প্রথম পাতা > ইসলাম, ধর্মীয়, নামায, নারী > নারীদের নামাজের উত্তম স্থান

নারীদের নামাজের উত্তম স্থান

eid-ul-adhaমুফতি মাহমুদ হাসান : ইদানীং দেখা যাচ্ছে, নারীরা অধিক সওয়াবের আশায় মসজিদেঈদগাহে ছুটে চলছেন। অথচ নারীদের ওপর ঈদ ও জুমার নামাজ কোনোটাই ওয়াজিব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্যও নারীদের মসজিদে না গিয়ে ঘরে পড়লেই বেশি সওয়াব। তাঁদের জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া শরিয়ত অনুমোদিত নয়। পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে নারীদের পর্দা করার অত্যধিক তাগিদ করা হয়েছে। সেসব আয়াত ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যত দূর সম্ভব নারীদের নিজ গৃহে অবস্থান জরুরি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাকজাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন কোরো না। তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

নারীদের মসজিদে আসার প্রতি রাসুল (সা.)-এর নিরুৎসাহ প্রদান

নারীদের নামাজ সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস আছে, যেগুলোতে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মসজিদে আসতে নিরুৎসাহী করা হয়েছে।

এক. হজরত আবদুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ক্ষুদ্র কক্ষে নারীদের নামাজ বড় কামরার নামাজের তুলনায় উত্তম। ঘরের নির্জন কোণে নামাজ ক্ষুদ্র কক্ষের নামাজের তুলনায় উত্তম।’ [আবু দাউদ, হাদিস : ৫৭০ (হাদিসটি সহিহ)]

অন্য বর্ণনায় হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নারীদের ঘরে নামাজ পড়া ঘরের বাইরে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।’ (আল মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ৯১০১)

দুই. উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণ। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৫৪২ (হাদিসটি হাসান)]

তিন. আবু হুমাইদ আল সাঈদি থেকে বর্ণিত, একবার উম্মে হুমাইদ নামক একজন মহিলা সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করো। কিন্তু তোমার জন্য বড় কামরার তুলনায় গৃহের অন্দরমহলে নামাজ পড়া উত্তম। আবার বড় কামরায় নামাজ পড়া উত্তম বারান্দায় নামাজ পড়ার চেয়ে। বারান্দায় নামাজ আদায় করা উত্তম তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে। মহল্লার মসজিদ উত্তম আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) থেকে।’ এ কথা শোনার পর উম্মে হুমাইদ (রা.) তাঁর গৃহের নির্জন স্থানে একটি নামাজের স্থান বানাতে নির্দেশ দিলেন। সেখানেই আজীবন নামাজ আদায় করতে লাগলেন। এ অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭০৯০; সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ১৬৮৯ {হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.)-এর মতে, হাদিসটি হাসান। ফাতহুল বারি : /২৯০}]

চার. যেসব পুরুষ প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ পড়ে, তাদের বিষয়ে রাগান্বিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি ঘরগুলোতে নারী ও শিশুরা না থাকত, তাহলে আমি এশার নামাজের ইমামতির দায়িত্ব অন্যজনকে দিয়ে কিছু যুবকদল দিয়ে তাদের ঘরের সব কিছু জ্বালিয়ে দিতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮৭৯৬)

এতে বোঝা যায়, যখন নামাজের জামাত চলতে থাকে, তখন নারীরা ঘরে থাকে।

পাঁচ. আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জামাতে জুমার নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অকাট্য ওয়াজিব, তবে ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব নয়।’ [আবু দাউদ, হাদিস : ১০৬৭ (হাদিসটি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহ.)-এর শর্ত অনুযায়ী সহিহ)। আল মুস্তাদরাক : /২৮৮]

ছয়. হজরত মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাজি (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নারী ও দাসের ওপর জুমার নামাজ নাই।’ [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৯৬ (হাদিসটি সহিহ)]

উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায়—এক. পুরুষদের দায়িত্ব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়া, আর মহিলাদের দায়িত্ব হলো ঘরে নামাজ পড়া। দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের জন্য জামাতে শরিক হওয়া ওয়াজিব, সুন্নাত বা অত্যাবশ্যকীয় ছিল না; বরং শুধু অনুমতি ছিল। তবে সেটিও এমন, অপছন্দের সঙ্গে ও শর্তসাপেক্ষ ছিল।

তিন. হজরত উম্মে হুমাইদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথার ওপর আমল করার জন্যই মসজিদ ছেড়ে সারা জীবন বাড়ির নির্জন কক্ষে নামাজ আদায় করেছেন। সে যুগের নারীরা সাধারণত এটাই করতেন। চার. সে যুগের পরিবেশ ভালো ছিল, এ জন্যই কেবল মহিলাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নচেৎ রাসুল (সা.)-ই কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন।

কঠোর শর্ত সাপেক্ষে নারীদের মসজিদে আসার অনুমতি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের যে মসজিদে আসার অনুমতি ছিল, তাও অনেক শর্তসাপেক্ষ ছিল। যথা—() সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে। () সেজেগুজে খুশবু লাগিয়ে বের না হওয়া। () বাজনাদার অলংকার, চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না। () অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না। () পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে। () অপ্রয়োজনে কোনো বেগানা পুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া ফিতনার কারণ হবে না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৫, আহকামুল কোরআন, থানভি : /৪৭১, বাজলুল মাজহুদ : /১৬১)

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায়ের কিছুদিন পর থেকেই যখন এই শর্তগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন রাসুল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা তা উপলব্ধি করতে পেরে নারীদের মসজিদে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

নারীদের মসজিদে আসার ব্যাপারে সাহাবিদের নিষেধাজ্ঞা

সাহাবায়ে কেরাম থেকে রাসুল (সা.)-এর আদর্শবিরোধী কোনো কাজ প্রকাশ পাবে—সেটা কল্পনাও করা যায় না। তাই হাদিস শরিফের পাশাপাশি সাহাবিদের আমলও দলিলরূপে গণ্য। কেননা তাঁরা ছিলেন সত্যের মাপকাঠি। রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা আমার পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেমন মাড়ির দাঁত দিয়ে কোনো জিনিস মজবুতভাবে ধরা হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৭)

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজ খেলাফত আমলে যখন মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থা দেখেন এবং ফিতনার আশঙ্কাও দিন দিন বাড়তে থাকে, তখন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.), ইবনে মাসউদ ও ইবনুজ জুবায়ের (রা.)সহ বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম নারীদের মসজিদে না আসার আদেশ জারি করলেন। অন্য সাহাবায়ে কেরামও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। কেননা তাঁরা জানতেন যে মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করার মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়নি; বরং তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হুকুমের বিরোধিতা করার কল্পনাও করা যায় না। তা সত্ত্বেও তাঁরা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এ জন্যই যে যেসব শর্তের সঙ্গে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল, এখন সেসব শর্ত হারিয়ে যাচ্ছে।

নারীদের মসজিদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞায় সাহাবিদের যেসব উক্তি বর্ণিত হয়েছে, এর আংশিক নিম্নে উল্লেখ করা হলো—

এক. হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নারীরা যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা যদি রাসুল (সা.) জানতেন, তবে বনি ইসরাইলের নারীদের যেমন নিষেধ করা হয়েছিল, তেমনি তাদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৬৯)

বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর এই মন্তব্য তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুনিয়া থেকে বিদায়ের কিছুদিন পরের নারীদের সম্পর্কে। অথচ আজকের যুগের নারীদের উগ্রতা আর বেহায়াপনার হাজার ভাগের এক ভাগও সে যুগে ছিল না। তাহলে এ অবস্থা দেখে তিনি কী মন্তব্য করতেন?’ (উমদাতুল কারি : /১৫৮)

এখন আমরা চিন্তা করে দেখতে পারি যে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) নিজ যুগ তথা হিজরি নবম শতাব্দীর নারীদের সম্পর্কে এ কথা বলেছেন। তাহলে আজ হিজরি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যে অশ্লীলতা আর উলঙ্গপনার দিকে ছুটে চলেছে, বেপর্দা আর বেহায়াপনার আজ যে ছড়াছড়ি, মেয়েরা যখন পুরুষের পোশাক পরছে, পেটপিঠ খুলে রাস্তাঘাটে বেড়াচ্ছে, ঠিক সে মুহূর্তে অবলা মাবোনদের সওয়াবের স্বপ্ন দেখিয়ে মসজিদে আর ঈদগাহে টেনে আনার অপচেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। অথচ এর জন্য দলিল দেওয়া হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের নারীদের দ্বারা। এ যুগের নারীরা কি সে যুগের নারীদের মতো? কস্মিনকালেও নয়। তা সত্ত্বেও সে যুগেই নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে এ যুগের নারীদের মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে নামাজের জন্য উৎসাহ দেওয়া যায়?

দুই. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, ‘ওমর (রা.)-এর এক স্ত্রী (আতেকা বিনতে জায়েদ) ফজর ও এশার নামাজে জামাতের জন্য মসজিদে যেতেন। তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি কেন নামাজের জন্য বের হন? অথচ আপনি জানেন যে হজরত ওমর (রা.) তা অপছন্দ করতেন ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিপন্থী মনে করেন?’ তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে ওমর কেন আমাকে সরাসরি নিষেধ করেন না?’ তখন বলা হলো যে রাসুল (সা.)-এর বাণী রয়েছে—তোমরা আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না—এ কথার কারণে তিনি সরাসরি নিষেধও করছেন না।’ ’’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯০০)

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, স্ত্রী আতেকা বিবাহের সময় ওমর (রা.)-কে মসজিদে নববীতে গিয়ে নামাজের অনুমতি দেওয়ার শর্ত করেছিলেন, এ জন্য ওমর (রা.) অপছন্দ সত্যেও স্ত্রীকে নিষেধ করতে পারছিলেন না। (আল ইসাবাহ : /২২৮)

তিন. আবু আমর শায়বানি (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে দেখেছি, তিনি জুমার দিন নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন, আপনারা বের হয়ে যান। আপনাদের ঘরই আপনাদের জন্য উত্তম। (আল মু’জামুল কাবির, হাদিস : ৯৪৭৫) আল্লামা হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য (সেকা)(মাজমাউজ জাওয়াইদ : /৩৫)

চার. হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) তাঁর পরিবারের কোনো নারীকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে যেতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৬ (হাদিসটি সহিহ)]

পাঁচ. হজরত ইবনে ওমর (রা.) তাঁর স্ত্রীদের ঈদগাহে বের হতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৫ (হাদিসটি সহিহ)]

নারীদের মসজিদে গমন নিয়ে ফিকাহবিদদের মতামত :

প্রথমদিকের কিছু ওলামায়ে কেরাম বৃদ্ধাদের জন্য মাগরিব ও এশার সময় ফিতনামুক্ত হওয়ার কারণে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। পরবর্তী ফিকাহবিদরা ফিতনার ব্যাপকতার কারণে যুবতী ও বৃদ্ধা সবার জন্য সব নামাজে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। (শরহুস সগির : /৪৪৬, আল মাজমু : /১৯৮, আল মুগনি : /১৯৩)

হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাদায়েউস সানায়ে’তে বলা হয়েছে যে যুবতী নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনা। (বাদায়েউস সানায়ে : /১৫৬)

আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি ও আল্লামা হাসকাফি (রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপক প্রচলন হওয়ায় ফতোয়া হলো, সব নারীর জন্যই সব নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি। (আল বাহরুর রায়েক : /৬২৭৬২৮, আদ্দুররুল মুখতার : /৩৮০)

নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যা

এক. হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৪৪২; আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৬)

উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করা হতো না। ওই নির্দেশ সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে ও শর্ত না পাওয়ার কারণে এখন নিষেধ করাটাই সুন্নত। কারণ রাসুল (সা.)-এর যুগ ওহি নাজিলের যুগ ছিল। তাই নারীরা যাতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ আয়াত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ভালোভাবে শিখে নিতে পারেন, সে জন্য নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।

আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) বলেন, এ হাদিসে যদিও স্বামীকে নিষেধ করতে বারণ করা হয়েছে, এ বারণ কঠোর নিষেধ নয়, বরং তা হলো সাধারণ নিষেধ। এ জন্যই স্বামী অনুমতি দিলেও ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান ফিতনার আশঙ্কায় নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ করতে পারবেন। (মিরকাতুল মাফাতিহ : /৮৩৬)

দুই. নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে দ্বিতীয় হাদিস হলো, উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমাদের আদেশ করা হয়েছে যে আমরা যেন ঋতুবতী পর্দানশিন নারীদেরও ঈদের ময়দানে নিয়ে যাই। যাতে তাঁরা মুসলমানদের জামাত ও দোয়ায় শরিক থাকতে পারেন। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের জায়গা থেকে আলাদা থাকবে। জনৈকা সাহাবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অনেকের তো চাদরও নেই। রাসুল (সা.) বললেন, তাকে যেন তার বান্ধবী নিজ চাদর দিয়ে সাহায্য করে। (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৯৭৪)

ব্যাখ্যা : এখানেও আগের উত্তরটি প্রযোজ্য। আর তা হলো, নারীরা যাতে ঈদের দিনের যাবতীয় শরয়ি বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ও রাসুলের ঈদের খুতবায় যাবতীয় ওয়াজনসিহত ও মাসয়ালামাসায়েল ভালোভাবে শিখে নিতে পারে, সে জন্য রাসুল (সা.)-এর যুগে ঈদগাহে আসার অনুমতি ছিল। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।

ইমাম তাহাবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ছিল, যাতে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য দেখে ইসলামের দুশমনদের যেন চক্ষুশূল হয়। কিন্তু আজ যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই এবং সংখ্যাধিক্য দেখানোর জন্য পুরুষরাই যথেষ্ট, তাই ওই বিধানও প্রযোজ্য হবে না। (ফাতহুল বারি : /৪৭০)

আল্লামা ইবনুল হাজ মালেকি (রহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিধানটি রাসুল (সা.)-এর যুগের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী যুগের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। (আল মাদখাল : /২৮৮)

দুটি সন্দেহ ও তার নিরসন

সন্দেহ এক. কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যদি বর্তমান যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনার আশঙ্কায় নিষেধ হয়, তাহলে রাসুল (সা.) স্পষ্ট এ কথা বলে যাননি কেন যে আমার যুগের পর নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ?

নিরসন : রাসুল (সা.) শরিয়তের অসংখ্য বিধানাবলির ক্ষেত্রেই এরূপ করে গিয়েছেন যে তা স্পষ্ট করে বলে যাননি। তিনি জানতেন ও বুঝতেন যে প্রিয় সাহাবি তাঁর সব কথার মর্ম ও উদ্দেশ্য বুঝেই পরবর্তী সময়ে আমল করবেন। তাই সব কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। যেমন—রাসুল (সা.)-এর পর আবু বকর (রা.)-কে খলিফা বানানোর কথা স্পষ্ট বলে যাননি। কেননা তিনি জানতেন যে তাঁর সাহাবিরা বিভিন্ন আকারইঙ্গিতে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছেন। এখন আর তাদের তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আলোচিত বিষয়টিও তদ্রূপ। নারীদের ফিতনা ও নারীদের পর্দাসংক্রান্ত শত শত হাদিস থাকা সত্ত্বেও সাহাবিরা এ বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর ইচ্ছা বুঝবেন না, তা অসম্ভব।

সন্দেহ দুই, অনেক ভাই বলে থাকেন যে মক্কামদিনার হারামাইন শরিফে নারীরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

নিরসন : আসলে হারামাইনে কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কারণে নারীদের জামাতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা হলো, নারীদের যেহেতু মক্কার মসজিদে হারামে তাওয়াফের জন্য আসতে হয় এবং মদিনার মসজিদে নববিতে জিয়ারতের জন্য তাঁরা এসে থাকেন। এ অবস্থায় নামাজের আজান হয়ে গেলে আর বের না হয়ে তাঁরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ওলামায়ে কেরাম এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে শুধু কেবল জামাতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নারীদের হারামাইনে যাওয়ার অনুমতি নেই। বর্তমানে না জেনে অনেক মহিলা শুধু নামাজের জন্যই হারামাইনে উপস্থিত হয়ে থাকেন, তা ঠিক নয়। (ইলাউস সুনান : /২৩১)

লেখক : ফতোয়া গবেষক

ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বাংলাদেশ

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৯ আগস্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: