প্রথম পাতা > পরিবেশ, বাংলাদেশ, রাজনীতি > জট খুলছে গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের

জট খুলছে গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের

Farakka-damগাজী শাহনেওয়াজ : জট খুলছে গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়েরও অভিমত একই। তাদের ভাষ্য, আলোচনার জন্য শিগগিরই ঢাকায় আসছে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের একটি টেকনিক্যাল টিম। আলোচিত এই প্রকল্পে অর্থায়নের পুরাটাই দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। পিছিয়ে নেই জাপানও। মন্ত্রণালয়ের আশা, সম্পৃক্ত হবে বিশ্বব্যাংকও। তবে ভারত যুক্ত হলেই গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পটি পূর্ণতা পাবে বলেই মনে করেন মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা।

জানতে চাইলে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. নজরুল ইসলাম যাযাদিকে বলেন, গঙ্গা বাঁধ ভারতের সম্পৃক্ততা দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী নিজেই। দীর্ঘদিন ধরে আলাপআলোচনার পর ভারত এ বিষয়ে নমনীয় হয়েছে। তাদের কাছে ভারত কিছু তথ্যউপাত্ত চেয়েছিল। তারা সেগুলো দিয়ে তাদের সহযোগিতা করেছেন। এসব তথ্য পর্যালোচনার পর দেশটির একটি প্রতিনিধি দল এখানে সফরে আসার অভিপ্রায় জানিয়েছে। আশা করছেন, আগামী ২/৩ সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের এই টেকনিক্যাল টিম আসবে; এটা নিশ্চিত। তবে নিদিষ্ট কোনো দিনক্ষণ আপাতত বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, গঙ্গা বাঁধ বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সহযোগিতা অপরিহার্য। সেটিও দ্রুত এগোচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে এই প্রকল্পের বিষয়ে আরও ভালো খবর পাওয়া যাবে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশ সীমান্তের এপারের অংশটি প্রমত্ত পদ্মা এবং ভারতের অংশের নাম গঙ্গা। হিমালয় পর্বতমালার গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ভাগীরতী নদী আর নন্দা দেবী, ত্রিশুল, ক্যামেট ইত্যাদি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন আলকানন্দা এই দুটি উপনদী মিলেই গঙ্গার মূলধারাটি সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে জাহ্নবী নদীও এর সঙ্গে মিলিত হয়ে সম্মিলিত প্রবাহ হিমালয়ের গিরীসঙ্কট পার হয়ে ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গোয়ালন্দে এসে এটি যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরে আবার চাঁদপুরে সুরমা আর কুশিয়ারার প্রবাহের সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভারত সরকার প্রথমে ১৯৫১ সালে গঙ্গা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে একটি বিকল্প খাল দিয়ে গঙ্গার পানিকে হুগলী নদীতে প্রবাহিত করে বন্দরের সঞ্চিত পলিকে স্থানচ্যুত করার পরিকল্পনা নেয়। পরে ১৯৭৪৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধনামে এটি পরিচিতি পায়। এ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা বিতর্ক, আলোচনা ও সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে।

তবে বাঁধ নির্মাণের পূর্বেই গঙ্গার পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল বাংলাদেশের। তখন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন মতৈক্যের ভিত্তিতেই বাঁধের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে উল্লেখ ছিল, ভারত বিকল্প খাল দিয়ে ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নেবে। আর বাকি প্রবাহ বাংলাদেশে চলে যাবে। এই পরীক্ষামূলক পানি বণ্টন মাত্র ৪১ দিন স্থায়ী হয়। ১৯৭৬ সালে আগের মতৈক্যের নবায়ন না করে ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিতে শুরু করে। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে পদ্মানদী কেন্দ্রিক দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের ওপর।

১৯৭৭ সালেও ভারতের অবস্থার বদল হয়নি। পরে বাংলাদেশ জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করে এবং সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়। যার ফলে বাংলাদেশ ও ভারত মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের একটি বৈঠক হয় ঢাকায়। আর ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে প্রতিবছর (জানুয়ারি থেকে মে) গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে একটি পাঁচবছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল দশদিন সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সাড়ে ৩৪ হাজার কিউসেক এবং ফারাক্কার বিকল্প খাল দিয়ে কলকাতা বন্দরের জন্য সাড়ে কুড়ি হাজার কিউসেক পানি বরাদ্দ করা হয়। তবে, ফারাক্কায় গঙ্গার পানি বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল ফারাক্কার উজানে ভারতে বা নেপালে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষা মৌসুমে পানি সঞ্চয় করা।

অপরদিকে, ভারতের প্রস্তাব ছিল ব্রহ্মপুত্র থেকে সংযোগ খাল কেটে গঙ্গাতে পানি বৃদ্ধি করা। তবে কোনো দেশের প্রস্তাবই গৃহীত হয়নি। এই অজুহাতে ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তি ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর আর নবায়নে সাড়া দেয়নি ভারত।

পরে ১৯৮৩ ও ৮৪ সালের শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনের জন্য ১৯৮২ সালের অক্টোবরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ১৯৮৪ সালে শেষ হলেও পুনরায় চুক্তি করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ গঙ্গার পানি ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়।

তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। খুলতে শুরু করেছে জটও। কারণ আগামী ২/৩ সপ্তাহের মধ্যে এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে বলে আশা করছে এই সংশ্লিষ্টরা। আলোচনা ফলপ্রসূ বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরের নদী পদ্মা ও গঙ্গার দুপাশে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার জলাধার নির্মাণ হবে। যা শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট দূর হবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের অর্থাৎ নদীপারের মানুষের জীবনমান বদলে দেবে এ বাঁধ প্রকল্পটি। কৃষি থেকে শুরু করে হাঁসমুরগি পালন সবই চলবে নির্বিঘ্নে। এ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ হবে তাদের অর্থায়নে। জাপানও অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন ভারতের সম্মতি মিললেই অবসান ঘটবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার।

সূত্রঃ দৈনিক যায় যায় দিন, ২০ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: