প্রথম পাতা > ইতিহাস, জীবনী, বাংলাদেশ > বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেখ মুজিব-কে স্মরণ -১

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেখ মুজিব-কে স্মরণ -১

তিনি ছিলেন জনগণের বন্ধু

national condolence day 1বাহালুল মজনুন চুন্নু : তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। তখন আমি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে ফরিদপুর হয়ে গোপালগঞ্জে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে ফরিদপুরের সিএন্ডবি বাংলোতে সংক্ষিপ্ত বিরতি নেন তিনি। আমরা ফরিদপুরের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম সেদিন। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মনোরঞ্জন সাহা এবং সাধারণ সম্পাদক ফকির আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আমরা তাঁর সঙ্গে দেখা করি। আমরা তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম ফরিদপুর স্টেশন রোডে ছাত্রলীগের নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করার জন্য। তিনি সানন্দে রাজি হন। যদিও তাঁর গোপালগঞ্জে যাওয়ার প্রচণ্ড তাড়না ছিল, তবু তিনি আমাদেরকে বিমুখ করেননি। তিনি তখনো বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি, তিনি তখন ছিলেন সকলের কাছে মুজিব ভাই। আমি নিজে রিকশায় বসে মাইকে সারা শহরে নেতার আগমন এবং ভাষণের কথা ঘোষণা করেছিলাম। ঘোষণার পরপরই জনসমুদ্রে পরিণত হয়ে যায় স্টেশন রোড। যার যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই ছিল না কেন, সেসব ফেলে সবাই ছুটে এসেছিল নেতার বক্তব্য শুনতে। তিনি মাত্র দুতিন মিনিট বক্তব্য দিলেন। বক্তব্য শেষে তিনি কবি জসীম উদ্দিনের কবিতার দুুই ছত্র আবৃত্তি করলেন, ‘আমার ঘর ভাঙিয়াছে যেবা,আমি বাঁধি তার ঘর/ আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

এরপর তিনি জয় বাংলা বলে তাঁর গাড়িতে উঠে যান। মাত্র দুতিন মিনিটের বক্তব্য; কিন্তু তাতেই জনসমুদ্র বিমোহিত, উজ্জীবিত হয়ে পড়েছিল। সেই বক্তব্যে তিনি বাংলার দুঃখী নিপীড়িত মানুষকে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার শক্তি জুগিয়েছিলেন। এবং অত্যন্ত চমত্কারভাবেই। যে ব্যক্তি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য ফাঁসির মঞ্চেও উঠতে দ্বিধা করেননি মুহূর্তমাত্র, সেই তাঁর পক্ষেই কেবল এটা সম্ভব হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যতবারই পেয়েছি, ততবারই তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশালতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। দেশপ্রেমের গভীরতা দেখে উজ্জীবিত হয়েছি। তিনি কেবল বিপ্লবী নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী এক নেতা, দার্শনিক এবং একজন দক্ষ পরিচালকও। স্বাধীনতার পর আমরা ছাত্রলীগের বর্ধিত সভা শেষ করে পুরাতন গণভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বিভিন্ন জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের তিনি ডেকেছিলেন তাঁর বাসভবনে। তিনি আমাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। আমি যখন আমার পরিচয় দিয়েছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ও তুই ফরিদপুরের সভাপতি।চারটি মাত্র শব্দ কিন্তু এর মধ্যে এত আন্তরিকতা মেশানো ছিল যে, আমার তখন নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিল। তিনি আমাদের সামনে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চিত্র তুলে ধরে আমাদের করণীয় সর্ম্পকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে আমি তাঁর দার্শনিক সত্তাটিকে খুঁজে পেয়েছিলাম। অত্যন্ত গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা না থাকলে, অত্যন্ত বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন না হলে এত কার্যকরী নির্দেশনা দেওয়া সম্ভবপর নয়। তিনি তাই ছিলেন। তিনি সমগ্র দেশ ও জাতি এমনকি বিশ্ব নিয়ে এমন ভাবনা চিন্তার অধিকারী ছিলেন যে, তা কেবল কোনো দার্শনিকের পক্ষেই সম্ভব। তাঁর চিন্তায় স্বচ্ছতা ছিল এবং তা ছিল অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষিত। তিনি ছিলেন মনে প্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি। আর সবগুণ মিশে তিনি হয়ে উঠেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

mujib-1 -artবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এমনই এক ব্যক্তিত্ব যে; তাঁর তীব্র দৃষ্টি, আন্তরিক কণ্ঠ এবং রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারত না। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, নিপীড়িতদুঃখী জনতার সাথি। পূর্ব বাংলার মানুষের মঙ্গল কামনার ব্রত নিয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল দীর্ঘ কণ্টকার্কীণ শ্বাপদসঙ্কুল পথ। তিনি কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নন, তিনি বাঙালির অন্তর্নিহিত দুঃখবেদনার ফল হিসেবে নিজেকে তাদের আলোকবর্তিকা হাতে মুক্তির বার্তাবাহক নেতায় পরিণত করেছিলেন। ছাত্ররাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিবিদে পরিণত হয়ে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন। তিনি আত্মবিশ্বাসহীন ও দীর্ঘকাল বঞ্চিতলাঞ্চিত, শোষিত জনগণের মধ্যে প্রদীপ শিখা জ্বালিয়েছিলেন। তিনি দুর্দশামাখা নির্বাক কণ্ঠগুলোকে ভাষা দিয়েছেন, তাদেরকে উজ্জীবিত করেছিলেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। আর তা করতে পেরেছিলেন দুর্দান্ত সাহসী ছিলেন বলেই। মৃত্যুভয়ও তাঁর কাছে ছিল পরাজিত।

বঙ্গবন্ধুর বন্ধু ব্যারিস্টার কাজী আহমেদ কামাল তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব এমন একজন ব্যক্তি, যাঁকে ভয় ছুঁতে পারে না। যদি এক শব্দে শেখ মুজিবকে প্রকাশ করতে হয়, বেছে নিতে হবেসাহসীশব্দটি।তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারগারের বিষণ্ননিষিদ্ধ চারদেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকলেও তিনি তাঁর জীবন, তাঁর ভবিষ্যত্ বা তাঁর পরিবার নিয়ে চিন্তা করেননি। তিনি শুধু দেশ ও দেশের জনগণের জন্য চিন্তা করে গেছেন। তিনি যেন একটা লক্ষ্য নিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন। লক্ষ্যটা হলো গতকালের অন্ধকারকে আগামীকালের আলোতে পরিণত করা। তাঁর জীবন একটা মূলমন্ত্রের ওপর বিন্যস্ত। আর তা হলো জনগণের কল্যাণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখাঅসমাপ্ত আত্মজীবনীপড়লেই বোঝা যায়, তিনি আসলে কেমন ছিলেন। তিনি তাঁরঅসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালির সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উত্স ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।মানুুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ তা এই কয়টি ছত্রেই ফুটে ওঠে।

বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়ায় তিনি আরোহন করলেও কখনই অহংকারী ছিলেন না, বিনম্রতা আর বন্ধুবাত্সল্যের মধ্যে দিয়ে আপামর জনগণকে নিয়েছিলেন আপন করে। সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়েও তিনি নিজে যেমন অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করতেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকেও সেভাবে পরিচালিত করেছিলেন। এক্ষেত্রে জাতির মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথাও বলা যায়। তিনিও স্বামীর মতো অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেই অভ্যস্ত ছিলেন। এবং তারা দুজনে তাঁদের সন্তানদের তাদের মতোই মানবিক, পরিশ্রমী, ত্যাগী, দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালনে কখনই পিছপা হননি। আবার তাই বলে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশমাতৃকার কথা, দেশের মানুষের কথা বিন্দুমুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি। তিনি সবকিছুই সামাল দিতেন সমান তালে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে, যা কেবল একজন মহামানবের পক্ষেই সম্ভব।

mujib lying deadঅথচ সেই মহামানবের প্রাণবায়ুকে আঠারোটি বুলেট রুদ্ধ করে দিয়েছিল পনের আগস্টের কালো রাতে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের খবরে পৃথিবীবাসী শোকে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিল। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে, সাহসিকতায় এই মানবই হিমালয়। আর এভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা এ মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ভাষায় বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেনঐশ্বরিক আগুনএবং তিনি নিজেই সে আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল ২ মে, ১৯৭১। তার কিছু অংশ হলো এমন, ‘মার্চে শাসনতান্ত্রিক এই সংকট যখন সৃষ্টি হয় তখন শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সাধারণ বাঙালির কাছে তাঁর কাপড় স্পর্শ করা ছিল তাবিজে শুভ ফল পাওয়ার মতো। তাঁর বাক্যই হয়ে উঠেছিল আইন। ধানমন্ডিতে তাঁর বাসা থেকে তিনি সব করছিলেন, সবার সঙ্গেই ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তাঁর কাছে যাওয়ায় কোনো বাধা ছিল না। সম্পদ বা পদমর্যাদার দিকে তাঁর কোনো নজর ছিল না, সম্পূর্ণভাবে আন্তরিক ছিলেন জনগণের প্রতি। প্রতিটি বাঙালি, তিনি যত তুচ্ছ বা গরিবই হোন না কেন, তিনি তাকে মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দিয়েই বিবেচনা করতেন, সাহায্য করতেন।

তিনি বাঙালিদের প্রচণ্ড বিশ্বাস করতেন। তাঁকে যখন ষড়যন্ত্রের কথা বলা হতো, তিনি বলতেন, ‘সবাই আমার সন্তান, কেউ আমাকে মারবে না।এরকমই ছিল বাঙালির প্রতি তাঁর ভালোবাসা, বিশ্বাস।

নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট তখন বলেছিলেন, ‘মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।ভারতীয় বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ শ্রী চৌধুরী বাঙালিদেরবিশ্বাসঘাতকহিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।এতে কেবল জাতির পিতাই স্তব্ধ হয়ে যাননি, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এদেশের অগ্রযাত্রা। গভীর গিরিগাতের অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল দেশের মানুষ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আর্দশই বাংলাদেশকে সেই অন্ধকার থেকে আবার আলোতে নিয়ে এসেছে। তাঁর আদর্শের নেতৃত্বেই আজ সমগ্রজাতি বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে বুকে লালন করে এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখ পানে।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ আগষ্ট, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: