প্রেম, পরিণতি ও করণীয়

বিলকিস আক্তার : ইদানিং রাস্তাঘাটে বের হলে মনে হয় চোখ বন্ধ করে রাখতে পারলে ভাল হতো। কোন অপ্রীতিকর ও অসামাজিক কর্মকান্ড তাহলে চোখে পড়ত না। কিন্তু যাদের দৃষ্টি শক্তি নাই তাদের কথা ভিন্ন আর যাদের চোখ আছে তারা কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে চলবে? তবুও উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা যেভাবে চলাফেরা করে তাতে চোখ বন্ধ না করে কোন উপায় আছে? তাদের ভাবসাব দেখলে মনে হয় আমরা ভুলে ভীনগ্রহে চলে এসেছি। যে গ্রহের নিয়ম কানুন সম্পূর্ণই আমাদের থেকে আলাদা। ছেলেরা হাতে চুড়ি, ব্যাজ, কানে দুল, গলায় মোটা বড় বড় মালা আর মেয়েরা টাইট জিনস (যা টাকনুর বহু উপরে উঠানো) পরিহিতা, এ যেন উভয়েই ছেলেকে মেয়ে ও মেয়েকে ছেলে হইতে চাওয়ার আমরণ প্রচেষ্টা। মাত্র কয়েক বছরে দেশ এতটা অগ্রগতি (?) লাভ করেছে যে ভাবতে অবাক লাগে। আসলে এ সবই কি পরিবেশ ও যুগের দোষ? নাকি ছেলেমেয়েদের দোষ? নাকি পিতা-মাতাই এর জন্য দায়ী? আমাদর শিক্ষা ব্যবস্থা কি এর জন্য দায়ি নয়? সামাজিক অবক্ষয় কেন হচ্ছে এর রোধ করার কি কোন উপায় নেই? হাজারো প্রশ্ন তখন, মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। অলিতে, গলিতে, পার্কে, স্কুল-কলেজ সর্বত্রই যেন প্রেমের ছড়াছড়ি। এ যেন লাইলি মজনুকেও হার মানিয়ে দিবে। এ যুগের ভালবাসা বলে কথা! যত্রতত্র এত ভালবাসার ছাড়াছড়ি তারপরও কি সামজে, সত্যি ভালবাসা আছে? যে ভালবাসার টানে দীর্ঘ রত্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করে বেরিয়ে যাচ্ছে অল্প পরিচিত মানুষটির হাত ধরে সেখানেই বা কি নিজেকে সুখী করতে পারছে। মরিচীকার মতো ছুটেই চলেছে ভালবাসা নামক অলীক বস্তুটিকে আপন করে পাওয়ার জন্য। অব্যর্থভাবে চেষ্টা চালানোর পরও তারা ব্যর্থ হচ্ছে ভালবাসার প্রজাপতিটিকে ধরতে। আমাদের সমাজের ভুল পথে ভালবাসাকে পাওয়ার এই প্রচেষ্টা থেকেই আমার আজকের কলম ধরা।
প্রেম কি : নারী ও পুরুষের মধ্যকার যে সম্পর্ক তার নামই প্রেম। অথবা বিপরীত ধর্মী লিঙ্গ একজন আর একজনের জন্য নিজের জান, নিজের বিশ্বাস ও নিজস্ব অস্তিত্ব সপে দেয়ার নামই প্রেম বা ভালবাসা। আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে এভাবে বলেছেন, ‘‘এবং তার নিদর্শন সমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে- তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন। যেন তোমরা তার কাছে মানসিক শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।’’ (সূরা রুম, ২১)। প্রেমের সংজ্ঞায় আল্লাহ আরো বলেছেন, ‘‘তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে জোড়া হিসেবে তৈরি করেছেন যেন তোমরা একে অপরের কাছ থেকে শান্তি ও আরাম পাও। ’’ (সূরা আরাফ-১৮৯)। সাথী বা জোড়কে কুরআনে ‘আযওয়াজ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। বহু কবি সাহিত্যিকরা রঙ তুলিতে প্রেমের বহু সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, কিন্তু আমার আল্লাহর সংজ্ঞার চাইতে কোনটা কি উত্তম হয়েছে?
কখন হয় এই প্রেম : প্রেমের কোন বয়স নাই
নাই কোন তার রং
প্রেমে পড়ার সময় যে সব সময়।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। সাদা, কাল, ভাল, মন্দ এই সব প্রেম নির্বাচন করতে পারেনা। যে কোন বয়সে যার তার সাথে প্রেমে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এক দশক ধরে এই জিনিসটা বেশি দেখা যাচ্ছ অবিবাহিত ছেলেরা ২-৩ বাচ্চার মার প্রেমে পাগল হয়ে তার জন্য সব করতে পারছে, মহিলারা স্বামীকে রেখে অন্য পুরুষের হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রেমের সেঞ্চুরি করছে। কুরআনে এইগুলোকে আল্লাহ বলেছেন বেশি পাওয়ার লোভ তাদেরকে গাফেল করে রেখেছে।
প্রেমের সামাজিক অবক্ষয়গুলো : ‘প্রেম’ সমাজের একটি বিষাক্ত দাহ্য পদার্থ। যা একটি পরিবারে অনুপস্থিত থাকলে পরিবারটি হয় বিষাক্ত। আর ইসলামের বিপরীত প্রেমের ফলে হয়ে উঠে দেশ, জাতি ও সমাজ বিষাক্ত। এই ইসলামের বিপরীত প্রেমের সয়লাবে আমাদের সমাজ মাতোয়ারা। ফলে নৈতিক দিক থেকে আমরা হয়ে পড়েছি মেরুদন্ডহীন প্রাণী কোঁচোর মতো।
প্রেমের কারণে ভেঙে যাচ্ছে সংসার, সন্তানরা হচ্ছে দিশেহারা পারিবারিকভাবে হতে হচ্ছে হেয় প্রতিপন্ন। লজ্জায় অপমানে একটা পরিবার সামাজিকভাবে বয়কট এর পথে হাঁটছে। নিম্নে প্রেমের সামাজিক অবক্ষয়গুলো তুলে ধরা হলো :
অবাধ মেলামেলা : ছেলে মেয়েতে অবাধ মেলামেশার ফলে প্রেমের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এর প্রধান কারণ। এক সাথে ছেলেমেয়েতে চলাফেরা না করলে আবার তথাকথিত মুক্ত চিন্তা বিদদের (ইসলামের চিন্তা থেকে মুক্ত) ভাষায় ছেলেমেয়েরা ব্যাকডেটেড হয়ে যায়। তাই তাদের মত করে যুগটাকে সাজাতে গিয়েই প্রেমের হার আরো বেড়েছে।
অবাধ নারী স্বাধীনতা : মনে হয় নারীরা আগে পরাধীন ছিল এখন তারা বহু রঙের বিনিময়ে বহু মা, বোনের ইজ্জতের বিনিমযে নারী স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আসলে কিন্তু তা নয়। নারী পুরুষের সমান অধিকার পাওয়ার জন্য যে চেষ্টা সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি চলে এসেছে তা কিন্তু পুরুষের কলকাঠি নাড়ানোর কারণেই। নৈপথ্যে থেকে পুরুষই নারীকে স্বাধীনতা আদায় করার জন্য ঘর থেকে বের করিয়ে এনেছে। বোকা নারীরা সেই সমস্ত পুরুষের হাতেই তাদের সতীত্ব হারাচ্ছে। সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব, বেহায়ার মত তখনই পুরুষের মন খুশি করার জন্য বলছে আমরা নারী স্বাধীনতা চাই। আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছি। এইভাবে নারী কোমলমতি হয়ে উঠেছে স্বৈরাচারীনী ও কঠোর। এই অবাধ নারী স্বাধীনতা আদায় করতে গিয়ে আজকে পত্রিকা খুললেই নারী নির্যাতন, হত্যা, খুন, ধর্ষণসহ নানা খবর আমরা প্রতিনিয়তই দেখতে পাই। অথচ আমাদের মা, চাচীদের আমলে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, উনারা নারী স্বাধীনতা কি তা জানতেনই না, এখনো জানার চেষ্টা করেন না, অথচ উনাদের সেই সময়গুলো কত সুন্দর ছিল! ভালবাসায় ভরপুর ছিল তাদের ঘর। তখন ছিল না নারী নির্যাতন, ছিল না হত্যা, ধর্ষণ ও খুন। ফলে প্রেমের নামে কলংক লোচন করে তথাকথিথ নারীরা কোন স্বাধীনতা অর্জন করতে চায় ;তা কি তারা আদৌ বোধগম্য?
পরিবার থেকে যখন অনেক দূরে : বহু পিতামাতা আছেন যারা বিভিন্ন কারণে তাদের সন্তানদের প্রতি সঠিকভাবে যত্ন নিতে পারছেন না বা তাদের প্রতি সঠিকভাবে খেয়াল রাখতে পারছে না। ফলে সন্তানরা পিতামাতার চাইতে ভাল কম্পানি বা সঙ্গী খোঁজে। আর বিপরীত ধর্মী লিঙ্গের প্রতি স্বভাবতই আকর্ষণ বেশি তাই তারা অধিক ভাল আশ্রয়ের খোঁজে, একটু শান্তির আশায় প্রেমের এই পথকে বেছে নেয়। এই পথ যে সর্বদা বন্ধুর তা নয় এই পথই একটি সন্তানের জন্য ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ বিপদ। এভাবে যখন তারা অগ্রসর হয় তখন প্রেমে বাধা আসাটাই স্বাভাবিক, আর তখন সন্তান হয় বখাটে, মাস্তান ও সন্ত্রাসী। হেরোইন, ড্রাগ, পেথিড্রিন এর মত বাজে নেশায় তখন তারা হয়ে উঠে মত্ত। সমস্ত নিষিদ্ধ কাজ তখন তাদের জন্য সহজ হয়ে উঠে।
যত্রতত্র যাতায়াত : বিভিন্ন সময়ে সন্তানরা বন্ধু/বান্ধুবীর বাসার নাম করে অথবা কোচিং এ, অথবা প্রাইভেট পড়তে। পড়ানোর নাম ভাঙ্গিয়ে যত্রতত্র যাওয়া আসা করার অবাধ স্বাধীনতা ছেলেমেয়েদেরকে দেয়ার ফলে বাড়ন্ত বয়সটা হয়ে পড়ছে হুমকির সম্মুখীন। তাই এই বয়ঃসন্ধিকালটাতে পিতা মাতার উচিত সন্তানের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করে তার সব খবর রাখা। নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজের সন্তানকে রক্ষা করা।
কবি ও কবিতা, গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে প্রেমের যে চিত্র মনের রংতুলি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে তা আসলে ইসলামের ধারে কাছেও নেই। আল্লাহর প্রতি ভয় ভীতি গল্প উপন্যাস, নাটক সিনেমাগুলোতে অনুপস্থিত। যার ফলে যুব সমাজ সেই অশ্লীলতার দিকেই ঝুকে পড়ছে। আজকাল টিভি চ্যানেলগুলো খুলতেই যেই চ্যনেলই দেখার জন্য খুলে বসি সেখানেই প্রেম, ভালবাসা, পরকীয় ছাড়া কোন গল্প নাই। দেখে মনে হয়, নির্মাতাগণ ভালবাসার এই নোংরা কাহিনী ছাড়া যেন গল্পই লিখতে পারেন না, অথচ ইরানী ছবিগুলো কত সুন্দর সুস্থ  বিনোদনের কথা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ আমার সাথে সবাই একমত হবেন যে, নির্মাতাগণ যে সমস্ত চলচ্চিত্র তৈরি করছেন বা পোস্টার তারা দেয়ালে লাগিয়ে থাকেন তা কি কোন ইসলামী দেশের সংস্কৃতিতে আছে? তাহলে সেই দেশের যুবসমাজ কেনই বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
০ স্কুল পালানো ও বখাটেরা : এই শ্রেণীর লোকদেরকে সমাজের দুর্বল লোকেরা ভয় পেয়ে থাকে। তারা নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করার জন্য নেতা নেতা ভাব নিয়ে চলাফেরা করে, ক্লাসে তাদের মন বসে না। নামেমাত্র ক্লাসে ভর্তি হয়। অবশেষে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ও মেয়েদের টিজ করে। এভাবেই তারা বখাটের খাতায় নাম লেখায়। মেয়েদের কাছ থেকে সাড়া না পেলে বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানি করে। অবশেষে এসিড নিক্ষেপ ও ধর্ষণের মত কাজেও হাত দিতে পিছ পা হয় না।
০ পরকীয়া : ছোটছোট ছেলেমেয়েদের সাথে প্রেমের পাল্লা দিতে গিয়ে বিবাহিতা মহিলা ও পুরুষরাও অনেকেই এগিয়ে গেছেন প্রেমের স্পর্শকাতরতায়। নিজ স্বামী-সন্তানকে পর করে অন্য পুরুষের হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছে আরও শান্তির আশায়, অধিক ভালবাসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ২ ছেলের মা রাইমা। স্বামী বিদেশ। অবশেষে স্বামীর বন্ধুর সাথে প্রেম। তারপর পালিয়ে বিয়ে। জানাজানি হলে রাইমা তার সন্তানদেরকে এতিম করে চলে যায় নতুন স্বামীর ঘরে। খবর পেয়ে বিদেশ থেকে প্রাক্তন স্বামী আসে। ঘটনা সহ্য করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। অথচ হাদীসে আছে, যেই নারী বিনা কারণে এক পুরুষের ঘর ছেড়ে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে গেল সেই নারী জাহান্নামী। তার ইবাদাত কখনই কবুল হবে না। তওবার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
ঘটনা-২ : আনিকার স্বামী বিদেশ। ১ ছেলে ১ মেয়ে। বিশাল সম্পদের মালিক তার হাজব্যান্ড। বাড়ি ভাড়া দেয়া আছে। ভদ্রলোক আনিকার বাসায় মাঝে সাজে আসে। আনিকা একদিন ভদ্রলোককে নিজের বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। সেই থেকেই কাল হলো। ভদ্রলোক আনিকার রান্নার খুব প্রশংসা করল। বলল, জানেন ভাবী আমার বউ কোন গুণেরই না, অথচ আপনি কত সুন্দর। আপনার চুল কত লম্বা, আপনার রান্না কত মজা! এভাবেই ভদ্রলোক আনিকাকে মাতিয়ে রাখেন। আনিকার এখন ঐ ভদ্রলোক ছাড়া চলেই না। স্বামী, সন্তান তার কাছে তুচ্ছ। সব ভাল ঐ ভদ্রলোক। এভাবেই একটি সংসার নষ্টের শেষ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে।
ঘটনা-৩ : সামিন ২ সন্তানের জনক। স্ত্রী ও তার মাঝে ভালবেসে বিয়ে হয়। সেই সামিন অফিসের মিটিংয়ের নাম করে সপ্তাহে ৩/৪ রাত বিভিন্ন হোটেলে নতুন নতুন গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে কাটায়। স্ত্রীসহ আত্মীয়-স্বজন অনেকেই ঘটনা জানতে পেরেছে। মাফ চেয়ে সবার কাছ থেকে ভাল হওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু কয়দিন পরই আবার আগের সেই মানুষটির চরিত্রই দেখা যায়।
০ পরকীয়া প্রেমের কারণে সংসার সমাজ দারুণভাবে নৈতিক মানদন্ডের মাপকাঠি হারাচ্ছে। পরকীয়া প্রেমগুলোতে কোন পক্ষই উপযুক্ত, অনুপযুক্তর মাপকাঠি নির্বাচন করছে না। ভাল লাগছে, করে বসেছে। এভাবে সমাজ থেকে শ্রদ্ধাবোধও হারিয়ে যাচ্ছে।
কেন এই পরকীয়া : দীর্ঘদিন স্বামীরা অর্থের লোভে স্ত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে তাদের প্রতি মনের টান কমে যাচ্ছে। তখন শয়তান তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মহিলাদের মস্তিষ্কে কলকাঠি নাড়তে থাকে। ফলে যৌন সম্পর্ক তখন তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। আর সেইদিকে নজর দিতে গিয়েই সর্বনাশটা পুরোপুরি আদায় করল।। প্রিয় সন্তান, স্বামী ও মান ইজ্জত সবটুকুকে বস্তাবন্দি করে অন্য পুরুষের হাত ধরে পালিয়ে যাচ্ছে। মুমিন হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, পারস্পরিক ভালবাসা। একটি সংসারকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন একে-অপরের প্রতি Sacrifice and compromise. আদর্শ দাম্পত্য জীবনের সুখনির্ভর করে এই জিনিসটির উপরই। যেই ঘরে এই জিনিসটি অনুপস্থিত তার ঘরে লাখ টাকার ফার্নিচার থাকলেও মনে শান্তি থাকবে না, শান্তির জন্য দরকার এই ফার্নিচারটির। তাহলে অন্য ফার্নিচার না থাকলেও ঘরে ঢুকবে বেহেশতি বাতাস। ইসলামে এই বেহেশতি বাতাসের নাম দিয়েছে ইহসান। রাসূল (সা.) বলেছেন, স্ত্রী/স্বামীর একটি ত্রুটি তোমার খারাপ-লাগলে তার অন্য একটি গুণের দিকে তাকাও। পরকীয়া প্রেম একটি জঘন্য সামাজিক অপরাধ। ইসলামে যাকে ব্যাভিচার বলে ঘোষণা করেছে।
০ সবচেয়ে আসল কথা হলো এই পরকীয়া প্রেমের কারণে তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটছে বেশি। উভয়পক্ষ থেকেই তারা ফায়দা হাসিল করছে। আমাদের এই তৃতীয় পক্ষ হতে সতর্ক থেকে পরকীয়ার খাজড়ী-পাচড়ার হাত থেকে নিজের সমাজকে রক্ষা করতে হবে।
প্রেমের কুফল : প্রেমের কুফল বা ক্ষতিকর দিকগুলো কি বলে বা লিখে শেষ করা যাবে? যতই দিন যায় ততই নিত্যনতুন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। আল্লাহ ১৮ হাজার মাখলুকাত তৈরি করেছেন, মানুষের মাঝেই দেখা যায় ভালবাসার দ্বনদ্ব, সংঘাত ও কুফল। প্রেমের ভয়াবহ পরিণতিগুলো এক ফাঁকে জেনে নিই :
অল্প বয়সে প্রেমে পড়ল বিনি। একদিন অতি ভালবাসার দায়ে মানিক তার গায়ে হাত দেয়। একপর্যায়ে বিনি বুঝতে পারে তার শরীরে অন্যরকম অস্তিত্ব। মাকে জানাতে না চাইলেও পরে বাধ্য হয় জানাতে। মা মানিকের সাথে, মানিকের বাবা-মার সাথে যোগাযোগ করে। এতে সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে মানিকের পক্ষ থেকে আসে হুমকি। বাড়ি থেকে রাতের অন্ধকারে বের করে দেয়। বিনি অবশেষে এবরশন করাতে বাধ্য হয়। অকালেই ঝরে পড়ে মাতৃত্বের সাধ।
প্রেমের কারণে দেশে ঝরে পড়ছে শিক্ষিতের হার। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পড়ালেখা। আত্মহত্যা, বিষ খেয়ে মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে।
প্রেমের পরিণতি ভালর চেয়ে মন্দই বেশি। তাই বহু পরিবার হারায় তাদের মানসম্মান। সামাজিকভাবে হতে হয় হেয় প্রতিপন্ন। অনেক পরিবারকে হতে হয় নিঃস্ব ও পথহারা।
০ প্রেমের ভুল পথে অগ্রসর হওয়ার কারণে বহু মেয়ে হয়েছে ধর্ষিত, হযেছে লাঞ্ছিত এবং হারিয়েছে নারী জাতির বহু মূল্যবান সম্পদ ইজ্জত।
০ স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছেলে-মেয়েরা প্রেমের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে প্রেমের বালাখানা তৈরি করেছে তাতে তারা নিজেদেরকে অর্থাৎ নিজেদের চরিত্র ও সম্ভ্রমের কলংকের কালিমা থেকে হিফাজত করতে কি পারছে?
০ প্রেমের নামে বর্তমানে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণে লাগামহীনভাবে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী মেলামেশা করছে। ঝোপ-ঝাড় আড়ালে, প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠভাবে বসে আপত্তিকর আচরণ করছে। প্রেমিক-প্রেমিকা একত্রে ইচ্ছামত যেখানে খুশি সেখানে চলে যাচ্ছে। ক্লাব, হোটেল বা বন্ধুর বাসায় রাত কাটাচ্ছে। বেগানা একজন নারী এবং একজন পুরুষ একত্রিত হলে শয়তানকে নিয়ে সেখানে হয় তিনজন। বলাবাহুল্য যে, শয়তানের কাজ হলো পরস্পরের মনে কুচিন্তা সৃষ্টি করা। এখন এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে রাস্তাঘাটে, ডাস্টবিনে নবজাতক সন্তান পাওয়া যাচ্ছে। নার্সিং হোমে গিয়ে গর্ভপাত ঘটাচ্ছে। এই অকাল গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের ফলে অনেক মেয়েই মৃত্যুবরণ করছে এবং এইসব নির্লজ্জকর ঘটনা পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে।
০ পশ্চিমা দেশের আদলে আমাদের দেশেও এখন ১৬ বছরের কোন মেয়ে/ছেলে যদি বলে বয়ফ্রেন্ড। গার্লফ্রেন্ড নাই। বা তাদের সাথে খোলামেলা সম্পর্ক হয়নি তাহলে তারা নাকি উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়। এই সবই ঘটেছে নারী-পুরুষের নামে অবাধ স্বাধীনতার ফলে।
প্রেম বিয়ের আগে বা পরে উভয়টাই নিষিদ্ধ ইসলামে। এই নিষিদ্ধকে হালাল করতে গিয়ে উঠে গেছে আল্লাহ্র ভয়। হয়েছে নৈতিক স্খলন, সমাজে বেড়েছে সামাজিক উন্মাদনা।
০ এই প্রেমের কারণে বহু লোক আছে পাগলাগারদে। যৌনতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বহু ঘর সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে।
রাস্তা-ঘাটে কত ছেলে মেয়ে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বিয়ের জন্য পাত্র চাই! কিংবা পাত্রী চাই। তখন সবারই এক কথা, ভাল ছেলে বা ভাল মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। তার একটাই কারণ এই প্রেম। বিয়ের আগে সবাই চায় একটি ভাল চরিত্রের ছেলে/মেয়ে তার ঘরে আসবে। কিন্তু এই প্রেমের কারণে সমাজ ভাল ছেলে/মেয়ে থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাবা-মায়ের অমতে তানিয়া বিয়ে করে মিলনকে। মিলনের বাবা-মার মন জোগানোর জন্য ঘরের সমস্ত কাজ করে তানিয়া। শরীর যখন ক্লান্ত মন যখন একটু ভালবাসা খোঁজে একটু সহানুভূতি চায় তখন সে একেবারেই একা। বহু রাতে মিলন ঘরে আসে মদ খেয়ে। কিছু বলতেই তানিয়াকে এলোপাতারি মার। বাবা মার কাছে তো বলতেই পারে না। সবই নীরবে সহ্য করে। গায়ে কত জখম! জখমে আস্তে আস্তে হাত বুলায় আর চোখের পানি ফেলে ভাবে এ যে প্রেমের দান!
প্রচার মাধ্যম : টিভি, চ্যানেল, নাটক, সিনেমা থেকে আরো বেশি প্রেমের প্রচার প্রসার হচ্ছে। নায়ক নায়িকা দু’জনে হাত ধরাধরি করে, আরো কত কি! এইসব দৃশ্য দেখে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা আরো প্রেমের নানা রকম ফায়দা শিখছে। যা আদৌ কাম্য নয়।
আমাদের করণীয় : প্রেমের দুষ্ট চক্রের হাত থেকে নিজেকে পরিবারের প্রতিটি সদস্য ও সমাজকে বাঁচাতে হলে চুপচাপ যা চলছে যা ঘটছে তা হতে দেয়া যায় না। তাই মানুষ হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব তাকে রুখে দাঁড়াবার। এই জন্য তিনটি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি : ক. ব্যক্তিগত উদ্যোগ; খ. সামাজিক উদ্যোগ; গ. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে যা করণীয় : প্রথমেই ‘‘আমার ঘর আমার বেহেশত’’ এই ফর্মুলা নিয়ে এগোতে হবে।
সপ্তাহে অন্তত ২ দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসা, সবার ব্যক্তিগত খোঁজ-খবর নেয়া।
যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে খাবার টেবিলে হলেও একসাথে বসা ও টেকনিক করে ব্যক্তিগত খবরাখবর নেয়া। এতে যে কাজটা হয় সন্তানরা বুঝতে পারে তাদের বাবা-মা কত আন্তরিক তাদের সুখে দুঃখের খোঁজ খবর নিচ্ছে। ফলে পিতা-মাতার প্রতি সন্তান আন্তরিক থাকবে।
সন্তান যেন অনুগত থাকে সেজন্য পিতামাতা হিসেবে তার জন্য দোয়া করা। সূরা আল ইমরানের ৩৮নং আয়াতে আল্লাহ তা শিখিয়ে দিয়েছেন এভাবে, রাবিব হাব্লি মিল্লাদুনকা যুর্য়িইয়্যাতান ত্বায়্যিবাতান, ইন্নাকা সামী ‘উদ্ দু’আ-ই’।
সন্তান যদি বিপথে, কুপথে পরিচালিত হতে দেখা যায়, কথা শুনতে চায় না। তখনও আল্লাহ পিতামাতাকে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন সূরা আহ্কাফ-এ ১৫নং আয়াতে ‘রবিব আছলিহ লী ফী-যুররিয়্যাতি, ইন্নী তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমীন।
সুতরাং আল্লাহর দেয়া বিধান মোতাবেক প্রথমে নিজেকে চালাতে হবে। তারপর নিজের পরিবারকে সেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে হবে। বাঁচাতে হবে নিজের সমাজ তথা নিজের দেশকে। তাই কুরআনি রঙে নিজেকে রাঙিয়ে রাঙাতে হবে গোটা বিশ্বকে। অন্যায় যুলুম যেখানেই হতে দেখা যাবে সেখানেই বাধা দিতে হবে। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একদল লোক থাকবে যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে। নামায কায়েম করবে যাকাত দিবে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করবে। ওরা এমন লোক, যাদের ওপর আল্লাহর রহমত অবশ্যই নাযিল হবে।’’ সুবহানাল্লাহ।
আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারেও পিতামাতাকে যথেষ্ট নজর রাখতে হবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, শিক্ষার জন্য তোমরা সূদুর চীন দেশ পর্যন্ত যাও।’’ সেই শিক্ষা যেন হয় আল্লাহকে জানার শিক্ষা। আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন শিক্ষাই আজ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি পারবেও না। আমাদের শিক্ষা যেন হয় পরস্পরকে বন্ধু বানানোর, সাথী ও সহযোগী বানানোর। দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তি তখনই আসবে। আমরা বর্তমান সমাজে শিক্ষার যে চিত্র দেখতে পাই তাতে মনে হয় এই যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিএসসি ক্যাডার, বড় বড় শিল্প-প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া বড় চাকরিজীবী হওয়া। এইসব বড় বড় ‘হওয়া’ওয়ালারা কি মৃত্যুর পর আল্লাহকে চাকরি করে খাওয়াবে, নাকি ডাক্তার আল্লাহকে ডাক্তারি করবে? নাউযুবিল্লাহ।
আল্লাহ এই সকলকিছুর ঊর্ধ্বে। আল্লাহর খাওয়া পরার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু আমাদের তা ও এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য। মৃত্যুর পরে আর কোন প্রয়োজন নেই। তাহলে এই অল্প সময়ের প্রয়োজনটুকু আমাদের কাছে এত বেশি কেন? আমরা কি ঈমানদার হতে পেরেছি? নফসের তাড়নায় কেন আমরা বিমুখ হয়ে রয়েছি। মৃত্যুর পরও যেন কবরে আমল পৌঁছায় সেই ব্যবস্থা কি দুনিয়াতেই করে যেতে চাই না? অবশ্যই হ্যাঁ তাহলে আসুন আগে নেক সন্তান বানানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করি এখন থেকেই। তাহলে আর আমাদের সন্তানকে গুন্ডা, বদমাইশ, ইতর, সন্ত্রাসী ডাক শুনতে হবে না।
সৎসঙ্গে সন্তানকে উৎসাহ দেই। সৎ শিক্ষায় সন্তানকে শিক্ষিত করি। সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলি।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, ‘‘রববানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবান নার।’’ সূরা বাকারাহ-২০১নং আয়াত।
সামাজিকভাবে করণীয় : প্রেমের অসভ্যতাকে বন্ধ করার জন্য সামাজিকভাবে প্রতিটি মানুষের কিছু করণীয় আছে। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করাটাই মানুষের নিয়ম। আমাদের সমাজকে সুন্দর করার দায়িত্ব আমাদের। ইসলাম বিয়ের পূর্বে প্রেমকে নিষিদ্ধ করেছে। প্রেমের নামে এই সব যথেচ্ছাচার হতে যেখানেই দেখা যাবে সেখানেই এর বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন থাকতে হবে, শক্ত হাতে তা প্রতিরোধ করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে সমাজ থেকে অন্যায় রোধ করা যায়। সেজন্য প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সামাজিকভাবে প্রেমের অত্যাচারকে রুখে দাঁড়াবার কিছু পদক্ষেপ :
আমাদের দেশে বিজাতীয় সংস্কৃতির আদলে পহেলা বৈশাখ, ভালবাসা দিবস পালন করা হয়। এতে প্রেমিক-প্রেমিকারা, উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা বেহায়া ও বেলাল্লাপনার উন্মাদনায় মত্ত থাকে। যা আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আঘাত করে। কুরআন-হাদীসের বিরুদ্ধের আচরণ হয়। তাই আমাদের উচিত ইসলামী অনুশাসন টিকিয়ে রাখতে হলে এইসব বিজাতীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আইন করা, কঠোর নীতির মাধ্যমে তা সমাজ থেকে দূর করা। যারা এর পক্ষে কথা বলবে তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনা। কুরআনের আইন বাস্তবায়ন করা।
বিজাতীয় সংস্কৃতির আবর্জনায় ঢাকা পড়ে গেছে ইসলামের সৌন্দর্য্য। মিথ্যার আবর্জনায় চাপা পড়েছে শাশ্বত কুরআনের সত্য। সত্যি বলতে কি সত্যের সূর্য রক্তিম আভা নিয়ে উদিত হবেই। ইসলামের নূরকে, কুরআনের নূরকে যারা মুখের ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায় তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। ইসলামী সংস্কৃতি জানালাকে সকলের সামনে খুলে ধরা।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: