প্রথম পাতা > জীবনী, নারী, বাংলাদেশ, সমাজ, সাহিত্য > ‘সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত’ – গুলকেতিন

‘সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত’ – গুলকেতিন

gultekin-6আতিক রহমান পূর্ণিয়া : বিচ্ছেদের পরও কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের নামের সাথে কোনো না কোনোভাবে এখনো আলোচনায় আসে গুলতেকিনের নাম। হুমায়ূন নিজেই তার বিভিন্ন লেখায় অমর করে রেখে গেছেন প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনকে। হুমায়ূন আহমেদের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পে তিনি যেন এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

গুলতেকিন খান থেকে গুলতেকিন আহমেদ। আবার গুলতেকিন খানে প্রত্যাবর্তন। জীবনের গল্প এর মধ্যে গড়িয়েছে অনেক দূর। শব্দ আর সেলুলয়েডে গল্প বলা মোহনকথকের পাশে আধাজীবন কাটানো এই মানুষটার গল্প কেমন? তা জানতেই তার সাক্ষাৎকারের জন্য এই প্রতিবেদকের প্রায় ৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। শেষতক গুলতেকিন খান পরিবর্তন ডটকমের কাছে উজাড় করলেন তার অনেক অব্যক্ত কথা। একই সঙ্গে জানালেন গত এক যুগে এটাই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার।

আপনার ছোটবেলার কথা শুনতে চাই।

আমার জন্ম ধানমন্ডির দখিন হাওয়া নামের বাড়িতে। আমার বোন আর মা আমি বড় হবার পর বলতেন, আমার জন্মের দিন ছিল আষাঢ় মাসে। বিকালবেলা। সেদিন আকাশ খুব মেঘলা ছিল। ছোটবেলায় কখনও হাসতাম না। সবাই বলতো মেঘলা দিনে জন্ম বলেই আমার মুখ সবসময় মেঘলা হয়ে থাকতো। বড় হতে হতেও মুখে খুব হাসি ছিল না। মনে হতো এত হেসে কী হবে? আমার মুখটাই মেঘলা। জীবনে প্রথম খুব মন খুলে হেসেছি ইউএসএ গিয়ে। আগে মনে হতো এতো হাসার দরকার কী?

আপনার জীবনে কার প্রভাব বেশি?

আমার দাদা ইব্রাহীম খান (প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ)। দাদাদাদু খুব আদর করতেন। তারা সবাই সাহিত্য চর্চা করতেন। লিখতেন। চমৎকার একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। দখিন হাওয়া সুন্দর একটা বাড়ি ছিল। সারা বাড়িতে বিভিন্ন ফলের গাছ। মায়ের শখ ছিল ফুলের বাগান করার। আমি আমার মায়ের গুণগুলো পেয়েছি।

শহীদুল্লাহ হলে থাকার সময়, ইউএসএতেও ফুলের বাগান করেছি। প্রতিদিন গান শুনি। বাবার চেয়ে মায়ের সাথে ক্লোজ ছিলাম।

আমার বেড়ে ওঠার পেছনে আমার মাবাবার অবদান অনেক। প্রথমে মা’র কথা বলতে হলে বলা যায়, মা আমার জীবনে স্বাধীনভাবে চলার অনুপ্রেরণা। আমি তাকে কখনো দেখিনি ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কারো সাথে আলাপ করতে, বা কারো অগোচরে তাকে নিয়ে কথা বলতে।

আর আমার বাবা বাসায় সবসময় রিডার্স ডাইজেস্ট আর টাইমস পত্রিকা রাখতেন। আমি স্কুল শুরুর আগেই এই দুটো থেকে ছবি দেখতাম। পরে পড়তে শিখলাম। বাবাই আমাকে প্রথম পড়তে উৎসাহ দেন। তিনি খুবই বন্ধুসুলভ ছিলেন।

আমার জীবনে দাদার ইনফ্লুয়েন্স বেশি। অনেক পরে বুঝেছি যে অজান্তেই মায়ের প্রভাব পেয়েছি। আমার বিয়ের সময় মা সব থেকে বেশি কান্নাকাটি করেছেন। কাঁদতেন আর বলতেন, আমার আর পড়াশুনা হবে না। ’৭৬ এর মার্চের ১৪ তারিখ এসএসসি পরীক্ষা দিলাম আর ২৮ তারিখ বিয়ে। শুধু মায়ের জন্য ৮/৯ বছর বিরতি দিয়েও পরে পড়াশুনায় ফিরে এসেছিলাম।

পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

এসএসসি আজিমপুর গার্লসএ। এইচএসসিতে হলিক্রসে পড়তাম। পরীক্ষার ৩ মাস আগে আমার বাচ্চাদের বাবা (হুমায়ূন আহমেদ) আমাকে জোর করে ইউএসএ নিয়ে গেল। পরীক্ষা দেওয়া হল না। আমি যেতে চাইনি। শেষে আমার দাদাকে চিঠি লিখে আমাকে যেতে বাধ্য করল। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। মেডিকেলে পড়তে পারলাম না। এক সময় আমার সাবেক স্বামীর ছোট ভাই, মানে আহসান হাবীবের বিয়ের পর সংসার বড় হল। এক বাসায় হয় না। শাশুড়ি থেকে আলাদা হলাম। তখন আমি বললাম, এইচএসসি দেব। মোহনগঞ্জ (হুমায়ূন আহমেদের নানা বাড়ি) গিয়ে মাত্র সাতদিনের মধ্যে সব ফরমালিটি শেষ করে পরীক্ষা দিয়েছি। মাহবুব মামা ( হুমায়ূন আহমদের মামা) যে কলেজে ছিলেন সেখানে ব্যবস্থা করলেন।

এইচএসসি শেষে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাইলাম। আমার সাবেক স্বামী বললেন তোমাকে ইডেনে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি। আমার খুব মন খারাপ হল। বললেন মেডিকেল তো পারছোই না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও না।

একদিন আমার বড় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তার (মেয়ের) এক বান্ধবীর মা’র কাছ থেকে জানলাম যে লং গ্যাপ থাকলেও তখন আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ আছে। তিনি হেল্প করতে চাইলেন। আমি আমার সাবেক স্বামীকে জানালাম। তিনি বললেন কোনো হেল্প করতে পারবেন না। আমি খুব ছুটাছুটি করে কষ্ট করে ভর্তি ফরম আনলাম।

তখন পরিবারের একজন খুব অসুস্থ। সবাই হাসপাতালে ছুটাছুটিতে ব্যস্ত। একদিন সকালে হাসপাতালে খাবারদাবার পাঠিয়ে পত্রিকা নিয়ে বসেছি। দেখি লিখাআজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। হুট করে ভাবলাম, যাই পরীক্ষাটা দিয়ে আসি। ততদিনে আমাদের গাড়ি কেনা হয়েছে।

সূত্রঃ পরিবর্তন, ২০ জুলাই ২০১৬

স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে যা বললেন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন

gultekin & nuhasহুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখছেন তার সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খান। সম্প্রতি নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের একটি বাড়িতে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন জনপ্রিয় উপন্যাসিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের সাবেক/তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী।

গুলতেকিন জানিয়েছেন, এরই মধ্যে তিনি স্মৃতিকথার অর্ধেক লিখেও ফেলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হুমায়ূনকে নিয়ে স্মৃতিকথামূলক একটি বই লিখছি। প্রায় অর্ধেক লিখে ফেলেছি। লেখার কাজ শেষ হলেই তা বই আকারে বের হবে।’

গুলতেকিন তার নিজের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আজো কেউ হাঁটে অবিরাম’— যেটি গত বছর একুশের বইমেলায় প্রকাশ হয়েছিল— সেটি সম্পর্কেও বলেন। তিনি নিজের আত্মপরিচয় সম্পর্কেও কথা বলেন।

গুলতেকিন বলেন, ‘একজন জনপ্রিয় লেখকের স্ত্রী ছিলাম, এই পরিচয়টা কখনো আমাকে উৎসাহিত করেনি। আমি কখন তার জনপ্রিয়তার সুযোগ নেইনি। বিশেষ করে আমি সব সময় নিজের দাদা প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খাঁর নাতনি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতাম।’

এ বছর একুশের বইমেলায় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আজো কেউ হাঁটে অবিরাম’ প্রকাশিত হয়। অনেক দিন ধরে বন্ধ এক লৌহ কপাট যেন খুলে গেল এবং বেরিয়ে এলো এক পশলা কোমল আলো।

গুলতেকিন বলেন, নিজেকে আড়াল করে রাখতেই সচেষ্ট ছিলাম। যখন হুমায়ুন আহমেদের স্ত্রী ছিলাম, তখনও আমি তাঁর (হুমায়ুন আহমেদের) স্ত্রী বলে পরিচয় দিইনি। তাঁর জনপ্রিয়তার সুযোগ কখনও নিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বা পরবর্তীতে নিজের কর্মস্থলে (স্কলাসটিকা স্কুলে) যতদিন পেরেছি নিজের স্বামীর পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করেছি। একটা সময় তা পেরে ওঠা যায়নি।

প্রশ্ন ছিল, হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর আগে (অসুস্থ থাকার সময়ে) আপনি কি তাঁর সঙ্গে করার চেষ্টা করেছিলেন? তিনি জানান, চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদকে যেন বন্দি করে রাখা হয়েছিল। হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করাটা ছিল দুরূহ কাজ। তিনি বলেন, মাঝেমাঝে আমাদের কথা হতো। কারণ, হুমায়ুন আহমেদ আমার সন্তানদের পিতা ছিলেন। এ কারণেই কথা হতো। তবে সবসময় একটা দেয়াল যেন ছিল তাঁর চারপাশে। এ প্রসঙ্গে আর বেশি কিছু কথা বলেননি তিনি।

কবি হলেন কীভাবে? গুলতেকিন খান বলেন, ক্লাশ সেভেনে পড়ার সময় থেকে ছড়া লিখতাম। বিয়ের পর লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে সংসারী হয়ে যাই। ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি ছড়া লিখতাম। তবে আমার ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল। নিয়মিত ডায়েরি লিখতাম। ডায়েরি লেখা বিষণ্নতা নিরসনের ভাল থেরাপি। তিনি বলেন, ২০০৩ সালে ছোটবেলার ছড়ার খাতাটা হঠাৎ খুঁজে পাই। তখন লেখালেখির বিষয়টা পুনরায় মাথায় আসে। তবে সত্যজিৎ রায়ের মত ছড়াকার হতে পারব না ভেবে ছড়া লেখার দিকে না ঝুঁকে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। একটা সময় কবিতার বইও পড়তাম। ২০১৩ সাল থেকে কবিতা লিখতে শুরু করি। কবিতা বন্ধুদের শোনাই, ফেসবুকে পোস্ট করি। এতে ব্যাপক সাড়া পাই। আড়াই বছর পর দেখি ৩৫টি কবিতা হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, নিজের ভাল লাগার জন্য আমি কবিতা লিখি। কবির স্বীকৃতি পাবো বা কিছু পাবো, এই ভাবনা আমার নেই। আত্মতৃপ্তির জন্য কবিতা লিখি। গত বছর তাম্রলিপি প্রকাশনী আমার কবিতার বইটি প্রকাশ করে। বইটির বিক্রিও ভাল হয়েছে। এটি ছিল জাফর ইকবালের বইয়ের পর দ্বিতীয় বেস্ট সেলার বই।

কাউকে ভেবে বা কারো জন্য আনন্দ বা কষ্ট পেয়ে কোন কবিতা লিখেছেন কি? এর জবাবে তিনি বলেন, কাউকে ভেবে কবিতা লিখিনি। তবে বনানীতে একবার ১১ বছরের একটি শিশু ক্রিকেট খেলার সময় মাথায় বলের আঘাত পেয়ে মারা গিয়েছিল। তাকে উদ্দেশ্যে করে একটি কবিতা লিখি। এ ছাড়া আমার ছোট মেয়ে যখন পুত্র সন্তানের মা হয়, তখন আমি ওই আনন্দে একটি কবিতা লিখেছিলাম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে কবিতার পাঠক খুব কম। তিনি আরো জানান, নিজেকে কবি ভাবেন না। কবি ভাবার স্পর্ধা তাঁর নেই। কবিতার বইয়ের নাম ‘আজো কেউ হাঁটে অবিরাম’ কেন রেখেছেন? এর জবাবে বলেন, আসলে আমি বইটির নাম রেখেছিলাম, ‘দিকভ্রান্ত জলপরী’। নামটি শোনার পর আমার বড় মেয়ে নোভা বলল, মা, তোমাকে সবসময় দেখেছি বিভ্রান্ত না হয়ে, ভেঙে না পড়ে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজে পথ চলেছো। এই নামটি নিয়ে পাঠকদের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে। ওর কথাটা ভাল লাগে। পরে নাম রাখি ‘আজো কেউ হাঁটে অবিরাম’। ছোটবেলায় তিনি কী হতে চেয়েছিলেন প্রশ্নের জবাবে জানান, তাঁর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন। হতে পারেননি। হয়েছেন শিক্ষক।

ছেলে নুহাশ কী হতে চায়? এই প্রশ্নে জানিয়েছেন, নুহাশ চলচ্চিত্র বানাতে চায়। নুহাশের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং ছেলের পাশে থাকছেন। তাঁর কথা, সন্তানরা যাই করতে চায়, করুক। তাদের স্বাধীনতায় কোন হস্তক্ষেপ করতে চান না।

সূত্রঃ সংবাদ২৪ ডট নেট, ১০ জুন, ২০১৬

হুমায়ুননামাঃ পরাজিত এক গুলতেকিন শাওন

ফাহরিয়া ফেরদৌস : হুমায়ূন আহমেদ নির্দিধায় একজন গুনি মানুষ। ওনার অনেক বই পড়েছি পড়ার বইয়ের মাঝে লুকিয়ে। অসাধারণ ক্ষমতা তার মানুষকে মুগ্ধ করার। তার বই, নাটক, সিনেমা, গান সবই ভালো লাগে আমার। কোথাও কেও নেই থেকে শুরু করে ঘেটুপুত্র কমলা সবই দেখেছি। অনেক সাধারন ভাবে অনেক জটিল বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন। লেখক, নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ কে নিয়ে বলার কিছু নেই, তিনি অসাধারণ। কিন্তু ব্যাক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বলার আছে।

gultekin-5নাটক যখন টিভিতে দেখাতো তখন শাওন ও শিলা দু’জনের অভিনয়ই এতো ভালো লাগতো যে, কে বেশী প্রিয় হিসেব করাটা কঠিন ছিল। কিন্তু যখন থেকেই একটু একটু শুনতে পেলাম যে হুমায়ূন আহমেদ ও শাওনের মাঝে কোন সম্পর্ক আছে, তখন শিলার জন্য খুব খারাপ লাগতো। তখনও গুলতেকিন এবং শাওন বিষয়টি মাথায় আসেনি। যখন হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করলেন শাওনকে তখন আমি ও ভালোবাসা কি বুঝে গেছি, তাই খারাপ লাগাটা ছিলো কেবলই গুলতেকিনের জন্য। আমি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খান আলাদা হয়ে গেছেন। কারন হুমায়ূন আহমেদের যত বই পড়েছিলাম তার মাঝে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল তার লিখা বই “হোটেল গ্রোভার ইন”, যেখানে তিনি লিখেছিলেন গুলতেকিন খানের সাথে ব্যাক্তিগত জীবন তথা প্রেম ও ভালোবাসা নিয়ে । আমার কাছে মন হতো আমার প্রেমটি ও হবে হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খানের মত। তাই তাদের বিচ্ছেদ হজম করতে আমার খুব সমস্যা হয়েছিলো। হুমায়ূন আহমেদ ও শাওনের প্রতি ছিল তীব্র অভিমান।

কেও কিন্তু কখনো হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে বলতে সাহস পাননি তিনি জিবীত থাকা অবস্থায়। শুধু পুরুষ সে কারনেই নয় বরং হুমায়ূন আহমেদের উপর নির্ভর করতো অনেকের আয় ও ক্যারিয়ার। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা হুমায়ূন আহমেদের সাথে কাজ করা শুরু করেছিলেন গুলতেকিন খানের সময় থেকে। তাদের মাঝ থেকে আজও যারা এখনো পর্যন্ত যারা শাওনের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন তারা শাওনের জন্য নয় বরং উত্তরাধিকার সূত্রে হুমায়ূন আহমেদের নামটি শাওনের সাথে জুড়ে থাকার জন্যে।

সবুরে মেওয়া ফলে, এ কথাটি যেমন ঠিক; তেমনি সবুরে যে মেওয়া পচে ও যায় তার প্রমাণ হল গুলতেকিন খানের ইন্টারভিউ। পত্রিকা থেকে যতটুকু জেনেছি হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়ের পরপরই হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিন খান দুজন দুটি লিখা দেন, যেটি পাশাপাশি ছাপানোর কথা ছিল, কিন্তু ছাপানো হয়নি। গুলতেকিন খান তখন চাইলে ভিন্ন পত্রিকা বা মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন তার অভিমত। করলে এক অর্থে ভালো হত, হুমায়ূন আহমেদ নিশ্চয়ই তার জবাব দিতেন। কাদা ছোড়াছুড়ি তো এখনো হচ্ছে, তাই তখন হলেই ভালো হত। বরং আজ এতো বছর পর মহান লেখকের মৃত্যু দিবসে তার সম্পর্কে অভিযোগ করে গুলতেকিন খানের পাপ করতে হতনা। তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, পাঠকের সাথে তো আর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি তাই পাঠক কিভাবে সহ্য করে এই সব অপবাদ!!! আবার ভেবে দেখুন ২০১৬ সালের এই দিনে একজন একজন ব্যাক্তির অনুপস্থতিতে তাকে নিয়ে কথা বলাতে কেমন ঝড়ের মুখে পড়তে হয়েছে গুলতেকিন খানকে। তাহলে ২০০৩ সালে, আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে এই কথা গুলো হুমায়ূন আহমেদের সামনে বললে গুলতেকিন খানকে কেমন ঝড়ের মোকাবেলা করতে হত! সে জন্য তিনি এখন বলে এক অর্থে যথার্থই করেছেনে বটে!

ফেসবুকের বদলতে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ও মৃত্যু দিবসে অনেকে অনেক কথা লিখেন। শেষ বছর হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে সবার ভালবাসা দেখে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, এই হুমায়ূন আহমেদ হওয়ার পিছে যে মানুষটির অবদান ছিল, যে ১৯২০ বছরের ধনীর দূলালী সুদূর আমেরিকা গিয়ে বেবি সিটিং করেছিলেন সংসারে স্বচ্ছলতার জন্য , নন্দিত নরকে প্রকাশ করার জন্য, তার অনুভূতি কি? তিনি কি মনের ভাব প্রকাশ করেছেন ফেবু স্ট্যাটাস দিয়ে, মুড়াল উদ্ভোধন করে, কেক কেটে!!! না, করেনি । হাজারো হুমায়ূন এর পিছে লুকায়িত থাকে হাজারো গুলতেকিন। হুমায়ূনরা যত উপরে উঠে গুলতেকিনরা তত উপরে উঠে না, কারণ হূমায়ূনদের উপরে তুলতে যেয়ে গুলতেকিনরা নিঃস্ব হয়ে যায় । হুমায়ূনরা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছানোর পর গুলতেকিনদের ভুলে যায়, গুলতেকিনেরা তখন বোঝে হয়ে যায়, অসুন্দর হয়ে যায়, গুলতেকিনেরা অসহনীয় হয়ে উঠে, তখন এই সমস্ত তুচ্ছ গুলতেকিনদের যন্ত্রণা থেকে বের হয়ে আসতে সঙ্গী হিসেবে অসাধারণ রূপবতী ও বুদ্ধিমতি কন্যার প্রোয়জন হয়। আর বেচারি গুলতেকিন, কাগজের সম্পর্ক, এক কলমের খোঁচায় শেষ,তাই সমাজ, সংসার, অভিমান আর অবহেলায় বলতে পারে না “তোমার জন্মদিনটি আমার মনে আছে।মনে আছে প্রতিটি দিন।প্রতিটি অভাব, কারণ সেই অভাবে ও ছিল ভালবাসো। ছিল সারাটি জীবন একসাথে চলার প্রতিঙ্গা।ছিলনা কোন পাওয়ার হিসাব , ছিল কেবলই ভালবাসা, হিসাব ছাড়া ভালবাসো ।”

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু দিনে সাক্ষাতকার দেয়াটা ভুল হয়েছে নাকি তার প্রাক্তন স্বামী, লাখো মানুষের প্রিয় লেখক সম্পর্কে নেগেটিভ চরিত্র তুলে ধরার জন্য এটা অপরাধ মনে হচ্ছে! কতটুকু ভালোবাসা থাকলে একজন মানুষের এতগুলো বছর লেগেছে নিজেকে শক্ত করতে এবং ভালোবাসার মানুষের বিপক্ষে যেয়ে নিজের অপমান ও অধিকারের কথা বলতে! হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর গুলতেকিন খান গিয়েছিলেন ওনার কবর দেখতে, কিন্তু আজ যদি চিত্র বিপরীত হত, অর্থাৎ গুলতেকিন খান আগে মারা যেতেন তবে হুমায়ূন আহমেদ কি যেতেন উনার কবর দেখতে!! কবরের পাশে থাকা অবস্থায় উনার চোখে যে পানি ছিল, সেটা কি ঘৃনা ছিল!! হুমায়ূন আহমেদ কিন্তু গুলতেকিন খানকেই ছেড়ে যাননি, ছেড়ে গিয়েছিলো উনার তিন কন্যা কেও! তাই গুলতেকিন কিন্তু কেবল শুধু নিজেকেই সামলাননি, সামলেছেন তিন কন্যা কেও; যে বিপাশা তার বাবা বাইরে যাবার সময় বাবার গায়ের ঘ্রান ভরে রাখতো বোতলে, সেই বিপাশা কেও! এই বিষয়ে তো কোন দিন কেও বাহবা দেননি গুলতেকিন কে, তাহলে একটি সাক্ষাৎকারে কেন এতো নেগেটিভ বক্তব্য!!

হুমায়ূন আহমেদ কোন নারীকে তৈরী করেননি বরং বেঁছে বেঁছে তিনি মেধাবী ও সুন্দরি নারীদের প্রেমেই পরেছেন। হুমায়ূন আহমেদ না থাকলে ও শাওন প্রস্ফুটিত হতেন। শাওনের প্রতি আমার অভিমান শেষ হয়ে যায় হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর। কারন আমি শাওনের অবস্থানটি অনুভব করতে পারি। শাওন নিজেও মেধাবী, মেধার কারনেই হুমায়ূন আহমেদ শাওনের প্রমে পরেছিলেন, বরং হুমায়ূন আহমেদের কারনে শাওন কোন দিনও নিজ পরিচয়ে দাড়াতে পারেননি!

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস “দুই নারী হাতে তরবারি” অবলম্বনে নির্মিত ছবি “অপরাজিতা তুমি” দেখেছিলাম। এক পুরুষ কে নিয়ে দুই নারীর টানাটানি। কাহিনীতে জিতে যায় কিন্তু পুরুষটি। ঠিক তেমনি জিতে আছেন হুমায়ূন আহমেদ,বার বার পরাজিত হচ্ছেন এক গুলতেকিন ও এক শাওন!!

লেখিকাঃ আইনজীবী,বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

উৎসঃ এস নিউজ, ১৭ আগষ্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: