প্রথম পাতা > বাংলাদেশ, সংস্কৃতি > অভেদ ভুবনের শিল্পী [নাট্যকার] সেলিম আল দীন

অভেদ ভুবনের শিল্পী [নাট্যকার] সেলিম আল দীন

selim al din 6আয়েশা সিদ্দিকা : সেলিম আল দীন। বাংলা নাট্যসাহিত্যের শেকড়স্পর্শী নাট্যকার। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি অন্তরে ধারণ করেছিলেন বাংলার বর্ণময় কৃষ্টিসংস্কৃতি। স্বদেশীয় হাজার বছরের নাট্যঐতিহ্যকে ধারণ ও বহন করে সফলতার সঙ্গে তিনি হেঁটেছেন আধুনিক সাহিত্যের অঙ্গনে। প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়া মধ্যযুগের সাহিত্যকর্মকে আত্তীকরণ করেছেন আধুনিকমনস্বতায়। পরে বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক তত্ত্ব ও দর্শনকে নখদর্পণে নিয়েই নির্মাণ করেছেন নিজস্ব নাট্যদর্শন। তিনি তার মধ্যযুগের বাঙলা নাট্যগ্রন্থে প্রাচীন ও মধ্যযুগের অনবদ্য সৃষ্টি চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, গাজীর গান, শাস্ত্রগান, কৃত্যমূলক পাঁচালী, গীতিকার মধ্যে নাট্যমূলক উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণ করেছেন। বর্তমানে প্রচলিত পালাগুলোর পরিবেশনা ও পাুলিপি ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে নৃত্য, গীত, বাদ্যের সঙ্গে গায়েনদোহারের বর্ণনা ও সংলাপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নাট্যমূলক আখ্যানই বাংলা নাট্যসাহিত্যের নিজস্ব ঐতিহ্য। বিশ্বনাট্যসাহিত্যে প্রচলিত সংলাপের সীমায় সাধারণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনকে বাধা যায় না বলে তিনি তার শিল্পকর্মে বর্ণনা, সংলাপের সঙ্গে নৃত্য, গীত যুক্ত করেন। তবে নিরীক্ষাপ্রিয় এই নাট্যকার নাট্য রচনার ক্ষেত্রে এক পথে দুবার হাঁটেননি। প্রতিটি নাটকেই তিনি নির্মাণ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন শিল্পরীতি। নাটকে জোয়ারভাটার হিসাবে অঙ্ক বিভাজন, বাক্য বিনাসে কমা, দাঁড়ি, সেমিকোলনের বদলে তারকা (*) চিহ্নের ব্যবহার, দ্বারা কাহিনী বিভাজন, মিউজিক্যাল কমিডি, এপিকধর্মিতা, বর্ণনার পাশাপাশি গানের ব্যবহার প্রভৃতির মাধ্যমে নিজের সৃষ্টিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছেন সেলিম আল দীন।

নাট্যকার সেলিম আল দীন স্বদেশী চেতনা মনে ধারণ করে নাট্য রচনা শুরু করেন। যদিও তিনি কাব্যচর্চা দিয়ে সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করেন। তবু যৌবনের উন্মুখ দিনগুলোয় তিনি বক্তব্য প্রকাশের জন্য বেছে নেন নাট্যসাহিত্যকে। তখনই তার হৃদয়ের গভীরে গ্রামীণ সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের ঘামঝরা পরিমস্নান মুখগুলো স্থায়ী আবাস তৈরি করে নেয়। নিষ্ঠুর দাদনের ব্যবসায়ী মহাজনের কাছে বাঁধা কৃষকের দিনরাত। খাটুনিবেচা দরিদ্র জীবনের যন্ত্রণা উপলব্ধি করার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়েই এক সময় তার দৃষ্টি পড়ে সমাজের আরেক পদদলিত সম্প্রদায়ের ওপর। দেশ যাদের কখনো উপজাতি, কখনো আদিবাসী অভিধায় অভিহিত করেছে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওপরের অন্যায় নির্যাতন সূক্ষ্ম অনুভূতিপূর্ণ হৃদয়ের অধিকারী সেলিম আল দীনকে ব্যথিত করেছিল। তাদের নির্মল ও নিষ্পেষিত জীবন তার নাটকে প্রযুক্ত করেছেন।

সাহিত্যচর্চার প্রথম দিকে সেলিম আল দীন প্রচলিত পাশ্চাত্য প্রভাবিত ধারায় নাট্য রচনা শুরু করেন। কিন্তু অব্যবহিত পরেই তিনি নিজের অনিষ্ঠ গন্তব্য খুঁজে পান। আঙ্গিক নিরীক্ষার সমসাময়িক সময়ে পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে তিনি কিছুটা সংস্কৃত নাট্য আঙ্গিক মেনে নিয়ে রচনা করেন শকুন্তলা। তারপর প্রাচীন ও মধ্যযুগের নাট্যমূলক আখ্যানের অনুপ্রেরণায় বাংলা বর্ণনাত্মক রীতির আধুনিক রূপের সঙ্গে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেন কীত্তনখোলা নাটকে। হাত হদাই এই পর্বেরই রচনা। চাকা নাটককে তিনি অভিহিত করলেন কথানাট্য নামে। বনপাংশুল ও প্রাচ্য রচিত হয় বিশুদ্ধ পাঁচালীর আদর্শে। বাংলা বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা হলেও কেরামতমঙ্গল, কীত্তনখোলা, যৈবতী কন্যার মন, নিমজ্জন নাটকগুলো একটি থেকে অন্যটি গঠনগত দিক থেকে ভিন্ন। যে গল্পটি যেভাবে বলতে ভালো লেগেছে তিনি তা সেভাবেই বলেছেন। চাকানাটকে কথাসরিৎসাগরের কথামুখ, কথা পীঠ, তরঙ্গ, লম্বকগল্প বিভাজনের এই রীতি যৈবতী কন্যার মন বা হরগজে পাওয়া যায় না। আবার হাত হদাই নাটকে গল্প বিভাজন রীতি জোয়ার ভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেখে করা হয়েছে। মোট একুশটি জোয়ার এবং উনিশটি ভাটায় এই নাটকের কাহিনী বিস্তৃত। কীত্তনখোলা নাটকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে স্তরে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র, শিল্পী জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার পাশাপাশি নির্যাতিত নারীর কাহিনী উপস্থাপনা বন্দনার পরে সর্গদ্বারা বিভাজিত হয়েছে, যেমন : প্রথম সর্গ, দ্বিতীয় সর্গ। অন্যদিকে কেরামতমঙ্গলেপৃথিবীতে মানুষ সৃষ্ট নরকে যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন কত নির্মম হতে পারে তার দৃষ্টান্ত উপস্থাপনে অনুসৃত হয়েছে খন্ডদ্বারা বিভাজন রীতি, যেমন নখলা খন্ড, বিরিশিরি খন্ড। এসব উদাহরণই সেলিম আল দীনের নিরীক্ষা প্রবণতার পরিচয় বহন করে। তবে ভিন্ন ভিন্ন শিল্প আঙ্গিক তার রচনায় একটি মাত্র আঙ্গিকের রূপ পরিগ্রহ করে। এই শিল্প আঙ্গিককে সেলিম আল দীন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব অভিধায় শনাক্ত করেন। ১৯৯১ সালে রচিত চাকা নাটকে তিনি নিজেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পী বলে ঘোষণা করেন। অভেদভুবনের শিল্পী সেলিম আল দীন কথানাট্য চাকার কথাপুচ্ছ অংশে বলেছেন, ‘আমি কথার শাসনে নাটক রচনা করেছি তাই এর নাম দিয়েছি কথানাট্য।কথা বলতে বলতে এই নাটক পরিপূর্ণ অবয়বপ্রাপ্ত হয়েছে। বর্ণনা, সঙ্গীত, সংলাপ, কবিতা, দৃশ্যচিত্র সব মিলেমিশে এক হয়ে ধরা দিয়েছে কথানাট্য চাকায়। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য প্রণিধানযোগ্য চাকাকে কেউ যদি কাব্য বলে আপত্তি করব না, গল্প বললে অখুশি হবো না। আমি সব সময় চেয়েছি আমার লেখা নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্যসব শিল্পতীর্থগামী হোক। কারণ শিল্পে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী।তার রচিত বনপাংশুল নাটকে পরিচয় হয় ক্ষয়িষ্ণু মান্দাইগোষ্ঠী আর বাঙালিদের সংঘাতের সঙ্গে, হরগজএ টর্নেডোর ধ্বংসচিত্র ও মানবিকতার বিপর্যয়, প্রাচ্যনাটকে আছে জীবের প্রতি ভালোবাসা, অতৃপ্তি ও অবহেলার সঙ্গে বিষাদময় বসবাস কীভাবে আত্মহত্যায় নারীদের বাধ্য করে তা উঠে এসেছে যৈবতী কন্যার মন নাটকে আর নিমজ্জন তো বিশ্বমানবতা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার সকরুণ চিত্র। সাহিত্যকর্মে অনালোকিত জীবন ও জগতের ওপর মানবিকতার দৃষ্টি দিয়েছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন।

বাংলা নাট্যসাহিত্যে আঙ্গিক ও বিষয়ের বৈচিত্র্য দানের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত এই নাট্যকারের নিজের প্রতিটি নাটকের বিষয় ও প্রকরণের মধ্যে ভিন্নতা স্পষ্ট। সেলিম আল দীনের নাটকের পরিধিপরিসর এত ব্যাপক, এর চরিত্র এত বৈচিত্র্যময়তায় পূর্ণ যে ছোট কোনো নিবন্ধে তা তুলে আনা সম্ভব নয়।

সূত্রঃ দৈনিক যায় যায় দিন, ১৯ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: