প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, রাজনীতি > [তুর্কী] সুলতান – [রাশান] জার ঐক্য

[তুর্কী] সুলতান – [রাশান] জার ঐক্য

erdogan-putinরবার্ট ফিস্ক : হ্যাঁ, সুলতান জারের সঙ্গে দেখা করতে সেন্ট পিটার্সবার্গে গেলেন। আর দামেস্কের খলিফা সিরিয়া থেকে এই প্রত্যয় নিয়ে তাকিয়ে দেখবেন যে, বাথ পার্টির নীতির কার্যকারিতা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। নীতি? দাঁড়ান পাঠক, অপেক্ষা করুন।
সিরিয়ার ওপর তুরস্কের প্রভাব দামেস্কের জন্য বড় হুমকি, এরপর আসল তুরস্কের সেই রহস্যজনক অভ্যুত্থান, যাদের সেনাবাহিনী এর পরিণতিতে খাসি হয়ে গেল। আর তারপর তুর্কি সুলতান এরদোয়ান রাশিয়ায় গিয়ে তাঁর দেশকে ন্যাটো থেকে মা রাশিয়ার ছায়াতলে নিয়ে গেলেন। আর এসবই হচ্ছে তখন, যখন সিরিয়ার বিদ্রোহী সেনারা আলেপ্পোতে সরকার অনুগত সেনাদের ঘিরে ফেলেছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল, তুরস্কের সঙ্গে তাদের যে সরবরাহ লাইন আছে, সেটা আবার চালু করা।
রুশ সেনারা তুর্কি সীমান্তের ৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থান করছে। যে বিদ্রোহীরা আলেপ্পো ঘেরাও করে আছে, রুশ সেনারা তাদের ওপর প্রতিদিনই বোমা বর্ষণ করছে। ফলে জার পুতিন এটা আর সহ্য করবেন না, তাঁর ক্ষেপণাস্ত্র তুর্কি সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে বিদ্রোহীদের হাতে পড়ুক, আর তারা সেটা দিয়ে রুশ বিমান ভূপাতিত করুক। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বিশ্বাস করে যে, বাশার সরকারের পতন ও ইউরোপে শরণার্থীর স্রোত ঠেকাতে তারা সুলতান এরদোয়ানের ওপর ভরসা রাখতে পারেন বা ইনসারলিক বিমানঘাঁটিসহ আনাতোলিয়ার সাবেক আর্মেনীয় ভূখণ্ড থেকে মার্কিন বিমান বিনা বাধায় উড়তে পারবে, তাহলে তাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে।

সুলতানের রাশিয়া সফরের গুরুত্ব অপরিসীম। সুলতান নিজেই বলেছেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে এই সফর এক নতুন মাইলফলক। আমি ব্যক্তিগতভাবে ও তুর্কি জাতির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পুতিন ও রুশ জনগণকে সালাম জানাই।’ রুশ টেলিভিশনে তাঁর এ কথা শোনা গেছে। এরপর রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের কাছে তিনি পুতিনকে ‘বন্ধু পুতিন’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি অঙ্গীকার করেছেন, ‘আমাদের দুটি দেশের একত্রে আরও অনেক কিছু করার আছে।’ এবার জারসুলতান গল্প বাদ দিই। এটা অনেকটা এ রকম যে, ব্রেজনেভ ও পডগর্নি ওয়ারশ চুক্তির লঙ্ঘনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে এ রকম ভ্রাতৃত্বমূলক বাণী শোনার আশা করতেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে’ ভরপুর, আর সঙ্গে আছে ‘সালাম’, ‘বন্ধুত্ব’ (যদিও ‘চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব’ নয়, ভ্রাতৃপ্রবণ দেশগুলো যেগুলো ক্রেমলিনকে একদা প্রতিশ্রুতি দিতে পারত)

কথা হচ্ছে, তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোয়ান প্রথম সফরে গেলেন রাশিয়ায়, আর এটি এক ভিন্ন ধরনের অভ্যুত্থান। এরদোয়ান প্রাকপিটার্সবার্গ ঘোষণায় বলেছেন, ‘রাশিয়াকে ছাড়া সিরিয়ার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। শুধু রাশিয়ার সহায়তা নিয়েই আমরা সিরিয়ার সংকট মোকাবিলা করতে পারি।’ আর বাশার আলআসাদের সঙ্গে সহযোগিতার কী হবে? এই স্মৃতি বাশারের হৃদয়কে উষ্ণ করবে যে, তিনি একসময় এরদোয়ান ও তাঁর স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, এটি আমাদের মনে রাখা দরকার। তুরস্ক যদি রুশ বিমান ভূপাতিত করে আবার পুতিনকে ‘বন্ধু’ বলে জড়িয়ে ধরতে পারে, তাহলে এরদোয়ান বাশারকেই বা আবার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবেন না।

হিলারি ক্লিনটন ও ট্রাম্পও কথাটি ভেবে দেখতে পারেন। যদিও জার সম্পর্কে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি এখনকার সুলতানের মতোই। সেন্ট পিটার্সবার্গের মঞ্চে অনেকেই হয়তো পরাজিত হবেন। প্রথমত, আইএস ও আলকায়েদা/নুসরা/ফাতাহ্ এলশাম, যারা হঠাৎ করেই দেখল, তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র সরবরাহকারী তাদেরই সবচেয়ে ঘোরতর শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে রুশ বিমানবাহিনীর মালিকের সঙ্গে। এরপর সৌদি ও কাতারের কোটিপতিরা তো আছেনই, যারা সুন্নি যোদ্ধাদের টাকা ও অস্ত্র দিচ্ছে, যে যোদ্ধারা দামেস্ক ও বাগদাদে সরকার উৎখাত করতে চায় এবং ইরান, সিরিয়া ও লেবাননের শিয়াদের পোষ মানাতে চায়।

সর্বোপরি তুর্কি সেনাবাহিনী তো আছেই, যার সদস্যরা জারের প্রাসাদে সুলতানের প্রমোদ ভ্রমণের পর প্রাণহানির আশঙ্কায় দিন কাটাবে। যে ব্যাপারটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো—যাকে বলে গল্পের শুরু—রাশিয়া ও ইরান সম্ভবত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে এরদোয়ানকে সতর্ক করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হচ্ছে। আরবদেরও রুশরা বলেছে, সাবেক কেজিবি প্রধান পুতিন ব্যক্তিগতভাবে এরদোয়ানকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, অভ্যুত্থান হতে যাচ্ছে। তিনি তুর্কি সেনাবাহিনীর বার্তা প্রেরণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে এটা জানতে পেরেছিলেন। সিরিয়ার লাতাকিয়ার একটু বাইরে রুশ টেকনিশিয়ানরা এই বার্তা প্রেরণ ব্যবস্থায় ঢুকে তাদের কথোপকথন শুনতে পেয়েছিলেন। ওদিকে ইরানিরাও চায়, তুর্কিরা সিরিয়ার সুন্নি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক, যারা তাদের শত্রু। ফলে তারাও এরদোয়ানকে এ অভ্যুত্থানের খবর জানিয়ে দিয়েছিলেন। বেশি দিন আগের কথা নয়, হিলারি পুতিনের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে হয়। এখন এরদোয়ান সে চেষ্টা করছেন, কেউ ভাবতে পারেন, এর কার্যকারিতা অনেক বেশি হবে।

কথা হচ্ছে, ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটা এখন এতটা ভেদবিচারহীনভাবে ব্যবহৃত হয় যে, শব্দটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবিষ্কার। প্রকৃতপক্ষে ফরাসি বিপ্লবের পর এই শব্দের প্রথম এস্তেমাল হয়েছিল মস্কোতে, যেখানে জারের দিকে যারা বোমা ছুড়ে মারত, তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেওয়া হতো, যারা জারকে উৎখাত করতে চেয়েছিল। এখন সুলতানজারের সম্মেলনের পর সরকারি ইশতেহারে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটার কী ব্যবহার হয়, সেদিকে খেয়াল করুন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সেন্ট পিটার্সবার্গের মহা ঐক্য। সন্ত্রাস, সন্ত্রাস, সন্ত্রাস। সামনের দিনে যদি মাতা রাশিয়ার কাছ থেকে এই বাণী শোনেন, তাহলে জানবেন, সিরিয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।

রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৭ আগষ্ট ২০১৬

তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান

তুর্কি সুলতান ও রুশ জারের হঠাৎ মৈত্রী!

erdogan putin mtg st peteফারুক ওয়াসিফ : ঘটনা চমৎকার এবং অদ্ভুত। তুরস্কে জিতল এরদোয়ান কিন্তু আনন্দের বাজি ফুটল রাশিয়ায়। পুতিনের মতো খুশি সিরিয়ার বাশারও। দূর থেকে সন্তোষ প্রকাশ করছে ইরান। এদিকে বাশারকে উচ্ছেদে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ বছরের আয়োজনও হুমকিতে। সিরিয়ায় কী হবে এখন তা অনেকটা ঠিক হচ্ছে রুশ চাহিদা অনুসারে। কয়েক দিন আগে যিনি ছিলেন বাশারের বিরুদ্ধে ন্যাটোর খুঁটি, এখন সেই এরদোয়ানকে না সরিয়ে বাশারকে সরানো কঠিন। ক্যুপরবর্তী গত ১০ দিনে আগাগোড়া বদলে গেছে ন্যাটো বনাম রাশিয়ার শক্তি প্রতিযোগিতার চালচিত্র। অভ্যুত্থানকে সহযোগিতার দায়ে এরদোয়ান আঙুল তুলেছেন এত দিনের মিত্র ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। অথচ তুরস্ক এখনো ন্যাটোভুক্ত দেশ এবং কয়েক মাস আগেই রুশ বিমান ভূপাতিত করে রাশিয়ার সঙ্গে শত্রুতা বাড়িয়েছিল দেশটি।

পরিবর্তনের ইঙ্গিতটা হাজির হয়েছিল অভ্যুত্থানের দুই দিন আগে, ১৩ জুলাই। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী সেদিন ঘোষণা দেন, ‘আমি নিশ্চিত, সিরিয়ার সঙ্গে আমাদের বন্ধন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবেএটা আমাদের দরকার। আমরা ইসরায়েল ও রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছি।’ (দ্য গার্ডিয়ান, ১৩ জুলাই) অথচ তুরস্কই ছিল বাশারবিরোধীদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং ঘাঁটি জোগানো দেশ। কেন এই রদবদল, তা বুঝতে সিরীয় যুদ্ধের ভেতরের সমীকরণ বোঝা দরকার। বাশার চলে যাওয়া মানে সিরিয়া কয়েক টুকরো হওয়া, ইতিমধ্যে ইরাক সেই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে করে সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দিদের দ্বারা তুরস্কের সীমান্তে স্বাধীন কুর্দি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বিগড়ে যান এরদোয়ান। এটা হলে তুরস্কের কুর্দিদেরও ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। কুর্দি–নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। সম্ভবত এ পরিস্থিতিই তুরস্ককে রুশ শিবিরের দিকে ঠেলে দেয়। রাশিয়াও জানে তুরস্কের সামনে বাশারের চেয়েও বড় হুমকি কুর্দিরা।

জুনের শেষ সপ্তাহে এরদোয়ান রুশ প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি লিখে রুশ বিমান ভূপাতিত করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করায় পশ্চিমারা নড়েচড়ে বসে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম ভদ্রকুমারসহ অনেকেই মনে করেন, তুরস্কমার্কিন সম্পর্কের এই ফাটলই এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল (এশিয়া টাইমস, ২৩ জুলাই)
বাস্তবে ক্যুতে ব্যবহৃত দুটি এফ১৬ যুদ্ধবিমান তুরস্কের মার্কিন সেনাঘাঁটি থেকেই উড়েছিল। এবং আকাশে তাদের জ্বালানি সরবরাহ করেছিল ওই ঘাঁটিরই আরও দুটি বিমান। শুধু তাই নয়, এফ১৬ দুটির একটি চালাচ্ছিলেন রুশ বিমান ভূপাতিত করা সেই পাইলট। তুরস্কের অভিযোগ, মার্কিন ওই সামরিক ঘাঁটির উচ্চ প্রযুক্তির যোগাযোগব্যবস্থা দিয়েই অভ্যুত্থানকারীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতেন। প্রতিক্রিয়ায় তুরস্ক ওই বিদ্রোহী পাইলটকে আটক করে এবং মার্কিন সেনাঘাঁটির বিদ্যুৎ–সংযোগ ও গোয়েন্দা যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারী হিসেবে ফেতুল্লা গুলেনকে তুরস্কের হাতে তুলে দেওয়া অথবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলা মানে সম্পর্কের মাঝে লাল দাগ টেনে দেওয়া।

ওবামার ওপর এরদোয়ানের ক্ষোভের কারণ যথেষ্ট। ওবামা প্রশাসনই একেপি সরকারকে সিরিয়ায় টেনে নিয়েছে বাশারকে উচ্ছেদের নিশ্চয়তা দিয়ে। সিআইএ–প্রধান ডেভিড পেট্রাউস কয়েকবার তুরস্ক সফর করে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের চাপ দেন। কিন্তু বাশার টিকে থাকছেন রুশ সহযোগিতায় কিন্তু তুরস্ক একদিকে কুর্দি বিদ্রোহী অন্যদিকে সিরীয় উদ্বাস্তুর ভার আর জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্ত। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে স্বাধীন কুর্দিস্তানের হুমকি। এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক সিরিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করায় পদক্ষেপ নিল।

অভ্যুত্থানের চেষ্টাটা হলো তখনই। বেছে নেওয়া সময়টা তাই বিশেষ ইঙ্গিতবহ। ইরানের ফার্স ও রাশিয়ার স্পুটনিক সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের কথা রাশিয়া আগাম জানিয়েছিল এরদোয়ানকে। অভ্যুত্থান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার আগেই রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি ফোন করে এরদোয়ানকে দৃঢ় সমর্থন জানান। ওয়াশিংটন ও ইউরোপ তখনো মুখ খোলার জন্য সময় নিচ্ছিল। বিপদের দিনে কীভাবে বন্ধু চিনতে হয়, এরদোয়ান নিশ্চয়ই সেটা এখন শিখছেন।

দুই.
একসময় বলা হতো, কনস্টান্টিনোপলে যাঁর দখল থাকবে, তিনিই হবেন মধ্য এশিয়ার শাসক। পনেরো শতকে সুলতান মেহমেত কনস্টান্টিনোপল দখল করে যে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত করেন, আজকের এরদোয়ান তারই ধারাবাহিকতা। সেই কনস্টান্টিনোপলই এখনকার ইস্তাম্বুল এবং এখান থেকেই উসমানিয়া সুলতানেরা বিরাট সাম্রাজ্য চালাতেন। তুরস্কের সুবিধা হলো তা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার সেতু। যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্ককে দরকার কয়েকটি কারণে: . কাতার থেকে ইউরোপ পর্যন্ত জ্বালানির পাইপলাইন টানতে এবং ২. কৃষ্ণসাগরে (এবং ভূমধ্যসাগর) ন্যাটোর স্থায়ী নৌঘাঁটি বসিয়ে ওই সমুদ্রে রাশিয়ার ঐতিহাসিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে। এটা দিতে পারে তুরস্ক। ১৯৩৬ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসারে, কৃষ্ণসাগর তীরের দেশ ছাড়া অন্য কারও স্থায়ী অবস্থান সেখানে নিষিদ্ধ। ওই চুক্তি বসফরাস প্রণালি ও দারদানেলেস প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের হাতে দিয়েছে।

আগামী মাসের গোড়াতেই পুতিন ও এরদোয়ান মুখোমুখি বসবেন। ইরানের সঙ্গে তুরস্কের যোগাযোগও বাড়ছে। ইতিমধ্যে আলেপ্পো থেকে তুর্কি গোয়েন্দাদের সরে আসার নির্দেশ বোঝায় যে বাশারবিরোধীদের সঙ্গ ছাড়া শুরু করেছে তুরস্ক। এসব ঘটনায় সিরীয় ফ্রন্টে আমেরিকার সুযোগ কমে গেল। আজকের যুগে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার যুদ্ধের অপর পিঠে থাকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার যুদ্ধ। অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে এরদোয়ান বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু যদি সত্যি সত্যিই, রাশিয়ার নেতৃত্বে তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া+হিজবুল্লাহ মিলে কোনো মৈত্রী গড়ে উঠলে কী হবে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া, তা একটা প্রশ্ন। এদিকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলেও চীন বনাম পাশ্চাত্য শক্তির উত্তেজনা বাড়ছে।

যুদ্ধ ও রাজনীতি মতবাদ, আদর্শ বা ধর্ম দিয়ে হয় না। তা হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বার্থের মিল বা অমিলের ভিত্তিতে। তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও ইরানের স্বার্থ মিললে, এরদোয়ান আরও শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক খেলায় ঢুকবেন। দেশেবিদেশি নতুন মিত্র পেলেও, অভ্যুত্থানপন্থীদের যে কঠোরতা দেখাচ্ছেন, তা তাঁর একিলিস হিল তথা নাজুক গোড়ালি হয়েই থাকবে।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো
, জুলাই ২৭, ২০১৬

fisk on turkey coup

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: