আর্কাইভ

Archive for মে, 2015

চিত্র-ব্যাঙ্গঃ মশা মারতে কামান দাগানো…

একমাত্র বাংলাদেশে-ই এসব সম্ভব?!

mosquito-annihilation-1

বিভাগ:বাংলাদেশ

কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মবিশ্বাস

কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। নজরুল অসংখ্য হামদ, নাত লিখেছেন; সাথে সাথে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন। তাই অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন, উনি প্রকৃতই হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা? নিজেরা ব্যাখ্যা দেবার আগে সবচেয়ে ভালো হয় নজরুল এ বিষয়ে কী বলেছেন সেটা পর্যালোচনা করা। কেউ কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কি বলেছেন সেই ব্যাখ্যাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সেই ব্যাখ্যার দ্বারা যদি প্রমাণিত হয় সেটা ইসলামবিরোধী তাহলে অবশ্যই সেটা ইসলামবিরোধী।nazrul-67

কালী পূজা

অনেকে অভিযোগ করে থাকেন নজরুল কালি পূজা করেছেন এবং অভিযোগটা আসে মুসলিমদের থেকেই। ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ বই এর ৪২ পৃষ্ঠায় লেখক নিতাই ঘটক উল্লেখ করেছেন, “সীতানাথ রোডে থাকাকালীন কবিকে হিন্দুশাস্ত্র বিশেষভাবে চর্চা করতে দেখেছি। অনেকে বলেন কালীমূর্তি নিয়ে কবি মত্ত হয়েছিলেনএকথা ঠিক নয়। আমি কখনো তাকে এভাবে দেখিনি।” হিন্দুরাই বলছেন নজরুল পূজা করেননি, যদিও সেটা হয়ে থাকলে হিন্দুদেরই খুশী হবার কথা ছিল বেশী। এখানে এ কটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য; তা হোলো, হিন্দুধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা আর কালীপূজা করা এক জিনিস নয়।

হিন্দু ধর্ম বিষয়ক লেখা

এখন আমরা দেখব নজরুল হিন্দু ধর্ম বিষয়ক কবিতা, গান কেন লিখেছিলেন। নজরুল বলেছেন, “আমি হিন্দুমুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]

এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন কি প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দুমুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দুমুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী , পৃষ্ঠা ৩, ]

ধর্মবিশ্বাস
কেউ হয়তো বলবেন, হিন্দু মুসলিম এর মিলনের জন্য উনি না হয় এমন লিখেছেন, কিন্তু এতে প্রমাণিত হয়না যে তিনি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করতেন। হ্যাঁ কথা ঠিক। এর উত্তর নজরুল দিয়েছেন তার ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধের ৬১ পৃষ্ঠায় “আমার আল্লাহ নিত্যপূর্ণ পরমঅভেদ, নিত্য পরমপ্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। ‘ইসলাম’ ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে – কোরান মজিদে এই মাহাবাণীই উত্থিত হয়েছে। “এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভূ নাই। তার আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আল্লাহ লাশরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আলকোরআন আমার পথপ্রদর্শক। আমার কবিতা যারা পড়ছেন, তারাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমুখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি।”

১৯৪০ সালে কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিরি ঈদসম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ নজরুল বলেছিলেন, “ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।” [নজরুল রচনাবলী – () পৃষ্ঠা ৩৩]

এই লেখার মাধ্যমে নজরুল নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

ইসলামের পক্ষে কলম পরিচালনা করা
মৌলভী তরিকুল আলম কাগজে এক প্রবন্ধ লিখে বললেন কোরবানীতে অকারণে পশু হত্যা করা হয়; এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোনো মানে নাই। নজরুল তার জওয়াবে লিখলেন ‘কোরবানী’ কবিতা। তাতে তিনি বললেন

ওরে, হত্যা নয়, এ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধnazrul-4567,
দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুদ্ধ মন।
…..
এই দিনই মীনা ময়দানে
…..
পুত্র স্নেহের গর্দানে

……ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ,
ছি,ছি, কেঁপো না ক্ষুদ্র মন।

[নজরুল স্মৃতিচারণ, নজরুল একাডেমী পৃষ্ঠা ৪৩৯ ]

ইসলামের বিপক্ষে আক্রমণ হলে সেটার প্রতিবাদস্বরূপ নজরুল কবিতা লিখেছিলেন। ব্যাপারটা বিস্ময়ের বৈকি। যে কবিকে “কাফের” ফতোয়া দেয়া হয়েছে তিনিই কিনা ইসলামের পক্ষে কলম ধরেছেন!!!

মুসলমানের সমালোচনা করে কবিতা লিখা

আরো একটি অভিযোগ করা হয়, সেটা হোলো নজরুল আলেমদের সমালোচনা করেছেন, যেমন:

মৌলোভী যত মোলভী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে

দেবদেবী নাম মুখে আনে সবে তাও পাজীটার যাত মেড়ে।

এখানে মৌলভীদের নজরুল “মৌ লোভী” বলেছেন। যারা এতে অসন্তুষ্ট তাদের এই কবিতাটা হয়ত নজরে পড়েনি:

শিক্ষা দিয়ে দীক্ষা দিয়ে

. ঢাকেন মোদের সকল আয়েব

পাক কদমে সালাম জানাই

.নবীর নায়েব, মৌলভী সাহেব।

এখানে মৌলভী সাহেবদের নজরুল সালাম জানিয়েছেন। দুটোর মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই। বর্তমান সমাজে এটাই বাস্তব। আলেমদের মধ্যেও ভালোখারাপ দুধরণের পরিস্হিতি বিদ্যমান। দুটোই নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন। আর মুসলমানদের দোষত্রুটি থাকলে সেটা বলার মধ্যে দোষের কিছু নেই। ইব্রাহিম খাঁর চিঠির জবাবে নজরুল সেটাই বলেছেন, “যাঁরা মনে করেনআমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি, তারা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যারা করেন, তারা যেন আমার লেখাগুলো মন দিয়ে পড়েন দয়া করেএ ছাড়া আমার আর কি বলবার থাকতে পারে?” [ইসলাম ও নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, পৃষ্ঠা ৯৫]

আরো একটি অভিযোগ

অনেকে আরো একটি অভিযোগ করেন, নজরুল প্রথম দিকে হিন্দুদের খুশী করার জন্য হিন্দু ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখেছেন, পরবর্তীতে মুসলমানদের খুশী করার জন্য ইসলাম বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। বিষয়টি তথ্য বিভ্রাট ছাড়া আর কিছু নয়। নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্হ অগ্নিবীণায় ১২টি কবিতার মধ্যে ৭টি কবিতা ইসলামবিষয়ক। নজরুল তার সমগ্র জীবনে ছিলেন অকুতোভয়। জীবনে কখনও তিনি কাউকে খুশী করার জন্য বা কাউকে ভয় করার কারণে সত্য গোপন করেননি। সুতরাং হিন্দুদের খুশী করার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দিবেন এটা চিন্তাই করা যায় না। এখানে আমরা একটি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখব নজরুল তার সাহিত্য জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখেছেন:

* ‘মোসলেম ভারত’এ প্রকাশিত তার প্রথম কবিতাটি ছিল ‘শাতইল আরব’ (মে,১৯২০)
*
দ্বিতীয় কবিতা ‘খেয়াপরের তরণী’ (জুলাই ১৯২০)
* ‘
কোরবানী’ ১৩২৭এর ভাদ্রে (আগস্ট, ১৯২০)
* ‘
মোহরাম’ ছাপা হয় ১৩২৭এর আশ্বিনে (সেপ্টেম্বর ১৯২০)
*
১৯২২এর অক্টোবরে নজরুলের যে ‘অগ্নিবীণা’ কাব্য প্রকাশিত হয় তার ১২টি কবিতার মধ্যে ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তস্বরধারিণী মা’ আগমনী’, ‘ধূমকেতু’ এই পাঁচটি কবিতা বাদ দিলে দেখা যায় বাকি ৭টি কবিতাই মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কিত। (১৯২২)
*
আরবী ছন্দের কবিতা (১৯২৩)
*
১৯২৪এ প্রকাশিত তার ‘বিষের বাঁশীর প্রথম কবিতা ‘ফাতেহাদোয়াজদহম’ (আবির্ভাবতিরোভাব) (১৯২৪)
*
খালেদ কবিতা (১৯২৬)
*
উমর ফারুক কবিতা সওগাতে প্রকাশিত (১৯২৭)
*
জিঞ্জির কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯২৮)
*
রুবাইয়াত ই হাফিজ প্রকাশ (১৯৩০)
*
কাব্য আমপারা (১৯৩৩)
*
জুলফিকার ইসলামিক কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯৩২)
*
মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা ও যাবি কে মদিনায় নাত এ রসুল প্রকাশ (১৯৩৩)
*
তওফীক দাও খোদা ইসলামে নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৪)
*
মক্তব সাহিত্য প্রকাশ (১৯৩৫)
*
ফরিদপুর জালা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে “বাংলার মুসলিমকে বাঁচাওঅভিভাষণ পাঠ (১৯৩৬)
* ‘
সেই রবিউল আউয়ালের চাদ’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৭)
* ‘
ওরে ও মদিনা বলতে পারিস’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৮)
*
দীওয়ান ই হাফিজ এর ৯টি গজল অনুবাদ এবং নির্ঝর কাব্যগ্রন্হে প্রকাশ (১৯৩৯)
*
নতুন চাঁদ (১৯৩৯)
*
খোদার রহম চাহ যদি নবিজীরে ধর নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৪০)
*
মরুভাস্কর ( অসুস্হ হবার পরে প্রকাশিত ১৯৫০)
*
রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম (১৯৫৮)

সাহিত্যিক জীবনের প্রথম (১৯২০১৯৪১) থেকে শেষ পর্যন্ত নজরুল অজস্র ধারায় ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখে গিয়েছেন উপরের পরিসংখ্যান সেটাই প্রমাণ করে।

কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান
১। নজরুল বাংলা ভাষায় সর্বাধিক “হামদনাত” এর রচয়িতা।
২। গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে নজরুলের হামদনাত যখন বের হোতো, তখন মাঝে মাঝে রেকর্ডের ওপর “পীরকবি নজরুল” লেখা থাকত।
৩। বাংলা ভাষায় যারা হামদনাত রচনা করে গেছেন, তাদের মধ্যে একই সাথে হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম উভয় বিষয়ে পারদর্শী কেউ ছিলনা, একমাত্র ব্যতিক্রম নজরুল।
৪। একাধিক আরবীছন্দ নিয়ে নজরুলের অসংখ্য কবিতা আছে, বাংলা ভাষার আরও এক প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ এ বিষয়ে কারিশমা দেখাতে পারেনি।
৫। ইরানের কবি হাফিজ আর ওমর খৈয়ামের যতজন ‘কবি’ অনুবাদক আছেন তার মধ্যে নজরুল একমাত্র মূল ফারসী থেকে অনুবাদ করেছেন, বাকী সবাই ইংরেজীর থেকে।
৬। “ফারসী” এবং “আরবী”তে নজরুল এর জ্ঞান ছিল পাণ্ডিত্যের পর্যায়ে।
৭। গ্রামোফোন কম্পানি থেকে “ইসলামি গান” নজরুলের পূর্বে আর কেউ গায়নি।

মুজাফফর আহমদ ও নজরুল

নজরুলের তরুণ জীবনের কমুনিস্ট হয়ে যাওয়া বন্ধু কমরেড মুজাফফর আহমদ তাকে কমুনিজমে নিতে ব্যর্থ হন। তার স্বপ্ন সফল হয়নি। ১৯৬৬ খৃস্টাব্দের ২রা আগস্ট কবি আবদুল কাদিরের কাছে লেখা এক চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন, “নজরুল যে আমার সঙ্গে রাজনীতিতে টিকে রইল না; সে যে আধ্যাত্নিক জগতে প্রবেশ করল তার জন্যে অবশ্য আমার মনে খেদ নেই। যদিও আমি বহু দীর্ঘ বৎসর অনুপস্থিত ছিলেম তবুও আমার মনে হয় আমি হেরে গেছি।

তিনি আরো বলেছেন, “আমি তাকে যত বড় দেখতে চেয়েছিলেম তার চেয়েও সে অনেক, অনেক বড় হয়েছে।

(নজরুল একাডেমী পত্রিকা: ৪র্থ বর্ষঃ ১ম সংখ্যাঃ পৃষ্ঠাঃ ১৬৪)

নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়

nazrul-artনজরুলের জীবনের একমাত্র সাক্ষাৎকার যেটা উনি ১৯৪০ সনে দিয়েছিলেন, চিরদিনের জন্য অসুস্হ হয়ে যাবার কিছুদিন আগেসেখানে উনি বলেছিলেন, “মুসলমানরা যে একদিন দুনিয়াজোড়া বাদশাহি করতে সমর্থ হয়েছিল সে তাদের ইমানের বলে। আজ আমরা ইমান হারিয়ে ফেলেছি। ইমানের প্রকৃত অর্থ ‘পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পন’। ভারতে রাজাবাদশাদের দ্বারা ইসলাম জারি হয় নাই। আর মানুষের মঙ্গলের বিধান করেছেন আউলিয়া ‘পীর’ বোজর্গান। সারা ভারতে হাজার আউলিয়ার মাজার কেন্দ্র করে আজো সেই শান্তির কথা আমরা শুনতে পাই। আমি মওলানা আকরম খাঁ ও মৌলবি ফজলুর হক সাহেবকে বলেছিলাম যে, আসুন, আপনারা সমস্ত ত্যাগ করে হজরত ওমর (রাঃ) ও আবুবকরের (রাঃ) আদর্শ সামনে রেখে সমাজে লাগি, আমি আমার সব কিছু ছেড়ে কওমের খেদমতে লাগতে রাজি আছি।” [অতীত দিনের স্মৃতি, সম্পাদনা আব্দুল মান্নান সৈয়দ পৃষ্ঠা ১৯২,১৯৩]

দুটি ঘটনা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি।

প্রথম ঘটনা

নজরুল স্মৃতিচারণ বইএ ৩১৭ পৃষ্ঠায় লেখক খান মুহম্মদ সালেক বলেন, “১৯৩৯ সালের ৫ আগষ্ট। কলকাতা বেকার হোস্টেলে নবীনবরণ অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকারকে। বিশিষ্ট অতিথি ছিলেন নজরুল ইসলাম আর আব্বাস উদ্দীন। অনুষ্ঠান শেষে কবিকে চাপানের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো হোস্টেলের কমনরুমে। কিছু ছাত্র আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তারা এক টুকরো করে কাগজ কবির সামনে ধরছে আর আবদার জানাচ্ছে কিছু লিখে দেবার জন্য। কবি একটা পেন্সিল হাতে নিলেন। তারপর একজনকে লিখে দিলেন, ‘আল্লাহু আকবর।আর একজনকে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসলুল্লাহ।’ আবার কাউকে লিখলেন, ‘খোদাকে চেনো, খোদাকে চিনবে।’ আমিও এক টুকরো কাগজ বের করে সামনে ধরলাম। তিনি লিখলেন, ‘যারা ধৈর্যশীল খোদা তাদের সহায়।’ তার এ ধরণের উক্তি থেকে মনে হয়েছিল তিনি কোন পীরদরবেশ বা অলি আউলিয়ার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছেন।

দ্বিতীয় ঘটনা

শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে নজরুলকে না পেয়ে সকালে তার বাসায় গেলেন। বাসায় গিয়ে দেখলেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছেন। নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন। আব্বাস উদ্দিন অনকেক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে তিনি উসখুস করতে লাগলেন। নজরুল বললেন, “কি তাড়া আছে, যেতে হবে?” আব্বাসউদ্দিন বললেন, “ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আর এসেছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য। গজল না নিয়ে আজ যাওয়া হচ্ছে না।” [নজরুলকে যেহেতু বাউন্ডেলে স্বভাবের কারণে পাওয়া যেত না, তাই সবাই এইভাবে লেখা আদায় করত] নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিস্কার চাদর তার ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন। এরপর আব্বাস উদ্দিন যথারীতি জোহেরর নামাজ শেষ করার সাথে সাথে নজরুল আব্বাসউদ্দিনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাও তোমার গজল।” আব্বাস উদ্দিন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন তার নামাজ পড়তে যে সময় লেগেছে ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নজরুল সম্পূর্ণ একটি নতুন গজল লিখে ফেলেছেন। নীচে গজলটি দেয়া হলো:

হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ।

আমি গোনাহগার বেখবর
নামাজ পড়ার নাই অবসর
তব, চরণছোওয়ার এই পাপীরে কর সরফরাজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

তোমার অজুর পানি মোছ আমার পিরহান দিয়ে
আমার এই ঘর হউক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে;
যে শয়তান ফন্দিতে ভাই
খোদার ডাকার সময় না পাই
সেই শয়তান থাক দূরে (শুনে) তকবীরের আওয়াজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

আমার লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, নজরুল আদর্শ মুসলমান ছিলেন কিংবা তিনি অনুসরণীয়এটা প্রচার করা। বরং আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো, নজরুল বিশ্বাসে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম ছিলেন যেটা অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না। আশাকরি উপরের আলোচনা আমাদের নতুন করে সেটাই ভাবতে শেখাবে। এরপরও অনেকে থাকবে যারা বিদ্বেষ ছড়াবে, তাদের সম্বন্ধে নজরুল বলেছেন:

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব, “সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।”

(সংগৃহীত)

জামায়াত মওদুদীর চোখে বাংলাদেশকে দেখেছে

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামবাদিতা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তা নতুন নয়। ধর্মীয় মতবাদ এবং বাংলার মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যে বিরোধ চলমান তার বয়স কম করে হলেও ১শ’ বছর। তবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলার মাটিতে জামায়াতের সামান্যই জনসমর্থনের নমুনা পাওয়া যায়। আর তারা সবসময় মওদুদীর চোখে পূর্ব পাকিস্তানmaududi-33কে বুঝতে চেয়েছে। অথচ বাঙালির জন্য মওদুদীর কোন সহানুভূতি ছিল না।
সম্প্রতি ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ‘লিমিটস অব ইসলামিজম জামায়াত-ই-ইসলামী ইন কনটেম্পরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বইয়ে ওই অভিমত ছাপা হয়েছে। বইটির লেখক কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম। তাঁর মতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে মুসলিম লীগ যে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিল তার পেছনে ছিল ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর গোড়ার দিকে কমিউনিস্টদের দ্বারা উৎসাহিত কৃষক বিদ্রোহ। মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্টদেরকে হিন্দুদের সঙ্গেই চিহ্নিত করলেন। কিন্তু এই প্ল্যাটফরম তেমন কাজে দেয়নি, কারণ মুসলিমরাই মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। মুসলিম লীগের পরে ইয়াহিয়া সরকার শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে ধর্মীয় শিক্ষা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। এবং এর ফলে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার বিরাট ক্ষতি হয়েছিল। ইয়াহিয়ার এই শিক্ষানীতি যখন পূর্ব পাকিস্তানের তিনটি প্রধান ছাত্র সংগঠন- ছাত্রলীগ, পিকিং ও মস্কোপন্থি ছাত্র ইউনিয়ন প্রত্যাখ্যান  করেছিল তখন জামায়াত সমর্থিত ইসলামী ছাত্রসংঘ সামরিক সরকারের শিক্ষানীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছিল।
তবে দেশভাগ বিতর্কে জামায়াত প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুুদী পাকিস্তানের দাবি উত্থাপনকারী মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসপন্থি মুসলিম উলেমা, যারা জাতীয়তাবাদের ভারতীয় ব্যাখ্যা কবুল করেছিলেন, তাদের উভয়ের মতের বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান বিরোধিতা করেছিল, কারণ জামায়াত বিশ্বাস করতো যে, পাকিস্তান একটি ‘ইসলামী রাষ্ট্রে’ পরিণত হবে না। মওদুদীর যুক্তি ছিল যে, হিন্দু-মুসলমানের সমস্যার সমাধান একটি অখণ্ড ভারতে নিহিত। কারণ মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশগুলোতে যেসব ভারতীয় মুসলমান বাস করবেন, তাদের অবস্থান ভবিষ্যতে দুর্বল হবে।
মওদুদী তাই ‘মুসলিম পরিচিতি’ এবং ‘ইসলামী পরিচিতি’র মধ্যে একটি পার্থক্য আনেন। মওদুদীর ইসলামে সেইসব মুসলিমের কোন জায়গা নেই, যারা ‘খাঁটি ইসলাম’ অনুসরণ করে না। তাঁর যুক্তি: কেবল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার সুবাদেই কেউ খাঁটি মুসলিম হতে পারে না তাই তাঁর ধর্মরাষ্ট্রে জিন্নাহ ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনুসারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ঠাঁই হয়নি। তারা বাদ পড়েছিলেন। ১৯৪০ সালের দেশভাগ বিতর্র্কে তিনি মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। মওদুদী এ জন্য তিনটি কারণ ব্যাখ্যা করেন: ১. ‘মুসলিম’ এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ ‘স্ববিরোধী’। ২. ‘মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ  বলেই তারা মুসলিমদের নেতা হতে পারেন না। কারণ তাদের ‘ইসলামী মানসিকতার’ ঘাটতি আছে। ৩. পাকিস্তান কেবলই একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের আবাসভূমি হওয়া উচিত নয়, এটি হতে হবে একটি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’, যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সরকার ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম এরপর লিখেছেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় জামায়াতের জনসমর্থন খুবই কম। এমনকি স্বাধীনতার আগেও তেমন ছিল না। একটি ইসলামী সংবিধানের জন্য তাদের প্রচারণা ১৯৫০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবেই তেমন কোন ভিত্তি রচনা করতে পারেনি। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর গোড়ায় জামায়াত পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও ভাষা আন্দোলনের মতো কোন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথাই বলেনি। জামায়াত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাকে মওদুদীর চোখে মূল্যায়ন করতে চেয়েছে। আর সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য মওদুদীর কার্যত কোন সহানুভূতি ছিল না। ১৯৫২ সালের গোড়ায় মওদুদী তাঁর তারজুমান আল কোরআন বইয়ে বাংলাকে একটি জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মওদুদ বলতেন এটা করা হলে বাঙালিরা কখনও উর্দু শিখবে না। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা তখন সারাজীবনের জন্য ‘ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবে।’ আর তখন  পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব  তৈরি হবে এবং হিন্দুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং তাঁর আগের মনোভাব পাল্টান। এবং বলেন বাঙালিদের কিছু ক্ষোভ আছে। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও জাতীয় ভাষা করার পক্ষে মত দেন। এরপর ১৯৫৬ সালের সংবিধান তৈরির সময় পূর্ব পাকিস্তান যখন যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী ব্যবস্থার দাবি তুললো, তখন জামায়াত তার বিরোধিতা করলো। তারা যুক্তি দিলো এটা পাকিস্তানি সত্তার বিরোধী। এর ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের ক্ষমতা দখল করার সুযোগ বাড়বে।
অধ্যাপক ইসলাম লিখেছেন, এভাবে তারা ১৯৫০ থেকেই বাংলা ভাষার উপরে উর্দু শ্রেষ্ঠত্ব চাইলো। তারা এভাবেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, কমিউনিস্ট ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো। ২০১৩ সালের ৬ই মার্চে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রেস রিলিজ মতে জামায়াতের পক্ষ থেকেই সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিকভাবে সহিংস হামলা এসেছে।

 

জনৈক কথিত আহলে হাদীসের সাথে মুহাম্মদ আমীন সফদর রহঃ এর একটি চিত্তাকর্ষক কথোপকথন

জনৈক কথিত আহলে হাদীসের সাথে মুহাম্মদ আমীন সফদর রহঃ এর একটি চিত্তাকর্ষক কথোপকথন
লিখেছেন লুৎফর ফরাজী, ১৫ এপ্রিল, ২০১২

একদা মুহাম্মদ আমীন সফদর রহঃ এর কাছে কয়েকজন কথিত আহলে হাদীসের লোক এল। এসে হযরতের কাছে বসল। বসেই বলতে লাগল-“আমরা অনেক পেরেশানীতে আছি। বহুত পেরেশানীতে আছি”।

সফদর রহঃ-“যারাই বড়দের ছেড়ে দেয়, তারা সারা জীবনই পেরেশানীতে থাকে। মওদুদী এই পেরেশানীতেই ছিল। কাদিয়ানীও এই পেরেশানীতেই ছিল। আপনারাও মনে হয় বড়দের ছেড়ে নিজেরাই সব বুঝতে চাচ্ছেন। এজন্যই পেরেশানীতে আছেন”।

কথিত আহলে হাদীস-চারজন ইমাম। চার, চার, চার। কি করবো আমরা?

সফদর রহঃ-আপনি এখানে চারজন পেলেন কোথায়? এখানেতো কোন হাম্বলী নেই। শাফেয়ীও নেই। মালেকীও নেই।

কথিত আহলে হাদীস-যদি চারজন হয়ে যায়!

সফদর রহঃ-হলে ভিন্ন কথা। সেই পেরেশানী এখনই কেন টেনে আনছেন?

কথিত আহলে হাদীস-এটা কেমন কথা যে, আল্লাহ এক আর ইমাম হল চারজন?

সফদর রহঃ-এটা কেমন কথা যে, আল্লাহ এক আর নবী এক লাখ চব্বিশ হাজার? ওখানে যেমন বল যে, এক নবীকে মান, আর বাকিদের ছেড়ে দাও। এখানেওতো ব্যাপার তাই। এক ইমামকে মান। বাকিদের ছেড়ে দাও। কোথাও কি আছে নাকি যে, ইমাম বেশি হতে পারবে না? যদি থাকে বলেন আমি মেনে নিব। আমি দেখি ইমাম বেশি হতে পারবে কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ فَلا تَكُنْ فِي مِرْيَةٍ مِنْ لِقَائِهِ وَجَعَلْنَاهُ هُدىً لِبَنِي إِسْرائيلَ وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا
অর্থাৎ বাস্তব কথা হল আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছি, সুতরাং (হে রাসূল!) তুমি তার সাক্ষাত সম্পর্কে কোন সন্দেহে থেকো না। আমি সে কিতাবকে বনী ইসরাঈলের জন্য বানিয়েছিলাম পথ-নির্দেশ।
আর আমি তাদের মধ্যে কিছু লোককে, এমন ইমাম বানিয়ে দিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত। {সূরা সাজদা-২৩,২৪}
এক রাসূলের উম্মতের মাঝে কয়েকজন ইমাম হতে পারে। এটাতো কুরআন বলছে। কুরআনের শব্দ ইমামের বহুবচন আইয়িম্মাহ ব্যবহৃত হয়েছে।

কথিত আহলে হাদীস- চার ইমামই কি সঠিক?

সফদর রহঃ-হ্যাঁ, চার ইমামই সঠিক।

কথিত আহলে হাদীস-তাহলে চার ইমামের অনুসরণ করেন না কেন? শুধু নিজের ইমামের অনুসরণ করেন কেন?

সফদর রহঃ-যেমন সবাই এক লাখ চব্বিশ হাজার নবীকে সঠিক মানি, কিন্তু অনুসরণ করি আমাদের নবীর। তেমনি সঠিক মানি চার ইমামকেই। কিন্তু অনুসরণ করি নিজের ইমামকে।

কথিত আহলে হাদীস-কোন হাদীসে আছে নাকি এক ইমামের অনুসরণ কর?

সফদর রহঃ-আপনি কুরআন পড়েন?

কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ পড়ি।

সফদর রহঃ-এক কেরাতে? না সাত কেরাতে?

কথিত আহলে হাদীস-এক কেরাতে?

সফদর রহঃ-সারা জীবন এক কেরাতে কুরআন পড়া আর বাকি কেরাতকে ছেড়ে দেবার কথা কুরআন বা হাদিসের কোথাও আছে?

কথিত আহলে হাদীস-আমাদের কাছে আছেই এটা। তাই পড়ি। কিন্তু এক ইমামের অনুসরণ করলেতো চতুর্থাংশ দ্বীন মানা হয়।

সফদর রহঃ-এক কেরাতে কুরআন পড়লে কি সাত ভাগের একভাগ সওয়াব পাওয়া যায়?

কথিত আহলে হাদীস-না, না, এক কিরাতে পড়লে পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াবই পাওয়া যায়।

সফদর রহঃ-তেমনি এক ইমামকে মানলে পূর্ণ শরীয়তেরই অনুসরণ হয়।

কথিত আহলে হাদীস-আপনাদের আকল কখনো হবে না? ইমামদের মাঝেতো হারাম-হালালের মতভেদ। একজন যেটাকে হালাল বলেন, অন্যজন সেটাকে হারাম বলেন। তাহলে যিনি হারাম বলেন তিনিও সঠিক। আর হালাল যিনি বলেন তিনিও সঠিক! এটা কি করে সম্ভব?

সফদর রহঃ-আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আকল দিয়েছেন। নবীগণ সবাই সঠিক।
আদম আঃ এর সময়ে আপন বোনকে বিবাহ করা জায়েজ। আমাদের দ্বীনে হারাম। কিন্তু উভয় নবীই সঠিক।
ইয়াকুব আঃ এর দুইজন স্ত্রী আপন বোন ছিল। এটা সে সময় জায়েজ ছিল। কিন্তু আমাদের নবীর দ্বীনে তা হারাম। উভয়ই সঠিক। সবার আল্লাহ একই। অথচ হুকুম ভিন্ন। তেমনি চার ইমামই সঠিক। কিন্তু তাদের হুকুম ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

কথিত আহলে হাদীস-আরে এখানেতো নাসেখ মানসুখের বিষয়। একটি হুকুম এসে অন্যটাকে রহিত করে দিয়েছে।

সফদর রহঃ-আর ইমামদের ইখতিলাফের মাঝে রাজেহ-মারজুহ এর মাসআলা। তথা একটি হুকুমের উপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেবার মাসআলা। যেমন রহিত হওয়া বিষয়ের উপর আমল জায়েজ নয়, তেমনি প্রাধান্য পাওয়া হুকুম রেখে অপ্রাধান্য পাওয়া বিষয়ের উপর আমল করাও জায়েজ নয়।

কথিত আহলে হাদীস-আপনারা যেহেতু অন্য ইমামদের মানেন না, তাহলে তাদের বাতিল বলেন না কেন? সঠিক বলেন কেন?

সফদর রহঃ-আদম আঃ সঠিক নবী হলে কেন বোনকে বিবাহ করা যায় না? ইয়াকুব আঃ সঠিক নবী হলে দুইবোনকে এক সাথে বিবাহ করা কেন করা যাবে না?

কথিত আহলে হাদীস-আমরা শুধু আমাদের নবীকে মানি। বাকিরাও হক একথা ঠিক আছে।

সফদর রহঃ-আমরাও বলি-অন্য ইমাম ঠিক আছে, কিন্তু আমরা মানি আমাদের ইমামকে।

কথিত আহলে হাদীস-সেখানেতো সময় আলাদা আলাদা।

সফদর রহঃ-এখানে এলাকা আলাদা আলাদা। শাফেয়ী শ্রীলংকায় আর হানাফী পাকিস্তানে [বাংলাদেশে]। সেখানে সময় আলাদা আলাদা, আর এখানে এলাকা আলাদা আলাদা।

কথিত আহলে হাদীস-যদি কোন মাসআলায় তিন ইমাম একদিকে হয় আর এক ইমাম একদিকে হয় তাহলে কী করবেন?

সফদর রহঃ-তিন জন নয়, তিন হাজার হলেও আমাদের ইমামকেই মানবো।

কথিত আহলে হাদীস-এটা কোন ইনসাফ হল?

সফদর রহঃ-অবশ্যই এটা ইনসাফ।

কথিত আহলে হাদীস-আরে অপরদিকে তিন ইমাম।

সফদর রহঃ-তাতে কি? আমরাতো আমাদের ইমামের অনুসরণ করবো। তিন হাজার হলেও কি?

কথিত আহলে হাদীস-আপনি কি জিদ করছেন নাকি?

সফদর রহঃ-নাহ, জিদ করবো কেন? ইউসুফ আঃ তার পিতা ইয়াকুব আঃ কে সিজদা করেছিলেন এটা কুরআনে আছে কি?

কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ আছে।

সফদর রহঃ-সে আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরীনরা বলেন-হুজুর সাঃ এর নবুওয়াতের আগে সকল নবীর যুগে সম্মান করে সেজদা দেয়া জায়েজ ছিল। তো একদিকে এক লাখ তেইশ হাজার নয় শত নিরান্নবই নবীর কাছে সম্মানসূচক সেজদা জায়েজ। আর একজন হযরত মুহাম্মদ সাঃ বলেন জায়েজ নয়। আপনি বলছেন তিন জনের কথা। এখানে লাখের বিষয়। কাকে মানবেন? বিশাল জামাতকে? না একজনকে?
মুফাসসিরীনরা বলেন-প্রথম সকল নবীর শরীয়তে দেহযুক্ত ছবি আঁকা জায়েজ ছিল। কেবল আমাদের নবীর শরীয়তে না জায়েজ। তাহলে এক লাখ তেইশ হাজার নয় শত নিরান্নব্বই নবীর শরীয়ত মানবেন না আমাদের এক নবীর শরীয়ত মানবেন? বেশি কে না একজনকে?
কুরবানীর গোস্ত খাওয়া আমাদের নবীর আগে কারো শরীয়তে জায়েজ ছিল না। তাহলে কাকে মানবেন? লাখ নবীকে না আমাদের এক নবীকে?

কথিত আহলে হাদীস-[কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে] দ্বীন মক্কা-মদীনায় এসেছে? না কুফায়?

সফদর রহঃ-মক্কা-মদিনায়।

কথিত আহলে হাদীস-তাহলে মক্কা-মদিনার ইমামকে মানা উচিত না কুফার ইমামের?

সফদর রহঃ-আপনার মন কি বলে?

কথিত আহলে হাদীস-মক্কা-মদিনার ইমামদের মানা উচিত।

সফদর রহঃ-বড় একটি মিথ্যা কথা বলেছেন আপনি। কখনো এটা মাফ হবে না।

কথিত আহলে হাদীস-ভুল হইছে?

সফদর রহঃ-হ্যাঁ, বহুত বড়।

কথিত আহলে হাদীস-কিভাবে?

সফদর রহঃ-কুরআন মক্কা-মদিনায় নাজিল হয়েছে না?

কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ।

সফদর রহঃ-সাত জন ক্বারী ছিল। এর মাঝে মক্কা-মদীনার ক্বারীও ছিল। বসরার ক্বারীও ছিল। কিন্তু সবাই ক্বারী আসেম কুফীর কিরাতে কুরআন কেন পড়েন? কুফী ক্বারীর কেরাতে কুরআন পড়লে আপনাদের থেকে বড় কুফী আর কে আছে? কুরআন নাজিল হয়েছে মক্কা-মদিনায় আর কেরাত পড় কুফীর! এটা কেমন কথা?

কথিত আহলে হাদীস-কুফার লোকেরাতো আর কুরআন নিজেরা বানায়নি। কুফাতে যে সাহাবারা এসেছেন তারা কুরআন সাথে নিয়ে এসেছিলেন।

সফদর রহঃ-মক্কা-মদিনা থেকে সাহাবারা গিয়ে কুরআন যদি কুফায় নিয়ে নতুন না বানিয়ে থাকেন, তাহলে নামায কি মক্কা-মদিনা থেকে সাহাবারা কুফায় নিয়ে গিয়ে নতুন নামায বানিয়ে ফেলেছেন?

খামোশ হয়ে গেল কথিত আহলে হাদীসের লম্বা জিহবা।

হাদিস দেখেই সেটা অনুসরন করা যাবে না

হাদিস দেখেই সেটা অনুসরন করা যাবে না, অনুসরন করার পদ্ধতি আছে।

লিখেছেন রাসেল আহমদ ৩১ মে ২০১২, বিকেল ০৪:৫৩
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

সম্প্রতি একটি পোস্ট এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে হাদিস দেখেই সেটা আমরা কি অনুসরন করতে পারি না? কথাটা শুনতে ভালো লাগলেও আসলে ব্যাপারটা তেমন সহজ নয়। যেকোন মুসলমানকেই কোরআন এবং হাদিস অনুসরন করতে হবে । কিন্তু কিভাবে ? সেভাবেই যেভাবে কোরআন হাদিসকে অনুসরন করতে বলা হয়েছে । যেভাবে সাহাবীরা, তাবেয়ীরা , তাবেতাবেয়ীনরা , পূরবর্তী ওলামায় কিরাম অনুসরন করেছেন । যেমন একটি উদাহরন দেয়া যাক । বর্তমানে দেখা যায় অনেকেই সিহাহ সিত্তা বা অন্য কোন হাদিস শরীফের কিতাব পড়ে কোন একটি নতুন হাদিস শরীফ সম্বন্ধে জানল । বিষয়টি হয়ত তার কাছে নতুন অথবা তার প্রতিষ্ঠিত কোনো মতের সাথে সাংঘর্ষিক । এখন সে কি করবে ? যেহেতু এটি সহীহ হাদিস স্বভাবতই সবাই বলবেন এই হাদিস শরীফের ওপরই আমল করা উচিত । আসলেই কি তাই ? আসুন নীচের পরিস্হিতি বিচার বিশ্লেষন করে দেখা যাক :

প্রথম পরিস্হিতি :

হাদিস শরীফ: হযরত হুযায়ফা (রা) থেকে বর্নিত , তিনি বলেন “রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম একবার এক সম্প্রদায়ের আবর্জনা ফেলার স্হানে গমন করলেন । সেখানে এসে তিনি এর ওপর দাড়িয়ে প্রস্রাব করলেন । …. ( তিরমিযী শরীফ ১৩ নং হাদিস )

এখন মনে করুন আপনি এই হাদিস শরীফ পড়লেন এবং সবাইকে বললেন রসুল (সা) যেহেতু দাড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন এবং এটা সহীহ হাদিস তাই এই হাদিসের ওপর আমল করাতে কোনো অসুবিধা নেই।

এখন কিছুদিন পর আপনি তিরমিজী শরীফ আবার খুলে পড়া শুরু করলেন এবং এই হাদিসটি পেলেন :

হাদিস শরীফ: হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্নিত তিনি বলেন “যে তোমাদের কাছে বর্ননা করবে যে রসুল (সা) দাড়িয়ে প্রস্রাব করতেন , তোমরা তার কথা বিশ্বাস করবে না । তিনি কেবল বসেই প্রস্রাব করতেন । ( তিরমিযী শরীফ ১২ নং হাদিস ) 

দ্বিতীয় নং হাদিস শরীফ পড়ে আপনি তো মহা সমস্যায় পড়লেন । কেননা আপনি প্রথম হাদিস শরীফ পড়ে আমল করেছেন এবং আপনার হয়ত আরো বন্ধুদের বলেছেন । কিন্তু দেখা গেলো দুটো হাদিস শরীফ সহীহ হওয়া সত্বেও সাংঘর্ষিক ।

 

চলুন আমরা দেখি আসলে ব্যাপারটা কি । প্রথম হাদিস শরীফের ব্যাখ্যা হোলো রসুলের (সা) একবার হাটুতে ব্যাথ্যা থাকার কারনে বসতে কষ্ট হচ্ছিল যে কারনে দাড়িয়ে প্রস্রাব করেছিলেন । ( হাকীম এবং বায়হাকীর রেওয়ায়েতে এটা প্রমান হয় ) কিন্তু রসুলের (সা) সবসময়ের আমল এটা ছিল না । দুটো হাদিসের মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই । কিন্তু সমস্যা তখনই হবে যখন একটি হাদিস পড়ে এবং এ বিষয়ের অন্য হাদিস না পড়ে , ব্যাখ্যা শানে নজুল না জেনে , আলেমদের সাথে পরামর্শ না করেই আমল করা শুরু করব । সমস্যা এখানেই ।


আমি আরো কিছু পরিস্হিতির উল্লেখ করব যে সব ক্ষেত্রে সরাসরি হাদিস অনুসরন করলে বিপদ হতে পারে : যেমন:

দ্বিতীয় পরিস্হিতি : আপনি কোনো সহীহ হাদিস পেলেন , যেটাতে নামাজে কথা বলা যায় এমন ঘটনা বর্ননা করা আছে । কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই হুকুম এখনও বলবৎ আছে । কেননা অন্যন্য হাদিস শরীফ দ্বারা আমরা জানতে পারি এই হুকুম পরবর্তিতে মনসুখ ( বা রহিত ) হয়ে গেছে ।

উদাহরন দেয়া হোলো:

হাদিস শরীফ: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্নিত , তিনি বলেন , রসুলুল্লাহ (সা) আমাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন । আমি ফিরে এসে দেখি , তিনি (সওয়ারীতে আরোহন করে নফল) সালাত আদায় করছেন আমি ( ঐ অবস্হায়) তাকে সালাম দিলাম । তিনি ইংগিতে আমাকে চুপ করতে বললেন । তারপর সালাত শেষ করে আমাকে ডাকলেন এবং বললেন , তুমি এক্ষুনে আমাকে সালাম দিয়েছিলে অথচ আমি সালাতরত ছিলাম । বর্ননাকারী বলেন , তিনি এই সময় পূর্বমুখী ছিলেন । ( মুসলিম শরীফ : ১০৮৬ )

দেখুন এখানে কিন্তু রসুলুল্লাহ (সা) নামাজের মধ্যেই ইশারাতে তাকে চুপ করতে বললেন ।

এবার এই হাদিসটি দেখুন :

হাদিস শরীফ: যায়দ ইবনে আরকাম (রা) থেকে বর্নিত যে , তিনি বলেন , আমরা সালাতে কথাবার্তা বলতাম , প্রত্যেকেই তার পাশের ব্যক্তির সাথে আলাপ করত । অত:পর যখন “ওয়া কুমু লিল্লাহি কনিতিন” (আল্লাহর জন্য দাড়াবে বিনীতভাবে) ( :২৩৮) আয়াতটি নাযিল হোলো , তখন আমাদেরকে চুপ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরস্পরে আলাপ করতে নিষেধ করা হয় ।

এছাড়া আরো অনেক হুকুম আছে যেটা আগে নামাজে ছিল পরবর্তিতে নিষেধ করা হয় । যেমন থুথু ফেলা । প্রথমদিকে নামাজ পড়া অবস্হায় বাম দিকে থুতু ফেলা যেত ।

তৃতীয় পরিস্হিতি : এমনও হতে পারে কোনো সহীহ হাদিস দুরকম ব্যাখ্যা হয় এবং দুটোই সঠিক

দেখুন: 

রসুলুল্লাহ (সা) একবার একদল মুসলমানকে নিম্নোক্ত নির্দেশসহ প্রেরন করলেন “বনু কুরায়জায় পৌছে সালাত আদায় করবে” । তার এই আদেশকে শাব্দিক অর্থে গ্রহন করে দলের কিছু সাহাবী নির্ধারিত সময় আসর সালাতের জন্য না থেমে প্রায় সুর্যাস্হ পর্যন্ত সফর অব্যাহত রাখেন এবং বনু কুরায়জায় গিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন । আবার কিছু সংখ্যক লোক যারা রসুলের (সা) আদেশের শাব্দিক অর্থ গ্রহন না করে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুসরন করতে গিয়ে বনু কোরায়জায় পৌছার পূর্বে স্বল্প সময়ের জন্য বিরতি করে আসেরর সালাত আদায় করেন । রসুল (সা) এর নিকট উভয় দলের ঘটনা বর্ননা করা হলে তিনি বলেছিলেন , উভয়ই সঠিক ।


এই হাদিস দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম কিছু ক্ষেত্রে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের দুটি সমাধান হতে পারে যার দুটোই সঠিক । এবং এটাকে আপনি কিয়াসও বলতে পারেন । দুই দল সাহাবী রসুলের (সা) বক্তব্যের ওপর কেয়াস করেছিলেন এবং দুটোই সঠিক ছিল । ( তবে এমন কিয়াস করতে পারেন শুধু মুজতাহিদগন , আমাদের মত আমজনতা নন )

৪র্থ পরিস্হিতি : এমনো হতে পারে কোনো হাদিসে কোনো একটি কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে , আপনি হয়ত ভাবলেন সেটা সবার জন্য , চিরকালের জন্য নিষেধ । কিন্তু গবেষনা করে দেখা গেল সেটা আসলে সেই ব্যক্তির জন্য এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ , পরবর্তিকালে সবার জন্য সেটা নিষেধ নয় । ( নির্দিষ্ট কিছু সাহাবীকে হাদিস সংকলন করতে নিষেধ করা এই বিষয়ের মধ্যে পড়বে )

প্রথম হাদিস শরীফ (হাদিস বিষয়ে লিখতে নিষেধ করা ): রসুলুল্লাহ (সা) বলেন “আমার নিকট হতে কোরআন ব্যতীত তোমরা অন্য কিছু লিখবে না । যে ব্যক্তি আমার নিকট হইতে কোরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখিয়াছে সে যেন তাহা মুছিয়া ফেলে । ( মুসলিম, মোকদ্দামা )

দ্বীতিয় হাদিস শরীফ( হাদিস বিষয়ে লিখতে বলা ) : কোনো কোনো সাহাবার নিকট ক্ষুদ্র পুস্তিকা ছিল হাদিসের সংকলন । আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের হাদিস এর পুস্তকখানি এক দৃষ্টান্ত । তিনি তার বই এর নাম রেখেছিলেন “আস সাদিকাহ” । কোনো কোনো সাহাবার দৃষ্টি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বই এর প্রতি পড়ল । তারা বলল , রসুল (সা) যা কিছু বলেছেন তা আপনি লিখে রাখছেন ? রসুলল্লাহ (সা) রাগান্বিত হলে এমন কিছু বলেন যা সাধারনত শরীয়ত বলে গ্রহন করা চলে না । অত:পর ইবনে আমর বিষয়টি রসুলের (সা) কে বললেন । রসুলুল্লাহ (সা) বলেন “আমার থেকে যা শ্রবন কর তা লিখে রাখ । ঐ পবিত্র সত্বার শপথ যার হাতে আমার জীবন আমার মুখ থেকে হক ব্যতীত কিছুই বের হয় না ।

প্রথম হাদিস শরীফে লিখতে নিষেধ করা হয়েছে , আর দ্বিতীয় হাদিস শরীফে লিখতে বলা হয়েছে । এর ব্যাখ্যায় আলেমগন বলেন **

অধিকাংশ আলেমগন বলেন অনুমতি দ্বারা নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে ।


**
কিছু কিছু আলেম বলেন নিষেধাজ্ঞা ছিল তাদের জন্য যাদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ছিল তারা “কোরআন” এবং “হাদিস” মিশিয়ে ফেলতে পারেন , কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ছিল না তাদেরকে নিষেধ করা হয়নি।

 

সূত্র : 

১। ইসলামি শরীয়াহ ও সুন্নাহ : মুস্তফা হোসন আস সুবায়ী
২। হাদিসের তত্ব ও ইতিহাস : নুর মোহাম্মদ আজমী


৫ম পরিস্হিতি : কোনো একটি আমল এর ক্ষেত্রে আপনি একটি হাদিস পেলেন যেটা জঈফ , এর ভিত্তিতে আপনি ধারনা করলেন এই আমল করা ঠিক হবে না । কিন্তু এমনও দেখা গেছে ( এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য ) একই “আমলের” বিষয়ে একটি জঈফ হাদিস আছে এবং আরো অনেক সহীহ হাদিস আছে । সুতরাং এই “জঈফ” হাদিসের কারনে এই আমল বাতিল হবে না , যেহেতু এর সাথে সংশ্লিষ্ট আরো সহীহ হাদিস আছে।

৬ষ্ঠ পরিস্হিতি : আবার এমনও দেখা গেছে কোন একটি বিষয়ে শুধুমাত্র “জঈফ” হাদিস আছে । কোনো সহীহ হাদিস নেই । কিন্তু দেখা গেছে “সাহাবীদের (রা) ” মধ্যে এই আমল প্রচলিত আছে । এতে মুজতাহিদ ঈমামগন বা যারা ফকীহ তারা সিদ্ধান্তে এসেছেন এই আমল নিশ্চয়ই রসুলুল্লাহ(সা) থেকে এসেছে যেহেতু সাহাবীদের মধ্যে এটা এখনও প্রচলিত আছে। তাই রাবীর কারনে হাদিসটি জঈফ হতে পারে কিন্তু হাদিসটির মুলত গ্রাউন্ড আছে। এবং এই পরিস্হিতিতে এই জঈফ হাদিসের উপর বেস করে আমলটি সম্পূর্ন গ্রহনযোগ্য । সুতরাং এতে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি , জঈফ হাদিস দেখে কেউ যদি বলে এর ওপর আমল করা যাবে না তাহলে সবসময় সেটা সত্য নাও হতে পারে । যেহেতু সাপোর্টিং হিসেবে সাহাবীদের মধ্যে এই আমল প্রচলিত আছে ( যেটাকে কেউ হাদিস বা কেউ “আছারে সাহাবা” বলে থাকেন )

তাহলে বোঝা যাচ্ছে “সহীহ হাদিস হলেও সেটা পড়ে সাথে সাথে বিচার বিশ্লেষন না করে অনুসরন করলে বিপদের সম্ভাবনা আছে”। সহীহ হাদিস হলেই সেটা সরাসরি অনুসরন করা যায় না । হাদিস অনুসরন করার এটা পদ্ধতি নয় ।এটা হাদিস অনুসরন করার “বেদআতি পন্হা” । কোনো বই এ সহীহ হাদিস উল্লেখ করে মাসআলা দেয়া থাকলে বলা যাবে না সেটা সহীহ বা সেই বই এর সব মাসআলা বিশুদ্ধ । কেননা এমনও হতে পারে উপরের সমস্যা গুলো লেখক বা গবেষক খতিয়ে দেখেননি ।

বর্তমান কিছু সমস্যার পর্যালোচনা :

আজকাল অনেক সময়ই দেখা যায় কেউ কেউ কোনো একটি হাদিস গ্রন্হ পড়ে একটি হাদিস দেখলো যেটা প্রচলিত “মাজহাবের” আমলের বিপরীত । সাথে সাথে তারা সিদ্ধান্ত আসে “সহীহ হাদিসের ওপর আমল করতে হবে , মাজহাবের এই আমল যেহেতু সহীহ হাদিসের বিপরীত তাই এটা অনুসরন করা যাবে না” । । তাদেরকে আমার কিছু প্রশ্ন :

) আপনি কি ১০০% নিশ্চিত যে মাজহাবের এই আমলের দলীল সাপেক্ষে সহীহ হাদিস নেই ?
) আপনার কাছে কি এই নির্দিষ্ট আমল সংক্রান্ত পৃথিবীর সমস্ত হাদিস কালেকশনে আছে , যার ভিত্তিতে আপনি বলতে পারেন মাজহাবের এই আমলের সাপোর্টিং কোনো সহীহ হাদিস নেই ?
) আপনি কি নিশ্চিত মাজহাবের এই আমলের সাপোর্টিং হিসেবে সাহাবীদের কোনো আমলে নেই ?
) আপনি যে হাদিসকে সহীহ বলছেন সেটা পরবর্তিকালে “রহিত/মনসুখ” হয়নি এ বিষয়ে কি আপনি নিশ্চিত ?

উপরের প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন , তাহলে আপনাআপনিই এর সমাধান পেয়ে যাবেন । এমন অনেক পরিস্হিতি হতে পারে যেগুলোর সমাধান এত সহজে করা যায় না ।

সাহাবীগন , তাবেয়ীন , তাবেতাবেয়ীন , সলফে সালেহীনগন এভাবে হাদিস অনুসরন করেননি । এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে কিভাবে ওনারা হাদিস অনুসরন করেছেন ? ওনারা কিভাবে অনুসরন করেছেন সেটা আজকের পোস্ট এর বিষয় না ।

আজকের পোস্টের বিষয় হোলো সরাসরি হাদিস অনুসরন করার যে পন্হা বর্তমানে চলছে সেটা ভুল পন্হা ।
আহলে হাদিস নাম দিলেই বলা যাবে না তারাই একমাত্র “হাদিস” প্রকৃতভাবে অনুসরন করছে । বরং সুন্নত সিস্টেম সেটাই যেভাবে সাহাবীগন , তাবেয়ীগন এবং আগেকার সলফে সালেহীনগন হাদিস অনুসরন করেছেন , যেটা অন্য পোস্টে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হবে ইনশাল্লাহ ।

ওয়াস সালাম

[
সূত্র: এই পোস্ট লেখার সময় যে সকল বই এর সাহায্য নেয়া হয়েছে ] 

১। দরসে তিরমিজী : মাওলানা তকী ওসমানী
২। মুসলিম শরীফ
৩। মাজহাব কি ও কেনো : মাওলানা তকী ওসমানী
৪। ইসলামি উসূলে ফিকাহ : : তাহা জাবীর আল আলওয়ানী
সূত্র http://www.peaceinislam.com//hafiz/12288/

ইংরেজ সৃষ্ট কথিত আহলে হাদীস গ্রুপঃ ধর্মীয় বিভক্তির ভয়ংকর খেলায় মত্ত

মুযাহেরে হক্বকিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা কুতুব উদ্দীন তারতুহফাতুল আরব ওয়াল আযমগ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সারসংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হল
সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই রহ. পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মাযহাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়। যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ রহ. এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত১২৭৫ হি)। তার এর ধরনের অসংখ্যা ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারনে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদর রহ. ১২৪৬ হিজরীতে তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রান জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ রহ. এর খলীফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যপারে ফতওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মাযহাবের সম্মানিত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসীকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন (এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)। মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী পলায়ন করত : কোভাবে আত্মরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবআবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনাসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।(তুহফাতুল আরব ওয়াল আজম, পৃ: ১৬, :, আলনাজাতুল কামেলা, পৃ:২১৪, তন্বীহুদ্দাল্লীন, পৃ:৩১)

গাইরে মুক্বাল্লিদ আলিম মৌলভী আসলাম জিরাজপুরী তার বিশিষ্ট রচনানাওয়াদিরোতেলিখেন,
প্রথমত এ জামাত নিজেদের বিশেষ কোন নাম রাখেনি। মাও: ইসমাইল শহীদ রহ. এর শাহাদাতের পর প্রতিপক্ষের লোকেরা যখন দুর্নাম করা জন্য তাদেরকে ওহহাবী বলতে শুরু করে, তখন তারা নিজেরদেকেমুহাম্মাদীবলতে থাকে, অত:পর এ নামটি পরিহার করেআহলে হাদীসউপাধি চয়ন করে যা আজ পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে।(নাওয়াদিরাত, পৃ: ৩৪২)

উপরোক্ত বিররণ থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লামাযহাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সেওয়াহাবীহিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকেমুহাম্মাদীবলে প্রচার করতো। পরবর্তীতেইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারামএ মর্মে ফতওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজপত্র থেকেওয়াহাবীনাম রহিত করে আহলে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়।

ভারতবর্ষে ইংরেজবিরোধী ও ইংরেজ বিতাড়নে জিহাদ যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার ওহহাবী বলে আখ্যায়িত করেছিল, তখন গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহহাবী নামের আখ্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই তারা তখন নিজেদের জন্যমুহাম্মদীএবং পরবর্তীতেআহলে হাদীসনাম বরাদ্দ করার সম্ভাব্য সকল অপতৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গাইরে মুক্বাল্লিদদের তৎকালীন মুখমাত্র মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লাহোরী বৃটিশ সরকারের প্রধান কার্যালয় এবং পাঞ্জাব, সিপি, ইউপি, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাঙ্গালসহ বিভিন্ন শাখা অফিসে ইংরেজ প্রশাসনের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করত: তাদের জন্যআহলে হাদীসনাম বরাদ্দ দেয়ার দরখাস্ত পেশ করেন। এ দরখাস্তগুলোর প্রতি উত্তর সহ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত তৎকালীনএশায়াতুস সুন্নাহপত্রিকায় (পৃ:২৪২৬, সংখ্যা:, :১১) প্রকাশ করা হয় যা পরে সাময়ীক নিবন্ধ আকারেও বাজারজাত করা হয়। তাদের মানসিকতা ও লক্ষ্যউদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করার জন্য আপনাদের সমীপে সন্মধ্য হতে একটি দরখাস্তের অনুবাদ নিম্নে পেশ করছি।

বখেদমতে জনাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী,
আমি আপনার খেদমতে লাইন কয়েক লেখার অনুমতি এবং এর জন্য ক্ষমাও পার্থনা করছি। আমার সম্পাদিত মাসিকএশায়াতুস সুন্নাহপত্রিকায় ১৮৮৬ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলাম যে, ওহহাবী শব্দটি ইংরেজ সরকারের নিমক হারাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ শব্দটি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের ঐ অংশের জন্য ব্যবহার সমীচিন হবে না, যাদেরকেআহলে হাদীসবলা হয় এবং সর্বদা ইংরেজ সরকারের নিমক হালালী, আনুগত্যতা ও কল্যাণই প্রত্যাশা করে, যা বার বার প্রমাণও হয়েছে এবং সরকারী চিঠি প্রত্রে এর স্বীকৃতিও রয়েছে।
অতএব, এ দলের প্রতি ওহহাবী শব্দ ব্যবহারের জোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সাথে সাথে গভার্মেন্টের বরাবর অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে আবেদন করা যাচ্ছে যে, সরকারীভাবে এ ওহহাবী শব্দ রহতি করে আমাদের উপর এর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক এবং এ শব্দের পরিবর্তেআহলে হাদীসসম্বোধন করা হোক।

আপনার একান্ত অনুগত খাদেম
আবু সাঈদ মুহাম্মদ হুসাইন
সম্পাদক, এশায়াতুস সুন্নাহ

দরখাস্ত মুতাবেক ইংরেজ সরকার তাদের জন্যওহহাবশব্দের পরিবর্তেআহলে হাদীসনাম বরাদ্দ করেছে। এবং সরকারী কাগজচিঠিপত্র ও সকল পর্যায়ে তদেরআহলে হাদীসসম্বোধনের নোটিশ জারি করে নিয়মতান্তিকভাবে দরখাস্তকারীকেও লিখিতভাবে মঞ্জুরী নোটিশে অবহিত করা হয়।

সর্বপ্রথম পাঞ্জাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী মি: ডব্লউ, এম, এন (W.M.N) বাহাদুর চিঠি নং১৭৫৮ এর মাধ্যমে ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৬ ইংরেজিতে অনুমোদনপত্র প্রেরণ করেন। অতপর ১৪ই জুলাই ১৮৮৮ইং সি.পি গভার্মেন্ট চিঠি নং৪০৭ এর মাধ্যমে এবং ২০শে জুলাই ১৮৮৮ইং ইউ.পি গভার্মেন্ট চিঠি নং৩৮৬ এর মাধমে এবং ১৪ই আগষ্ট ১৮৮৮ইং বোম্বাই গভার্মেন্ট চিঠি নং৭৩২ এর মাধ্যমে এবং ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৮মাদ্রাজ গভার্মেন্ট চিঠি নং ১২৭ এর মাধ্যমে এবং ৪ঠা মার্চ ১৮৯০ইং বাঙ্গাল গভার্মেন্ট চিঠি নং১৫৫ এর মাধ্যমে দরখাস্তকারী মৌলভী আবু সাইদ মুহাম্মদ বাটালভীকে অবহিত করা হয়।
(এশায়াতুস সুন্নাহ, পৃ:৩২৩৯, সংখ্যা:, :১১)

কোন মুসলিম জামাতের নাম অমুসলিম, মুসলামানদের চিরশত্রু খৃষ্টান নাছারাদের মাধ্যমে বরাদ্দ করা ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিরল। যা কেবল হিন্দুস্তানী গাইরে মুক্বাল্লিদদেরই গৌরব ও সৌভাগ্যের বিষয় (!!!!!!!!) তাই তারা এ ইতিহাসটা অত্যন্ত গৌরবের সহিত নিজেরদের পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে তৃপ্তি লাভ করেছেন।

ইংরেজ সৃষ্ট কথিত আহলে হাদীস গ্রুপঃ ধর্মীয় বিভক্তির ভয়ংকর খেলায় মত্ত

একতা আজ সময়ের দাবী

মুসলমানদের অবস্থা এখন বড়ই খারাপ। কোথাও তারা নিরাপদ নয়। না দেশে, না বিদেশে। না মুসলিম রাষ্ট্রে, না বিধর্মী রাষ্ট্রে। গোটা পৃথিবীতে যখন ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। মুসলমান দেখলেই “সন্ত্রাসী” উপাধী দিয়ে হেনস্থা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ইসলাম ধর্মকে সন্ত্রাসী ধর্ম, সাম্প্রদায়িক ধর্ম আখ্যা দেওয়ার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে উপর্যুপরিভাবে। মুসলমানদের ইসলামী শিক্ষালয়কে সন্ত্রাসী কেন্দ্র আখ্যা দেবার হীন কর্মকান্ডে লিপ্ত। ঠিক এমনি সময় মুসলমানরা আজ শতধা বিভক্ত। মুসলমনদের মাঝে ধর্মীয় কোন্দলের সয়লাব। অথচ এখন সবচে’ প্রয়োজন হল মুসলমানদের মাঝে একতা সৃষ্টি করা। ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত করা। নবীজী (সাঃ)-এর কালিমায়ে তায়্যিবার প্লাটফর্মে এক হওয়া আজ সময়ের আবশ্যকীয় দাবি।

যখন মুসলমানদের দুশমনরা মুসলমানদের উপর হামলা করে, তখন তারা এটা দেখে না যে, সে কি দেওবন্দী না বেরেলবী? সে কি মুকাল্লিদ, না গায়রেমুকাল্লিদ? সে কি কিয়াম করে, না করে না? সে কি মাজারে যায়, কি যায় না? সে ইমামের পিছনে কিরাত পড়ে, না পড়ে না? “লোকটি মুসলমান” কেবল এই অপরাধেই হত্যা করা হয়।

(অত্যান্ত দুঃখের সাথে জানাতে চাই ডঃ জাকির নায়েক আহলে হাদিসদের পক্ষে কাজ করছে আর তাই হক্কানী আলেম ওলামারা তার বক্তব্য শুনতে নিষেধ করছেন।শিকদার )

ইংরেজদের আগমনের আগে এই উপমহাদেশে ধর্মীয় বিভেদ ছিল না

ইতিহাস সাক্ষ্য ইংরেজদের আসার আগে এই উপমহাদেশে কোন বাদশা ছিল না যে মাযহাবের বিরোধিতা করত। কোন ধর্মীয় কোন্দল ছিল না। টিপু সুলতান (রহঃ), মোঘল সম্রাজ্যের সকল মোঘল বাদশা, শাহজাহান, ঘুরি, জাহাঙ্গীর, বাদশা যফরসহ সকলেই হানাফী মাযহাবী ছিল। আকবর সে নতুন ধর্ম উদ্ভাবন করার অপচেষ্টা করেছিল, সেও মাযহাবের ইমামদের বিরোধিতা করেনি। কাউকে গালি দেয়নি।

এ উপমহাদেশে যত মুসলিম হাকিম বংশীয়, যত গোলাম বংশীয় আর যত ঘুরি বংশীয়, আর যত খিলজী বংশীয়, সাদাত বংশীয়, তুঘলোক বংশীয়, আর সুরী অথবা মোগল বংশীয় বাদশা ছিল, সবাই ছিলেন সুন্নী হানাফী। এই দেশে ইসলাম, কুরআনহাদিস আনয়নের ভাগ্য কেবল হানাফীদেরই ললাটেই আছে। সুতরাং নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানও একথা স্বীকার করে লিখেন যে, “যখন থেকে ইসলাম এ এলাকায় আসে, তখন থেকে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা হল এই যে, যেহেতো অধিকাংশ লোক বাদশার মতপথ এবং মাযহাবের অনুসরণকেই পছন্দ করে, এ কারণেই সূচনা থেকে এখন পর্যন্ত তারা হানাফী মাযহাবেই প্রতিষ্ঠিত। আর এখানে এই মাযহাবের আলেম এবং ফারেগীনরাই বিচারক আর মুফতী ও হাকিম হয়ে থাকে”।(তরজুমানে ওহাবিয়্যাহ১০)

৫৮৯ হিজরীতে সুলতান মুয়িজুদ্দীন সাম ঘুরী আসলেন। আর দিল্লী পর্যন্ত পদানত করেন। সে সময় থেকে নিয়ে ১২৭৩ হিজরী পর্যন্ত আপনারা এই দেশের ইতিহাস পড়ে দেখুন। মাহমুদ গজনবী (রহ.) থেকে নিয়ে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত, এমনকি সাইয়্যিদ আহমাদ শহীদ বেরলবী (রহ.) পর্যন্ত কোন গায়রে হানাফী গাজী, বিজেতা অথবা মুজাহিদ পাওয়া যাবে না।

কাশ্মীরের ব্যাপারে ঐতিহাসিক ফেরেস্তা লিখেন-“আমি দেখেছি এই দেশের সবাই ছিলেন হানাফী মাযহাবপন্থী”।(তারীখে ফেরেস্তা৩৩৭) আর এর পূর্বে রাশেদী এর বরাতে তিনি লিখেন-“হযরত শায়েখ আব্দুল হক সাহেব মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহ.) বলেন-”اهل الروم وما وراء النهر والهند كلهم حنفيون،ط” অর্থাৎ মা ওরাউন নাহার এবং হিন্দের সবাই ছিলেন হানাফী”। (তাহসীলুত তায়াররুফ৪৬) আর হযরত মুজাদ্দেদে আলফে সানী (রহ.) বলেন-“আহলে ইসলামের বড় অংশ ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর অনুসারী ছিল”। (মাকতুবাত/৫৫) শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহ.) বলেন-“সকল শহরের আর সকল দেশের বাদশা ছিল হানাফী। আর কাযী, অধিকাংশ শিক্ষক ও অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ছিল হানাফী” (কালিমাতে তায়্যিবাত১৭৭) এছাড়াও তিনি লিখেন যে, অধিকাংশ দেশ এবং প্রায় শহরেই আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুসারী ছিল। (তাফহীমাতে ইলাহিয়া/২১২) অর্থাৎ অধিকাংশ ইসলামী রাষ্ট্র এবং দুনিয়াব্যাপী অধিকাংশ মুসলমান ছিল হানাফী। ইসলামী দুনিয়ার অধিকাংশ অংশ হানাফী অনুসারী ছিল। আর এই মাযহাবের বদৌলতে কমপক্ষে হাজার বছর পর্যন্ত সমগ্র ইসলামী দুনিয়ায় বিধান প্রয়োগিত হত। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহ.) সত্য মাযহাবের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন যে, “দ্বীন ইসলামের প্রসারের সাথে দ্বীনে ইসলামের উপর হামলা এবং ফিতনার প্রতিরোধ করা হবে”।

এটাই তো স্পষ্ট যে, পাক ও হিন্দে দ্বীনে ইসলামের প্রসারে হানাফীদের সাথে শরীক কেউ নাই। সারা দেশের মাঝে ইসলাম হানাফীরাই ছড়িয়েছে। আর কাফেররা ইসলামে প্রবিষ্ট হয়ে হানাফীই হয়েছে। এই দেশে ইসলামের উপর দু’টি কঠিন সময় এসেছে। একটি হল সম্রাট আকবরের নাস্তিকতার ফিতনা।

দ্বিতীয় হল ইংরেজদের শাসন ও শোষণ।

আকবর যখন ইমামে আজমের অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে নাস্তিকতার দাওয়াত দিতে শুরু করে, তখন মুজাদ্দেদে আলফে সানী (রহ.) এবং শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহ.) এর প্রতিরোধে এই নাস্তিকতার ফিতনা মিটে যায়। আর ইংরেজদের শোষণের প্রতিরোধে হানাফীরাই এগিয়ে আসে। গায়রে মুকাল্লিদ নওয়াব সিদ্দীক হাসান লিখেন-“কেউ শোনেনি যে, কোন একেশ্বরবাদী, কুরআন ও সুন্নাতের অনুসারী ব্যক্তি ইংরেজদের সাথে বিদ্রোহ করার অপরাধে অপরাধী হয়েছে অথবা ইবলীসী ফিতনা আর বিদ্রোহের উপর অগ্রসর হয়েছে। যত লোক খারাপ ও মন্দ করেছে, আর ইংরেজ ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তারা সবাই হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। (তরজুমানে ওহাবিয়া২৫)

কিন্তু যখন ইংরেজরা আসল, ওরা দেখল এদেশের মুসলমানরা তাদের ধর্মের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। তাদের মাঝে কোন অভ্যান্তরীণ বিভেদ নাই। একতার এক স্বর্গীয় বাঁধনে তারা জড়িয়ে আছে। তাই ইংরেজরা তাদের বহুল প্রচলিত “ডিভাইড এন্ড রুল” তথা “পরস্পরে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের উপর শাসন করা হবে” এই নীতি বাস্তবায়িত করতে উঠেপরে লেগে গেল। মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় বিভেদকোন্দল সৃষ্টির জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে দিল। টাকা দিয়ে, অর্থ সম্পদ দিয়ে, বিত্তবৈভব দিয়ে কিছু দুনিয়ালোভি আলেমদের নির্বাচিত করে। অবশেষে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের ফসল হয়মীর্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী, বেরেলবী। তাদের শামসুল ওলামার উপাধী দেয়।

অথচ জেলে গেলেন, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহঃ), শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহঃ)-কে যেতে হল মাল্টার জেলে। থানবী (রহ.) “ইংরেজদের পণ্য ক্রয় করা হারাম” হবার ফাতওয়া দিলেন। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহঃ) ও কাসেম নানুতবী (রহঃ)-এর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী হল। রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী (রহঃ)-কে আদালতে ডাকা হল। যা স্পষ্টই প্রমাণ করে যে, তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে কতটা অগ্নিগর্ভ ছিলেন। আর ইংরেজরা তাদের কতটা ভয় পেত। স্বাধীনতার জন্য তারা কতটা উদ্বেগ নিয়ে কাজ করেছেন। আর কতটা মাথ্যা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তারা ইংরেজদের।

আহলে হাদীসনাম রাণী ভিক্টোরিয়ার দেয়া নাম!

একদিকে হুসাইন আহমাদ মাদানী রহঃ এর ফাতওয়া যে, “ইংরেজদের দলে ঢুকা হারাম”। আর আশরাফ আলী থানবী রহঃ এর ফাতওয়া যে, “ইংরেজদের পণ্য ব্যবহার হারাম”।

অপরদিকে ইংরেজদের পদলেহী, পা চাটা গোলাম একদল ঈমান বিক্রেতাদের ক্রয় করে নিল। তাদের মাঝে ছিল বাটালবী। তাদের মাঝে একজন কিতাব লিখল-“আল ইকতিসাদ ফি মাসায়িলিল জিহাদ”। যাতে সে লিখে যে, ইংরেজদের শাসন ইসলামী রাষ্ট্র। আর ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম। এই বই লিখার পর তাকে শামসুল উলামা উপাধী দেয়া হয়, তাকে মেডেল দেয়া হয়। অনেক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

যখন এদেশের মানুষ দেখল যে, ওরা ইংরেজদের দালাল। তখন তাদের “ওহাবী” বলে গালি দেয়া শুরু হয়। ওহাবী সেই যুগে তাদের বলা হতযারা দেশের গাদ্দার। দেশদ্রোহী। ওরা যেখানেই যেত সাধারণ মানুষ তাদের দেখে বলতএইতো ওহাবী চলে এসেছে। ওরা বাজারে গেলেও তাদের মানুষ বকা দিতসবাই বলত বাজারে ওহাবী চলে এল।

যখন তাদের সবাই ঘৃণার চোখে দেখতে লাগল, তখন নিজেদের সম্মানিত করার জন্য ওরা রাণী ভিক্টোরিয়ার কাছে গিয়ে আবেদন করল যে, আমরা তো আপনাদের কথা অনুযায়ী কিতাব লিখে আপনাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম বলেছি, এখন আমাদের সবাই ধিক্কার দিচ্ছে। গালি দিচ্ছে “ওহাবী” বলে। আমাদের জন্য সম্মানজক কোন পদবীর ব্যবস্থা করুন। তখন তাদের নাম দেয় রাণী ভিক্টোরিয়া “আহলে হাদীস”। এই হল আহলে হাদীসদের প্রতিষ্ঠার প্রকৃত ইতিহাস।

নিজেদের সংগঠনের রেজিষ্টার করায় ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে। অথচ দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার জন্য ইংরেজদের কাছে যাওয়া হয়নি। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহঃ ও আশরাফ আলী থানবী রহঃ এর খানকার অনুমোদনের জন্য ইংরেজদের কাছে যাওয়া হয়নি। কারণ তারা তো ইংরেজদের শাসন মানেন নি। তাদের শত্রু। তাদের থেকে অনুমোদন নেবার প্রশ্নই উঠেনা। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাই হয়েছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য। কিন্তু ইংরেজদের দালাল কথিত আহলে হাদীস গ্রুপ নিজেদের দালালিপনা পূর্ণ করার জন্য ইংরেজদের কাছ থেকে অনুমোদনকৃত নাম নেয় “আহলে হাদীস”।

এই আহলে হাদীস নাম কুরআন সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত নাম নয়। এটা বুখারী থেকে প্রাপ্ত নয়, এটা সিহাহ সিত্তার কিতাব থেকে প্রাপ্ত নয়। এটা ইংরেজদের থেকে প্রাপ্ত নাম। ওরা সর্ব প্রথম ফিরক্বা আহলে হাদীস নামে আবির্ভূত হয়। ওদের মূল নমুনা দেখা যায় আব্দুল্লাহ বিন সাবার কর্মকান্ড থেকে। আব্দুল্লাহ বিন সাবা যেমন মুসলমনাদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে সুচারুভাবে। ঠিক একই কাজ করছে এই ইংরেজ প্রসূত দল গায়রে মুকাল্লিদ আহলে হাদীস গ্রুপ। ওরা বলে যে, সে সময় ইংরেজ শাসন ছিল, তাই তারা তাদের থেকে রেজিষ্টার করেছে। ইংরেজদের দালালী করার জন্য নয়।

ইংরেজদের দালালদের আমরা বলিযদি রেজিষ্টার করা এতটাই দরকার হত, কাসেম নানুতবী রহঃ কেন দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করতে ইংরেজদের থেকে রেজিষ্টার দরকার হয়নি কেন? রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহঃ এর কেন দরকার হয়নি। কেন হাজী মুহাজেরে মক্কী রহঃ এর কেন দরকার হয়নি? কেন আশরাফ আলী থানবী রহঃ এর তার খানকার রেজিষ্টারের কেন দরকার হয়নি?

একটাই কারণ দেওবন্দী ওলামায়ে হযরাতের ইংরেজদের দালালী করার দরকার হয়নি। তাদের পা চাটতে তারা পারবেন না। তাই তাদের ইংরেজদের পদলেহন করে রেজিষ্টার করারও দরকার হয়নি। অপরদিকে গায়রে মুকাল্লিদরা সাধারণ মানুষের দালাল গালি শুনা থেকে বাঁচার জন্য ইংরেজদের বাচ্চা এই আহলে হাদীসদের নিজেদের সংগঠনের নাম আহলে হাদীস মঞ্জুর করাতে হল। ওদের স্থান কোথাও ছিলনা, কেউ তাদের আশ্রয় দেয়নি, না কোন মসজিদে। না কোন খানকায়, না কোন মাদরাসায়। আশ্রয় পেল কেবল রাণী ভিক্টোরিয়ার দরবারে। যেখানে গোটা ভারত অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সেখানে ইংরেজদের পা চেটে নিজেদের মজবুত করে নেয় এই দালাল গোষ্ঠি।

বিশেষজ্ঞ ছাড়াই নিজে নিজে সব বুঝে নিবেএমন গাঁজাখুরী কথা ইংরেজদের আমলের আগে কেই বলেনি

ইংরেজদের আসার আগে এরকম কোন দল ছিলনা যারা ফুক্বাহায়ে কিরামকে গালি দিত। ফুক্বাহাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখত। ফিক্বহ সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করে পথভ্রষ্ট করেছে। মাযহাব বিরুদ্ধবাদী কেউ ছিল না। কেউ একথা বলেনি যে, যে সকল লোক পাকনাপাকের মাসআলা পর্যন্ত জানে না। নামাযের নিয়ম সঠিকভাবে বুঝে না, সেই সকল লোক কোন ফক্বীহ এর অনুসরণ ছাড়াই সরাসরি কুরআন সুন্নাহ থেকে মাসআলা বের করে আমল করবে। এরকম গাঁজাখুরী কথা ইতোপূর্বে কেউ বলেনি।
যেমন সকল ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, তেমনি কুরআনে কারীম এবং রাসূল সাঃ লাখ হাদীস থেকে যেটাকে মনে হবে সেটাকেই আমল করবে। কোন মুজতাহিদের দরকার নাই। কারো বুঝানোর দরকার নাই। কোন শিক্ষকের দরকার নাই। জন্ম থেকেই বগলে বুখারী নিয়ে জন্ম নিবে। বুখারী খুলে যা বুঝবে তাই আমল করবে। এই গাঁজাখুরী দল ইংরেজ আসার আগে ছিল না। রাণী ভিক্টোরিয়া থেকে রেজিষ্টার করে, অনুমোদিত করে এই বাতিল ফিরক্বা বিভ্রান্তির প্রসার শুরু করে।

তোমরা মুহাম্মদী না হানাফী? এই প্রশ্নটি কি যৌক্তিক? না হাস্যকর?

গোটা পৃথিবীর মুসলিম এলাকায় মুসলমানদের মাঝে বিভ্রান্তিকোন্দল সৃষ্টি করার জন্য পায়তারা করে যাচ্ছে কথিত আহলে হাদীস দলটি। মুসলমানদের ঘরে ঘরে, এলাকায় এলাকায়, মসজিদে মসজিদে গিয়ে বলছে-“তোমরা মুহাম্মদী না হানাফী?”
সাহাবায়ে কিরামের মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত্ব ছিল যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সবচে’ উত্তম ছিলেন। এজন্য কাউকে আবু বকরী বলা হয় না। তারপর হযরত ওমর রা. এর ব্যাপারেও কোন মতভেদ ছিল না। এজন্য কাউকে ওমরী বলা হয় না। হযরত উসমান রা. এবং হযরত আলী রা. এর ব্যাপারে কিছু ইখতিলাফ ছিল।
জমহুর সাহাবীরা হযরত উসমান রাঃ কে হযরত আলী রা. থেকে উত্তম বলতেন। স্বাতন্ত্রতার জন্য হযরত উসমানকে উত্তম বলাকারীদের উসমানী বলা হয়। আর আলী রা. কে উত্তম বলাকারীদের আলিয়ী বলা হয়।
কিছু তাবেয়ীকে উসমানী এবং আলিয়ী বলার বর্ণনা বুখারী শরীফের ১ নং খন্ডের ৪৩৩ নং পৃষ্টায় আছে।
কুরআনে পাকের ক্বিরাতের মাঝে যখন ইখতিলাফ হয় তখন স্বাতন্ত্রতার জন্য ক্বারী আসেম রহ. এর ক্বিরাত এবং ইমাম হামযাহ রাহ. এর ক্বিরাত রাখা হল। এটাকে কেউ তো এই উদ্দেশ্য নেয়নি যে, এটা আল্লাহর কুরআন নয়, বরং ক্বারী আসেমের বানানো! হাদিসের মাঝে মতভেদ হলে বলা হয় এটা আবু দাউদের হাদিস আর এটা বুখারীর হাদিস। এই কথার উপরও কেউ কুফরীর নিসবত করে না তো!
ঠিক এমনি হাল ফিক্বহী বিষয়ে মতভেদের সময় ‘হানাফী” আর “শাফেয়ী” বলাটা। আমরা ঈসায়ীদের বিপরীতে নিজেকে মুসলমান বলি। আহলে বিদআতি খারেজী মুতাজিলীদের বিপরীতে নিজেদের আহলে সুন্নাত বলি। আর শাফেয়ীদের বিপরীতে নিজেদের হানাফী বলি।
যেমন আমরা ভারতীদের বিপরীতে নিজেদের বাংলাদেশী বলি। গাজীপুরের বিপরীতে এসে বলি নরসিংদী। নরসিংদী, গাজীপুরী, বাংলাদেশীকে মেনে বলা হয়। ছেড়ে নয়। ওদের এই প্রশ্নটিই একটা ধোঁকাবাজি। এ রকম প্রশ্ন ফাইজলামী ছাড়া কিছু নয় যে, আজ শনিবার নাকি ৫ তারিখ? আজ নভেম্বর নাকি রবিবার? প্রশ্ন হবে আজ শনিবার নাকি রবিবার? আজ নভেম্বর নাকি ডিসেম্বর? সুতরাং এক্ষেত্রেও প্রশ্ন হবে-“তুমি মুহাম্মদী না ঈসায়ী? তুমি হানাফী না শাফেয়ী?” কিন্তু একথা বলা ভুল এবং হাস্যকর যে, “তুমি পাকিস্তানী না পাঞ্জাবী? আজ নভেম্বর না শনিবার? তুমি হানাফী না মুহাম্মদী?”

আমলের ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টির এক ভয়ানক খেলায় মত্ত ওরা

গায়রে মুকাল্লিদরা আজ ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করেছে। ফাযায়েলে আমালের বিরুদ্ধে লেগেছে। যেই কিতাব যখন কোন এলাকায় ঢুকেছে সেই এলাকায় দাড়িহীন লোক দাড়ি রাখছে। সুদখোর সুদ ছাড়ছে। ঘুষখোর ঘুষ ছেড়ে দিচ্ছে। গোটা পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ঢুকে মানুষকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করছে। সেই কিতাবের বিরুদ্ধে লেগেছে ইংরেজদের দোসর এই বাতিল ফিরক্বা।
আজ নামের মুসলমানরা পাকনাপাকের মাসআলা জানে না। নখপালিশ দিয়ে অযু করছে তাদের অযু হচ্ছে না, গোসল হচ্ছে না। যদি আহলে হাদীস গ্রুপ ইংরেজদের দোসর না হত, তাহলে তারা তাবলীগ জামাতের বিরুদ্ধে না লেগে মুসলমানদের আমল শিক্ষা দিত। কুরআন শিক্ষা দিত। পাকনাপাকের মাসআলা শিক্ষা দিত। মুসলমানদের মদপান থেকে বিরত রাখতে কাজ করত। সুদ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করত। কিন্তু তারা এসব কিছুই করছে না। বরং যেই লোকগুলো নামায পড়ছে তাদের মনে ওয়াসওয়াসা তথা সন্দেহ সৃষ্টি করে দিয়ে বলছে যে, তোমাদের নামায হয় না। তোমাদের কালিমা হয় না ইত্যাদী। নামাযী মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দিয়ে বলছে , তোমাদের নামায মুহাম্মদী নামায নয় হানাফী নামায। তোমাদের কালিমা মুহাম্মদী কালিমা নয় হানাফী কালিমা। তোমরা শিরক করছ। এভাবে আমলকারী মুসলমানদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ওদের কার্যক্রম জোরদার করছে। ওরা আমলকারীদের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে দিচ্ছে সহীহ হওয়া না হওয়ার।
এই ওয়াসওয়া থেকেই আল্লাহ তায়ালা আশ্রয় চাইতে সূরা নাসে শিক্ষা দিয়েছেন যে,
الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ (5) مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ (6)
অর্থাৎ যারা মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা তথা সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় মানুষ ও জিন জাতির মধ্য থেকে তাদের থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। {সূরা নাস}
ওরা আমলের মাঝে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কুরআনের মাঝে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে, হাদীসের মাঝে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। নামাযের মাঝে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। ওরাই কুরআনে বর্ণিত সেই ওয়াসওয়াসা সৃষ্টিকারী দল। যাদের থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা।

মক্বামদীনা নয়, কুরআনসুন্নাহই অনুসরণীয়

ওরা মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে যে, মক্কা থেকে দ্বীন এসেছে। মদীনা থেকে দ্বীন এসেছে। মক্কা মদীনায় নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধে। ইমামের পিছনে কিরাত পড়ে। সুতরাং তোমরাও তাই কর। তোমরা যেই নামায পড়ছ এটা হচ্ছে না। এটা মুহাম্মদী নামায নয়, এটা হানাফী নামায। মুহাম্মদী নামায সেটাই যা দ্বীন যেখানে নাজীল হয়েছে সেই এলাকার মানুষ করছে সেটাই হল দ্বীন। সুতরাং তোমরা মদীনার নামায রেখে কেন হিন্দুস্থানী নামায, কুফাবাসীর নামায কেন পড়?
এই আহম্মকদের আমরা বলি বর্তমান আরবের শায়েখদের আমলই যদি শরীয়ত হয়, তাহলে আরবের অনেক শায়েখ এক সাথে ১৪জন বিবি রাখছে। তোমরা এটাকেও অনুসরণ করবে? ওদের সিডি দেখিয়ে মানুষকে বল যে, এক সাথে ১৪ বিবি রাখা যায়! কারণ সেখানে তো দ্বীন এসেছে মক্কামদীনা থেকে তাই ওখানের লোকেরা যা করে সেটাই শরীয়ত!
ওরা একদিকে বলে যে, কুরআন সুন্নাহ ছাড়া কোন কিছুই দলিল নয়, তারাই আবার আরবের শায়েখদের নামাযের বর্ণনা দিয়ে বলে যে, ওরা যেহেতু বুকে হাত বাঁধে তাই আমাদেরও বাঁধতে হবে। আরবের লোকেরা যেহেতু আমীন জোরে পড়ে তাই আমাদেরও জোরে পড়তে হবে! ওদের এ কাজ কোন দোষণীয় নয়?!
আর আমরা শুধু ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর জ্ঞানের উপর নির্ভর করেছি। তার বিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেছি, তাই আমরা হয়ে গেছি মুশরিক, আর ওরা আরবের লোকদের তাক্বলীদ করে খাঁটি মুমিন থাকে কি করে? অথচ আল্লাহর নবী ইরশাদ করেছেন যে,
تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة نبيه
তথা আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বিষয় রেখে গেলাম, তোমরা ভ্রষ্ট হবেনা যদি এ দু’টি আকড়ে ধরে রাখ। কিতাবুল্লাহ ও নবীর সুন্নত। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং১৫৯৪}
রাসূল সাঃ মক্কাকে আদর্শ বানাননি। মদীনাকে আদর্শ বানাননি। আদর্শ বানিয়েছেন কিতাবুল্লাহ ও নবীজী সাঃ এর সুন্নাতকে।
অথচ ইংরেজদের দালাল আহলে হাদীস গ্রুপ আরবের শায়েখদের ভিডিও দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে যে, ওরা বুকে হাত বাঁধে তাই আমাদেরও বাঁধতে হবে। ওরা জোরে আমীন বলে তাই আমাদেরও বাঁধতে হবে। যেই লোকগুলো ১৪টি ১৮টি স্ত্রী রাখে এক সাথে। ওসব শায়েখদের আমল ওদের কাছে দলিল হতে পারে আমাদের কাছে নয়।

আমাদের ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর সময় একটি বকরী চুরি হয়ে গিয়েছিল, তাই তিনি একটি বকরী যত দিন জীবিত থাকতে পারে ততদিন পর্যন্ত কোন বকরীর গোস্ত খাননি। যাতে চুরিকৃত বকরীর গোস্ত তার পেটে না পৌঁছে। আমরা এমন মুত্তাকির ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করি বলে আমরা হয়ে গেছি মুশরিক। আর ওরা ১৪টি ১৫টি স্ত্রী এক সাথে রেখে হারামে লিপ্ত শায়েখদের নির্ভর করতে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। ওদের লজ্জা গেল কোথায়?

অধীনতাহীন কুকুর পদে পদে হয় লাঞ্ছিত

আমাদের আকাবীররা একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন যে, একটি পালিত কুকুর তার গলায় যখন মনীবের রশি থাকে, তখন সে অসুস্থ্য হয়ে গেলে তার মনীব তার চিকিৎসা করে। তাকে নিয়মিত খাবার দেয়। তার সর্বদিক দেখাশোনা করে। সে যেখানে ইচ্ছে মুখ দেয় না। তাই তাকে কেউ আঘাত করে না। কিন্তু যখনই সে মনীব থেকে নিজের গলার রশি খুলে পালায়, যেখানে ইচ্ছে মুখ লাগায়, সকালে এখানে, বিকালে ওখানে, তাহলে বাচ্চারা পর্যন্ত এই কুকুরটিকে ঢিল ছুড়বে। লাঠি দিয়ে তাড়াবে। লাঞ্ছিত হবে সে পদে পদে।
ঠিক তেমনি ইংরেজদের ফরযন্দ আহলে হাদীসরা যখন ইমাম আবু হানীফা থেকে নির্ভরতার রশিকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। ইমাম শাফেয়ী রহঃ থেকে নিজের রশিকে ছাড়িয়ে নিয়েছে, ইমাম মালেক রহঃ থেকে গলার রশি ছাড়িয়ে নিয়েছে, ইমাম আহমাদ রহঃ থেকে রশিকে ছাড়িয়ে নিয়েছে, আর সর্বজন বিদিত বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা রেখে সরাসরি দ্বীন বুঝতে চেয়েছে, তখন এক মাসআলায় হানাফী, এক মাসআলায় শাফেয়ী, এক মাসআলায়া মালেকী আরেক মাসআলায় হাম্বলী সেজেছে। তাই ওরাও স্বাধীন কুকুরের মত দিশাহীন বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার আরবের ভিডিও দেখায়, একবার বুখারী নিয়ে দৌঁড়ায়। একবার আলবানীর বই দেখায়, একবার ইবনে তাইমিয়ার কিতাব, একবার ইবনুল কায়্যিমের কিতাব দেখায়।
এই উন্মাদদের প্রশ্ন করিকুরআন সুন্নাহ রেখে আলবানী আর ইবনে তাইয়মিয়া আর ইবনে বাজের ফাতওয়া দেখায় কেন? ভিডিও দেখায় কেন? মক্কার আমল দেখায় কেন? মদীনার আমল দেখায় কেন? ওরা তো সরাসরি শুধু কুরআন আর সহীহ হাদীস দেখাবে। এছাড়া অন্য কিছু দেখানোর তো ওদের কোন অধিকারই নেই। তাহলে তো তাক্বলীদ হয়ে যাবে। আর তাক্বলীদ ওদের ভাষায় শিরক।
আশ্চর্য লাগেবাড়ি গড়ার জন্য যেতে হয় ইঞ্জিনিয়ারের কাছে, জুতা ঠিক করতে মুচির কাছে, চুল কাটতে নাপিতের কাছে, আইন জানতে হলে যেতে হয় আইনজিবীর কাছে, কিন্তু মুহাম্মদ সাঃ এর দ্বীন এতই সস্তা হয়ে গেছে যে, ওটা জানার জন্য কারো কাছে যাবার দরকার নাই। কোন বিশেষজ্ঞের শরাণান্ন হবার প্রয়োজন নেই। নিজে নিজে কুরআন হাদীস দেখেই দ্বীন বুঝে যাবে।

মক্কামদীনার অধিবাসীরা গায়রে মুকাল্লিদ নয়

মক্কা মদীনার মূল শায়েখ ও ওলামায়ে কিরাম গায়রে মুকাল্লিদ নয়। মদীনাবাসী মালেকী মাযহাবী। আর মক্কীরা হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করেন। হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবে আমীন জোরে পড়ার বিধান, তাই তারাও আমীন জোরে বলেন। হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবে বুকের উপর হাত রাখার বিধান, তাই মক্কা ও মদীনাবাসী বুকের উপর হাত বাঁধে। ইংরেজদের দালাল আহলে হাদীসদের মত গায়রে মুকাল্লিদ এজন্য নয়।

একথাটির সবচে’ বড় দলিল হলমক্কা ও মদীনায় রমযান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ হয়, কিন্তু ইংরেজদের দালাল কথিত আহলে হাদীসরা পড়ে ৮ রাকাত। মক্কা ও মদীনার আলেমরা গায়রে মুকাল্লিদ হলে তারাও গায়রে মুকাল্লিদদের মত ৮ রাকাত তারাবীহ পড়ত। কিন্তু মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবে তারাবীহ ২০ রাকাত হবার কারণে মক্কা মদীনার বাসিন্দারা তারাবীহ ২০ রাকাত পড়ে , গায়রে মুকাল্লিদদের মত ৮ রাকাত নয়। এটাই প্রমাণ করে যে, মক্কা মদীনার লোকেরা ইংরেজদের দালাল কথিত আহলে হাদীস গ্রুপ তথা গায়রে মুকাল্লিদ নয়।

বড়ই আশ্চর্যের বিষয় যে, রমযান এলে বেনামাযী নামাযী হয়ে যায়। ফরজ যারা পড়তেন তারা নফল পড়া শুরু করেন। সকল আমলকে বাড়িয়ে দেন। যে কুরআন পড়ে না, সেও কুরআন পড়তে শুরু করে। যে নফল দুই রাকাত পড়ত সেও ৪ রাকাত বা বেশি পড়তে থাকে। কিন্তু এই নাফরমান গায়রে মুকাল্লিদ গ্রুপ আমলকে ২০ রাকাত তারাবীহকে কমিয়ে ৮ রাকাত বানিয়ে দেয়।

তাই জাকির নায়েক থেকে সাবধান থাকুন।

মাজহাব মানার অর্থ কি?

মাজহাব মানার অর্থ কি?

লিখেছেন এসো দেশ গড়ি ২৯ এপ্রিল ২০১২

একটি ভিডিওতে দেখলাম এক ব্যাক্তি শ্রোতাদেরকে বলছেন ভাইসব দেওবন্দি মাদ্রাসা গুলোতে দেখলাম ক্লাসে উস্তাদ ছাত্রদের বলছেন ইমাম আবু হানিফা এরকম বলেছেন ইমাম শাফি এরকম বলেছেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এরকম বলেছেন
, ইমামা মালেক এরকম বলেছেন কিন্তু আল্লাহ আর আল্লাহর রাসুল কি বলেছেন সেটা কেন বলেন না?
আবার একজনকে দেখলাম তিনি বলছেন ভাই সব ইমামা আবু হানিফার কথা মানবেন নাকি কোরান হাদিসের কথা মানবেন?
উপরোক্ত কথা শুনে যে কেও এই কথাটি খুব ভাল হয়েছে বলে প্রশংসা করবে। কিন্তু তার ভিতরে তিনি আসলে কি বলেছেন সেটা যদি একটু চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন তিনি আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সুন্দর একটি কথার আড়ালে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন।
কিভাবে তা করেছেন একটু দেখুন। তিনি প্রথমেই দাবী করেছেন আল্লাহ আর আল্লাহর রাসুল যা বলেন ইমামগণ তার উলটা বলেন। যার কারণে তিনি শ্রোতাদেরকে ইমামগণের কথা না মেনে আল্লাহ আর আল্লাহর রসুলের কথা মানতে বলছেন। আল্লাহ আর আল্লাহর রসুলের কথা মানতে বলছেন ভাল কথা কিন্তু ইমামগণ আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুলের কথার বিপক্ষে কথা বলেন তা আপনি দাবী করলেন কেন? এটা প্রতারণা না?
ইমাম আবু হানিফা রহঃ বলেছেন যা কোরান হাদিস মতে হবে সেটাই তার মাজহাব। তাহলে আপনি তাদেরকে কোরান হাদিসের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিলেন কেন?
আমরা জানি কোরানের কিছু কিছু আয়াত সহজে বুঝা যায় যা আরবী জানা যে কেও বুঝতে পারে। আর কিছু কিছু আয়াত আছে যা যেকেও বুঝতে পারে না। তা বুঝতে হলে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। গভীর জ্ঞানের অধিকারী সেই সব ইমামগণ কোরান আর হাদিস গবেষণা করে আমাদের জন্য মাসআলা বের করেছেন। তাতে তারা নিজ থেকে কিছুই বলেন নি। যা বলেছেন কোরান হাদিস থেকেই বলেছেন। তাহলে তাদেরকে কথা কোরান হাদিসেরই কথা। কিন্তু আপনি বললেন কোরান হাদিস মানবেন নাকি ইমামদের কথা মানবেন
?
ইমামদের মধ্যে কিছুটা এখতেলাফ আছে সেটাও কোরান হাদিস থেকে এসেছে। যেমন মহিলাদের ইদ্দতের সময় তিন হয়হয় নাকি তিন তুহুর তাতে এখতেলাফ আছে। সেই এখতেলাফটা এসেছে “ক্বুরু” শব্দ থেকে। সেই শব্দটা এসেছে কোরানে। একই শব্দ থেকে তিন হায়েজ বা তিন তুহুর অর্থ করা যায়। দেখা যাচ্ছে ইমামদের কথা মানার অর্থ হচ্ছে কোরান হাদিসের যে ব্যাখ্যা তারা করেছেন সেটা মানা।তাহলে ইমামগণ নিজ থেকে কোরান বিরোধী কথা বলেছেন বলে মিথ্যা প্রচারণা করার হেতুটা কি?
ইমামগণ সারা জীবন কোরান হাদিসের গবেষণায় কাটিয়ে দিয়েছেন। তারা আমাদের চেয়ে হাজার গুন বেশি কোরান হাদিস বুঝেছেন। আর তারা আমাদের মত কোনোও সংস্থার অধীনে চাকরি করার কারণে অমুকের কথা কোরান বিরোধী তার কথা মানবেন নাকি কোরানের কথা মানবেন বলে উলটা পালটা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন সেরকম কোনোও প্রমাণ নাই। ইমামগণ একে অন্যকে সম্মান করতেন। তাহলে আপনারা যারা ইমামদের কথা না মানার জন্য আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন আপনাদের কথা যে মিথ্যা সেটা আমি একটু আগে বলেছি। এই সব মিথ্যা কথা আমি না মেনে নিঃস্বার্থ ত্যাগী জ্ঞানী, পরহেজগার ইমামদের ব্যাখ্যামত কোরান হাদিস মানলে অসুবিধা কোথায়?
অনেকেই আবার বলে সরাসরি কোরান হাদিস দেখে চলেন। আমি আগেই বলেছি কিছু কিছু আয়াত আমি দেখে চলতে পারি। কিন্তু আর কিছু কিছু আয়াত বুঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয় তাহলে আমি কি করব? যে ব্যাক্তি কোরানের ইংলিশ তারজুমা পড়ে নিজেকে মুজতাহিদ দাবী করে আর আল্লাহকে রাম বা ভ্রম্মা নামে ডাকলেও জায়েজ হবে বলে ফতোয়া দেয় তার কথা মানা আমার জন্য কি সম্ভব? না তা সম্ভব নয়।
সরাসরি কোরান দেখে চলার উপদেশ আপনি খুব সুন্দর করে দিয়ে থাকেন কিন্তু আবার ইউটিউবে আমাকে ওয়াজ করেন কেন? আমি আপনার ওয়াজ শুনে তার মতে আমল করলেতো আর সরাসরি কোরান দেখে চলা হয় না। তা আপনার কথা মত চলা হয়ে যায়। এটা স্ববিরোধীতা না? আপনার ওয়াজ শুনে যদি আমাকে চলতে হয় আমি ইমামদের ব্যাখ্যা অনুসারে করান হাদিস মতে চলা আমার জন্য অনেক অনেক ভাল। কারণ ইমামগণ কারো বেতন খেয়ে মিথ্যা বলতেন না। আর নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করার জন্য বড় বড় আলেমদের না ধরে ধরে কাফের কাফের বলতেন না। যা আহলে হাদিস নামধারী ভণ্ডরা আজকাল করছে।
পরিশেষে বলতে চাই দীন মতে চলতে হলে দীনদার ইমামগণের ব্যাখ্যা মেনে চলা অনেক ভাল যারা নেটে বসে নামাজ দোয়া বাদ দিয়ে শুধু ইমামদেরকে গালাগালি করে তাদের কথা মানার চেয়ে।
আমি আহলে হাদিসের কয়েকজনকে দেখেছি যারা আগে মাদ্রাসায় পড়েছে। পরে একটি সংস্থার অধীনে চাকরি করে সউদি আরব গেছে। ওখান থেকে আসার পরে নামাজ পড়ে না। দাড়ি কেটে ফেলেছে। হাফ প্যান্ট পরে বাজারে যায়। বউকে বেপর্দা চালায়। মানুষ তাকে দেখে ছি ছি করে। আমার চোখ দেখা মানুষের কথা বললাম। কেও চ্যালেঞ্জ করলে আমি প্রস্তুত আছি। দেখিয়ে দেব তার বাড়িতে আপনাকে নিয়ে গিয় দেখিয়ে দেব যে দেখেন আহলে হাদিস কারে কয়?
আবারও বলছি মাজহাব মানা মানে ইমামদের কথা মানা নয়। মাজহাব মানা মানে হচ্ছে ইমামদের ব্যাখ্যা মতে কোরান হাদিস মানা।