আর্কাইভ

Archive for জুন, 2016

শব-ই-ক্বদরের সন্ধানে ইবাদত-বন্দেগী

sab-i-qadr 2

তুরস্কের দুধ-কলা দিয়ে সাপ পোষার পরিণতি…

বরাবরের মতো স্বভাবসুলভ কোনো রকম তদন্ত না করেই তুরস্ক যেহেতু ইস্তাম্বুল বিমান বন্দরে বোমাগোলাগুলির জন্য তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় ফুলেফেঁপে ওঠা আইএসএর ওপর দোষ চাপাচ্ছে, তাই উপরোক্ত শিরোণামে খবরটি পরিবেশন করা হলো ।

istanbul airportbloody attackistanbul airport attackistanbul airport bombingwho is behind attackattack after diplomatic overturetourism affected

রমজানে ‘ইফতারের’ ফজিলত

iftar-family -artমোহাম্মদ নঈমুদ্দীন : রোজার অপরিহার্য একটি অংশ ইফতার। এটা সাহরি খাওয়ার মতোই এবাদত এবং রাসুল (সা.) এর সুন্নত। সূর্যাস্তের পরপরই দ্রুত ইফতার করতে হবে। খেজুর, খোরমা ও পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত।

হাদিসে আছে, হযরত সালমান ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ রোজায় ইফতার করে, সে যেন খেজুর কিংবা খোরমা দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হচ্ছে বরকত। আর তা না হলে পানি দিয়ে করবে, তা পবিত্রকারী।’ (জামে তিরমিজি, ২য় খণ্ড, হাদিস৬৯৫)

কখন ইফতার করতে হবে সে প্রসঙ্গে হাদিসে রয়েছে, আমিরুল মুমেনিন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন যখন রাত্র সেদিক থেকে ঘনিয়ে আসে, দিনও এদিক থেকে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন সায়িম তথা রোজাদার ইফতার করবে। (সহিহ বুখারী)

হাদিস মতে, যখন সূর্যাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায় তখন ইফতার করে নিতে হবে। তখন আর আপনাকে সাইরেন কিংবা আযানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

ইফতারির সময় হওয়ার আগ থেকে ইফতার নিয়ে বসে থাকা এবাদত। কিন্তু ইফতারির সময় হওয়া মাত্রই ইফতার করে নিতে হবে। আমাদের অনেকেই ইফতারির সময় হওয়ার পরও অহেতুক বিলম্ব করে থাকেন। মূলত: বিলম্বে ইফতার করা উচিত নয়। এতে মাকরূহ হবে বরং দ্রুত ইফতার করতে রাসুল (সা.) এর নির্দেশনা রয়েছে।

হযরত সাহল ইবন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, লোকেরা যতদিন যাবত ওয়াক্ত হওয়া মাত্রই ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে। (সহিহ বুখারী)

ইফতার তাড়াতাড়ি করা রাসুলের কাছে প্রিয় এমনকি স্বয়ং আল্লাহর কাছেও প্রিয়।

হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে সেই বেশি প্রিয় যে ইফতার তাড়াতাড়ি করে। (তিরমিজি, ২য় খণ্ড, হাদিস৭০০)

এই হাদিসে ইফতারে তাড়াতাড়ি মানে হচ্ছে, ইফতারের সময় হওয়ার পরপরই ইফতার দ্রুত করা। ইফতারের সময় হওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি করে খেয়ে ফেলা নয়।

রমজানের ইফতার রোজাদারদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি বড় খুশি রয়েছে। একটি প্রভুর সাক্ষাত আরেকটি ইফতারের সময়। (সহিহ বুখারি)

প্রকৃত অর্থে প্রকৃত রোজাদার ইফতারের সময় দিনের সব ক্লান্তি ভুলে সওয়াবের উদ্দেশ্যে খুশী মনেই ইফতার করেন।

ইফতারের আরেকটি বড় ফজিলত হচ্ছে এ সময় রোজাদারের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। তখন আপনি খালেছ নিয়তে যা চাইবেন তাই প্রভুর দরবারে কবুল হবে। রোজার ইফতার বান্দাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া থাকে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, ২য় খণ্ড, হাদিস২৯)

আরেক হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া কখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. রোজাদারের (ইফতারের সময়), দুই. ন্যায় বিচারক বাদশাহর এবং তিন. মজলুমের। এ তিন জনের দোয়া আল্লাহ পাক মেঘ থেকেও অনেক উঁচুতে তুলে নেন এবং আসমানের দরজা তাদের জন্য খুলে দেন।

আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, আমি আমার সম্মানের শপথ করছি, আমি অবশ্যই তোমায় (দোয়াকারী) সাহায্য করবো, যদিও কিছু দেরিতে হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, ২য় খণ্ড, হাদিস১৭৫২)

রোজাদারকে ইফতার করানোও সওয়াব। হাদিসে আছে, হযরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য কিংবা পানি দ্বারা কোনো মুসলমানকে রোজার ইফতার করালো, ফেরেশতাগণ মাহে রমজানের এ সময়ে তার জন্য ইস্তিগফার করেন। আর হযরত জিবরাইল (.) শবে কদরে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করেন। (তাবরানী আল মু’জামুল কবীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদিস৬১৬২)

আরেক হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজাদারকে পানি পান করাবে আল্লাহ তা’আলা তাকে পান করাবেন। সে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত কখনও পিপাসার্ত হবে না। (কানযুল উম্মাল, ৮ম খণ্ড, হাদিস২৩৬৫৩)

আরেক হাদিসে আছে, হযরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার গোনাহ মাফ হয়ে যাবে, সে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করবে। ওই রোজাদারের সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াব সে লাভ করবে। তবে ওই রোজাদারের সওয়াবে কোনো কম করা হবে না। এভাবে ইফতার করানোর সওয়াব বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।

ইফতারের আগে কিংবা পরে দোয়া পড়া বাঞ্ছনীয়। দোয়াটি হলোআল্লাহুম্মা ইন্নি লাকা ছুমতু ওয়া বেকা আ’মানতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী)

আল্লাহ আমাদের সঠিক সময়ে ইফতার করা এবং অন্য মুসলমানদের ইফতার করানোর তওফিক দিনআমীন।

রমযানে গুনাহ মোচনকারী আমলসমূহ

জান্নাতুল মহল : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তাকে (পাপ ও পুণ্যের) দুটো পথ দেখিয়েছি।’ [সূরা আল বালাদ ৯০১০] আয়াতটিতে সুস্পষ্ট পথ দুটি; অর্থাৎ ‘আমল বা কর্ম দুটি. পুণ্য ও ২. গুনাহ।

মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত কিছু গুনাহ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা শরীয়তে এমন কিছু ‘আমল বাতলে দিয়েছেন যা সম্পাদন করলে গুনাহসমূহ মাফ হয়। গুনাহ এমন একটি বিষয়, যা একের পর এক করতে থাকলে মুমিন নারী বা মুমিন পুরুষের ঈমানী নূর নিভে যেতে থাকে, যা এক সময় তাকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। আর শয়তান সেটাই চায়। সে চায় আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাকে দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত করে তাকে শয়তানী পথে পরিচালিত করতে। এজন্য সে সর্বদা এ কাজে নিয়োজিত থাকে। রমযান মাস গুনাহ মাফের মাস, গুনাহ মোচনের মাস। অতএব, সৌভাগ্যবান সে, যে এই গুনাহ মাফের মাস পাওয়ার পর গুনাহ থেকে নিজেকে পবিত্র করতে সচেষ্ট হলো।

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বরে আরোহণ করে পর্যায়ক্রমে তিনবার আমীন বললেন। অতঃপর এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! ইতিপূর্বে তো এরূপ করতেন না? তখন তিনি কারণ বললেন, আমাকে জিবরাঈল (.) এসে বলে গেলেন যেঐ ব্যক্তি আল্লাহর করুণা হতে বিতাড়িত অথবা আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন যে রমযান মাসে উপনীত হওয়ার পর তার যথাযোগ্য হক্ব আদায় করল না, ফলে তার পাপরাশি মার্জিত হলো না, আমি এটা শ্রবণ করে বললাম : আমীন। পুনরায় আমাকে জানালেন, ঐ ব্যক্তি আল্লাহর করুণা হতে বিতাড়িত বা ধ্বংস হোক, যে তার মাতাপিতা বা এদের কাউকে জীবদ্দশায় পেয়ে তাদের যথাযথ আনুগত্য বা এদের সেবাযত্ন না করার ফলে জান্নাতে প্রবেশের উপযোগী হলো না, তখন আমি বললাম : আমীন। এরপর আরেকটি বিষয় সম্পর্কে আমাকে অবগত করালেন, ঐ ব্যক্তি আল্লাহর রহমাত হতে বিতাড়িত বা ধ্বংস হোক, যার সম্মুখে আপনার নাম উচ্চারিত হবে অথচ সে আপনার প্রতি সালাত (দরূদ) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঠ করল না, তখন আমি বললাম, ‘আমীন’। [হাসীদটি বর্ণনা করেছেন ইবনু খুযাইমাহ৩য় খণ্ড, পৃ.-১৯২, মুসনাদ আহমাদ২য় খণ্ড, পৃ.-২৬৪ এবং বায়হাকী৪র্থ খণ্ড, পৃ.-২০৪]

গুনাহ হওয়ার মূল কারণ দ্বীনের ‘ইলম বা জ্ঞানার্জন না করা : আসুন! জীবনের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সচেতন হই, দ্বীনের জ্ঞানার্জন করে গুনাহ থেকে মুক্ত হই। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে ধন্য হই।

রমযানের প্রস্তুতিতে গুনাহ মোচনকারী কিছু ‘আমল’


. দুয়া করা : রমযানে দুয়া করিআল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার কাছে, পরিপূর্ণ ঈমানঈমানের দৃঢ়তা, ইখলাসের পরিপূর্ণতার জন্য, রিয়া ও কিবর থেকে বাঁচার জন্য।

. ক্ষমা প্রার্থনা করা : দুয়া বা প্রার্থনা এই আমলের মধ্য দিয়ে গুনাহ মাফ। আদম (.) ও বিবি হাওয়া (.) যে দুয়া করে ক্ষমা পেয়েছিলেন– ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি, যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো আর দয়া না করো, তাহলে আমরা অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। [সূরা আল আরাফ ৭২৩]

. ঈমানসহ নেক আমল : ইসলামী শরীয়তে এমন অনেক আমল আছে, যার মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ‘আর যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের মন্দ কাজকগুলোকে মুছে দেব, আর তাদের অবশ্য অবশ্যই প্রতিদান দেব তাদের উৎকৃষ্ট কাজগুলোর অনুপাতে, যা তারা করত।’ [সূরা আল আনকাবুত ২৯] আর যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করব। [সূরা আল আনকাবুত ২৯]

. নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা :যদি তোমরা নিষিদ্ধ কাজের বড়গুলো হতে বিরত থাকো, তাহলে আমি তোমাদের ছোট ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের এক মহামর্যাদার স্থানে প্রবেশ করাব। [সূরা আন নিসা ৪৩১]

. তাকওয়া অর্জন করা :হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি সিয়াম (রোজা) ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’ [সূরা আল বাকারাহ ২১৮৩]

সিয়াম অর্থ বিরত থাকা, আর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য। অতএব, তাকওয়া অর্জনের জন্য। অতএব, তাকওয়া অর্জনে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা। ‘বলো, আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায়, বিরোধিতা আল্লাহর অংশীদার স্থির করা যে ব্যাপারে তিনি কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি, আর আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের অজ্ঞতাপ্রসূত কথাবার্তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।’ [সূরা আল আরাফ ৭৩৩]

আয়াতগুলোতে সুস্পষ্টপ্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায় ও আল্লাহর সাথে শরীক করানিষিদ্ধ কাজ। আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকা তাকওয়া অর্জন। ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সরলসঠিক কথা বলো।’ [সূরা আল আহযাব ৩৩৭০]

আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের ‘আমলগুলোকে ত্রুটিমুক্ত করবেন আর তোমাদের পাপগুলোকে ক্ষমা করে দিবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে সাফল্য লাভ করেমহাসাফল্য।’ [সূরা আল আহযাব ৩৩৭০]

. সিয়াম পালন করা : রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ঈমান সহকারে সওয়াবের আশায় রমযানের সওম পালন করবে, তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ [সহীহুল বুখারী, সহীহ্ মুসলিম] কোনো ব্যক্তি তার ধনসম্পদ, স্ত্রীপরিজন ও প্রতিবেশীর দ্বারা কৃত পাপসালাত, সিয়াম ও দান সদকাহ দ্বারা মোচন করে দেয়।’ [সহীহুল বুখারী, সহীহ্ মুসলিম]

. তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা : আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)কে রমযান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় ক্বিয়ামে রমযানে; অর্থাৎ তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।’ [সহীহুল বুখারীহা. ২০০৮]

. ক্বদরের রাত্রিতে পালন : রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় ক্বাদরের রাত্রিতে সালাতে দাঁড়ায় তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ [সহীহুল বুখারীহা. ১৮০২]

. রমযানে বিশেষ দুয়া : শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে পড়ার জন্য রাসূল (সা.) একটি দুয়া শিক্ষা দিয়েছেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাস, তাই আমাকে ক্ষমা করো।’ [সুনান আত্ তিরমিযীহা. ৩৭৬০, সুনান ইবনে মাজাহ্হা. ৩৮৫০]

১০. ‘ওমরাহ, আদায় করা : আবু ইবনু মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) হতে বণিৃত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হাজ্ব ও ওমরাহ দারিদ্র্যতা ও গুনাহ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনারুপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়।’ [সুনান ইবনু মাজাহ হা. ২৮৮৭, সুনান আত্ তিরমিযীহা. ৮১০, মিশকাতুল মাসাবীহ হা. ২৫২৪২৫, হাসান সহীহ] ইবনু ‘আব্বাস (রা.) থেকে রমযানে ‘ওমরাহ পালন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নবী (সা.) এক আনসারী মহিলাকে বলেন, আমাদের সাথে তোমার হজ্ব করতে বাধা কিসের? ইবনু আব্বাস মহিলার নাম বলেছিলেন, কিন্তু আমি ভুলে গেছি। মহিলা বললেন, ‘আমাদের একটা পানি বহনকারী উট ছিল। কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (মহিলার স্বামী ও পুত্র) আরোহণ করে চলে গিয়েছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন পানি বহনকারী একটি উট, যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি।’ নবী (সা.) বলেন, ‘আচ্ছা রমযান এলে তখন ‘ওমরাহ, করে নিও। কেননা রমযানের ‘ওমরাহ একটি হজ্বের সমতুল্য অথবা এরূপ কোনো কথা বলেছিলেন।’ [সহীহুল বুখারী হা. ১৭৮২]

১১. পরিপূর্ণভাবে অজু ও মাসজিদে গমন : রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা জানাবো না, যা করলে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বলুন। তিনি বললেন, কষ্টকর অবস্থায়ও পরিপূর্ণরূপে অজু করা, সালাতের জন্য অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষায় থাকা।’ [সহীহ মুসলিম হা. ৬০১, মুসনাদ আহমাদ হা. ৪৭৬, সুনান আত তিরমিযী হা. ৫১, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ৪২৮] তিনি আরও বলেন, কোনো মুসলিম বা মুমিন বান্দা যখন অজুর সমসয় মুখমন্ডল ধৌত করে, তখন তার মুখমন্ডলের গুনাহ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায়। যখন সে দুই হাত ধৌত করে, তখন দুই হাতের স্পর্শের মাধ্যমে অর্জিত সব গুনাহ পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায়। অতঃপর যখন সে তার পা দুখানা ধৌত করে, তখন তার পা দুখানা হাঁটার মাধ্যমে অর্জিত গুনাহ পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায়। এভাবে সে যাবতীয় গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে যায় [সীহ মুসলিমহা. ২৪৪, আহমাদ হা. ৮০২০]

১২. অজুর পর সালাত আদায় :তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা করো দিনের দু’প্রান্ত সময়ে আর কিছুটা রাত অতিবাহিত হওয়ার পর, পুণ্যরাজি। পুণ্যের কাজ (অবশ্যই পাপরাশিকে দূর করে দেয়, এটা তাদের জন্য উপদেশ, যারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ [সূরা হুদ ১১১১৪] উসমান ইবনু আপফান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল (সা.) পূর্ণাঙ্গরূপে অজু করার পর বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এ অজুর ন্যায় অজু করার পর একাগ্রচিত্তে দুই রাকাত সালাত আদায় করবে, তাহলে তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ সহীহুল বুখারী হা. ১৫৮, ১৬৪, সহীহ মুসলিম হা. ২২৬, মুসনাদ আহমাদ হা. ৪১৮]

রাসূল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম উত্তমরূপে অজু করে সালাত আদায় করলে পরবর্তী ওয়াক্তের সালাত পর্যন্ত তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ সহীহ মুসলিমহা. ২২৭] রাসূল (সা.) আরও বলেন, ‘যখন কোনো মুসলিমের নিকট ফরজ সালাতের সময় উপস্থিত হয়, তখন যদি উত্তমরূপে অজু করে এবং একান্ত বিনীতভাবে সালাতের রুকুসিজদাহ ইত্যাদি আদায় করে তাহলে সে পুনরায় কবীরা গুনাহে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তার পূর্বেকার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়। আর এরূপ সারা বছরই হতে থাকে।” সহীহ মুসলিমহা. ১৩৮, মিশকাতুল মাসাবীহহা. ২৮৬।

১৩. সাদাক্বাহ্ করা :তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু খরচ না করা পর্যন্ত কখনো পুণ্য লাভ করবে না, যা কিছু তোমরা খরচ করোনিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব ভালভাবেই অবগত। সূরা আলে ইমরান ৩ : ৯২। অর্থাৎ যে কোন সময় সচেতন বা অসচেতন অবস্থায় গুনাহ হয়ে যেতে পারে, আর তা থেকে পুণ্যলাভ করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে – “সাদাক্বাহ”। আয়াতটিতে সুস্পষ্ট, পুণ্য লাভ অর্থাৎ গুনাহ হতে মুক্ত হওয়ার জন প্রিয় বস্তু খরচ করার কথা বলা হয়েছে।

১৪. বেশি বেশি সাজদাহ করা : মাদান ইবনু ত্বালহাহ্ব আলইয়ামাবি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়া সাল্লাম)-এর আযাতকৃত গোলাম গাওবানের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিন যা করলে আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অথবা আমি তাকে প্রিয় ও পছন্দনীয় কাজের কথা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি চুপ থাকলেন। আমি পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তখনও চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, “তুমি আল্লাহর জন্য বেশি বেশি সাজদাহ করবে। কেননা তুমি যখনই আল্লাহর জন্য একটি সাজদাহ করবে, মহান আল্লাহ এর বিনিময়ে তোমার মর্যাদা এক ধাপ বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।” সহীহ মুসলিম হা. ১১২১, সুনান আত তিরমিযীহা. ৩৮৮, সুনান ইবনু মাজাহহা. ১৪২৩।

১৫. জুমু’আর খুৎবাহ শুনা : সালমান ফারসী (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমু’আর দিন গোসল করে এবং যথাসাধ্য ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করে ও নিজের তেল হতে ব্যবহার করে বা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে। অতঃপর তার নির্ধারিত সালাত (ইমাম খুতবায় দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত যথাসাধ্য) আদায় করে এবং ইমামের খুৎবাহ দেয়ার সময় চুপ থাকে, তাহলে তার সে জুমু’আহ হতে অপর জুমু’আহ মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” সহীহুল বুখারী হা. ৮৮৩, মিশকাতুল মাসাবীহ হা. ১৩৮১।

১৬. অসচ্ছল ও অভাবীকে অবকাশ (সুযোগ) দেয়া : নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইডি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “জনৈক ব্যবসায়ী লোকদের ঋণ দেয়। কোন অভাবগ্রস্তকে দেখলে সে তার কর্মচারীদের বলত, তাকে ক্ষমা করে দাও, হয়ত আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দিবেন। এর ফলে আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেন।” সহীহুল বুখারী হা. ২০৭৮, মুসনাদ আহমাদ হা. ৭৫৮২।
১৭. মুসাফাহ করা : রাসূল (সাল্লাল্রাহু ‘আলাইডি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে দু’জন মুসলিম পরস্পর মিলিত হয়ে মুসাফাহ করে তাদের আলাদা হবার পূর্বেই তাদের সগীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।” সুনান আবু দাউদ হা. ৫২১২, সুনান আত তিরমিযী হা. ২৭২৭, সুনান ইবুন মাজাহ হা. ৩৭০৩, মিশকাতুল মাসাবীহ হা. ৪৬৭৯, সনদ সহীহ। অতএব আসুন, এই রমযানে এই সুযোগ লাভ করে গুনাহ মোচনে সৌভাগ্যবানদের দলভুক্ত হই।

১৮. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা : রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে তার চলার সময় কাঁটাদার গাছের একটি ডাল পেল এবং সেটাকে রাস্তা হতে অপসারণ করল, আল্লাহ তার এ কাজকে কবুল করলেন এবং তাকে মাফ কর দিলেন।” সহীহুল বুখারী হা. ২৪৭২।

১৯. খাদ্য গ্রহণ শেষে কৃতজ্ঞতা শুকরিয়া : রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি খাবার পর বলবেসেই আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি আমাকে আমার ক্ষমতা ও শক্তি ছাড়াই এই খাবার খাইয়েছেন এবং এই রুজি দান করেছেন, তাহলে তার বিগত সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে।” সুনান আত তিরমিযী হা. ৩৪৫৮, সুনান আবূ দাঊদহা. ৪০২৩, মিশকাতুল মাসাবীহ হা. ৪৩৪৩, সনদ সহীহ।

২০. হাটবাজারে প্রবেশের সময় দু’আ পাঠ : রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশের সময় বলবে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, সকল ক্ষমতা তাঁরই, সমস্ত প্রশংসা তার জন্য, তিনি প্রাণদান করেন ও মৃত্যু দেন। তিনি চিরজীবী, তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না, তার হাতেই মঙ্গল আর তিনিই সব সময় প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতার অধিকারী, তাহলে তার জন্য আল্লাহ তা’আলা দশ লক্ষ নেকী বরাদ্দ করেন, তার দশ লক্ষ গুনাহ মাফ করেন এবং তার দশ লক্ষ গুণ সম্মান বৃদ্ধি করেন।” সুনান আত তিরমিযী হা. ৩৪২৮, সুনান ইবুন মাজাহ হা. ২২৩৫, ২২৩৫, মিশকাতুল মাসাবীহ হা. ২৩১৮, সনদ হাসান।

২১. তাসবীহ তাহলীল করা : রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি দৈনিক ১০০ বার বল, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ (আমি আল্লাহর স্বপ্রশংসা পবিত্রতা ঘোষণা করছি’, তাহলে তার পাপসমূহ মুছে ফেলা হয় যদিও তা সাগরের ফেনা রাশির সমান হয়ে থাকে। সহীহুল বুখারী হা. /১৬৮, হা. ৬৪০৫, সহীহ মুসলিম হা. /২০৭১, হা. ২৬৯১।

২২. তাওবাহ ও ইস্তেগফার করা :তবে তারা নয় যারা তাওবাহ করবে, ঈমান আনবে, আর সৎ কাজ করবে। আল্লাহ এদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তিত করে দেবেন; আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।” সূরা আল ফুরক্বান ২৫ : ৭০।

যারা কোন পাপ কাজ করে ফেললে কিংবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ ব্যতীত গুনাহসমূহের ক্ষমাকারী কেই বা আছে এবং তারা জেনে শুনে নিজেদের (পাপ) কাজের পুনরাবৃত্তি করে না।” সূরা আলে ‘ইমরান ৩ : ১৩৫।

ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ করোআন্তরিক তাওবাহ। সম্ভবত : তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে তোমাদের থেকে মুছে দিবেন, আর তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণাধারা। সে দিন আল্লাহ নাবীকে আর তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে লজ্জিত করবেন না। (সেদিনের ভয়াবহ অন্ধকার থেকে মু’মিনদের রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে) তাদের নূর দৌড়াতে থাকবে তাদের সামনে আর তাদের ডান পাশে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের নূরকে আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দাও আর আমাদেরকে ক্ষমা করো; তুমি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” সূরা আত তাহরীহ ৬৬ : ৮।

মালাইকাদের ক্ষমা প্রার্থনা : তাফসীর ইবনু কাসীরে বর্ণিত। মানব জাতির জন্য সমস্ত সৃষ্ট জীবের মাঝে সবচেয়ে বেশি একনিষ্ঠ কল্যাণ কামনাকারী ও হিতাকাঙ্ক্ষী হলো “মালাইকারা”। আর মানব জাতির জন্য সমস্ত সৃষ্ট জীবের মধ্যে সর্বাধিক ধোকাবাজ হলো “শয়ত্বান”। অতএব, শয়ত্বানের ধোঁকা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে, জান্নাতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে রমযানের প্রস্তুতিতে, জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় মালাইকাদের দু’আ অবশ্য অবশ্যই প্রয়োজন। অবশ্যই মালাইকাদের দু’আ আমাদের পবিত্র বানাতে সাহায্য করবে। জান্নাতে যেতে সাহায্য করবে। জীবিত ও মৃত্যুর সময় মালাইকাদের দু’আ পাওয়া কতই না সৌভাগ্যের ব্যাপার। যদি একজন মালাইকা সারা বিশ্বের সকল ঈমানদারদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিবেন। তাফসীরে কাসেমী থেকে বর্ণিত। মালাইকাদের কাজ-‘তাসবীহ” ও ‘তাহমীদ” পাঠ করা এবং মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। তারা মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার ব্যাপারে অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং আল্লাহ তা’আলা তাদের দু’আ কবুল করেন।

আসুন, জীবনের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়র আগে সৌভাগ্যবানদের দলে অন্তর্ভুক্ত হই। কোন ‘আমল বা কোন কর্মের কারণে মালাইকারা দু’আ করে ক্ষমা চায়। গুনাহ এমন একটি বিষয় যা ঈমানের নূর নিভিয়ে দেয়। আবার নেক ‘আমল এমন একটি বিষয় যা গুনাহ মোচন করে। রমযান মাস গুনাহ মোচনের মাস। আর এমন অনেক ‘আমল আছে যা করলেমালাইকারা তাদের জন্য ক্ষমা চায়। রমাযানের প্রস্তুতিতে নিজেকে পবিত্র করতেজান্নাতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে মুমিনের মৃত্যু প্রস্তুতিতে মালাইকাদের সাক্ষ্য, মালাইকাদের ক্ষমা প্রার্থনাযা একজন মুমিনের অবশ্যই প্রয়োজন। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা আসমানজমিনের সব কিছু মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন।

. সিয়ামের নিয়্যাতে সাহরী ভক্ষণকারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম ইবনু হিব্বান (রযিয়াল্লাহু আনহু) এবং তাবারানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা সাহরী ভক্ষণকারীদের জন্য দয়া করেন এবং মালাইকারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। [আল ইহসান ফি তাকরিব সহীহ ইবনু হিব্বানহা. ৩৪৬৭, /২৪৬, শায়খ আরবানী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব/৫১৯]

. সিয়াম পালনকারীর সম্মুখে পানাহার করা হলে সিয়াম পালনকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘সিয়ামকারীদের রোজাদারদের) সামনে যতক্ষণ পর্যন্ত খানা খাওয়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মালাইকারা সিয়াম পালনকারীর পানাহারে বিরত থাকার কারণে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে।’ [আল মুসনাদহা. /৩৭০, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ১৭৫২, /৩২০৩২১]

. ওযু অবস্থায় ঘুমানো ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম তাবারানী (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু ‘আব্বাস (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের শরীরকে পবিত্র রাখো, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পবিত্র করবেন। যে ব্যক্তি পবিত্রাবস্থায় (ওযু অবস্থায়) রাত্রি যাপন করবে, অবশ্যই একজন মালাইকা তার সাথে রাত্রি যাপন করবে, রাতে যখন সে পার্শ্ব পরিবর্তন করে তখনই আল্লাহর সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! আপনার এ বান্দাকে ক্ষমা করুন। কেননা সে পবিত্রাবস্থায় (ওযু অবস্থায়) ঘুমিয়েছে।’ [আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, কিতাবুল নাওয়াফেলহা. /৪০৮৪০৯, সনদ জায়েদ।]

. সালাতের অপেক্ষাকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আবু হুরায়রাহ (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মাঝে কোন ব্যক্তি যখন ওযু অবস্থায় সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকে, সে যেন সালাতেই রত। তার জন্য মালাইকারা দোয়া করতে থাকে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো, হে আল্রাহ! তুমি তার ওপর দয়া করো।’ [সহীহ মুসলিমহা. ৬১৯, /৪৬০]

. যারা ইমামের সূরা আল ফাতিহা শেষ করার সময় আমীন বলেন : ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আবু হুরায়য়া (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের কেউ আমীন বলে আর মালাইকরাও আকাশে আমীন বলে, তখন উভয়ের আমীন বলা যদি মিলে যায়, তবে আমীন বলা ব্যক্তির অতীত জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ [সহীহুল বুখারী হা. ৭৮১, /২৬৬ ও সহীহ মুসলিম হা. ৭২ (৪১০), /৩০৭, শব্দগুলো সহীহুল বুখারীর।]

. সালাতের স্থানে বসে থাকা ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) আবু হুরায়রা (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মাঝে যারা সালাতের পর স্ব স্ব স্থানে বসে থাকে তাদের জন্য মালাইকারা দোয়া করতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ওযু ভঙ্গ না হবে, হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং হে আল্লাহ! আপনি তাদের ওপর দয়া করুন।’ [আল মুসনাদহা. ৮১০৬, ১৬/৩২, শায়খ আহমাদ শাকের এ হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

. নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর সালাত (দরূদ) পাঠকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বণিৃত হাদীস, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর একবার সালাত (দরূদ) পাঠ করবে, আল্লাহতা’আলা তার ওপর সত্তর বার দয়া করবেন, আর মালাইকারা তার জন্য সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ [আল মুসনাদ হা. ৬৬০৫, ১০/১০৬১০৭, দেখুন : আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব/২৯৭।]

. মুসলিম পরস্পরে ক্ষমা প্রার্থনাকারীর জন্য : মহান আল্লাহ বলেন, ‘কাজেই জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার ভুলত্রুটির জন্য আর মুমিন ও মুমিনাদের জন্য আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত।’ [সূরা মুহাম্মাদ ৪৭১৯]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘কোন মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করে বা ক্ষমা চায় তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন মালাইকা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে তখন সে নিযুক্ত মালাইকা বলে, আমীন অর্থাৎহে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্যও অনুরূপ। (তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তোমাকেও তাই দান করুন)।’ [সহীহ মুসলিমহা. ৮৮ (২৭৩৩), /২০৯৪]

. সৎকাজের শিক্ষা প্রদানকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : মালাইকাদের দোয়ায় ধন্য ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন যিনি মানুষকে ভাল কথা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয় মানুষকে ভাল কথা শিক্ষা প্রদানকারীর প্রতি আল্লাহ তা’আলা দয়া করে থাকেন এবং মালাইকারা, আসমানজমিনের অধিবাসীরা এমনকি গর্তের পিপিলিকা ও পানির মাছেরাও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে।’ [সুনান আত তিরমিযী হা. ২৮২৫, /৩৭৯৩৮০, শায়খ আলবানী এ হাদীসটি সহীহ বলেছেন, দেখুন : সহীহ সুনানুত তিরমিযী /৩৪৩]

১০. রোগী পরিদর্শনকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : ইমাম আহমাদ ও ইবনু হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আলী (রযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বলতে শুনেছি, ‘যে কোন মুসলিম তার অপর মুসলমান রোগী ভাইকে দেখতে যায়, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য সত্তর হাজার মালাইকা প্রেরণ করেন, তারা দিনের যে সময় দেখতে যায়, সে সময় থেকে দিনের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং সে রাতের যে সময় দেখতে যায় সে সময় থেকে রাতের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।’ [আল মুসনাদ হা. ৭৫৮, /১১০, আল ইহসান ফি তাকরিব সহীহ ইবনু হিব্বান হা. ২৯৫৮, /২২৪২২৫, শায়খ আহমাদ শাকের হাদীসটির সনদকে সহীহ সাব্যস্ত করেন, দেখুন : আল মুসনাদের টীকা/২২৪]

১১. মুমিন ও তাদের সৎ আত্মীয়দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা : আল্লাহ তা’আলার আরশবহনকারী ও তাদের পার্শ্ববর্তী মালাইকারা মুমিনদের জন্য দোয়া করে থাকে। সেই মালাইকাদের সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তারা হলো উচ্চ মর্যাদাবান ও সম্মানিত মালাইকামলী।’ [তাফসীরে কুরতুবী১৫/২৯৪, আল মুহাররার আর ওয়াজিজ১৪/১১৬ ও তাফসীরে বায়জাবী/৩৩৫]
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আরশ বহন করে আছে, আর যারা আছে তার চারপাশে, তারা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে আর তাঁর প্রতি ঈমান পোষণ করে আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দিয়ে সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছ, কাজেই যারা তাওবাহ করে ও তোমার পথ অনুসরণ করে তাদেরকে ক্ষমা করো, আর জাহান্নামের ‘আযাব থেকে তাদেরকে রক্ষা করো। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদেরকে আর তাদের পিতৃপুরুষ, স্বামীস্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তাদেরকেও চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করাও যার ওয়াদা তুমি তাদেরকে দিয়েছ; তুমি মহাপরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞ। সমস্ত খারাবি থেকে তাদেরকে রক্ষা করো। সেদিন তুমি যাকে সমস্ত খারাবি থেকে রক্ষা করলে, তার ওপর তো দয়াই করলে। ওটাই হলো বিরাট সাফল্য।’ [সূরা আল মুমিন ৪০ : ]

ব্রেক্সিটের মানে যা দাঁড়ালো…

brexit-29জেফরি ডি স্যাক্স: ব্রেক্সিট ভোটের মাধ্যমে আসলে তিন ধরনের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে: ক্রমবর্ধমান অভিবাসন, সিটি অব লন্ডনের ব্যাংকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এর ফলাফলও অনেক বড় হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকদের পালেও হাওয়া লাগবে। তা ছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়লে ব্রিটেনের অনেক অর্থনৈতিক ক্ষতিও হবে, তাতে আবার স্কটল্যান্ডও যুক্তরাজ্য ছাড়তে প্ররোচিত হতে পারে। ইউরোপীয় একতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর কিছু নাই বা বললাম।

ব্রেক্সিট আসলে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা, যাতে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বায়নের নতুন ঘরানার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে, এই ব্রেক্সিটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত বিদ্যমান অবস্থার (স্ট্যাটাস কৌ) চেয়ে যেটা অনেক উন্নত হতে পারে।

আসল কথা হলো, ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে অভিবাসীদের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার সর্বব্যাপক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। খসড়া হিসাবে দেখা যায়, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী, যারা মূলত শ্রমিকশ্রেণি, বিশ্বাস করে—অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যেটা আসলে জনজীবনের শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছে।

ব্রেক্সিটের প্রচারণার মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ মে মাসে জানা যায়, ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখ ৩৩ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছেন, যেখানে সরকারের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ। অর্থাৎ সরকারের লক্ষ্যের তিন গুণেরও বেশি লোক এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। হ্যাঁ, এই খবর এসেছে সিরিয়ার শরণার্থীসংকটের একদম চূড়ান্ত সময়ে; তার সঙ্গে আমরা শুনেছি, সিরিয়ার শরণার্থীরা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছেন। আবার জার্মানি ও অন্যান্য জায়গায় শরণার্থীরা নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন, এমন খবরও আমরা পেয়েছি।

ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের সমর্থকেরাও একইভাবে দেশটির প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নিবন্ধনহীন লোককে গালাগাল করেন, যাঁরা মূলত হিস্পানিক। অথচ এই লোকগুলো বেশ প্রশংসনীয়ভাবে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করেন, যদিও তাঁদের ভিসা ও কাজের অনুমতি নেই। ট্রাম্পের অনেক সমর্থকের কাছে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে অরল্যান্ডোর এই সাম্প্রতিক হামলাকারী একজন আফগান অভিবাসী মুসলমানের সন্তান, যিনি মার্কিনবিরোধী মনোভাব থেকে এই হামলা চালিয়েছিলেন (যদিও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে যারা গণহত্যা চালায়, তারা সবাই মার্কিন)

ব্রেক্সিট হলে যে ব্রিটিশদের আয় কমে যাবে, এমন সতর্কসংকেত একদম খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা ভয়ের ব্যবসা, অথবা ত্যাগবাদীদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এর তুলনা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্নিহিত শ্রেণিদ্বন্দ্বই হচ্ছে আসল ব্যাপার। ‘ত্যাগবাদীদের’ মধ্যকার শ্রমিকেরা যুক্তি দিয়েছেন, আয় যদি কারও কমে, তাহলে সেটা ধনীদেরই কমবে; বিশেষ করে, সিটি অব লন্ডনের ঘৃণিত ব্যাংকারদের আয়ই সবচেয়ে বেশি কমবে।

মার্কিনরা যেভাবে ওয়াল স্ট্রিটের লোভী ও অপরাধী চরিত্রকে ঘৃণা করেন, ঠিক তেমনি ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণি সিটি অব লন্ডনকে ঘৃণা করে। এতেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় একটা সুবিধা পেয়ে যাবেন, কারণ হিলারির নির্বাচনী খরচের বড় একটি অংশই আসবে এই ওয়াল স্ট্রিট থেকে। হিলারির উচিত হবে এ বিষয়টি আমলে নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা।

যুক্তরাজ্যে এই অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ও শ্রেণিদ্বন্দ্বের সঙ্গে আরও একটি সর্বব্যাপক মনোভাব যুক্ত হয়েছে, আর সেটা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর। হ্যাঁ, সেটা ঠিক। শুধু গত ছয় বছর ধরে গ্রিক সংকটের কথাই ধরুন, রাজনীতিকেরা স্রেফ স্বার্থপর ও ক্ষীণদৃষ্টি দিয়ে কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করেছেন, সেটা দেখুন। আর ইউরোজোনে এখনো যা ঘটছে, তাতে যুক্তরাজ্যের অনেক ভোটারই ইইউ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, বোধগম্যভাবেই।

ব্রেক্সিটের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব ইতিমধ্যে অনুভূত হতে শুরু করেছে: ৩১ বছরের মধ্যে পাউন্ডের মূল্য সবচেয়ে বেশি পড়ে গেছে। অন্যদিকে সিটি অব লন্ডনও খুব শিগগির বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে; লোকের যেমন চাকরি যাবে, তেমনি বোনাসের হারও কমবে। লন্ডনের সম্পত্তির মূল্যও কমে যাবে। ইউরোপে দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভাব্য আরও যেসব প্রভাব পড়বে সেগুলো হলো: স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, কাতালোনিয়ার সম্ভাব্য স্বাধীনতা, ইউরোপের জনগণের অবাধ চলাচল হ্রাস, অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত হওয়া ইত্যাদি। এগুলোর প্রভাব হবে সর্বব্যাপী। অন্যান্য দেশও নিজের মতো করে গণভোট আয়োজন করতে পারে, তাদের অনেকে আবার ইইউ ছাড়তেও পারে।

এদিকে ইউরোপে রব উঠেছে, যারা ব্রেক্সিটের চিন্তা করছে, তাদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্য দ্রুত ব্রিটেনকে শাস্তি দিতে হবে। এটা ইউরোপীয় রাজনীতির চরম মূর্খতা (গ্রিসের বেলায় যেটা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে)। ইউরোপের অভিন্ন বাজারে ব্রিটেনকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন্ধন শুধু শিথিলই হতে থাকবে।

তাহলে কী করা উচিত? আমি কিছু পরামর্শ দেব। প্রথমত, সিরিয়ার যুদ্ধ শেষ করে শরণার্থীদের স্রোত বন্ধ করতে হবে। আর সিআইএসৌদি জোট, যা বাশার আলআসাদকে উৎখাত করতে চায়, তা ভেঙে দিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত ও সিরিয়াকে স্থিতিশীল করা যাবে (প্রতিবেশী ইরাকেও একই মনোভঙ্গি নেওয়া যায়)। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তো বিভিন্ন দেশের সরকার হটানোর বাতিক আছে, আর সেটাই হচ্ছে এই শরণার্থীসংকটের গভীর কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই বাতিক যদি দূর হয়, তাহলেই কেবল শরণার্থীরা ঘরে ফিরতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, ন্যাটো যেন ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় সম্প্রসারণ বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে যে নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটা তার আরেক অবিমৃশ্যকারিতা, যেখানে আবার ইউরোপীয় দেশগুলোরও বোকামি আছে। ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধ হলে উত্তেজনা কমে আসবে, আর তাতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও স্বাভাবিক হবে, ইউক্রেন স্থিতিশীল হবে। এতে ইউরোপীয় অর্থনীতি ও প্রকল্পের গুরুত্ব নতুন করে সৃষ্টি হবে।

তৃতীয়ত, ব্রিটেনকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। এর বদলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জাতীয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে পুলিশি টহল বাড়াতে হবে। এটা তো সাধারণ জ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে উদার ও সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলো (পশ্চিম ইউরোপ) লাখ লাখ সম্ভাব্য অভিবাসীদের ঢুকতে দেবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেলায়ও একই কথা খাটে।

চতুর্থত, বিরূপ হয়ে যাওয়া শ্রমিকশ্রেণির মনে ন্যায্যতার বোধ সৃষ্টি করতে হবে। আর্থিক সংকট ও চাকরির আউটসোর্সিংয়ের জন্য তাঁদের জীবনজীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, সামাজিকগণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধগুলো অনুসরণ করতে হবে, অর্থাৎ ধনীদের কাছ থেকে কর আদায় করে এবং কর স্বর্গগুলো বন্ধ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে হবে। এই কর স্বর্গের কারণে অর্থনৈতিক অসমতা আরও তীব্র হচ্ছে। আরও কথা আছে, সেটি হলো—গ্রিসের ঋণসংকট দূর করে ইউরোজোনের দীর্ঘ সংকটের অবসান ঘটাতে হবে।

পঞ্চমত, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে যুদ্ধ খাতে অর্থ ব্যয় না করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে, তার জন্য সম্পদ জোগাড় করতে হবে। কথা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, চরম দারিদ্র্য, দক্ষতার অভাব ও শিক্ষাহীনতার কারণে যদি আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয়, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার উন্নয়নের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা না যায়, তাহলে দরিদ্র ও যুদ্ধজর্জরিত দেশগুলো থেকে আসা শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানো যাবে না।

এসব থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে যুদ্ধের নীতি থেকে বেরিয়ে টেকসই উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করতে হবে। দেয়াল ও বেড়া দিয়ে শরণার্থীদের ঠেকানো যাবে না, বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এটা সম্ভব।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

জেফরি ডি স্যাক্স: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নের অধ্যাপক।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, জুন ২৮, ২০১৬

 cr-brexit-1

কর্মক্ষেত্রে আরো উৎপাদনশীল হতে…

increasing productivity

বিভাগ:জীবনযাপন

শিষ্টাচার: সেকাল-একাল

আজ আমরা আধুনিকতা ও প্রযুক্তির বড়াই করি, বড়াই করি শিক্ষাদীক্ষারও। কিন্তু আমরা ভুলে যাই নৈতিকতা আর শিষ্টাচারের শিক্ষাই বড় শিক্ষা। ওই শিক্ষা না থাকলে কখনোই একজন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না।

আফরোজা পারভীন : দিন কয়েক আগে এক সন্ধ্যায় আমার বাসায় একজন ইফতারি পাঠালেন। আমি খুবই অবাক হয়ে গেলাম। কারণ যিনি পাঠিয়েছেন তাকে আমি চিনি না। ইফতারি বহনকারীকে বললাম, ‘ভাই! আপনি ভুল করছেন। এ ইফতারি আমার না।তিনি আমার বাসার নাম্বার গড় গড় করে বলে জানতে চাইলেন, এটা ওই নাম্বারের বাসা কিনা। আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি বললেন, ‘এটা এ বাসারই ইফতারি।একরকম জোরজবরদস্তি করে ইফতারিটা তিননি রেখে গেলেন। আমি তাকে বললাম, যিনি ইফতারি পাঠিয়েছেন তার একটা কার্ড দিয়ে যেতে। তিনি দিয়ে গেলেন। তখন ইফতারের সময় পার হয়ে গেছে। আমরা ওই ইফতারি স্পর্শ করলাম না। রাতে অনেক চেষ্টা করলাম যোগাযোগ করতে। কার্ডে শুধু টিএন্ডটি নাম্বার ছিল। কাজেই রাতের বেলা আর যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। দিনে যোগাযোগ করেও কোনো সদুত্তর পেলাম না। তিনি জানালেন, ইফতারিটা তার প্রতিষ্ঠানেরই। তবে আমার নামটা কে যোগ করেছে তিনি জানেন না। জেনে জানাবেন। ইফতারিটা আমাকেই পাঠানো হয়েছে কিনা তাও তিনি নিশ্চিত করতে পারলেন না।

ইফতারি পাঠানোর সংস্কৃতি আমাদের ছেলেবেলায় ছিল, এখন নেই। ইফতারের সময় হলেই এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ট্রেতে করে ঝালর দেয়া কাপড়ে ঢেকে ইফতারি যেত। আমরা উৎসুক হয়ে থাকতাম প্রতিবেশীর ইফতারি খাওয়ার জন্য। বাড়ির ইফতারি আর প্রতিবেশীর ইফতারির মেন্যু ছিল অভিন্ন। সেই ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, মুড়ি। তারপরও নিজের বাড়িরটা ভালো লাগত না। একই অবস্থা হতো শবে বরাতের আগের সন্ধ্যায়। ডাল আর সুজির হালুয়া আর চালের আটার রুটি বাড়ি বাড়ি পাঠানো হতো। আর নিজের বাড়িরটা রেখে আমরা অন্য বাড়িরটা খেতেই পছন্দ করতাম। এখন আর সেদিন নেই। এই ব্যস্ত নাগরিক জীবনে কারো সময় নেই বাটি চালাচালি করার। কেউ কাউকে চেনে না পর্যন্ত। তখন পাড়াপ্রতিবেশীর মধ্যে চাল থেকে শুরু করে নুনকাঁচামরিচ পর্যন্ত ধারের রেওয়াজ ছিল। ফেরত দেয়ার সময় সবাই কম দেয়ার চেষ্টা করত এ অপবাদও ছিল। যেমন বড় সাইজের ডিম নিয়ে ছোট ডিম দেয়া, বড় কাপে ডাল নিয়ে আঙুল ডুবিয়ে ডাল কম দেয়া, চামচে উঁচু উঁচু করে লবণ নিয়ে কম লবণ দেয়া, বড় মরিচের জায়গায় ছোট মরিচ দেয়া, এসব। আর এই দেয়ানেয়ার মধ্যে অদ্ভুত ধরনের একটা আনন্দও ছিল। এখন সব উধাও। এই করপোরেট যুগে আমার সেদিনের ইফতারির মতো কখনো কোনো শিল্পপতি, কোনো প্রতিষ্ঠান ইফতারি বিতরণ করে, কাকে করা হলো সে তা নিজেও জানে না। আর যে পেল সেও অস্বস্তিতে ভোগে। আর এ ধরনের প্রেরণ এবং গ্রহণ প্রায়ই হয় লাভলোকসানের হিসাবে।

দিন সত্যিই বদলেছে। ছেলেবেলায় বাবামা শিখিয়েছেন গুরুজনকে মান্য করতে হবে, অন্যের মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দিতে হবে, অন্যের মতামতকে দাম দিতে হবে। সে সব এখন উধাও। ছেলেবেলার শিক্ষা বহন করে চলেছি আজ অবধি। কখনো গুরুজনের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি বলে মনে পড়ে না। হেলান দিয়ে বসেছি বলে মনে পড়ে না। আর পায়ের ওপরে পা তুলে বসার তো প্রশ্নই ওঠে না। শিক্ষকদের রেখেছি মাথায় করে। আজকাল ছাত্রশিক্ষক বোঝা যায় না। ছাত্র শিক্ষকের সামনে দিব্যি পায়ের ওপর পা তুলে বসছে, হেলান দিয়ে বসছে। শিক্ষক ছাত্রের সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছেন। এক সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়ছেন। চা খেতে খেতে গুলতানি মারছেন। নানা ধরনের গসিপ আর নোংরা জোকস বলছেন। অনেকে হয়তো বলবেন, ‘বেশ তো, এটা খারাপ কী। শিক্ষকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলে পড়াশোনা ভালো হয়। ছাত্র যদি শিক্ষককে ভয় পায় তাহলে জড়তা কাটে না। ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। দেখেন না বিদেশেইত্যাদি ইত্যাদি।বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আর এক সঙ্গে বিড়িসিগারেট টানা এক বিষয় নয়। বিদেশ বিদেশই। তাদের সংস্কৃতি, আদবকায়দা সব তাদের মতো। আমাদের সঙ্গে কিছুই মেলে না। কথায় আছে, ‘যস্মিন দেশ যদাচার। বন্ধু হতে হতে আজকাল এমন অবস্থা হয়েছে যে, ছাত্ররা শিক্ষকদের অবরোধ করে রাখতেও পিছপা হয় না।

বড়দের সঙ্গে শিষ্টাচার আর ভদ্রতার সঙ্গে কথা বলা আর ছোটদের সঙ্গে আদরস্নেহের সঙ্গে কথা বলতেই শিখেছিলাম আমরা। ছোটরা ছোট বলেই তাদের তাচ্ছিল্য করা যাবে না, তাদের যথেষ্ট স্নেহ করে কাছে টেনে কথা বলতে হবে, আর ছোটবেলাতেই তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে তাদের বড়দের মতোই আত্মমর্যাদা আছে। এসব আজকাল কজন মানে? আমাদের ছেলেবেলায় মনে পড়ে না কেউ কখনো আমাদের অবমূল্যায়ন করেছে। আবার অতি আদর দিয়েও কেউ বেয়াড়া বানায়নি। আজকাল অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে বাড়তি আদর, বাড়তি সুযোগ দেয়া হয়। ফলে ছেলেবেলা থেকেই অতিরিক্ত পেতে পেতে তারা লাগামছাড়া হয়ে যায়। কাউকে কিছু দেয়া বা ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা তাদের থাকে না।

নৈতিকতা, আদবশিষ্টাচার এসব শব্দ এখন অন্তর্হিত প্রায়। বাবামা শিখিয়েছিলেন, ‘কথা বলবে হাসি মুখে, ভদ্রভাবে। কখনো যেন ঔদ্ধত্য বা অহংকার প্রকাশ না পায়।হাসিমুখ তো আজকাল দুরবিন দিয়ে খুঁজতে হয়। সবাই যেন রেগে আছে। মেজাজ সবার মাথায় চড়ে আছে এমনই অবস্থা । অন্যের কথা শোনার ধৈর্য কারোই এখন নেই। নিজেই বলবে এবং বলবে জোরে জোরে, গলা ফাটিয়ে। যেন চারপাশের সব লোক বধির, কেউ কানে শোনে না। আর নিজে যা বলবে তা প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে, এমন একটা চিন্তা আজকাল অধিকাংশ মানুষের মধ্যে। কথা যখন শুরু করে বলতেই থাকে, থামাথামি নেই। বেশি কথা বললে যে মানুষ বাচাল বলে, ব্যক্তিত্বহীন বলে আর বেশি কথা বললে যে ভুল বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা জেনেও বেশি কথা বলতেই হবে এমনই পণ। ভদ্রতা, বিনয় আজকাল প্রায় বিলুপ্ত শব্দ।

অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার দিকে তাকিয়ে কথা শোনা আর তার কথা শেষ হলে নিজের কথা বলার যখন সময় তখন কথা বলা এটাই ছিল আমাদের শিক্ষা। এ শিক্ষা আজকাল বাতিল। অন্যকে কথা বলতে না দেয়া, তার কথায় বাধা দেয়াই একালের শিক্ষা।

আর কথা বলার সময় দাঁত খোঁচানো, নাকে হাত দেয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা এসব তো ডালভাত। রাস্তায় চলতে চলতে সেখানে সেখানে থুতু ফেলা, সর্দিকফ ফেলা, কাগজের টুকরো ছুড়ে মারা এগুলো নিত্যকার ব্যাপার।

আমাদের ছেলেবেলায় বাসগুলোতে মহিলাদের জন্য আলাদা সিট থাকত। তারপরও দেখেছি মহিলা সিট ফিলআপ হয়ে যাওয়ার পর যদি কোনো অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বা কোনো বৃৃদ্ধবৃদ্ধা বা যার হাতে অনেক জিনিসপত্র আছে এমন মানুষ বাসে উঠতেন পুরুষরা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাদের বসতে দিতেন। কেউ লজ্জা করে বসতে না চাইলে বিনয়ের সঙ্গে তাকে বসতে অনুরোধ করতেন। বাসে এখনো মহিলা সিট আছে। কিন্তু মহিলাকে নিজের সিট ছেড়ে দেয়ার মতো ব্যাপার আজকাল খুবই কম চোখে পড়ে। বরং বিপরীত উচ্চারণ শুনি, ‘সারাক্ষণ সমঅধিকার সমঅধিকারের কথা বলেন, বাসে এলেই অবলা হয়ে যান।

আর পাবলিক বাসট্রেনে বুঝিনি বুঝিনি করে মেয়েদের শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেয়া তো নৈমিত্তিক ঘটনা। মেয়েরাও লজ্জায় কিছু বলতে পারে না।

বাড়িতে কেউ এলে তাকে সমাদরের সঙ্গে গ্রহণ করা, দরজা খুলে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া, আন্তরিকতার সঙ্গে বসতে দেয়া এসবও আজকাল উঠে যাচ্ছে। বেল বাজানোর পর দরজা খুলতেই বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায়। হ্যাঁ, আজকাল নিরাপত্তার ব্যাপারটা একটা বড় বিষয় মানি। কিন্তু চেনাজানা মানুষ হলেও আগের সেই আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকাল মানুষ মানুষের শরীর আর মন বুঝে কথাও বলে না। দেখা যায় একজন অসুস্থ মানুষের শয্যার পাশে বসে ইউরোপআমেরিকার গল্প করতে থাকে কিংবা হসপিটালে পেশেন্টের পাশে বসে ছেলের বিয়ের গল্প জুড়ে দেয়। মৃতের কুলখানি বা চল্লিশায় গিয়ে শাড়িগয়নার গল্প শুরু হয়। এতে যে যিনি অসুস্থ বা যার বাড়িতে স্বজন মারা গেছে তারা কতটা আহত হন, তা বোঝার মতো বোধবুদ্ধিও হারিয়েছে আজকালের আধুনিক মানুষ।

আর এক অত্যাচার টেলিফোন। সকাল নেই সন্ধ্যা নেই, ফোন বাজছে তো বাজছেই। বাড়িতে অসুস্থ রোগী থাকতে পারে, শিশু থাকতে পারে, তাদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। সে চিন্তা যিনি ফোন করছেন তার নেই। আর ফোনের সময়জ্ঞানও নেই। চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এটা কি খাওয়ার সময় না ঘুমানোর সময়, নাকি অফিসের সময় সে চিন্তাও কারো নেই। যাকে ফোন করা হয়েছে তিনি হয়তো লজ্জায় কিছু বলতে পারছেন না, অথবা দুএক বার বলার চেষ্টা করেছেন, ভাই! এখন আমি একটু ব্যস্তকিন্তু তার কথা শোনার ধৈর্য ওপারের ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলার হচ্ছে না। তিনি বলেই চলেছেন। এ চলা অন্তহীন।

আর সবশেষ যন্ত্রণা ফেসবুক। এটা আধুনিক প্রযুক্তি। আগের দিনের মানুষ হলেও আপনি কতটা আর পিছিয়ে থাকবেন। ফেসবুক থেকে আপটুডেট নিউজ পাওয়া যায়, সময়ও কাটে ভালো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায় এই ভাবনা থেকে আপনি একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। রক্ষণশীল না হয়ে অচেনা কিছু মানুষকে বন্ধুও করেছেন সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য। আর যেই করেছেন সেই মরেছেন। ফেসবুকে বসতে না বসতেই শুরু হবে, হাই হুই, নানা রকমের প্রস্তাব। ম্যাসেঞ্জারে কল আসবে আপনার কাছে। আপনি ব্লক করতে শুরু করবেন। কিন্তু কজনকে করবেন?

এ অবস্থাতেই আছি আমরা। আমাদের ছেলেবেলায় এতো কিছু ছিল না। স্মার্টফোন ছিল না, ট্যাব, নোটবুক, ভাইভার, টুইটার কিছুই ছিল না। কিন্তু আমরা কি খুবই খারাপ ছিলাম? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো একবার। নির্মল বিনোদনের অজস্র উপকরণ ছিল তখন। পাড়ার সব ঘরই ছিল নিজের ঘর। সবাই সবার আত্মীয়।

আজ আমরা আধুনিকতা ও প্রযুক্তির বড়াই করি, বড়াই করি শিক্ষাদীক্ষারও। কিন্তু আমরা ভুলে যাই নৈতিকতা আর শিষ্টাচারের শিক্ষাই বড় শিক্ষা। ওই শিক্ষা না থাকলে কখনোই একজন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না।

কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

সূত্রঃ দৈনিক যায় যায় দিন, ২৮ জুন ২০১৬