প্রথম পাতা > অপরাধ, ইসলাম, জীবনযাপন, ধর্মীয়, নারী, বাংলাদেশ, সমাজ, Uncategorized > মানারাত ‘মাদ্রাসা’ তাহলে নারী জঙ্গীদের আখড়া !

মানারাত ‘মাদ্রাসা’ তাহলে নারী জঙ্গীদের আখড়া !

ফেসবুকের ফাঁদে পা দিচ্ছে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণ তরুণীরা

ফেসবুকে তৈরি হচ্ছে নারী জঙ্গি, কার্যক্রম অ্যাপসে

আইএসের তথ্য ছবি আদানপ্রদান করতেন নারী

জেএমবির সদস্য ও টাকা সংগ্রহে নারী

female militants 3নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন ধারার (নব্য জেএমবি) নেতারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমেই নারী সদস্যদের সংগ্রহ করছেন। এরা নতুন সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি সংগঠনের জন্য ইয়ানত বা তহবিল সংগ্রহে নেমেছে। অনলাইনে খোঁজ করে তাঁরা ধর্মভীরু শিক্ষিত তরুণীদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন।

জঙ্গি মতাদর্শ গ্রহণের পর তাঁরা নিজেদের ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে নারী সদস্যদের জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছেন। মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট অ্যাপস ডাউনলোড করে কার্যক্রম পরিচালনা করার কৌশলও শেখানো হয়েছে নারী জঙ্গিদের। ঢাকা ও গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার চার তরুণীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পেয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশে (জেএমবি) সংগঠন প্রসারে নারী সদস্যরাও মাঠে কাজ করছে। রাজধানী ও গাজীপুর থেকে জেএমবির এক উপদেষ্টাসহ চার নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এ তথ্য পেয়েছে র‍্যাব। গত রবিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত গাজীপুরের সাইনবোর্ড, মগবাজার ও মিরপুর১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আকলিমা রহমান, ঐশী, মৌ ও মেঘলাকে। তাদের প্রত্যেকের বয়স ২৭ বছরের মধ্যে। নারী জঙ্গিদের কাছ থেকে মিলেছে জিহাদি বই, বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও প্রচার কাজে ব্যবহৃত অডিওভিডিও সিডি।

জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার চার নারী তাঁদের মোবাইল, ল্যাপটপ থেকে আইএসসমর্থিত বিভিন্ন সাইটে যেতেন। অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে আইএসের তত্ত্ব, তথ্য, ছবি, অডিও ও ভিডিও ডাউনলোড এবং নিজেদের মধ্যে দেওয়ানেওয়া করতেন। র‍্যাব বলছে, গ্রেপ্তার চার নারী মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী আকলিমা রহমান মনি, ইশরাত জাহান মৌসুমি, খাদিজা পারভিন মেঘলা এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ইসতিসনা আক্তার ঐশিকে দীক্ষা দিয়েছেন মাহমুদুল হাসান তানভির। এই মাহমুদুল হাসান নতুন ধারার জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলীয় শাখার আমির। ‘তাজরিয়ান আনহার’ নামে ফেসবুকে তাঁর একটি আইডি আছে। তাঁর অনুসরণকারীর সংখ্যা ৪৫২। তাঁদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার স্কুল, কলেজ, সরকারিবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের নারী, জামায়াতশিবিরের শিশু সংগঠন ফুলকুঁড়ির আসরও রয়েছে। তিনি তাঁর পাতায় নারীদের ‘দ্বীনি বোন’ বলে সম্বোধন করতেন। হিজাববোরকা থেকে শুরু করে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), পয়লা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষ উদ্‌যাপনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচার ও উদ্‌যাপন প্রতিরোধের ডাক দিতেন। গ্রেপ্তার নারীরা তাঁকে অনুসরণ করতেন, পোস্টে লাইক ও শেয়ার দিয়েছেন। গত ২১ জুলাই মাহমুদুল হাসানকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করে। তাঁর কথার ভিত্তিতেই ১৫ আগস্ট এই চার নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাব বলছে, গ্রেপ্তার নারী জঙ্গিদের দলে আরো অন্তত এক ডজন তরুণী আছে, যাদের মধ্যে ১০ জনের নাম পেয়েছে র‌্যাব। তারা হলো, সাফিয়া ওরফে সানজিদা ওরফে ঝিনুক, মাইমুনা ওরফে মাহমুদা ওরফে লায়লা, তাসনুবা ওরফে তাহিরা, সায়লা ওরফে শাহিদা, সালেহা ওরফে পুতুল, দিনাত জাহান ওরফে নওমী ওরফে বানী, তানজিলা ওরফে মুন্নী, আলিয়া ওরফে তিন্নি ওরফে তিতলী, মনিরা জাহান ওরফে মিলি ও ছাবিহা ওরফে মিতু। এই সন্দেহভাজন নারী জঙ্গিদের খুঁজছে র‌্যাব ও পুলিশ।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, ২১ জুলাই গাজীপুর থেকে জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলের আমির মো. মাহমুদুল হাসানকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, আকলিমা তাদের হয়ে নারীদের জঙ্গিবাদের দাওয়াত দেয় এবং ইয়ানত (তহবিল) সংগ্রহ করে। মাহমুদুল প্রথমে আকলিমাকে তাবলিগ, জামায়াতে ইসলামী, আহলে হাদিস, হিযবুত তাহ্রীর এবং আইএস সম্পর্কে ধারণা দেন। তাকে কথিত ‘আইএস’এ দলভুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেন। এরপর থেকে র‍্যাব তাকে নজরদারিতে রাখে এবং তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়। গত রবিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আকলিমাকে। তার মোবাইল ফোনে জঙ্গিবাদ ও জিহাদ সংক্রান্ত অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। দেড় বছর ধরে জিহাদি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে আকলিমা। মুফতি মাহমুদ খান আরো জানান, আকলিমা সংগঠনটির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে। আর মৌ ও মেঘলা তার সহযোগী। আকলিমা ও ঐশী জেএমবির নারী ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের সঙ্গে অনেক জেএমবি সদস্যের যোগাযোগ আছে।

female militants 4গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরের পাইকপাড়ায় র‍্যাব৪ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চার নারী জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়। ব্যাটালিয়নটির অধিনায়ক (সিও) খন্দকার লুত্ফুল কবির বলেন, মাহমুদুল হাসানকে আটকের পর নারী জঙ্গিদের তহবিল সংগ্রহের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর নজরদারিতে রেখে আকলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বাকি তিন নারীকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। এদের মধ্যে সোমবার সকাল ৮টায় রাজধানীর মগবাজার থেকে ঐশীকে, সোমবার রাত সোয়া ৯টার দিকে মিরপুরএর জনতা হাউজিং থেকে মৌকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাত ১০টার দিকে একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ধরা হয় মেঘলাকে। ঐশী তিন বছর আর মৌ ও মেঘলা সাত মাস ধরে জিহাদি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। দুজনের কাছেই জিহাদ সংক্রান্ত বইপত্র পাওয়া গেছে।

র‌্যাবএর অধিনায়ক অ্যাডিশনাল ডিআইজি খন্দকার লুৎফুল কবীর বলেন, আমরা প্রাপ্ত তথ্যগুলো খতিয়ে দেখছি। পাশাপাশি বিভিন্ন ডিভাইস ল্যাপটপ ও পেন ড্রাইভে যাদের নাম এসেছে তাদের ধরতে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, গ্রেফতার চার জঙ্গিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ওই চারজনকে গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জিহাদি বই, ডকুমেন্টারি, অডিও ও ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে।

আকলিমা রহমান মনি

পরিবারে সে মনি নামে পরিচিত। আকলিমা উত্তরা হাই স্কুল থেকে ২০১০ সালে এসএসসি এবং ২০১২ সালে হলি সাইন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চেষ্টা করেও ভর্তি হতে না পেরে ২০১৩ সালে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয় সে। বর্তমানে আকলিমা চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি আরবি পড়তে বিভিন্ন স্থানে যেত সে এবং সেখানে দাওয়াতের কার্যক্রম চালাত। দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারিতে আকলিমার সন্দেহজনক কার্যক্রম ধরা পড়েছে। সে অনেককেই জঙ্গিবাদে উৎসাহ প্রদান এবং বাইয়াত গ্রহণের জন্য তৈরি করত।

মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী আকলিমার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বুরঙ্গি এলাকায়। গাজীপুরের জয়দেবপুরের উত্তর খাইলকুরে থাকত সে। প্রায় এক বছর আগে আনসার আলী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তার পরিচয় হয় মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। মাহমুদুল তাকে তাবলিগ, জামায়াতে ইসলামী, আহলে হাদিস, হিযবুত তাহরীর, আইএস সম্পর্কে ধারণা দেন। আকলিমাকে কথিত ‘আইএস’এ দলভুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেওয়া হয়। আকলিমা আগে জামায়াতের ছাত্রী সংস্থায় যুক্ত ছিল। জেএমবির মতাদর্শ গ্রহণের পর মাহমুদুলের ফেসবুক আইডি থেকে সে জেএমবি নেতা ‘আল সাব্বির খান জাবিলের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। দলটি বিভিন্ন নামে মোবাইল অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। অ্যাপসের মধ্যে ‘উম্মা তাওহিদ’ ও ‘আনসার ইসলামিয়া’ উল্লেখযোগ্য।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, মাহমুদুল হাসান জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, গত রমজানে ১২ হাজার টাকা ইয়ানত সংগ্রহ করে দেয় আকলিমা। এরপর থেকে র‍্যাব তাকে নজরদারিতে রাখে।

সে জানিয়েছে, হিজবুত তাহরির ও কথিত আইএসের জন্য সে লোক রিক্রুটের দায়িত্বে ছিল। জামায়াতের ছাত্রী সংস্থার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করে দুই বছর ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইএসের বিভিন্ন তথ্য আপলোড করে তা বিভিন্নজনকে পাঠাতে। এছাড়া বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ (ইয়ানত) করে জঙ্গিদের ফান্ডে দিত। এ টাকা তার কাছ থেকে গ্রহণ করত টঙ্গীর আনসার আলী। এই আনসারের মাধ্যমে মাহমুদুল হাসান নামে আরেক জঙ্গির কাছে অর্থ যেত। সম্প্রতি মাহমুদুলকে র‌্যাব গ্রেফতার করে। পরে তার তথ্যের ভিত্তিতে নারী জঙ্গি নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া যায়।

গ্রেপ্তার চার নারীর মধ্যে আকলিমা রহমান ও ইসতিসনা আক্তার নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতেন বলে অনুসন্ধানে জেনেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ধানমন্ডির একটি মসজিদে আকলিমার সঙ্গে ইসতিসনার পরিচয় হয়। আকলিমা সে সময় তাঁকে মাহমুদুল হাসান সম্পর্কে এবং আইএসের সঙ্গে মাহমুদের পরিচয়ের কথা জানান। আকলিমা প্রথমে তাঁকে পেনড্রাইভে আইএসের বিভিন্ন খবরাখবর ডাউনলোড করে সরবরাহ করতেন।

ইসলামী ক্লাস ফর গার্লস পেজ’ এবং ‘ব্লাড রোজ’ নামের ফ্যান পেজ থেকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করত তারা। যেসব তরুণী জঙ্গিদের ‘মতাদর্শ’ গ্রহণ করে, তাদের মোবাইল ফোনে কয়েকটি অ্যাপস সরবরাহ করা হয়। এগুলোর মধ্যে ‘উম্মা তাওহিদ’ ও ‘আনসার ইসলামিয়া’ উল্লেখযোগ্য। ‘উম্মু জনদুল্লাহ হুরাইয়া’র মাধ্যমে থ্রিমা অ্যাপ ও একিউআইএস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তারা।

ইসতিসনা আক্তার ঐশী

ঐশী ১৯৯৮ সালে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয় এবং ২০১০ সালে এইচএসসি পাস করে। ২০১০১১ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে ২০১৬ সালে সে এমবিবিএস পাস করে। চলতি বছরেই জুন মাস থেকে একই প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নি করছে সে। তার বাবা বিশ্বাস আক্তার হোসেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং মা নাসিমা সুলতানা সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক। ঐশীর ল্যাপটপ ও মোবাইলে জিহাদ সংক্রান্ত ফাইল, ম্যাগাজিন, লেকচারের ভিডিও পাওয়া গেছে।

র‍্যাব সূত্র জানায়, ইয়ানতের ১২ হাজার টাকার মধ্যে ঐশী নামের একজনই আট হাজার টাকা দিয়েছে, এমন তথ্য পেয়ে তার ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করে র‍্যাব। এতে জানা যায়, সে তিন বছর ধরে জঙ্গিবাদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

ঐশীর ল্যাপটপে মিলেছে আরও ২৭ নারী জঙ্গির তালিকা। এদের সন্ধানে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা। ২৭ জঙ্গির ২৫ জনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই গ্রুপে যুক্ত। সেগুলো হলইসলাম ক্লাস ফর গার্লস পেইজ৩ ও ব্লাড রোজ। এ দুই পেজ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

ডাক্তার ঐশীর ল্যাপটপে থাকা ২৭ জনের মধ্যে ঐশীর মেডিকেল বন্ধু রাশেদা তানজুম হেনা ও তাসনীম নিশাদ প্রায় তিন বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে জঙ্গি কার্যক্রমে। এ দু’জন ঐশীর সঙ্গে ধানমণ্ডির এক বাড়িতে তালিম নিত। রাবেয়া বিনতে আজহার নারী জঙ্গিদের মগজ ধোলাইয়ের কাজ করছে। মুন্নি, আমিনা, সুইটি, শাহিদা, তানিয়া, মারিয়া, মৌসুমী, সুলতানা, খালেদা, নিলুফা, তাহেরা, লাবিয়া, তমিনা ও শাপুর (পাকিস্তানি নাগরিক) দাওয়াতি কার্যক্রম ও অর্থ সংগ্রহে যুক্ত। এদের কয়েকজন সুইসাডাল স্কোয়াডের সদস্যও সংগ্রহ করে থাকে।

র‌্যাবের তথ্য মতে, এ জঙ্গিরা থ্রিমাসহ বিভিন্ন বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে। তাদের মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে টেলিগ্রাম আইডির মাধ্যমে আইএস সংক্রান্ত তথ্য পোস্ট করা হতো অনলাইনে। ২৭ জনের একজন নারী জঙ্গিদের মগজ ধোলাই এবং কয়েকজন আত্মঘাতী বাহিনী তৈরির কাজে নিয়োজিত। আর এসব নারী জঙ্গির পেছনে কলকাঠি নাড়ছে জামায়াতের আনুকূল্যে গড়া ছাত্রী সংগঠন ইসলামী ছাত্রী সংস্থা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ইসতিসনা আক্তার হ্যাকিং এড়াতে আইএসনির্দেশিত অ্যাপ ব্যবহার করতেন। এই অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি আইএসসমর্থিত বিভিন্ন সাইটে যেতেন। যখনই কোনো সাইটে ঢুকতে অসুবিধা হয়েছে, তখনই তিনি অন্য কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করে সাইটগুলোয় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া ফেসবুকে তাঁর বিদেশি বন্ধুদের মাধ্যমেও তিনি বিভিন্ন পোস্ট পেতেন ও শেয়ার করতেন।

ডাক্তার ঐশীর বাবা ডাক্তার বিশ্বাস আক্তার হোসেন ঢামেক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক। মাও চিকিৎসক, নাম নাসিমা সুলতানা। ঐশীর জনতা ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা রয়েছে। গোয়েন্দারা তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য খতিয়ে দেখছেন। ঐশীর বাবা বিশ্বাস আক্তার হোসেনও ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে জঙ্গি নয়। সে ধর্মভীরু। ফেসবুকে এক বান্ধবীর মাধ্যমে অসহায়দের সহায়তা করে। এতেই সে না জেনে ফেঁসে গেছে।’

র‌্যাব সূত্র জানায়, ঐশীর গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার সিকসিমিল এলাকায়। ২০১৩ সালে ঐশী ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারে, ধানমণ্ডিতে একটি বাসায় ‘ইসলামী ক্লাস’ হয়। সে ওই ক্লাসে যেত। সেখানে ক্লাস নিত পাকিস্তানের নাগরিক শাহপুর নামের এক নারী। তার পাশাপাশি আমিনা নামের এক বাংলাদেশি নারীও ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণীদের মগজ ধোলাই করত।

ইশরাত জাহান মৌসুমী (মৌ)

মানারাতের একই বিভাগের নতুন শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান মৌসুমী (মৌ) গোয়েন্দাদের জানায়, সে আল কায়দা নেতা আনওয়ার আওলাকীর জীবনদর্শনের অডিও এবং ভিডিও সংগ্রহ করে। পরে তা অনেকের মাঝেই ছড়িয়ে দেয়। তার মা মাকসুদা রহমান জামায়াতের সমর্থক। ইশরাতের তথ্য অনুযায়ী, আওলাকীর অডিও লেকচারের ২২টি সিরিজ সে নিজে শোনে। পরে বাংলায় ডাবিং করা আরও ৩০টি সিরিজ সংগ্রহ করে। মাসখানেক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক আবদুল আজিজ তাকে পেন ড্রাইভে করে কিছু তথ্য দেয়। আজিজ আরবিও শেখাতেন। তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। আজিজের মতোই তাদের জিহাদি সংক্রান্ত শিক্ষক হিসেবে কাজ করে জিয়াউর রহমান নামে আরেকজন। এরা আত তামকিন সাইটের মাধ্যমে লেকচার শোনারও পরামর্শ দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে ইশরাত আরও জানায়, তারা বড় একটি গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করে। এজন্য আনসার ইসলামিয়া ও খিলাফাহ নিউজ নামে দুটি লিংক তারা ছড়িয়ে দেয় সামাজিক মাধ্যমে। এছাড়া তাদের দলের সদস্যরা আইএসের স্বর্ণমুদ্রা সংক্রান্ত তথ্য নিয়েও ঘাঁটাঘাঁটি করে।

manarat militants 11মৌ ইসলামিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় (মিরপুর) থেকে ২০১০ সালে এসএসসি ও ২০১২ সালে মিরপুরের বিসিআইসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। ২০১৩ সালে সে মানারাতে ফার্মেসি বিষয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়। বর্তমানে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। মৌ গত সাত মাস ধরে জিহাদি কার্যক্রমে যুক্ত। গ্রেপ্তারের সময় সে মোবাইল সিম ও মেমোরি কার্ড নষ্ট করে ফেলে। তবে তার ল্যাপটপে জিহাদ বিষয়ক বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও বই পাওয়া গেছে।

মৌসুমির গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিলবিলাসে। পরিবারের সঙ্গে সে মিরপুরে জনতা হাউজিংয়ে ৪ নম্বর গেটের কাছে থাকত সে। সৌদিপ্রবাসী আবদুল আজিজ ও জিয়াউর রহমান (বর্তমানে মানারাতের শিক্ষক) নামের দুই ব্যক্তির কাছে আরবি ভাষা শিখেছে মৌসুমি। ‘আততামকিন’ লিংকের মাধ্যমে সে কথিত আইএসের খিলাফত সংক্রান্ত বয়ান শুনত।

মিরপুরের জনতা হাউজিংয়ের প্রতিবেশীরা বলেন, ইশরাত জাহানকে এলাকার কেউ কোনো দিন দেখেনি। তিনি বোরকাহিজাব, হাতেপায়ে মোজা ও চশমা ব্যবহার করতেন। মাস চারেক আগে তিনি তাঁর বাবামায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে ওঠেন। পাশের বাড়ির এক ব্যক্তি বলেন, ‘মৌরা (ইশরাত) যখন এই বাসায় ওঠে, তখন তার সঙ্গে এক বস্তা বই ছিল। ১৫ আগস্ট সকালে যখন তাকে র‍্যাবপুলিশ ধরে নিয়ে যায়, তখনো তার সঙ্গে এক বস্তা বই নিয়ে গেছে।’

ওই দলের অপর সদস্য ইশরাত জাহান দলে ভেড়ান খাদিজা পারভিনকে। তাঁরা দুজনেই মিরপুরের জনতা হাউজিংয়ে থাকেন। খাদিজা ফেসবুকে অধরা ধ্রুব নামে আছেন। ২০১৬ সালে ইশরাত জাহান, ‘নবুওয়াত আদলে খিলাফত, সারা মুসলিম উম্মায় একজন খলিফা থাকতে পারবেন। তিনিই সারা বিশ্ব শাসন করবেন’—এই বক্তব্য লিখে খাদিজাকে বন্ধু হওয়ার আহ্বান জানান। মাস দুতিনেক আগে তাঁরা ‘ব্লাড রোজ’ নামে ফেসবুকে আলাদা একটি গ্রুপ খোলেন।

খাদিজা পারভীন মেঘলা

আকলিমাকে জিজ্ঞাসাবাদে র‍্যাব কর্মকর্তারা জানতে পারেন, সে ১৪ আগস্ট সকালে মৌ এবং মেঘলা নামে দুজনের সঙ্গে জিহাদ বিষয়ে আলোচনা করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় আকলিমা ও মৌ এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মেঘলা জিহাদি কাজে যোগ দেয়। সে ২০০৬ সালে আহম্মদ নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি ও ঢাকা ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করে। ২০১৩ সালে এইচএসসি পাসের পরই মো. রোকনুজ্জামান নামে একজনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে সে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগের (অনার্স) চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তার বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতীর বেলতৈলী গ্রামে। ‘ব্লাড রোজ’ নামে একটি গ্রুপের মাধ্যমে মেঘলা, আকলিমা, শহিদুল্লাহ, মৌসুমি ও তাদের বন্ধুবান্ধব ‘নবুওয়াতের আদলে খিলাফত’ ও একজন খলিফা কিভাবে মুসলিম উম্মাহ শাসন করবেন এ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করত।

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজা পারভীন মেঘলা স্বীকার করেছে, অধরা ধ্রুব নামে তার একটি ফেসবুক আইডি আছে। এ ফেইক আইডিতে সে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ আইডিতে তার ১০০ ফ্রেন্ড রয়েছে, যাদের লক্ষ্য করে সে কাজ করছিল। সে স্বীকার করেছেমৌ তাকে জানায়, ২০১৬ সালে ঠিক নবুয়তের আদলে মুসলিম উম্মাহর জন্য একজন খলিফা আসবে। তিনি সারা বিশ্ব শাসন করবেন। এসব কথা বলে মৌ তাকে প্রথম খেলাফতের দাওয়াত দেয়। পরে তাকে কিছু জিহাদি বই দেয়। প্রায় তিন বছর ধরে তারা এক হয়ে কাজ করছে। তাদের ব্লাড রোজ নামে একটি গ্রুপ আছে। গ্রুপের সদস্যরা সামাজিক মাধ্যমে নানা কৌশলে সদস্য সংগ্রহ করে।

ইশরাতের বাড়ির লাগোয়া একটি বাসায় এক কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতেন খাদিজা পারভিন। প্রতিবেশীরা বলেন, প্রায়ই দিন দশেকের জন্য তিনি উধাও হয়ে যেতেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে ও মাথায় কাপড় দিত। রোজার মাসে আমার সঙ্গে যখন তার দেখা হলো, তখন সে দেখি বোরকাহিজাব, হাত মোজাপা মোজা পরে বসে আছে। আমি তার সঙ্গে বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার নিয়ে কথা বলতে চাইতাম। সে শুনতে চাইত না। তবে, আমার বিশ্বাস, সে নতুন এই দলে ভিড়েছে।’

শেরপুর জেলার হাতীবান্ধায় খাদিজার বাড়িতে গেলে তাঁর মা হোসনে আরা দাবি করেন, ‘আমার মেয়ে কখনো এ ধরনের কাজ করতে পারে না। আমার মেয়েকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। আর কারও প্ররোচনায় পড়ে সে যদি এমন কাজ করেও থাকে, তবে তাকে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ তিনি তাঁর মেয়ের মুক্তি দাবি করেন। হাতীবান্ধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুতিন দিন আগে খাদিজার বাবা খোরশেদ আলম মেয়ের চাকরির কথা বলে আমার কাছ থেকে একটি চরিত্রগত সনদ নিয়েছেন। আমরা জানি, সে (খাদিজা) ভালো। তবে সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়টি আমি জানি না।’

মাহমুদুল হাসান

mahmudul hasan aka tanvirর‍্যাব জানায়, জঙ্গিনেতা মাহমুদুল হাসান ফেসবুকে তাজরিয়ান আনহার নামে উগ্র মতাদর্শ প্রচারে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে থাকেন। ফেসবুক পেজে দেখা যায়, প্রায় ৫০০ অনুসরণকারী রয়েছে। কিন্তু তাঁর জন্মস্থান সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার রশিদপুরে এবং বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মাহমুদুল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ২০১৫ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ুর রহমান হলের ২০২ নম্বর কক্ষে আসন বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তিনি যশোর শহরের কাজীপাড়া কদমতলা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ওই সময়ে ২০২ নম্বর কক্ষে থাকতেন এমন একজন প্রাক্তন ছাত্র বলেন, ‘নিজের বিভাগের কোনো ছাত্রের সঙ্গে মাহমুদুলের বন্ধুত্ব ছিল না। অন্য বিভাগের দুই ছোট ভাই ছিলেন তাঁর প্রিয়। তাঁরা তিনজনই আহলে হাদিসের অনুসারী। ক্যাম্পাসে আহলে হাদিস মসজিদ না থাকায় তাঁরা ক্যাম্পাসে থাকতেন না।’ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুস সাত্তার বলেন, ‘ঠান্ডা ছেলে হিসেবে পরিচিত মাহমুদুল হাসান ক্যাম্পাসের আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পেয়েও থাকেনি। যশোর শহরের কাজীপাড়া এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে থাকত।’

দুই বছর আগে মাহমুদুল একবার বাড়ি গিয়েছিলেন। এরপর আর যাননি। ২১ জুলাই র‍্যাব টঙ্গী থেকে মাহমুদুলকে গ্রেপ্তার করলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। র‍্যাব বলছে, মাহমুদুল নবম শ্রেণিতে লেখাপড়ার সময়ই জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৪ সালের শেষের দিকে সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ঢাকায় আসেন। মাহমুদুল হাসান প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি। প্রশিক্ষণে ভালো করায় জেএমবি সদস্যদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। র‍্যাবের দাবি, জেএমবি সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার নীলনকশা তৈরির সঙ্গেও মাহমুদুল জড়িত ছিলেন।

মানারাতে হঠাৎ ইউজিসি

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গুলশান ক্যাম্পাসের লাইব্রেরিতে ধর্মীয় উগ্রবাদের বই পাওয়া গেছে। এসব বই শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলেও দীর্ঘদিন ধরেই তা লাইব্রেরিতে যত্ন সহকারে রাখা আছে। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল হঠাৎই পরিদর্শনে গিয়ে এসব বইয়ের অস্তিত্ব পায়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রতিনিধিদল ইউনিভার্সিটিতে অবস্থান করে। ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মো. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ছিলেন উপপরিচালক জেসমিন পারভীন ও উপসচিব মো. শাহীন সিরাজ।

কমিশনের সদস্য ড. মো. আকতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রুটিন ওয়ার্কেই আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। তবে যেহেতু মানারাতের তিন শিক্ষার্থী জেএমবির সদস্য অভিযোগে ধরা পড়েছে, তাই আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা তথ্য জানতে গিয়েছিলাম। আমরা সব শিক্ষকের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছি। শিক্ষার্থীদের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছি। উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।’

নাম প্রকাশ না করে প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, গুলশান ক্যাম্পাসে শুধু বিজনেস ও ইংরেজি বিভাগ আছে। ফলে এখানে ওই বিষয় সংশ্লিষ্ট বই থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু দুটি র‌্যাকে ধর্মীয় বিষয়ের বই পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদের বইও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বইয়ের শিরোনাম দেখে এটা মনে হয়েছে। লাইব্রেরিতে যেখানে সংশ্লিষ্ট পাঠ্যপুস্তকই অপ্রতুল, সেখানে এই বইগুলো সার্বিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের মনে হয়েছে, এই বইগুলো থাকলে ছেলেমেয়েরা অন্যদিকে আকৃষ্ট হতে পারে।

জানা যায়, মানারাত ইউনিভার্সিটির গুলশান ক্যাম্পাসে পড়ালেখা করে দুই হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। আর শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৭০। তবে ইউজিসির প্রতিনিধিদল এসব শিক্ষকের মধ্যে ৬০ জনই লেকচারার বলে জানতে পেরেছে। ওই ক্যাম্পাসে সিনিয়র শিক্ষক নেই বললেই চলে। ইউনিভার্সিটির সায়েন্স ফ্যাকাল্টি মিরপুর ক্যাম্পাসে। ফার্মেসি বিভাগের ক্লাসও সেখানে হয়।

manarat anti-militant mtgইউজিসির প্রতিনিধিদল শিক্ষার্থীদের আচারআচরণ সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে। যারা জেএমবির সদস্য হিসেবে ধরা পড়েছে তাদের আচারআচরণ সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে। এছাড়া অন্য কোনো শিক্ষার্থীও এ ধরনের দলের সঙ্গে যুক্ত কি না তা খতিয়ে দেখতে বলেছে। এ ছাড়া লাইব্রেরিতে কী কী বই আছে এর বিস্তারিত তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছে।

মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘আমরা একদুই দিনের মধ্যেই পরিদর্শন প্রতিবেদন চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে জমা দেব। এরপর মানারাত ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে বেশ কিছু তথ্য চাওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হতে পারে।’

মানারাতের তিন শিক্ষার্থী বহিষ্কার : এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী মনিটরিং সেলের সদস্যরা সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের তিন ছাত্রী আকলিমা রহমান মনি, খাদিজা পারভীন মেঘনা ও ইসরাত জাহানকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার ঘোষণা করেন।

manarat univ

আতঙ্ক নারী জঙ্গি নিয়ে

সাখাওয়াত কাওসার : র‌্যাবপুলিশরা কাফির। এরা ইসলামের শত্রু। একের পর এক আমাদের ভাইদের গ্রেফতার করে জেলে বন্দী করে নির্যাতন করছে। ইসলামের দাওয়াতি কাজ থেকে বিরত রাখছে। এখন আমাদের টার্গেটই হলো র‌্যাবপুলিশ।’ মঙ্গলবার গাজীপুর থেকে গ্রেফতার মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আকলিমা রহমানের বরাত দিয়ে কথাগুলো বলছিলেন র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সম্প্রতি জঙ্গি কর্মকাণ্ডে নারীদের জড়িয়ে পড়ার হার অনেক বেড়েছে। তাদের অনেকে অস্ত্রবিস্ফোরক ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে উঠেছে এমন তথ্যও তাদের কাছে এসেছে।

re-emergence of JMB২০০৯ সালের ১৫ মে রাজধানীর শেওড়াপাড়া উত্তর পীরেরবাগ এলাকায় একটি বাড়ি থেকে জামা’আতুল মুজাহিদীনের তৎকালীন সামরিক কমান্ডার জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানকে গ্রেফতারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্দেশ করে তার স্ত্রী হালিমা বেগমের হুঙ্কারে অনেকটাই বিস্মিত হয়েছিলেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। এই জঙ্গি দম্পতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেছিল।

জেএমবির সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমান, আবদুল আউয়ালের স্ত্রীরা জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। জঙ্গি নেতাদের ফাঁসি হওয়ার পর কিছুদিন সংগঠনটির নারী ইউনিট চুপচাপ ছিল। এখন নতুন করে আবার তৎপরতা শুরু হয়েছে। নূরজাহান, মারজিয়া, মিনা আক্তার, লতা, শারমিন, জ্যোত্স্না ও বিলকিসদের নিয়ে নতুন করে গঠন করা হয়েছে মহিলা ইউনিট। তাদের সঙ্গে জেএমবির পলাতক শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দারা বলছেন, গত বছরের মাঝামাঝি থেকে নতুন করে তৎপরতা শুরু করে নারী জঙ্গিরা। উচ্চশিক্ষিত এই নারীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডে রীতিমতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। গোপনে নিচ্ছে অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ। পুরুষদের চেয়ে নারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি অপেক্ষাকৃত কঠিন এমনটা ভেবেই শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিরা নিজেদের দলে নারীদের ভেড়াতে বেশি আগ্রহী।

সূত্র বলছে, দল ভারী করতে অনেক পুরুষ জঙ্গি একাধিক বিয়ে করে থাকেন। বিয়ের পর স্ত্রীদের ধীরে ধীরে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেন তারা। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা কারাবন্দী মুফতি জসীম উদ্দীন রাহমানীর একাধিক স্ত্রীর একজন ছিলেন আয়েশা আক্তার। এক পর্যায়ে নির্দেশ অনুসরণ না করার কারণে তাকে তালাক দেন রাহমানী। এর কিছুদিন পরই ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট ৩১ সহযোগীসহ বরগুনা থেকে গ্রেফতার হন জসীম উদ্দীন রাহমানী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বেশির ভাগ জঙ্গি তাদের স্ত্রীদের এ পথে নিয়ে যায়। অনেকে বিয়ের আগেই তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে। আবার অনেকে বিয়ের পর তাদের স্ত্রীদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় তারা সফল হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংগঠনের স্বার্থে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিরা তাদের মেয়ে কিংবা বোনদের অপর জঙ্গির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে থাকে।

৪ জুলাই টাঙ্গাইলের কালিহাতীর রোজিনা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তারই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার হন সাজিদা আক্তার ও জান্নাতি ওরফে জেমি। সাজিদার স্বামী নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক নজরুল দুর্ধর্ষ জঙ্গি। এই নজরুল পঞ্চগড়ের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর রায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী, রংপুরে জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও ও মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিন নারীই স্বীকার করেছেন, তারা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির মহিলা শাখার সক্রিয় সদস্য। তাদের স্বামীরাও একই সংগঠন করেন। তারাই এদের এ পথে এনেছেন।

manarat militants 7অপরাধবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জঙ্গি মানে জঙ্গিই। রাষ্ট্রের স্বার্থে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে নারীপুরুষ আলাদা করলে চলবে না। তবে এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে নারীরা কিছুটা সুবিধা পায়। পর্দা ব্যবহার করে তারা ইসলামের ক্ষতি করে যাচ্ছে। এজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

গোয়েন্দারা বলছেন, নারী জঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে হিযবুত তাহরীর। নিষিদ্ধ এ জঙ্গি সংগঠনের ছাত্রী মুক্তি সংস্থা নামে একটি শাখা আছে। এর বাইরে জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আল্লাহর দলসহ প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনের আলাদা নারী ইউনিট রয়েছে।

এদিকে সর্বশেষ সোমবার রাজধানীর মিরপুরের জনতা হাউজিং এলাকা থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের ছাত্রী খাদিজা পারভিন মেঘলা (২৩) গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্রী ইসরাত জাহান মৌ তাকে প্রথম খিলাফতের দাওয়াত দেন এবং তাকে কিছু ইসলামী বই দেন। পরে ইন্টারনেট ব্যবহার করে জঙ্গিবাদের দিকে আকৃষ্ট হন তিনি।

একই দিন গ্রেফতার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ইসতিসনা আক্তার ঐশী (২৩) চিকিৎসক দম্পতির সন্তান। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী জানান, ২০১৪ সালে প্রথমে তিনি টিভি নিউজ, বিবিসি, সিএনএনের মাধ্যমে জানতে পারেন, খিলাফত ঘোষিত হয়েছে। এর বাইরে ফেসবুকে তিনি যেসব ইসলামী পোস্ট পেতেন, সেগুলো পড়তেন। ২০১৩ সালে ফেসবুকে ‘ইসলাম ক্লাস ফর গার্লস’ পেজের মাধ্যমে ধানমন্ডি ৬ নম্বর সড়কে একটি বাসায় ইসলামী ক্লাসে ভর্তি হন তিনি। সেখানে প্রথমে ‘সাপুর’ নামের এক পাকিস্তানি মহিলা, পরবর্তী সময়ে আমিনা নামের এক বাংলাদেশি মহিলা তাদের ক্লাস নিতেন। ‘ইসলাম ক্লাস ফর গার্লস পেজ৩’তে তাদের গ্রুপে সদস্য প্রায় ২৫ জন। তার মেডিকেলবন্ধুদের মধ্যে রাশেদা তানজুম হেনা, তাসনীম নিশাদ, প্রীতি, সুইটি (ঠিকানা অজ্ঞাত) ও মুন্নীসহ (ঠিকানা অজ্ঞাত) আরও অনেকেই ওই ক্লাসে উপস্থিত থাকতেন। প্রতি শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত, মাঝে মধ্যে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ক্লাস চলত। ঐশী জানান, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে আকলিমা নামে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ধানমন্ডির পাশে একটি মসজিদে নামাজ পড়ার সময় আকলিমা তাকে খিলাফত, জিহাদ ইত্যাদি বিভিন্নভাবে বোঝাতেন। তিনিই তাকে জানান, বাংলাদেশেও আইএস আছে। তার পরিচিত একজন আইএসের সঙ্গে যুক্ত। আকলিমা তাকে আইএস থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন অডিওভিডিও চিত্র পেনড্রাইভের মাধ্যমে দিতেন এবং আইএসের প্রকাশনা ‘দাবিক’ পত্রিকা পড়তে বলতেন।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুরুষদের পাশাপাশি বেশ কিছুসংখ্যক মহিলা জঙ্গিবাদী কাজে যুক্ত হয়েছে। এরা একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে বলে তথ্য এসেছে। সম্প্রতি একটি গ্রুপের চার নারীকে গ্রেফতার করার পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা পেয়েছি। তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

সূত্রঃ দৈনিক প্রতিদিন, ১৭ আগস্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: