প্রথম পাতা > ইতিহাস, ইসলাম, জীবনী, বাংলাদেশ > বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেখ মুজিব-কে স্মরণ -৭

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেখ মুজিব-কে স্মরণ -৭

ইসলামের প্রচার ও প্রসারে বঙ্গবন্ধু

mujib readingমোহাম্মদ আবু নোমান স্বাধীনসার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি বঙ্গবন্ধু, যিনি বাঙালি জাতির জনক। বঙ্গবন্ধুর সব উপাধি বাঙালির হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার প্রকাশ। ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে উৎসাহী করাসহ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় কর্মকান্ডকে যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করার জন্য বঙ্গবন্ধু অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্ন রেখে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদান দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বঙ্গবন্ধু ইসলাম ধর্মের যথাযথ স্থান সঠিকভাবে নির্ধারণের ব্যাপারে খুবই যত্নবান ছিলেন। তিনি ইসলামী আদর্শ, ঈমান, আকিদা, তাওহিদ, রিসালাত, ইসলামী তাহযিবতমদ্দুন সুন্নত তরিকা সমুন্নত রাখতে সদা তৎপর ছিলেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিতইসলাম বঙ্গবন্ধুগ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ দরবেশ শেখ আউয়াল হযরত বায়জীদ বোস্তামি (রহ.)-এর সঙ্গী হিসেবে বাগদাদ থেকে বঙ্গে আগমন করেছিলেন। পরবর্তীতে তারই উত্তর পূরুষরা বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম বংশধর। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন সুফি চরিত্রের অধিকারী, ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইসলামের প্রচার প্রসারের অন্যতম একজন ধারক।বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের স্বল্পকালীন শাসনামলে স্বাধীনসার্বভৌম বাংলাদেশের জনমানসে ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার প্রসারে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি ইসলামের সঠিক রূপ সমাজ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি মূল্যবোধের কথা মনে রেখে তিনি ইসলামের প্রচারপ্রসারে বাস্তবভিত্তিক কার্যকর নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় আসার পর একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন, সাথে সাথে শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রচার প্রসারের নিমিত্তে হক্কানী আলেমদের সম্পৃক্ত করার জন্য এক অর্ডিন্যান্স বলেইসলামিক ফাউন্ডেশনগঠন করেন। ইসলামের উদার মানবতাবাদী চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ছিল জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী চিন্তারই এক অমিত সম্ভাবনাময় স্বর্ণ ফসল। শুধু তাই নয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামিক প্রকাশনা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইসলামী মূল্যবোধ কর্মপদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণার আয়োজন করা তা প্রসার ঘটানো এবং জনপ্রিয় ইসলামী সাহিত্য সুলভে প্রকাশ করা এবং সেগুলোর প্রকাশনা বিলিবণ্টনকে অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। ইসলাম ইসলামের বিষয় সম্পর্কিত বইপুস্তক, সাময়িকী প্রচার পুস্তিকা অনুবাদ, সংকলন, বিতর্ক সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন সরকারি অর্থে পরিচালিত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ সংস্থা হিসেবে নন্দিত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেশেরইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্টবঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে শেখ হাসিনার নিজের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সরকারই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, যাতে আলেমওলামার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মসজিদভিত্তিক শিশু গণশিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত মাদ্রাসা বোর্ড গঠন করে শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তাসহ যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করেন। ইসলামী আকিদাভিত্তিক জীবন গঠন ও ইসলামী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পুনর্গঠন ছিল এক মহাবিপ্লব।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিওর অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন শরিফের আওয়াজ শুনতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার নির্দেশেই বেতার ও টিভিতে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদার সাথে কোরআন তিলাওয়াত ও তাফসির প্রচার শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত এ ব্যবস্থা আজও চালু রয়েছে।

বর্তমানের কাকরাইলের মসজিদটি ছিল খুবই অপ্রশস্ত। বঙ্গবন্ধু কাকরাইলের তাবলীগ জামাতের মারকাজ মসজিদের জন্য স্থান বরাদ্দ করেন এবং মসজিদটি তারই নির্দেশে সম্প্রসারিত হয়। তাবলীগ জামাত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনটি যাতে অবাধে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এ উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গীতে সুবিশাল জায়গা বরাদ্দ করেন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি কমিউনিস্ট দেশ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করায় বঙ্গবন্ধুর সাথে সে দেশের নেতৃবৃন্দের একটি সুদৃঢ় বন্ধুত্বের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পর প্রথম রাশিয়ায় তাবলীগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা করে রাশিয়ায় তাবলীগ জামাতের দাওয়াতি কার্যক্রমের ভিত্তি রচনা করেন।

বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে প্রথম হজযাত্রীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করেন এবং তিনি হজযাত্রীদের ভ্রমণ কর রহিত করেন। তার দিকনির্দেশনা পৃষ্ঠপোষকতায় রবিউল আউয়াল মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বৃহত্তর আঙ্গিকে ঈদেমিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। একজন সরকার প্রধান হিসেবে জাতীয়ভাবে বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বরে ঈদেমিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিলের উদ্বোধন উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম দৃষ্টান্ত। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আজও জাতীয়ভাবে ঈদেমিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল উদযাপন করে আসছে। ইসলামের ধর্মীয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুই প্রথম ঈদেমিলাদুন্নবী (সা.), শবেকদর, শবেবরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা পবিত্রতা রক্ষার জন্য সিনেমা হলে চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন। ইসলামের নামে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পাকিস্তান আমলে অবাধে মদ, জুয়া, হাউজি অসামাজিক কার্যকলাপ চলত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুই প্রথম আইন করে মদ, জুয়া, হাউজি অসামাজিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে শাস্তির বিধান জারি করেন।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাউত্তর তার শাসনকালেই বলেছিলেন, ‘আমি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলি, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মবিরোধিতা নয়। আমি মুসলমান, আমি ইসলামকে ভালোবাসি।১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি একজন মুসলমান এবং মুসলমান একবারই মাত্র মরে, দুবার নয়। আমি মানুষ। আমি মনুষ্যত্বকে ভালোবাসি। আমি আমার জাতির নেতা। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি।

পাকিস্তান আমলে ঢাকার বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। সেখানে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার নামে জুয়া, হাউজি বাজিধরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে অনেক মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যেত। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা বন্ধ করেন এবং রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করেসোহরাওয়ার্দী উদ্যানরাখেন। রাসূল (সা.) বৃক্ষরোপণের প্রতি জোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘যদি মনে কর আগামীকাল কিয়ামত হবে তবুও আজ একটি বৃক্ষের চারা রোপণ কর রেসকোর্স ময়দানের অনৈসলামিক কর্মকান্ডের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে বৃক্ষরোপণ করেন।

শান্তি, কল্যাণ মানবতার ধর্ম ইসলামের অপব্যাখ্যা করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসক গোষ্ঠী। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র মানুষ হত্যাসহ নির্বিচারে নির্যাতন চালায়। অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। লুট করে মানুষের সহায়সম্পদ। অথচ এসবই ছিল ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম অবৈধ। ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তারা যেসব ঘৃণ্য অপকর্ম সংঘটিত করে তা পবিত্র ইসলামের শুভ্র ললাটে কালিমা লেপন করে দেয়। এই কালিমালিপ্ত ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই জাতির জনক ইসলাম প্রচারপ্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু একদা বলেছিলেন, ‘ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণবঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে

বঙ্গবন্ধু ধর্মান্ধতাকে ঘৃণা করতেন। সব ধর্মের সহাবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। ১৯৭২ জাতীয় সংসদের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যভিচার।

বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের, যার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আমলেই মাধ্যমিক পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আলেমওলামাদের বহু বছরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে একটি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আরব বিশ্ব, বিশেষ করে প্যালেস্টাইনি ভাইদের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন অব্যাহত রাখেন। আরব দেশগুলোর চাপেই ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এটা ছিল আরব বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির এক বিরাট সফলতা। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে প্যালেস্টাইনি আরব ভাইদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ সারা আরব বিশ্বে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি করে। ইসলামের প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এসব অবদান এদেশের প্রতিটি সচেতন মুসলিমের মনে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

abunoman72@ymail.com

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১৫ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: