আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর, 2015

শিশুদের আঁকা গ্রামবাংলার কিছু ছবি

village_sarat

village3-art

village-art3

rural-scene

rural4-art

bullock-cart

bedeni

rural-57

Advertisements

বাউল ও মরমি কবি হাছন রাজা

দেওয়ান সমশের রাজা চৌধুরী : মাটি ও মানুষের কবি, গ্রামবাংলার কবি, বাউল ও মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজা আজ থেকে ১৬০ বছর পূর্বে ১২৬১ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ মোতাবেক ২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ ইংরেজি সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। hason-rajaতার জীবন কাহিনী অতি গৌরবময়, যিনি প্রতাপশালী জমিদার হয়েও সব ভোগলালসা ত্যাগ করে একদিন সাধারণ জনগণ ও আমজনতার মাঝে বাউল ও মরমি গানের মাধ্যমে বিলীন হয়ে গিয়েছেন। হাছন রাজা লিখিত প্রথম গানের বই ‘হাছন উদাস’, সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন তার পুত্র মরহুম দেওয়ান গণিউর রাজা। পরবর্তীকালে ১৯৭৮ ইংরেজি সালে ‘হাছন রাজার তিন পুরুষ’ শিরোনামে হাছন রাজার দ্বিতীয় গানের বই প্রকাশ হয়। হাছন রাজার নাম দেশেবিদেশে প্রসিদ্ধ। তার লেখা মরমি গান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে শ্রোতা ও শিল্পীদের মনে ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছে। তার লেখা মরমি সংগীত লেখক, গবেষক ও আমজনতাসহ বহির্বিশ্বে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আরো চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এখন পর্যন্ত মানসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নির্মিত হলেও হতে পারে। মরমি কবি হাছন রাজার জীবনী সম্পর্কে অনেকে ভুলভ্রান্তিতে রয়েছেন। মরমি কবির জন্মস্থান লক্ষণশ্রী হলেও তার পিতা মরহুম দেওয়ান আলী রাজা বিশ্বনাথ উপজেলার অন্তর্গত রামপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেওয়ান আলী রাজা ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র দেওয়ান উবেদুর রাজা তাদের কবর রামপাশা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে অবস্থিত। এই বংশের প্রথম মুসলমান রাজা বাবু রায় সিংহ, যার মুসলমানি নাম দেওয়ান বাবুর রাজা খান। তার সমাধি স্থান রামপাশা গ্রামে হাছন রাজার পিতার পাশে অবস্থিত। মরমি কবি হাছন রাজার পূর্বপুরুষরা আর্য বংশোদ্ভূত ক্ষত্রীয় ছিলেন। তারা যুক্ত প্রদেশের অযোধ্যা থেকে যশোর হয়ে সিলেটে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের পূর্বপুরুষ রাজা বিজয় সিংহ দেব তার পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র সিংহের নামানুসারে বর্তমান বিশ্বনাথ উপজেলার অন্তর্গত রামপাশা গ্রামে গোড়াপত্তন করেন। হাছন রাজার পিতা দেওয়ান আলী রাজা লক্ষণশ্রীর জমিদার আমির চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী হুরমত জাহান বানুকে বিবাহ করে লক্ষণশ্রী জমিদারী লাভ করেন। ইংরেজ শাসনামলে হাছন রাজার পিতা বৃহত্তর সিলেটের বিখ্যাত জমিদার ছিলেন। সিলেটের বিশ্বনাথ থানার কৌড়িয়া পরগনার বিশাল রামপাশা এস্টেট ছাড়াও সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী, চামতলা, মহারাম, পাগলা, লাউড় ও বর্তমান ভারতের করিমগঞ্জের অনেক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তাদের সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৩৫ লাখ বিঘা ছিল। কিশোর বয়সে তিনি তার বৈমাত্রের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেওয়ান উবেদুর রাজাকে হারান। এ শোকের ৪০ দিন কাটার আগেই তার পিতা দেওয়ান আলী রাজা মৃত্যুবরণ করেন। ওই সময় তার মা হুরমত জাহান বানু তাকে জমিদারী দেখার ভার দেন। অল্প বয়সে এত সম্পত্তির মালিক হওয়ার কিছুটা আবেগহীন বিলাসী জীবনযাপনের দিকে ধাবিত হন। তিনি ভাওয়ালী নৌকা এবং ঘোড়ায় চড়তে পছন্দ করতেন। জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি ইংরেজি বিদ্বেষী ছিলেন। পরাধীনতা পছন্দ করতেন না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, মরমি কবি হাছন রাজা সম্পর্কে যতটুকু গবেষণা করার কথা ছিল ততটুকু এখন পর্যন্ত হয়নি। হাছন রাজা শুধু পারিবারিক বেষ্টনীতে আবদ্ধ মরমি কবি নন। তিনি সর্বসাধারণের কবি ও আপনজন। দেওয়ান হাছন রাজা দানশীল হলেও ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি জমিদার ছিলেন। দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে মুক্তহস্তে দান করতেন বটে। তবে ভণ্ডপীরদরবেশদেরও পর্যাপ্ত টাকাকড়ি, এমনকি হাতিঘোড়া পর্যন্ত দান করতে দেখা গেছে। হাছন রাজা ইচ্ছে করলেই প্রাসাদতুল্য দালানকোঠা তৈরি করতে পারতেন বটে, কিন্তু তিনি কস্মিনকালেও ঘরবাড়ির প্রতি লক্ষ্য দিতেন না। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ হাছন রাজার গানের ভক্ত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সেলিম চৌধুরীকে দিয়ে ‘বাউলা কে বানাইলরে’ গানের সিডি বের করেন। তার জনপ্রিয় নাটক ‘আজ রবিবার’এর প্রতি পর্বে হাছন রাজার গান সন্নিবেশিত করে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে হাছন রাজার গান জনপ্রিয় করেছেন।

কবি ও গীতিকার রজনীকান্ত সেন

আখতার হামিদ খান : দেশাত্মবোধক ও ভক্তিমূলক গানের জন্য প্রসিদ্ধ রজনীকান্ত সেন ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই পাবনার ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গুরুপ্রসাদ ও মাতা মনোমোহিনী দেবীর তিনি তৃতীয় সন্তান। গুরুপ্রসাদ সাবজজ হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন এবং পদচিন্তা মণিমালা নামে ৪০০ বৈষ্ণব ব্রজবুলির একটি সংকলন প্রকাশ করেন। মনোমোহিনী দেবীরও সাহিত্যে বুৎপত্তি ছিলেন।rajani-kanta-sen

বদলি সূত্রে পিতার কাটোয়ায় অবস্থানকালে রজনীকান্তের জন্ম হয়। এই সুবাদে তার শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয় বাংলা ও বাংলাসান্নিহিত নানান স্থানে। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বোয়ালিয়া জেলা স্কুল (বর্তমানে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল) থেকে মাসিক ১০ টাকা জলপানিসহ রজনীকান্ত দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। দ্বিতীয় বিভাগে এফএ পাস করে রজনীকান্ত সিটি কলেজে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৮৮৯ সালে বিএ পাস করেন। দু’বছর পর তিনি আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন।

জন্মসূত্রে সাহিত্যপ্রীতি আর কৈশোরে সঙ্গীতপ্রীতির উন্মেশ ঘটে বন্ধু তারকেশ্বর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে। রজনীকান্ত শৈশব থেকেই বাংলা ও সংস্কৃতে কবিতা লিখেত পারঙ্গম ছিলেন। স্থানীয় উৎসাহ, আশালতা প্রভৃতি পত্রিকায় তার বহু কবিতা প্রকাশিত হয়। কলেজজীবনে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ও সমাপনী সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। রাজশাহী লাইব্রেরির সম্মিলনে রজনীকান্ত মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে লেখেন

তব, চরণ নিম্নে, উৎসবময়ী শ্যামধরণী সরসা:
ঊর্ধ্বে চাহ অগণিত মণিরঞ্জিত নভোলীলাঞ্চনা
সৌমামধুর দিব্যাঙ্গনা শান্তকুশলদরশা।

১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কলকাতার টাউন হলের সমাবেশ উপলক্ষে রজনীকান্ত লিখলেন

মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই
দীন দুখিনী মা যে তোদের তার বেশি আর সাধ্য নাই।

গানটি সবার মুখে মুখে গীত হতে থাকে। তার নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কবি স্বদেশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লিখছেন

আমরা নেহাত গরীব, আমরা নেহাত ছোট
তবু আছি সাত কোটি ভাইজেগে ওঠ!

এই গানের বাকি অংশে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আহ্বান ছিল। তার আরেকটি ভক্তিগীতি আজও প্রার্থনা সভায় গীত হয়

তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে, মলিন মর্ম মুছায়ে;
তব পুণ্য কিরণ দিয়ে যাক মোর মোহ কালিমা ঘুচায়ে।

শিক্ষাশেষে রজনীকান্ত রাজশাহীতে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। সেখানে তার জ্যাঠামশায় ছিলেন নামকরা উকিল। ফলে অল্পকালের মধ্যেই তিনি পসার লাভ করেন। ইতোমধ্যে পিতার স্বেচ্ছা অবসর ও দুই জ্যাঠাত ভাইয়ের আকস্মিক প্রয়াণে বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। ১৮৮৩ সালে তিনি হিরণময়ী দেবীকে বিবাহ করেন। তাদের শচীন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্র, ভূপেন্দ্র ও ক্ষিতীন্দ্র নামে চারপুত্র এবং শতদলবাসিনী ও শান্তিবালা নামে দুই কন্যাসন্তান জন্মে। অকালপ্রয়াত ভূপেন্দ্র স্মরণে শোকসন্তপ্ত কবি লিখলেন

তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুখ,
তোমারি দেওয়া বুকে, তোমারি অনুভব।
তোমারি দু’নয়নে তোমারি শোক বারি,
তোমারি ব্যাকুলতা তোমারি হা হা রব।

আইন ব্যবসায়ের চেয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় ছিল তার অধিক মনোযোগ। এ সময় তিনি বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র সংস্পর্শে আসেন। কিছুকাল মুনসেফ পদেও কাজ করেন। সময় ও মনোযোগ না দেয়ায় আইন ব্যবসায়ে ধীরে ধীরে পসার কমতে থাকে। সংসারে দেখা দেয় অর্থ সংকট।

১৯০৯ সালে তার গলায় সমস্যা দেখা দেয়। নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও তাকে চিকিৎসার জন্যে কলকাতা নেয়া হয়। ধরা পড়ে ল্যারিংস ক্যানসার। স্রষ্টার বিশ্বাসী কবি মনোবল হারাননিমনের শান্তির জন্য কিছুকাল বারানসী বাস করে পুনরায় কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতা মেডিকেলে ভর্তি হন। এসময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবিকে দেখতে যান রবীন্দ্রনাথ। তাকে গান গেয়ে শোনান কবির দুই পুত্রকন্যা ক্ষিতীন্দ্র ও শান্তিবালা, হারমোনিয়াম রাজান স্বয়ং কবি।

রবীন্দ্রনাথের বিদায়ের পর আবেগাপ্লুত কবি লিখলেন

আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করেছে, গর্ব করিতে চুর,
তাই যশ ও অর্থ, মান ও স্বাস্থ্য, সকলি করেছে দূর।
ঐগুলো সব মায়াময় রূপে, ফেলেছিল মোরে অহমিকাকূপে,
তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল করেছে দীন আতুর।

রজনীকান্ত কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের বোলপুরের ঠিকানায় পাঠান। কবিতাটি পড়ে বেদনার্ত রবীন্দ্রনাথ তার অনিঃশেষ প্রাণশক্তি ও অদম্য মনোবলের প্রশংসা করে একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন।

রজনীকান্তের জীবৎকালে বাণী (১৯০২), কল্যাণী (১৯০৫) ও অমৃতা (১৯১০) এবং মৃত্যুর পরে অভয়া (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), সদ্ভাবকুসুম (১৯১৩) ও শেষ দান (১৯১৬) নামে আটটি কাব্য ও গীতি সংকলন প্রকাশিত হয়। তার রচিত ও গীত অধিকাংশ গান কীর্তন, বাউল, টপ্প মিশ্রিত হিন্দুস্তানী রাগাশ্রয়ী। কান্তকবি নামে সমধিক পরিচিত রজনীকান্তের গান কান্তগীতি নামে উত্তরকালে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

ফিরে দেখাঃ ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্থিরচিত্র

71-murders

1971-refugees

fighters-watch

women during liberation war

71-murder

 

 

বিয়েতে প্রচলিত কিছু পুরনো কুসংস্কারের নমুনা

ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা চলছে অনেক দিন থেকেই। কাউকে ছেলের মনে ধরে তো ছেলের মাখালাফুফুর মনে ধরে না। একের পর এক মেয়ে দেখা চলছেই। অনেক ক্ষেত্রেই এই আদিখ্যেতা ‘বিয়ে’ নামক সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌলিক অংশ। এতে যে মেয়েদের ছোট করা হচ্ছে তা নারী হয়েও আমাদের মা, খালা, ফুফুদের তখন মনে থাকে না। বরকনের একটি অসফল দেখাদেখি পর্ব বাস্তবে জন্ম দেয় নানা দুঃখজনক ঘটনার। পাত্রী ও পাত্রীপক্ষ মনোবেদনা, অসম্মান, প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণার শিকার হয়। এ নিয়ে গল্পের শেষ নেই আমাদের চারপাশে।marriage-5

পাত্রী উচ্চশিক্ষিত। দেখতেশুনতেও ভালো। চলনেবলনে কোনো দোষ নেই। পাত্রী দেখাদেখি হলো, কিন্তু বিয়ে হলো না। পাত্রের কোনো এক চাচাকে পাত্রী নাকি ‘যথাযথ’ সম্মান দেয়নি। এ ঘটনার শিকার সেই মেয়ে এতটাই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল যে তাকে মনোরোগ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল।

বিয়েবাড়ির গেট। চলছে হৈহল্লা। কে জেতে কে হারে? মানইজ্জতের প্রশ্ন। যেভাবেই হোক বরপক্ষকে ভেতরে ঢুকতে হবেই। সেই যে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হলো তা যেন আর শেষ হয় না। এই পর্বটা খুনসুটি পর্যন্ত থাকলেই ভালো। কিন্তু অনেক সময় এই মজা আর মজার পর্যায়ে থাকে না। পাত্রপক্ষ বলে কথা। বড়াইবড়ত্ব তো দেখাতেই হবে।

বিয়ের অনুষ্ঠানে হোক কিংবা খাওয়াদাওয়া পর্বেই হোক—পাত্রীপক্ষকে হেয় করতেই হবে যে। আর এ কাজে রয়েছে অনেক রকম অস্ত্র। আগেও চল ছিল—এখনো মফস্বলে অনেক জায়গায় বরপক্ষ ভোজনপটু লোকজন নিয়ে যায় সঙ্গে। উদ্দেশ্য—১০ জনের খাবার একা সাবাড় করে পাত্রীপক্ষকে ‘ডাউন’ দেবে। পাত্রীপক্ষকে জব্দ করতে না পারলে আর মজা কোথায়!
এই চল নতুন নয়। এই ধারাকে বদলানোর কোনো প্রয়াসও দেখা যায় না অনেক ক্ষেত্রে। বরং বিয়ের অনুষ্ঠানের নিছক নির্দোষ আনন্দ বলে আখ্যা দিয়ে চালু রাখা হচ্ছে এখনো। পাত্র ভোজনপটু হোক না হোক, তার জন্য আস্ত খাসির রোস্ট চাইই চাই। এক ডজন আস্ত মুরগির রোস্টও চাই।

মানুন বা নাই মানুন, যৌতুককে আমরা বিদায় দিতে পারিনি এখনো। গোপন নানা কেতায় টিকে আছে যৌতুক। আর তাই এখনো যৌতুকের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হচ্ছে সচেতন মানুষকে। নানা শাস্তির বিধান সত্ত্বেও তা চলছে।

পাত্র যৌতুকের একদম বিরুদ্ধে। কিন্তু তাকে একটা মোটরসাইকেল উপহার দিলে মন্দ হয় না। সেটায় চড়ে বউকে নিয়ে সাড়ম্বরে শ্বশুরবাড়ি যেতে পারবে। খাট, লেপ তোশক, চাদর, বালিশ, এলইডি টিভি, প্রেশার কুকার, হাঁড়িপাতিল, ড্রেসিং টেবিলসহ নানা আসবাব না দিলে সেটা কেমন দেখায়! সংগতি থাকলে ফ্ল্যাটজমিপ্লট দিলে আরও ভালো। কন্যা তাতে সুখে থাকবে। থাকাখাওয়া নিয়ে কন্যাকে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না যে! এমন একখানা নামজাদা বিরল পাত্র পাওয়া গেছে—তাকে যত দেওয়া যায়, ততই তো মঙ্গল। এতেই যেন মেয়ের সুখ! এটাওটা নানা ভুজংভাজুং করে এই যে উপহারের মোড়কে যৌতুক নেওয়া—এটাও বরপক্ষের বড়ত্ব জাহিরেরই অংশ।

কন্যারই হোক কিংবা পুত্রের, বিয়ে তো বিয়েই। অথচ আমরা দুটি ক্ষেত্রে দুই রকম আচরণ করি। নিজের মেয়ের বেলায় দেখা যায় বেশ কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে পাত্রপক্ষকে আপ্যায়ন করতে। ভাবখানা মেয়ের বিয়ে তো নয়—জীবনের কঠিন কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বলার চল আছে এখনো। যদিও এখনকার নারী স্বাবলম্বী। সে আর মাবাবার দায় নয়। লেখাপড়া জানে। চাকরিবাকরি করে। অর্থকরী কাজে নারী যুক্ত। সমাজে, সংসারে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাকে নিয়ে কাঁচুমাচু হতে হবে কেন?

আসলে আমরা ভুগছি হাজার বছরের পুরোনো কুসংস্কারে। এটাকে কখনো সামাজিক আচার, বৈবাহিক সংস্কৃতি, কালচার, ধর্মীয় আচরণের নামে আধুনিক আলোকিত জমানাতেও টিকিয়ে রাখতে চাইছি।

পাত্রীকে বা তার আত্মীয়স্বজনকে ছোট হতেই হবে। বিয়ের আগে যে মেয়ে গান গাইত, বিয়ের পর তাকে তা ছাড়তেই হবে। নাচলে সে যেন অপরাধ। আবৃত্তি করলে সেটাও বাদ। ঘরের বউয়ের গলা উঁচু হবে কেন! কী করবে ঘরের বউ! শুধু ঘরকন্না করবে। রান্নাবান্না করবে। সন্তানের জন্ম দেবে, লালনপালন করবে। ঘর সামলাবে।

অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে চারপাশে। এমনও আবদার করা হয়—বিয়ের পর পাত্রীকে চাকরি ছাড়তে হবে। ভালো চাকরি। ভালো বেতন। মেয়েটি নিজের পায়ে দাঁড়ানো। নাহ্! পাত্রী হিসেবে একদম অচল। চাকরি ছাড়িয়ে যদি বউকে ঘরদোরের কাজের গৃহকর্মী না বানানো যায়, তাহলে পাত্রের সম্মানটা থাকে কোথায়!

কেউ কেউ আছেন, মেয়ের বিয়ের সময় যদি একবার ঠকে যান তবে সেটা ষোলো আনা তুলে আনতে চান ছেলেকে বিয়ে করিয়ে আনার মাধ্যমে। এ যেন প্রতিশোধপর্ব। অনেকে নিজের বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে বিশেষ কিছু পাননি। কিন্তু সেই খেদ মনে মনে আজও বয়ে চলেছেন। সেটাও পুষিয়ে ফেলতে চান ছেলেকে বিয়ে করানোর মাধ্যমে। ছেলেকে পণ্য বানিয়ে ছাড়েন নিজেদের অজান্তেই। অথচ পাত্রীর যোগ্যতা বিভিন্ন গুণা দুই পক্ষের সমঝোতা—যেগুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার সেসব বিষয়ে চোখ বুজে থাকে সবাই।

যা চলছে বিয়ের নামে

পানচিনি, হলুদসন্ধ্যা, বিয়ে, বউভাত—এই চারটি অনুষ্ঠান সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক করতে হবে কনভেনশন সেন্টারে। নিদেনপক্ষে পাড়ার কোনো কমিউনিটি সেন্টারে। এটা নাকি স্ট্যাটাস সিম্বল। আর তা চাপিয়ে দেওয়া হয় কনেপক্ষের ওপর। এ রকমই ঘটনার শিকার আমার কাছে আসা এক মেয়ে। ছেলের আগে একটা বিয়ে হয়েছিল। সেটা যে কোনো কারণেই হোক ভেঙে গেছে। বিয়ের যখন আলাপ চলছিল, পাত্র একদম তা লুকিয়ে গেছে। জানাজানি হলো বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন। বিয়ের পিঁড়িতে বসে এটা জানলে মনের অবস্থা কী হয়? নববিবাহিত মেয়েটির প্রশ্নে আমি বিব্রত। সে কেঁদেই চলছিল। তার এখন মনোসমস্যা হলো—মেয়েটি এখন কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে চায় না। গেলেই সেই দুঃসহ মুহূর্তের দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে। কাজের মাঝখানেও সেই কথা মনে আসে। আনমনা হয়ে যায়। অস্থিরতা বোধ করে।

বিয়ের নানা আয়োজন অবশ্যই হবে। কনেপক্ষ, বরপক্ষ অবশ্যই উৎসব করবে। কিন্তু তাতে সমতা থাকা চাই। কনেপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। গয়নাগাটি, বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান—বরের নানা চাহিদা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। এগুলো হবে উভয় পক্ষের আন্তরিকতার ভিত্তিতে। সংগতি অনুযায়ী সব হবে।

কেন এই জটিলতা

নিজের অতৃপ্তি, অপ্রাপ্তি মানুষ তার ছেলেমেয়ের মধ্য দিয়ে পূরণ করতে চায়। যার যেটা অভাব, স্বাভাবিকভাবেই সেটা সে পূরণ করতে চাইবে। নিজে পারেনি বলেই মানুষ ছেলেমেয়ের মধ্য দিয়ে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে চায়। অনেক সময় নিজের বাস্তব জ্ঞানের আলোকে সন্তানদের আলোকিত করতে চায়। কিন্তু প্রলুব্ধ মন যখন চোখে পর্দা ফেলে, তখন জটিলতা তো দেখা দেবেই।

এভাবে কত দিন চলবে

হাসপাতালে ভর্তি হলো ২২২৩ বছরের একটা মেয়ে। হুইলচেয়ারে বসা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমার রুমের দরজার সামনে। কথা বলতে পারছে না, হাঁটতেও পারছে না সপ্তাহ খানেক হলো। কথা বলে জানা গেল, মেয়েটির বিয়ে হয়েছে তিনচার বছর। বাবার আর্থিক সচ্ছলতা তেমন নয়। একটি ছেলেও আছে। মেয়েটির অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে গেছে মেয়েটির বাবা। হাতে এক কেজি ফজলি আম। শাশুড়ি তেলেবেগুনে জ্বলে গেলেন। কোন সাহসে তাঁর বেয়াই মাত্র এক কেজি আম নিয়ে তাকে দেখতে গেলেন? এ নিয়ে বাবার সামনেই মেয়েকে যা মন চায় বললেন। বাবা চলে গেলেন। আর মেয়েটি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেল। ভর্তি হলো হাসপাতালে।

যা হলে ভালো হয়

* এই গ্লানির বাস্তবতা বছরের পর বছর ধরে চলছে। নাটকে, উপন্যাসে এখনো পাত্র বিয়ের সময় মাকে বলে, ‘তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।’

* কেন বলে? এটা বলাই নাকি সামাজিক রীতি। যে মাকে দাসী এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুত্র যাচ্ছে, বলা বাহুল্য; সেই মাও একদিন দাসীর মর্যাদা নিয়েই এই সংসারের চৌকাঠে পা দিয়েছিলেন।

* এটা গল্প বা নাটকের হলেও বাস্তবে এ থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। মনে মনে এই প্রবৃত্তিই ধারণ করে চলেছি।
*
আর তাই নিজের মননকে শুদ্ধ করতে হবে আগে। পাত্রী বা পাত্রীপক্ষকে হেয় করার প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রে একটা কথা আছে—ইমপ্যাথেটিক অ্যাটিচ্যুড। অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাত্রপক্ষ হিসেবে যে জুতোয় পা গলিয়ে খুব হামবড়াই করা হলো; পাত্রীপক্ষ হলে একই ব্যক্তি বা পক্ষকে সেই জুতো খুলে অসম্মানের শিকার হতে হচ্ছে। সুতরাং রুচি, অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালেই তো হয়। বিবাহ ও সংসার নামক সামাজিক সংগঠন মানবজাতির ইতিহাসে অনিবার্য ও ইতিবাচক অংশ। নর ও নারী; পাত্র ও পাত্রী—উভয়কে নিয়েই এই সংসার। তারাই সংসারের ওতপ্রোত জরুরি অঙ্গ। অপর পক্ষকে হেয় না করে সম্মানের ও মর্যাদার সম্ভ্রম প্রতিষ্ঠাই এই বিবাহ সংগঠনকে মজবুত ভিত্তি দেবে।

সুলতানা আলগিন : সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

প্রথম আলোঃ ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

আবিষ্কৃত হলো বাংলার অজানা ইতিহাস

মোরসালিন মিজান ॥ প্রাচীন বাংলার ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে বহুকাল ধরে চলা বন্ধ্যত্ব দূর হলো। আবিষ্কৃত হলো বর্তমান বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের প্রাচীন ইতিহাস। জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত মুদ্রা তাম্রলিপি ইত্যাদির পাঠোদ্ধার ও গবেষণা শেষে বিস্ময়কর এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি এ কাজ সম্পন্ন করেছেন নিবেদিত প্রাণ তরুণ গবেষক ড. শরিফুল ইসলাম। বিরল এই গবেষণা কর্মের সমষ্টি তাঁর লেখা গ্রন্থ– New light on the History of Ancient South-East Bengal.. এতে প্রাচীন বাংলার ধারাবাহিক ইতিহাসটি স্বগৌরবে সামনে এসেছে। পূর্বের কিছু তথ্য ভুল প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি, পাওয়া গেছে এই অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস।bd-ancient-artefacts

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস বার বার পঠিত। বহুকাল ধরে স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এখানে বর্তমান বাংলাদেশটাই অনুপস্থিত! বাংলাদেশের খুব সামান্য অংশ প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কথা বাদ দিলে, বাকিটুকু বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস। এভাবে দীর্ঘকাল ধরে ইতিহাস শূন্য হয়ে ছিল বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড।

জানা যায়, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলার প্রাচীন ইতিহাস পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় বিশ শতকের গোড়ার দিকে। বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ওপর বর্তমানে তিনটি প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থ রয়েছে। প্রথমটি রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত ‘হিস্টোরি অব বেঙ্গল, ভলিয়ম ওয়ান’। দ্বিতীয়টি নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস, আদিপর্ব।’ তৃতীয় গ্রন্থটি আব্দুল মমিন চৌধুরীর ‘ডাইনেস্টিক হিস্টোরি অব বেঙ্গল।’ কিন্তু সব গ্রন্থেই বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণপূর্ব বাংলার ইতিহাস লেখা হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন থেকে বারো পৃষ্ঠা। ড. হারুনঅররশীদ “Early History of South-East Bengal” শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর ক্যামব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি থিসিস। এ গ্রন্থে শুধু ময়নামতির খননে প্রাপ্ত নিদর্শনের বর্ণনা পাওয়া যায়। দক্ষিণপূর্ব বাংলার ধারাবাহিক ইতিহাস ছিল যথারীতি অনুপস্থিত।

জানা যায়, ইতিহাসের এই শূন্যতা ঘোচাতেই কাজ শুরু করেন শরিফুল ইসলাম। জাতীয় জাদুঘরে অপ্রকাশিত অবস্থায় পড়ে থাকা প্রাচীন মুদ্রা তাম্রলিপির ধুলো পরিষ্কার করে এগুলোর পাঠোদ্ধারে মনোনিবেশ করেন তিনি। সে লক্ষ্যে জাতীয় জাদুঘরের এই কর্মকর্তা সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। প্রাচীন ব্রাহ্মী, খরোস্ট্রি, নাগরী ও প্রোটো বাংলা লিপি পড়ার সক্ষমতা অর্জন করেন। জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন লিপি ও মুদ্রাগুলোতে এসব ভাষায় খুদাই করা ছিল ঘটনাবহুল অতীত। সেখান থেকে তিনি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন প্রাচীন বাংলার বাকি ইতিহাস। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে নিভৃতে কাজ করে যান শরিফুল। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে থাকে ইতিহাস। গবেষণা কর্মের পূর্ণাঙ্গ ফল সম্প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ। এবার ৩০০ পৃষ্ঠার বই! পুরোটাজুড়ে বর্তমান বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড। খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগকে বর্তমান বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড ভাবা হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে বঙ্গ সমতট ও হরিকেল নামে পরিচিত এই অংশের ইতিহাস প্রথমবারের মতো তুলে আনতে সক্ষম হন ড. শরিফুল।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস বলতে এতদিন গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশের ইতিহাসকে বোঝাত। এর বাইরে দক্ষিণপূর্ব বাংলার যে সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে তা কারও জানা ছিল না। ড. শরিফুল ইসলাম দক্ষিণপূর্ব বাংলার সেই অজানা ইতিহাস তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গবেষণায় ওঠে এসেছে, প্রাচীনকালে বাংলার এ অঞ্চল একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। প্রাচীন গুপ্তউত্তর যুগে বাংলায় এই অংশে বিভিন্ন রাজবংশের উদ্ভব হয়েছিল। তাঁদের ছিল নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি।

বিগত দিনের লেখাপড়া বলে, গুপ্তশাসন শুধু উত্তর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রার পাঠোদ্ধারের ভিত্তিতে ড. শরিফুল ইসলাম প্রমাণ করতে সক্ষম হন, সমুদ্র গুপ্তের সময় বঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্তের সময় বঙ্গ সমতট ও হরিকেল অঞ্চলে গুপ্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অধ্যায়ে দক্ষিণপূর্ব বাংলায় গুপ্তশাসনের প্রভাব এবং বৈন্যগুপ্তের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বৈন্যগুপ্ত যে দ্বাদশাদিত্য নয়, প্রমাণিত হয়েছে সেটিও। এ অধ্যায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো সমতট থেকে শশাঙ্কের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার। নতুন এ গবেষণায় দেখা যায়, শশাঙ্ক এ অঞ্চলে রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের অপ্রকাশিত তাম্রলিপি পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে দ্বাদশাদিত্য নামে একজন নতুন রাজার ইতিহাস বর্ণনা করেন লেখক। এর আগে ইতিহাসে এই রাজার কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এ অংশে আরেকটি মৌলিক সংযোজন গোপচন্দ্রের মুদ্রা আবিষ্কার। ইতিহাসে এই প্রথম গোপচন্দ্রের মুদ্রা আবিষ্কার হলো। মুদ্রার সঠিক ইতিহাসটিও এলো সামনে। একই অধ্যায়ে সুধন্যাদিত্য নামে আরেকজন রাজার ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। জানা যায়, সুধন্যাদিত্যের ৯টি নতুন স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার হয়েছে। এসব মুদ্রার পাঠোদ্ধারের মাধ্যমেই পাওয়া যায় নতুন ইতিহাস।

গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে সমতটের রাত রাজাদের ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। ড. শরিফুল ইসলাম এই রাজবংশের একটি নতুন তাম্রলিপি আবিষ্কার ও পাঠোদ্ধার করেছেন। তা থেকে রাজবংশটির বহু অজানা তথ্য সামনে এসেছে। এ অধ্যায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, শ্রীধারণ রাত ও জীবধারণ রাতের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার। নতুন আবিষ্কৃত লিপি ও মুদ্রার ভিত্তিতে রাজবংশের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়েছে। বর্তমান গবেষণায় উঠে এসেছে, রাতগণ সমতট অঞ্চলে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। বংশ পরম্পরায় তাঁরা শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন।

গ্রন্থটির চতুর্থ অধ্যায় পাঠে জানা যায়, প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের নতুন এক রাজবংশের বংশাণুক্রমিক ইতিহাস। একইভাবে পঞ্চম অধ্যায়ে উঠে এসেছে দক্ষিণপূর্ব বাংলার খড়গ রাজাদের ইতিহাস। খড়গ রাজাদের বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার আবিষ্কার এ অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। এসব মুদ্রার ভিত্তিতে আবিষ্কৃত হয়েছে সর্বভট ও পৃথুভট নামে দুজন নতুন রাজার ইতিহাস। খড়গরা এতকাল বাংলার ইতিহাসে বৌদ্ধ রাজা নামে পরিচিত ছিলেন। গ্রন্থের লেখক প্রমাণ করেছেন, তাঁরা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য রাজা। খড়গ রাজাদের লিপি ও মুদ্রা বিশ্লেষণ করে অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে এই রাজবংশের বিস্তৃত ইতিহাস লেখা হয়েছে। নতুন গবেষণায় এই বংশের ৭ জন রাজার ধারাবাহিক ও বিস্তৃত ইতিহাস জানা যায়। একইসঙ্গে প্রচলিত ইতিহাসের বহু প্রতিষ্ঠিত ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এ অধ্যায়টি প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে মৌলিক অবদান হিসেবে গণ্য হবে।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে সমতটের আদি দেব রাজাদের বংশাণুক্রমিক ইতিহাস পাওয়া যায়। এ অধ্যায়েও স্বর্ণমুদ্রা ও লিপির ভিত্তিতে আদি দেব রাজবংশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বিধৃত হয়েছে।

গ্রন্থটির সপ্তম অধ্যায়ে দক্ষিণপূর্ব বাংলার চন্দ্র রাজাদের বিস্তৃত ইতিহাস। গবেষক অপ্রকাশিত দুটি নতুন তাম্রলিপির পাঠোদ্ধার ও বহু তথ্যের আলোকে চন্দ্র রাজাদের ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন। চন্দ্র রাজাদের উত্থানের বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায় এখানে। চন্দ্র রাজাদের আদি স্থান হরিকেল কোথায় ছিল, তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে, চন্দ্র রাজাগণ প্রথমে হরিকেলের আকর রাজাদের অনুগত সামন্ত ছিলেন। নতুন তথ্য বলছে, তাঁরা আরাকান থেকে আসেননি। তাঁদের আদিনিবাস বাংলায়। চন্দ্রদের শাসনামলে দেবপর্বত (ময়নামতী) থেকে রাজধানী বিক্রমপুরে স্থানান্তরিত হয়। তাঁরা বঙ্গসমতটহরিকেল সমগ্র দক্ষিণপূর্ব বাংলা জয় করে বিস্তৃত অভিন্ন রাজ্য গড়ে তোলেন। এ অধ্যায় পাঠে জানা যায়, কিভাবে বৌদ্ধ চন্দ্র রাজাগণ বৌদ্ধ পালরাজাদের দুঃসময়ে সাহায্য করেছিলেন। আবিষ্কৃত নতুন তথ্য মতে, চন্দ্র রাজাগণ দক্ষিণপূর্ব বাংলায় শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এ সময় দক্ষিণপূর্ব বাংলার খ্যাতি ও সমৃদ্ধি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। রাজধানী বিক্রমপুরের বিকাশ ঘটেছিল। প্রচলিত ইতিহাস বলে, শেষ দুই চন্দ্র রাজা গোবিন্দ চন্দ্র ও লডহ চন্দ্র বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ড. শরিফুল ইসলাম লিপিপাঠ ও নতুন তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, চন্দ্ররাজাগণ কখনও হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেনি। সকল চন্দ্ররাজাই ছিলেন ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ।

গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে বর্মণ এবং সেন পর্ব। এ অংশে দক্ষিণপূর্ব বাংলার ইতিহাস লেখা হয়েছে। বর্মণ রাজাগণ দাক্ষিণাত্য থেকে এসে কিভাবে দক্ষিণপূর্ব বাংলার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার একটি বিস্তৃত ইতিহাস এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। জানা যায়, . শরিফুল ইসলাম ১৯৬৭ সালে বিক্রমপুর থেকে প্রাপ্ত বর্মণ রাজাদের একটি শিলালিপি পাঠোদ্ধার করেন। নতুন আবিষ্কৃত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বর্মণ রাজাদের ধারাবাহিক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করেন। গ্রন্থটির একই অধ্যায়ে তিনি সেন রাজাদের বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থের দ্বাদশ অধ্যায়ে দক্ষিণপূর্ব বাংলার প্রাচীন নগর, রাজধানী শহর, প্রশাসনিক ও বাণিজ্য কেন্দ্রের ধারাবাহিক ও বিস্তৃত ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে উয়ারিবটেশ্বর, কোটালিপাড়া, সাভার, দেবপর্বত, বিক্রমপুর প্রভৃতি প্রাচীন প্রশাসনিক ও বাণিজ্য কেন্দ্রের ইতিহাস অপূর্ব দক্ষতায় লেখা হয়েছে। এ অংশে তথ্য দেয়া হয়, কোটালিপাড়া, সাভার ও দেবপর্বত (বর্তমান ময়নামতী) দক্ষিণপূর্ব বাংলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। এসব অঞ্চলের সঙ্গে শ্রীংহল, দাক্ষিণাত্য, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দক্ষিণপূর্ব বাংলা সমুদ্র উপকূলবেষ্টিত হওয়ায় এখানে মুদ্রা অর্থনীতি ও বহির্বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল।

এভাবে প্রাচীন বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটির সন্ধান দেয় New light on the History of Ancient South-East Bengal. ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়া ইতিহাস গ্রন্থটি রহস্য উপন্যাসের মতোই পাঠককে আকৃষ্ট করে রাখে। অনন্য সাধারণ কাজটি সম্পর্কে লেখকের অবশ্য সামান্যই বলা। জনকণ্ঠকে ড. শরিফুল ইসলাম বলেন, আমি আমার মেধা যোগ্যতার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। এর ফলে যে ইতিহাস উঠে এলো তা গোটা জাতির জন্য গৌরবের। আনন্দের। তবে ইতিহাসটি নিয়ে বহির্বিশ্বে ব্যাপক হইচই হলেও, বাংলাদেশে এতটা দেখা যায়নি। তাতে আক্ষেপ নেই লেখকের। বরং তিনি বলেন, আমি আমার কাজটি করেছি। এটাই তো আসল সার্থকতা। তবে স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে নতুন ইতিহাসটি দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

দৈনিক জনকন্ঠ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫

সৌদি জোট : ‘নতুন হলিউডি নাটক’

রবার্ট ফিস্ক : সৌদিরা জোট করতে ভালোবাসে। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে হটাতে তারা মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও বিভিন্ন তেল আমদানিকারকদের পাশে পেয়েছিল। এ বছরই মাস কয়েক আগে সৌদি সামরিক বাহিনী তাদের রাজতন্ত্রের শত্রু শিয়া হুথিদের ইয়েমেনে গিয়ে আক্রমণ করেছে, সেটা করতেও তারা জোট করেছিল।mideast-question

সামরিক বাহিনীর জায়গায় বিশ্বের তরুণতম প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উচ্চাভিলাষী সৌদি উপপ্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ পড়ুন। এই জোটে শুধু সৌদি যুদ্ধবিমানই ছিল না, কাতার, আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, মিশর, জর্ডান, মরক্কো ও সুদানও ছিল। কিন্তু এখন নতুন হলিউডি নাটক মঞ্চস্থ করতে সৌদিরা বহুজাতিক সামরিক অভিযান শুরু করেছে, প্রতিপক্ষ হচ্ছে ইসলামী ‘সন্ত্রাসের অসুখ’। এই জোটে মুসলিম ও মুসলিম তকমাপ্রত্যাশী বেশ অনেকগুলো রাষ্ট্র রয়েছে, মহানবী (সা.)–এর সময়ের পর এতগুলো মুসলিম রাষ্ট্র আর কখনোই একত্র হতে পারেনি।

ইয়েমেন অভিযানের মতো এবারও ৩১ বছর বয়সী যুবরাজ মোহাম্মদ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওদিকে সৌদি বিমান হামলায় ইয়েমেনে ইতিমধ্যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে অনেক বেসামরিক মানুষ মারা গেছে, বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে আমরা সে খবর পেয়েছি। একদম গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে মোহাম্মদ ঘোষণা করেছেন, তাদের এই সর্বশেষ জোটের যুদ্ধ করতে হলে ‘খুবই শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নিতে হবে। এই জোটের মধ্যে কারা আছে জানেন? রূপকথার মতো দেশ ‘ফিলিস্তিন’ থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত, লেবাননের মতো নখর দন্তহীন, শাদের মতো দেউলিয়া ও রিপাবলিক অব করোমোসের মতো দেশকে সৌদি আরব নিয়েছে শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্য যে এই জোটে যথেষ্টসংখ্যক দেশ আছে।

খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই এটা খেয়াল করেছে যে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া এই ৩৪টি দেশের শক্তিশালী জোটে নেই। এটা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার, কারণ ২০০২ সালে বালি হামলায় ২০২ জন বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পর ইন্দোনেশিয়ার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মধ্যে শত্রুর তালিকায় আলকায়েদাও ঢুকে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় ২০ কোটি সুন্নি মুসলমানের বসবাস, ফলে তারা নিজেদের সুন্নি মুসলমান ভাইদের সঙ্গে এই অভূতপূর্ব ‘জোটে’ যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল। অথবা এমনটা হতে পারে যে সৌদি আরবে ৩০ জন ইন্দোনেশীয় পরিচারিকাকে অন্যায্য বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে সৌদি আরবের জোটে যোগ দেওয়ার আগে তারা চায়, এই অবিচারের অবসান হোক।

তবে এই জোটে পাকিস্তানের যোগ দেওয়াটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর আগে তাদের যখন ইয়েমেনের বিপর্যয়কর গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে লড়াই করার জন্য বলা হয়েছিল, তখন ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট সৌদি আরবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তখন সৌদি আরব পীড়াপীড়ি করেছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুন্নি মুসলমানরাই শুধু যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে।

সার্বিকভাবে বেশ শক্তিশালী ‘জোট’ হয়েছে। এই দেশগুলোর অধিকাংশের ঘাড়েই বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা রয়েছে, তারা সব সময়ই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে আছে। ফলে এই অসাধারণ সামরিক জোট গঠনের পেছনের প্রকৃত বিবেচনা কিন্তু কত দেশ এই জোটে অংশ নিচ্ছে সেখানে নিহিত নয়, বরং সৌদি আরবকে এই ভ্রাতৃত্বসুলভ সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশগুলো তাদের কাছ থেকে কত মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলার পাবে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

এখন একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবেই এসে যায়: এই তরুণ যুবরাজ ‘সন্ত্রাস রোগের’ কোন তরিকা ধ্বংস করতে চান? আইএস তরিকা? যদিও এই সংগঠনটি ওয়াহাবি সুন্নি বিশুদ্ধতাবাদী মতবাদের ভিত্তিতে একরকম আধ্যাত্মিকভাবেই গড়ে উঠেছে। নাকি নুসরা তরিকা, যেটা সেই কাতার থেকেই সৃষ্ট, যে কাতার এখন এই রহস্যময় ‘জোটের’ অন্তর্ভুক্ত? অথবা ইয়েমেনের শিয়া হুথি তরিকা, যাদের ইয়েমেনের সুন্নি প্রেসিডেন্ট ইরানপন্থী সন্ত্রাসী মনে করেন, যেই সুন্নি প্রেসিডেন্টকে আবার সৌদি আরব সমর্থন করে। আর সৌদি যুবরাজ ইরানের সঙ্গে আবার কোন ধরনের সম্পর্কের কথা চিন্তা করছেন, যেখানে ইরানিরা ইরাক ও সিরিয়ায় সেই একই আইএস ‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে লড়ছে, যাকে আমাদের প্রিয় সৌদি যুবরাজ ‘অসুখের’ অংশ বলে মনে করেন?

শিয়া ইরান বা ইরাক—কেউই এই নতুন আন্তর্জাতিক মুসলিম সেনাবাহিনীর অংশ নয়, এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাহলে আমরা জানি যে একটি ‘জোট’ হয়েছে। কিন্তু সে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, আর সেখান থেকে কী ফলই বা পাওয়া যাবে? আর এটা কেন সুন্নি মুসলমানদের জোট, স্রেফ মুসলিম ‘জোট’ নয় কেন?