেন না…

ফরিদ আলী আর দুবাই যাবেন না…

farid ali 4সোমবার বিকেল ৪টায় ঢাকার মিরপুর হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা, নাট্যকার ও মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ আলী (ইন্নালিল্লাহিরাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

গত ১৫ জানুয়ারি পুরান ঢাকার এই অভিনেতা হার্টএ্যাটাক করলে তাকে নিকটস্থ ওয়ারী ডায়াবেটিকস হাসাপাতালে চিকিতৎসার জন্য নেয়া হয়। সেখানে তিনদিন থাকার পর তাকে চ্যানেল আইয়ের বেশকিছুটা সহযোগিতায় ‘জাপান বাংলাদেশ ‘ফ্রেন্ডশীপ হসপিটাল’এ চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এরপর গুরুতর অসুস্থাবস্থায় ফরিদ আলী রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের আইসিইউতে চিকিত্সাধীন ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা সহযোগিতা পান তার পরিবার। তারপর চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত আর শেষ রক্ষা হয়নি। উল্লেখ্য, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পী সমিতি তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও অসুস্থ অবস্থায় তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। মৃত্যুর আগে বিষয়টি তাকে বেশ পীড়া দিয়েছিল। এ নিয়ে বেশ ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

ফরিদ আলী [১৯৪১২০১৬] পুরোনো ঢাকার ঠাটারি বাজারের বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৫৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবার কথা থাকলেও তা আর শেষ পর্যন্ত দেয়া হয়নি তার। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে ফরিদ আলী সবার ছোট। ফরিদ আলী ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট মনোয়োরা বেগম বিউটির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফরিদ আলী চার ছেলে ও এক মেয়ে’র গর্বিত পিতা।

ফরিদ আলী কৌতুক অভিনয়ে দর্শক মনে এখনও দাগ কেটে রয়েছেন। বিশেষ করে ‘টাকা দেন দুবাই যাব, বাংলাদেশে থাকব না’ এই সংলাপটির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা এক বাক্যেই উচ্চারণ করবেন অভিনেতা ফরিদ আলীর নাম। শুধু অভিনয় নয়, নাটক লেখা ও নির্দেশনায়ও সিদ্ধহস্ত ছিলেন এই শিল্পী।

ফরিদ আলী ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম নাটকের শিল্পী এবং তৃতীয় নাটকের নাট্যকার। বিটিভির প্রথম হাসির নাটক ‘ত্রি রত্ন’র তিনজন ছিলেন প্রয়াত আশীষ কুমার লোহ, জলিল ও ফরিদ আলী। মূলত আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ‘ধারাপাত’ চলচ্চিত্রে ব্যাঙ্গা চরিত্রে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে চলচ্চিত্রে ফরিদ আলীর সম্পৃক্ততা ঘটে। এরপর সংগম, অভিশাপ, পরশমণি, গু্লা, রংবাজ, সপ্তডিঙ্গা, যে আগুনে পুড়ি, তিতাস একটি নদীর নাম, জালিয়াত, পালংক, অধিকার, গোপাল ভাঁড়, তরুলতা, ঘুড্ডি , লাগাম, কলমীলতা, ভাগ্যলিপি, সাধনাসহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

ফরিদ আলী তার অভিনয় জীবনে চলচ্চিত্রে বেশি অভিনয় করেছেন রাজ্জাক কবরীরর সঙ্গে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। বিটিভির চতুর্থ নাটক ‘নবজন্ম’ ছিলো ফরিদ আলীরই লেখা। তবে তার লেখা সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় আলোচিত নাটক ছিলো ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’। গত বছর ঈদে তিনি আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ‘পূর্ণিমার চাঁদে মেঘ’ নাটকে অভিনয় করেছেন।

ফরিদ আলী কৃতজ্ঞ ফরিদুর রেজা সাগরের কাছে। কারণ দীর্ঘ এক যুগ যাবত এই মানুষটি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ফরিদ আলীকে বঙ্গবন্ধু ‘চাল্লি ফরু’ বলে ডাকতেন। এ নামে কেউ ডাকলে তখন ভীষণ ভালো লাগে তার।

চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের সম্পর্ক ৫৫ বছরের। ১৯৬৩ সালে আমার লেখা ও নির্দেশনায় মঞ্চনাটক ‘ধারাপাত’এ অভিনয় করেন। পরে ‘ধারাপাত’ নিয়ে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, এখানেও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৪ সালে বিটিভিতে যখন প্রথম ‘জব্বার আলী’ শুরু করি, তিনিও আমার সঙ্গে ছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায় সাহায্য করেছিলেন। তাঁর মুখের সংলাপ ‘টাকা দেন বিদেশ যামু’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বয়সে তিনি আমার বেশ বড়। কিন্তু আমাকে খুব সম্মান করতেন। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। ১০ বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। একটু সুস্থ হলেই আমাকে ফোন করতেন। নতুন কাজ করছি কি না, খোঁজ করতেন। গত বছর রমজানের ঈদে আমার একটি নাটকে বাস কন্ট্রাক্টর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আমার চলচ্চিত্রে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের কণ্ঠকেও পরিবর্তন করে নিতেন। তিনি অনেক মঞ্চনাটকের প্রযোজক। বাংলাদেশ বেতারের অনেক অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন। কিছুদিন আগে তাঁর শাঁখারী বাজারের বাড়ি নিয়ে নানা জটিলতার কথা বলেছিলেন। মানসিকভাবে তাঁকে কখনোই সুখী দেখিনি। ভাবতে অবাক লাগে, ফরিদ আলীর মতো এত বড় একজন অভিনেতার কোনো মূল্যায়ন হয়নি। হয়তো মরণোত্তর অনেক সম্মাননা পাবেন, তবে মরণোত্তর সম্মাননা পেলে কারো কোনো লাভ হয় বলে মনে হয় না। বরং জীবিত অবস্থায় ফরিদ আলীর মতো অভিনেতাদের মূল্যায়ন করা উচিত। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, তবে আমার হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আজীবন। আমার মৃত্যু না হলে ফরিদ আলীরও মৃত্যু হবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি।” (দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৩ আগষ্ট, ২০১৬)

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: