প্রথম পাতা > ইতিহাস, জীবনী, রাজনীতি > র‌্যাডক্লিফ ও ভারত বিভক্তির কিছু অজানা কথা

র‌্যাডক্লিফ ও ভারত বিভক্তির কিছু অজানা কথা

Cyril-Radcliffe-and-partition-of-India 2মোবায়েদুর রহমান : কুলদ্বীপ নায়ার ভারতের সম্ভবত সবচেয়ে প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বর্তমান বয়স ৯৩ বছর। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন। . . . গত ১১ আগস্ট তার একটি লেখা ছাপা হয়েছে ‘ডেইলি স্টারে’। লেখাটির শিরোনাম, “The Partition”. দি পার্টিশন নামক লেখাতে তিনি অনেক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন যেগুলো ইতোপূর্বে অনেকের জানা ছিল না। অনেকদিন আগে তার লন্ডন সফরের সময় কুলদ্বীপ নায়ার স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের সাথে দেখা করেন। সেই দেখাসাক্ষাতের সময় যে দুচারটি কথা র‌্যাডক্লিফ বলেন সেগুলোর অংশবিশেষ তিনি আলোচ্য কলামে বর্ণনা করেছেন।

কুলদ্বীপ নায়ার শুরু করেছেন এভাবে, বৃটিশরা যখন ভারত ছেড়ে যায় তখন তারা ভারতকে একটি মেস বানিয়ে যায়। এটি তারা শুধুমাত্র ভারতের ক্ষেত্রেই করেনি। তারা ফিলিস্তিন, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল এবং ভারতের ক্ষেত্রে করেছে। সবাই জানেন, স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ ভারত বিভক্তির রেখা টেনেছিলেন। মি. র‌্যাডক্লিফকে নির্বাচন করেছিলেন ভারতের শেষ বড়লাট লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন। তখন র‌্যাডক্লিফ ছিলেন বৃটিশ বারের একজন উকিল। ভারত সম্পর্কে তার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ভারতে কোনো দিন আসেননি। তেমন একজন ব্যক্তিকে মাউন্ট ব্যাটেন যখন ভারত বিভক্তির গুরুদায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেন তখন র‌্যাডক্লিফ প্রথমে সেই প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। কারণ তিনি জানতেন, এ কাজটি করতে গিয়ে তিনি সমগ্র ভারতবাসীর প্রতি সুবিচার করতে পারবেন না। তখন মি. মাউন্ট ব্যাটেন এই কাজের পারিশ্রমিক বাবদ তাকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সেই সময় অর্থাৎ আজ থেকে ৭০ বছর আগে ৪০ হাজার টাকা একটি বড় অংক ছিল। তবে র‌্যাডক্লিফ এ কাজ করতে রাজি হন টাকার লোভে নয়। বরং পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ দেশ ভারতীয় উপমহাদেশকে তিনি দুটি ভাগে বিভক্ত করছেন তেমন একটি সম্মানজনক কাজের আকর্ষণে। তাকে বলা হয়েছিল, এই কাজটি করে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। ইতিহাসে তার নাম রয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেই নাম অঙ্কিত হয়েছে একজন কুখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে।

Radcliffe-lineর‌্যাডক্লিফ ভারতে এসে দাবি করেন যে, তাকে ভারতের এমন একটি মানচিত্র দেওয়া হোক যেখানে এই বিশাল দেশটির প্রতিটি জেলার মানচিত্র থাকে। কিন্তু সেই ধরনের কোনো মানচিত্র আদতেই বৃটিশরা তৈরি করেননি। তাই শুরুতেই তিনি যা চেয়েছিলেন সেটি থেকে তিনি বঞ্চিত হন। প্রথম কয়েক দিন ইন্ডিয়া সম্পর্কে স্ট্যাডি করে সেই দেশটিকে কিসের ভিত্তিতে ভাগ করা হবে সে সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা জন্মে তার মনে। সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি লাহোর শহরকে ভারতের ভাগে বরাদ্দ করেন। তখনো ভারত বিভক্তির রেখা তিনি চূড়ান্ত করেননি। কিছুদিন পর তার মনে হয় যে, তিনি পাকিস্তানকে দারুণভাবে বঞ্চিত করছেন। কারণ লাহোরও যদি ভারতকে দেওয়া হয় তাহলে পাকিস্তানের ভাগে কোনো উল্লেখযোগ্য শহর তো পড়ল না। এসব চিন্তাভাবনা করে তিনি লাহোর পাকিস্তানের ভাগে বরাদ্দ করেন। এর ফল হলো এই যে, পশ্চিম পাঞ্জাবের মানুষরা খুশি হলেন। কিন্তু পূর্ব পাঞ্জাবের মানুষরা লাহোর হারানোর জন্য তাকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারেননি। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পূর্ব পাঞ্জাব ভারতের ভাগে বরাদ্দ হয়। তাকে পারিশ্রমিক বাবদ যে ৪০ হাজার টাকা অফার করা হয়েছিল সেই টাকা তিনি কোনো দিন গ্রহণ করেননি। কারণ ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর এক দেশ থেকে আরেক দেশের মাইগ্রেশনের প্রক্রিয়ায় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যান সেই রক্তের ঋণ তার ওপরই পড়ে। ভারত বিভক্তির পর সেই যে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান তারপর আর একবারের জন্যও ভারতে ফিরে আসেননি। তিনি লন্ডনেই মারা যান। তার মৃত্যুর খবরও প্রথমে ভারতবাসী জানতে পারেনি। এ খবরটি প্রথমে লন্ডনের একটি পত্রিকায় ছাপা হয়। সেখান থেকে খবরটি সংগ্রহ করে ভারতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, তার হাত দিয়েই দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই সৃষ্টির জন্য তিনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। র‌্যাডক্লিফ ভারতের বুকে যে ছুরি চালিয়েছিলেন তারপর ভারতীয় এবং পাকিস্তানি কোনো জাতিই তার ওপর খুশি হতে পারেনি।

partition-of-india-4ঘটনা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছিল। এমন দ্রুতগতিতে এবং এমনভাবে এগোচ্ছিল যে, ভারত বিভক্তি রোধ করার কোনো পথ দৃশ্যমান হচ্ছিল না। তখন মি. মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী শেষ অস্ত্র হিসেবে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি নেহরু এবং প্যাটেলের কাছে প্রস্তাব দেন যে, যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অখন্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ দেওয়া হয় তাহলে হয়তো ভারত বিভক্তি রোধ করা যেতে পারে। এই প্রস্তাব শুনে উভয় নেতাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ স্বাধীন ভারতের এই শীর্ষ পদটির ওপর তাদের দুজনেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। কুলদ্বীপ নায়ার মন্তব্য করেছেন যে যদিও এই দুই নেতাই স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক অবদান রেখেছেন তৎসত্ত্বেও এই দুই নেতার কেউই এই পদ লাভের লোভলালসা থেকে ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কুলদ্বীপ নায়ারের মতে, ১৯৪৭ সালের ৩ জুন পার্টিশন প্ল্যান মি. গান্ধী কখনই সমর্থন করেননি। এই প্ল্যান সম্পর্কে আলোচনার জন্য মাউন্ট ব্যাটেন গান্ধীকে ডাকেন। আলোচনার এক পর্যায়ে মাউন্ট ব্যাটেন পার্টিশন শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথেই মি. গান্ধী কক্ষ ত্যাগ করেন। কারণ তিনি ওই শব্দটি শুনতে চাননি। কিন্তু প্যাটেল এবং নেহরু প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। কুলদ্বীপ নায়ারের মতে, ওই দুজন নেতা মনে করেন যে, তারা বেশি দিন বাঁচবেন না। তাই যে ক’দিন বাঁচেন, সেই ক’দিন দেশটিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চান।

মি. জিন্নাহর বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু জিন্নাহ যে পাকিস্তান পেলেন সেই পাকিস্তানে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট হননি। তাই তিনি বলেন, তিনি যা পেলেন সেটি ছিল ‘পোকায় খাওয়া পাকিস্তান’। কারণ যে পাকিস্তানের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার সেই স্বপ্নের পাকিস্তানের একদিকে থাকবে পেশাওয়ার আর অন্যদিকে থাকবে দিল্লি। তিনি এতই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে যখন তাকে বলা হলো যে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সংযোগ রক্ষা করা যায় কিনা, তখন জিন্নাহ সরাসরি বলে ফেলেন, আমি ওদেরকে অর্থাৎ ইন্ডিয়ানদেরকে বিশ্বাস করি না। শুধু তাই নয়, বৃটিশরা চেয়েছিল যে মাউন্ট ব্যাটেনকে নব গঠিত ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেরই গভর্নর জেনারেল করা হোক। ভারত এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে মাউন্ট ব্যাটেনকে তাদের প্রথম গভর্নর জেনারেল বানায়। কিন্তু মি. জিন্নাহ সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কুলদ্বীপ নায়ারের মতে, আজও অনেক ভারতীয় মনে করেন যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যদি অখন্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানানো হতো তাহলে তিনি হতেন একজন যোগ্য প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতও এক ও অখন্ড থাকত। তখন পর্যন্ত কেউ জানত না যে, তার ফুসফুসের ভিতরে বাসা বেঁধেছে ঘাতক ক্যান্সার। অনেকেই বলেন যে, বৃটিশরা ভারতের স্বাধীনতা আরো ১ বছর পিছিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের হিসেবটি ছিল এই যে, এই এক বছরের মধ্যে জিন্নাহ ক্যান্সারে মারা যাবেন এবং তারাও ভারতকে অখন্ড রাখতে পারবেন। তাদের মতে, জিন্নাহ মারা গেলে পাকিস্তানের উন্মাদনাও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসবে।

কুলদ্বীপ নায়ার আরেকটি অজানা তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইংল্যান্ডের মহাযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল জিন্নাহর কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে, পাকিস্তান যাতে কায়েম হয় সেটা তিনি দেখবেন। কারণ মি. নায়ারের মতে, মি. চার্চিল মনেপ্রাণে হিন্দুদেরকে ঘৃণা (Pathological Hatred) করতেন। তিনি বলে বেড়াতেন যে, হিন্দুদের এই বহুভাষিক জটিল ধর্ম (Polyglot Religion) তিনি বুঝতে পারেন না। সেই তুলনায় চার্চিলের মতে, ইসলাম ধর্মটি অত্যন্ত সহজ সরল এবং সহজেই বোঝা যায়। আবার অনেকের মতে কৌশলগত কারণেও চার্চিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করতেন। কারণ ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেটি একদিকে তেলসমৃদ্ধ মুসলিম জাহানের প্রবেশপথ এবং অন্যদিকে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নেরও সিংহ দুয়ার। সুতরাং পাকিস্তান তাদের কাছে অত্যন্ত কাঙ্খিত ছিল।

কুলদ্বীপ নায়ার শেষ করেছেন এভাবে। বহু বছর পর আমি লন্ডনে গিয়ে র‌্যাডক্লিফের সাথে দেখা করি। তিনি ব্লাড স্ট্রিটের মতো একটি অভিজাত এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। আমি তাই আশা করেছিলাম যে, তিনি পরিবেষ্টিত থাকবেন কিছু আইনজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে। কিন্তু আমি হতভম্ব হই যখন দেখি যে মি. র‌্যাডক্লিফ নিজে এসে দরজা খোলেন এবং আমাকে চা পানে আপ্যায়ন করার জন্য নিজেই কেতলিতে পানি গরম করতে দেন। তিনি তার দায়িত্ব এবং ভারত বিভক্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু যেহেতু আমি তার মুখোমুখি হয়েছিলাম তাই কিছু কিছু প্রশ্নের জবাব তাকে দিতেই হয়েছে। তবে তার সমগ্র মুখমন্ডলে ছিল বিষন্নতা এবং অনুতাপের ছাপ। আমার মনে হলো, তিনি সেই ব্যক্তি যিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য আজও তার বিবেকের দংশন অনুভব করছেন।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: