হযরত ওমর (রাঃ)-এর তাকওয়ার স্তর

arab ruler ministerখলিফা হযরত ওমর (রাঃ)-এর দুই পুত্র আব্দুল্লাহ এবং ওবায়দুল্লাহ বিখ্যাত যোদ্ধা ছিলেন। তারা ইরাকে জিহাদে অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন পর যখন মদীনায় ফিরছেন তখন ইরাকের গভর্ণর হযরত আবু মুসা আশ’আরী (রাঃ) তাদের হাতে বায়তুল মালে (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) জমা দেওয়ার জন্য কিছু অর্থ দিলেন। গভর্ণর জানতেন হযরত ওমর এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর । তাই তাদেরকে তিনি পরামর্শ দিলেন বায়তুল মালের এই অর্থ দিয়ে কিছু জিনিস কিনে মদীনায় নিয়ে যেতে যাতে সেটা বিক্রী করে কিছু লাভ করা যায়। আসলটা বায়তুল মালে জমা দিয়ে লভ্যাংশটা তারা নিবে।

সে মোতাবেক তারা উক্ত অর্থ দিয়ে কিছু জিনিস কিনে মদীনায় গিয়ে বিক্রী করে কিছু লভ্যাংশও পেল। আসল অর্থটা নিয়ে তারা যখন বায়তুল মালে জমা দিতে গেলেন, তখন হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, আমি জেনে ফেলেছি যে খলিফার পুত্রগণ রাষ্ট্রীয় সম্পদে ব্যবসা করেছে। এটা ঠিক হয়নি।

তিনি ইরাকের গভর্ণরকে জিজ্ঞেস করলেন ইরাক থেকে ফেরার সময় সকল সৈনিকের কাছে কি আপনি এভাবে আর্থ প্রেরণ করেছেন ? সকলের কাছে যে এভাবে অর্থ দেওয়া হয়নি তা তিনি জানতেন। কিন্তু কড়া ভাষায় এই ঘটনার জন্যে তিনি কৈফিয়ৎ নেন। আর দুই পুত্রকে বলেন লাভের অর্ত কোথায় ? তারা লাভের অংশটি নিয়ে আসেন। হযরত ওমর (রাঃ) লাভ এবং আসল দুটিই বায়তুল মালে জমা করে দেন। তার এ আচরনে আব্দুল্লাহ কিছু না বললেও ওবায়দুল্লাহ বলেন, “কিন্তু আমরা তো অন্যায় করিনি” (আসলে আইনানুগভাবে বিশ্লেষণ করলে এটাকে খারাপ বলা যায় না কিন্তু খলিফা ওমর তার অত্যন্ত উচু স্তরের তাকওয়ার কারনে এটা করেছিলেন)। হযরত ওমর (রাঃ) ওবায়দুল্লাহর কথার উত্তরে বললেন, “চুপ ! একদম কথা বলবে না।”

মদীনায় দূর্ভীক্ষের সময় গরিব মানুষের জন্যে রুটি, ঘি, মাংস সবরাহ করা হত। কিন্তু জনতার প্রতিনিধি আমিরূল মুমিনীন ওমর (রাঃ) নিজের জন্যে নির্ধারণ করলেন এর চাইতেও সস্তা খাবার-অমসৃন যবের রুটি এবং যয়তুনের তেল। এতে তার স্বাস্থ্যও খানিকটা ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু তিনি নিজে পেটের দিকে আঙ্গুলী নির্দেশ করে বলতেন- তোমাকে এটাই গ্রহন করতে হবে। এমতাবস্থায় একদিন যখন নিজের শিশুপুত্রের হাতে খরবুজা নামক ফল দেখলেন তখন তিনি তিরষ্কার করে বললেন- “দূর্ভিক্ষে মানুষ মারা যাচ্ছে আর খলীফার পুত্র খরবুজা ফল খাচ্ছে, বাহ চমৎকার !” তার পুত্র কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে চলে গেল। হযরত ওমর (রাঃ) এই দৃশ্য অবলোকনে তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল তিনি অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগলেন। খলীফার স্ত্রী জানালেন, তাকে রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকে নয় বরং বহু কষ্টে জমানো নিজের সামান্য অর্থ থেকে ফলটি কিনে দেওয়া হয়েছে।

ইরাকের গভর্ণর হযত আবু মূসা আশয়ারী (রাঃ) হযরত ওমরের (রাঃ) স্ত্রী আতিকা (রাঃ)-এর জন্যে মূল্যবান পোষাক উপহার হিসেবে পাঠান। কিন্তু তিনি এই পোষাক ফেরৎ পাঠান এবং কড়া সমালোচনা করে চিঠি লিখেন। উপহার সামগ্রী নেওয়া দোষনীয় নয় বরং ইসলামিক সমাজ উপহার সামগ্রীর আদান প্রদানকে উৎসাহিত করে। কিন্তু শাসকের ক্ষেত্রে এর ভিন্ন অর্থ রয়েছে। শাসকরা যদি এই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে সেটি ঘুষে রুপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। তাই সতর্কতার জন্যে ওমর (রাঃ) অত্যন্ত কঠোর নিয়ম অনুসরণ করতেন। আর এর সুফল ভোগ করেছিল গোটা ইসলামিক রাষ্ট্র।

রসূল (সাঃ) ইবনে তাবিহ (রাঃ)কে জাকাত সংগ্রহের জন্যে এক এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। সাহাবী জাকাতের বড় অংশটি রসূল (সাঃ)-এর সামনে পেশ করলেন এবং একটি অংশ দেখিয়ে বললেন, এটি তারা আমাকে হাদীয়া হিসেবে দিয়েছে। রসূল(সাঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বললেন- তোমাদের কেউ নিজেদের পিতা-মতার সাথে ঘরে বসে থাকুক, দেখুক কে তাদেরকে উপহার সামগ্রী দিয়ে যায়।

ওমর (রাঃ) জানতেন কোনো মানুষ বিশেষ দায়িত্বশীল পদে থাকার কারনে কেউ তাকে কোনোভাবে খুশী করার চেষ্টা করতে পারে যাতে কোনোভাবে সে কখনও এখান থেকে উপকৃত হতে পারে। প্রদত্ত সেই উপহারটি বেশীর ভাগ সময়ে মূলত সেই ব্যক্তির কারনে নয় বরং তার পদবীর কারনে হয়ে থাকে। ফলে শাসকের অধিকাংশ উপহার সামগ্রী ঘুষ হয়ে যেতে পারে। শাসকের ক্ষেত্রে উপহার সামগ্রী আর সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে উপহার সামগ্রী এক ব্যাপার নয়।

হযরত ওমর (রাঃ)-এর কঠোর আত্মসংযম এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, তার কন্যা উম্মুল মোমেনিন হযরত হাফসা (রাঃ) তাকে নিজের প্রতি যত্নবান হবার অনুরোধ জানালেন। জবাবে হযরত ওমর (রাঃ) তাকে রসূল (সাঃ)-এর ছুর পর্বতের গুহার সাথী হযরত আবু বকরের (রাঃ) কঠোর সংযমী জীবনের কিছু উদাহরণ পেশ করলেন। তিনি বললেন, “যদি আমি রাষ্ট্রের কল্যানে কঠোর সংযমী জীবন পালন করি তাহলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাদের সাথী হওয়ার সৌভাগ্য দান করবেন।”

হজ্জের সময় তিনি তাবুতে আশ্রয় নিতেন না। প্রচন্ড গরমে একখন্ড শুকনো চামড়া মাথার ওপর দিয়ে সূর্যের উত্তাপ থেকে নিষ্কৃতির চেষ্টা করতেন। কখনও গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাবুতে আশ্রয় নিতে পারতেন এবং তা জায়েজও ছিল। কিন্তু তাকে এটা জানালে তিনি বলতেন, “সকল হাজিকে কি তাবুর বন্দোবস্ত করতে পেরেছি ? আর সূর্যের উত্তাপের ভয় দেখাচ্ছ ? আখিরাতের সেই সঙ্কটময় মুহুর্তের কথা চিন্তা কর, নিশ্চয় জাহান্নামের আগুনের চাইতে এ সূর্র্য অধিক উত্তপ্ত নয়।”

একটি সমাজ তাকওয়াপূর্ণ হবে কিনা তা নির্ভর করে ইসলামের তাকওয়াপূর্ণ বিধানের বাস্তবায়ন এবং মুত্তাকী শাসকের ওপর। মাথা ঠিক; তো দেহ ঠিক।

Advertisements

এক রাখালের খোদাভীতি (তাকওয়া)

desert 3হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে মদিনার উপকণ্ঠে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁর সাথে আরো অনেক সঙ্গী-সাথী ছিলেন। দেখতে দেখতে খাবারের সময় ঘনিয়ে এলো। সাথীরা খাবারের আয়োজন করলেন। তারা দস্তরখানা বিছালেন। খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল। এমন সময় সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক রাখাল বালক। সে বকরি চরাচ্ছিল। রাখালকে দেখে আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন,‘হে রাখাল ভাই! আমাদের সাথে বসো। আমরা চাই,তুমি আমাদের সাথে কিছু খাবার খাও।’

রাখাল বললো,‘আমি রোজাদার। খাবারের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।’

আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বললেন,‘প্রচণ্ড গরম ও রোদ পড়েছে। আবহাওয়া খুবই শুষ্ক ও তীব্র। এ সময় পাহাড়ে তুমি বকরি চরাচ্ছ। এই গরমে তোমার বেশ কষ্ট হচ্ছে। এ সময়ে তুমি রোজা রেখে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?’

রাখাল জবাবে বললো,‘হ্যাঁ, জনাব। আমি এই প্রচণ্ড গরমেও রোজা রাখছি এজন্য যে,যখন আমল করার সুযোগ থাকবে না তার ভয়ে। আমি সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছি।’

আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) রাখালের কথায় খুবই খুশি হলেন। রাখালের মনে পরকালের ভয় দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন।

এবার তিনি রাখালের মধ্যে আল্লাহর ভয় পরীক্ষা করার কথা ভাবলেন।

আবদুল্লাহ বিন উমর (রা)এজন্য রাখালকে বললেন,‘আচ্ছা ভাই!আমি তোমার বকরির পাল থেকে একটা বকরি কিনতে চাই। তুমি বিক্রি করবে কী? তবে হ্যাঁ,আমরা নগদ মূল্যে বকরি কিনে নেব। এটি জবাই করে আমরা রান্না করবো। এখান থেকে ইফতারের জন্য তোমাকেও গোশত দেব।’

রাখাল বললো,‘না,না,এটা হবে না। এই বকরিগুলো আমার নয়। এগুলো আমার মনিবের। আমি মনিবের বকরী বিক্রি করতে পারিনা। আমাকে মাফ করবেন।’

আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বললেন,‘দেখ ভাই! এতে সমস্যা কি? পাহাড়ে বকরী চরাতে গেলে দু’একটা বকরি হারিয়ে যেতেই পারে। তুমি মালিককে গিয়ে বলবে একটি বকরি পাহাড়ে হারিয়ে গেছে। এজন্য তোমার মনিব তোমাকে কিছুই বলবে না। তাই একটি বকরি তুমি বিক্রি করলে তাতে কোন সমস্যা হবে না। তোমার মালিক একটি বকরির জন্য তোমাকে কিছুই বলবে না।’

আবদুল্লাহ বিন উমর (রা)-এর কথা শুনে রাখাল অবাক হলো।

সে আকাশের দিকে আঙুল উঠিয়ে বললো,‘আল্লাহ তো আছেন। তিনি সবই দেখছেন।’
এ কথা বলেই রাখাল সেখান থেকে চলে গেল।

রাখালের আল্লাহভীতি দেখে আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) যারপরনাই বিস্মিত হলেন।

মদিনায় ফিরে গিয়ে আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) রাখালের মালিকের কাছে লোক পাঠালেন। তিনি মনিবের কাছ থেকে বকরির পাল এবং রাখালকে কিনে নিলেন। তারপর রাখালকে মুক্ত করে দিলেন এবং বকরির পালও তাকে দান করলেন।

সততা ও আল্লাহভীতির জন্য রাখাল আবদুল্লাহ বিন উমর (রা)-এর কাছ থেকে বিরাট পুরষ্কার পেলেন। রাখালের জীবনের গতি বদলে গেল।

(সুনানে বাইহাকী ,হাদিসঃ ৫২৯১,উসদুল গাবাহ, হাদিসঃ ৩০৮৬)

রমজানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন

রমজান মাসে রোজা রাখার নির্দেশ দেয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে কুরআন মজিদে উল্লেখ করা হয়েছে,‘যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’

তাক্বওয়া অর্জনের সর্বোত্তম উপায় ও উপযুক্ত সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-ই আমাদের বাতলে দিয়েছেন । আর তা হচ্ছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ [٢:١٨٣]

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর (রমজানের) রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার। (সুরা বাক্বারাঃ ১৮৩)

অর্থাৎ রমজানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে মুমিন বান্দারা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পারে। আর তাকওয়ার বদৌলতে মানুষ সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে।

আল্লাহপাক পূর্ববর্তী লোকদের-ও তাকওয়া অর্জনের নির্দেশ দিয়েছিলেনঃ “আমি তোমাদের পূর্বের আহলে কিতাবদের এই উপদেশ দিয়েছিলাম আর এখন তোমাদেরকেও উপদেশ দিচ্ছি যে তাকওয়া অবলম্বন করো।” (সুরা নিসাঃ ১৩১)

তাকওয়া শব্দের অর্থ সাবধানতা ও সংযম। মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকাই তাকওয়ার অর্থ বলে বর্ণনা করা হয়। তবে মন্দ কাজ বর্জন যেমন জরুরি, তেমনি ভালো কাজগুলো করাও তাকওয়ার অন্তর্গত। কর্তব্য পালন ও বর্জনীয় পরিহারের সমষ্টিই তাকওয়া।

সাধারণভাবে তাকওয়া শব্দের অর্থ করা হয় আল্লাহর ভয়। মহান রাব্বুল আলামিনের সামনে একদিন সবাইকে হাজির হতে হবে। সে দিন দুনিয়াবি জীবনের প্রতিটি কথা,কাজ ও আচরণের হিসাব দিতে হবে। এ বিশ্বাস ও ভয়ই মানুষকে সাবধানী ও সংযমী করে তোলে।

তাকওয়ার মর্ম বর্ণনায় হজরত উবাই ইবনে কা’ব রাজিয়াল্লাহু আনহুর একটি উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। হজরত ওমর ফারুক (রা) তাকে তাকওয়ার মর্ম বর্ণনার অনুরোধ করলে তিনি বলেন,আমিরুল মুমিনীন,আপনি কি কখনো কাঁটাঝোপের মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন? সেখানে যেমন আপনাকে সবসময় সাবধানে নিজের শরীর ও কাপড় রক্ষা করে চলতে হয়,তাকওয়া ঠিক তেমনি সাবধানী আচরণ ও জীবনযাপনের নাম। বস্তুত আল্লাহর কাছে বান্দার জবাবদিহিতার অনুভূতিই তাকওয়া।

আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রা) বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে: আল্লাহর আনুগত্য করা- নাফরমানি না করা, তাঁকে স্মরণ করা- ভুলে না যাওয়া, তাঁর কৃতজ্ঞতা করা- কুফরী না করা।”

সাহল বিন আবদুল্লাহ্ বলেন, “বিশুদ্ধ তাকওয়া হল- ছোট-বড় সব ধরণের গুনাহের কাজ পরিত্যাগ করা।”

যওবানী বলেন, “আল্লাহ্ থেকে দূরে রাখবে (তাঁর ক্রোধ ডেকে নিয়ে আসবে) এমন সকল বিষয় বর্জন করার নামই তাকওয়া।”

হাসান বাছরী বলেন, “এই প্রকার (পশমের) ছেঁড়া-ফাটা পোষাকে তাকওয়ার কিছু নেই। তাকওয়া হচ্ছে এমন বিষয় যা হৃদয়ে গ্রথিত হয়; আর কর্মের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়।”

ওমর বিন আবদুল আযীয বলেন: “দিনে ছিয়াম আদায় এবং রাতে নফল ছালাত আদায়ই আল্লাহ’র ভয় নয়; বরং প্রকৃত আল্লাহর ভয় হচ্ছে, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা ফরয করেছেন তা বাস্তবায়ন করা। কেউ যদি এর অতিরিক্ত কিছু করতে পারে তবে সোনায় সোহাগা।”

প্রকাশ্যে পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নাম তাকওয়া নয়; বরং গোপন-প্রকাশ্য সব ধরনের পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নামই আসল তাকওয়া। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তুমি যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর।” [তিরমিযী]

ইসলামি শরিয়তে বান্দার করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এসবের গুরুত্ব ও মাত্রার পর্যায়ক্রম নির্ণীত আছে। করণীয়গুলোকে আবশ্যকতার মাত্রার পর্যায়ভেদ অনুযায়ী ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব পরিভাষায় প্রকাশ করা হয়। আর বর্জনীয়গুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় হারাম, মাকরুহ তাহরিমি, মাকরুহ তানজিহি ইত্যাদি পরিভাষা। কর্তব্য পালন ও বর্জনীয় পরিহারের মাত্রা অনুযায়ী তাকওয়ার স্তর বিন্যস্ত করা হয়। মুসলিম মনীষীরা তাকওয়ার তিনটি স্তর বর্ণনা করেন প্রাথমিক, মধ্যম ও উচ্চ। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যা অবশ্য পালনীয় অর্থাৎ ফরজ ও ওয়জিব, তা পালন করা এবং যা অবশ্য বর্জনীয় অর্থাৎ হারাম ও মাকরুহ তাহরিমি, তা বর্জন করা তাকওয়ার প্রাথমিক পর্যায়। তাকওয়ার ন্যূনতম পর্যায় হারাম ও মাকরুহ তাহরিমি বর্জন এবং ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করা। কারো মধ্যে কমপক্ষে এতটুকু থাকলেও তিনি মুত্তাকি। বলা যায়, একজন মুমিনের জন্য তাকওয়ার এ স্তরটি আবশ্যিক। নিম্নতম এ তাকওয়া নাজাতের জন্যও শর্ত। ফরজ ও ওয়াজিবের পাশাপাশি সুন্নতগুলো পালন এবং হারাম ও মাকরুহ তাহরিমির পাশাপাশি মাকরুহ তানজিহ বর্জন তাকওয়ার মধ্যম স্তর। আর মুস্তাহাবগুলো পালনে এবং সন্দেহজনক কাজগুলো বর্জনে সচেষ্ট থাকা তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর।

কুশাইরী (রহ) বলেন, “প্রকৃত তাকওয়া হল, শিরক থেকে বেঁচে থাকা, তারপর অন্যায় ও অশ্লীল বিষয় পরিত্যাগ করা, অতঃপর সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে বিরত থাকা, এরপর অনর্থক আজে বাজে বিষয় বর্জন করা।”

কোন ব্যক্তির তাকওয়া আছে কিনা তা তিনটি বিষয় দ্বারা সুস্পষ্ট হয়:

ক) যা এখনো অর্জিত হয়নি সে বিষয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখা।
খ) যা পাওয়া গেছে তাতে পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা এবং
গ) যা পাওয়া যায়নি তার প্রতি পূর্ণ।

সুফিয়ান ছাওরী বলেন, প্রকৃত তাকওয়া হল- “পাপ ছোট হোক আর বড় হোক তা পরিত্যাগ কর; এটাই আসল তাকওয়া। সতর্ক হও সেই ব্যক্তির ন্যায় যে কাঁটা বিছানো পথে সাবধানতার সাথে চলে।”

পাপ ছোট তাই তাকে তুচ্ছ মনে করো না; কেননা ছোট ছোট কঙ্কর দ্বারাই গঠিত হয়েছে বিশাল পাহাড়।

তাক্বওয়া অর্জনের উপায়:

ফরয-নফল সব ধরনের ইবাদত অধিক হারে করা। আল্লাহ্ বলেন,

يَاأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمْ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে লোক সকল তোমরা ইবাদত কর তোমাদের রবের যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন হতে পার।” [সূরা বাক্বারা- ২১]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তা‘যীম করা, তাঁর সুন্নতকে বাস্তবায়ন করা, তা প্রচার-প্রসারের জন্য প্রচেষ্টা চালানো, শুধু তাঁর নির্ধারিত পদ্ধতিতেই আল্লাহর ইবাদত করে তাঁর নৈকট্য কামনা করা। তাঁর দ্বীনের মাঝে কোন বিদআতের অনুপ্রবেশ না ঘটানো।

আর সেই সাথে যাবতীয় পাপাচার থেকে বিরত থাকা। যেমনটি ত্বলক বিন হাবীব বলেন, ‘তাকওয়া হল- তুমি আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করবে তাঁর নির্দেশিত পথে এবং আশা করবে আল্লাহর প্রতিদানের। তুমি আল্লাহর নাফরমানি ছেড়ে দিবে তাঁর নূরের ভিত্তিতে এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় করবে।

এক শ্রেণীর বান্দা আছে যারা রমযানে আনুষ্ঠানিক ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে সবিশেষ মনোযোগী থাকে এবং হয়তো সেটা কবুলিয়াতের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কৃত গুণাহসমূহ মাফ করিয়ে নেয় যদিও রমযান-পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক ইবাদাত-বন্দেগী  ও অনানুষ্ঠানিক ইবাদাতের মাধ্যমে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না ।

আমাদের মধ্যে ক’জন এ দাবী করতে পারবে যে আমরা রমযানের বাইরে একই পরিমাণ ইবাদাত-বন্দেগী করি – একই পরিমাণ দান-দক্ষিণা করি, নজল রোজা রাখি, মানুষকে গালাগালি করি না বা কটু কথা বলি না, গীবত করি না, ইত্যাদি? আমার উপলদ্ধি হচ্ছে, আমাদের ঈমান যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় উঠানামা করে (হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী) তেমনি তাকওয়া কম-বেশী হয়ে যায় । এটাই বাস্তবতা । তার মানে এটা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে না যে, আমরা সর্বদা (প্রতিদিনের ৮৬,৪০০ সেকেন্ড)সর্বোচ্চ মাত্রার (১০০% )  তাকওয়া বজায় রাখতে সচেষ্ট হবো না !

তথ্য-প্রযুক্তির যুগে শব্দার্থ বদল!

word meaning changing 1aword meaning changing 1b

কৌতুক-রসঃ কাকের পানি পান…

water drinking

বিভাগ:কৌতুক

মার্কিন সাংসদদের ভন্ডামী!

US parliament members can't rent

এই সব অসভ্যতা বন্ধ হবে কবে?

woman heckled in busমরিয়ম চম্পা : চলন্ত বাসে উঠার জন্য লড়াই চলছে। কেউ উঠতে পারছেন। কেউ পারছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপাকে নারীরা। ভিড় ঠেলে বাসের কাছে পৌঁছানোই দায়। ধাক্কাধাক্কির ভোগান্তি। বাসের হেলপারের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ। রোববার সকাল সাড়ে ১০ টায় প্রায় একইরকম দৃশ্যের দেখা মেলে রাজধানীর ফার্মগেট, বাংলামোটর, ধানমন্ডি ও শাহ্‌বাগে।

অবশ্য এ চিত্র রোজকার দেখা যায়। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। এই হয়রানি। খোদ রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে নারীদের রাস্তায় বের হতে হয়। কেউ কর্মজীবী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউবা নিজের আদরের সন্তানটিকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত এসব নারীর বড় অংশকেই কোনো না কোনো হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। এসব অঘটনগুলো ভেঙেচুরে দেয় নারীর মনোজগৎ। তছনছ করে দেয় নারীর আত্মবিশ্বাসকে। নানা মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন অনেকে।

নারীদের রাস্তাঘাটে চলাচল যেন এক ধরনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের কথা অনেকটা আক্ষেপ করে শোনালেন একাধিক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মিথিলা। মোহাম্মদপুর থেকে নিয়মিত ধানমন্ডি আসা-যাওয়া করেন তিনি। মিথিলা বলেন, বাসে উঠতে রীতিমতো লড়াই করতে হয়। ভিড় ঠেলে বাসে উঠা খুবই কষ্টকর। হেলপারদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণতো আছেই। ওরা বাসে উঠতে সাহায্য করার নামে পিঠে হাত দেয়। নিষেধ করলেও শোনে না। বলে না ধরলে পইরা গেলেতো দোষ দিবেন হেলপার আর ড্রাইভারের।

বাসে উঠার পর বসার আসন পাওয়া যায় না বেশির ভাগ দিন। মিনিবাসে তিন চারটি এবং বড় বাসে নয়টি সংরক্ষিত আসন থাকলেও পুরুষ যাত্রীরা ওইসব আসনে বসে থাকেন। আর উঠতে বললে বলেন, সমান অধিকার চাইলে দাঁড়িয়ে চলাফেরা করতে শিখুন। তিনি বলেন, কখনোও কখনোও বাসে ভিড় থাকলে হেলপাররা সিট খালি নেই বলে তুলতে চায় না। তাদের ধারণা নারী যাত্রীরা বাসে উঠতে-নামতে সময় বেশি নেয়। দাঁড়িয়ে যেতে বেশি জায়গা লাগে। সন্ধ্যার পর বাসে উঠা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

ফার্মগেট তেজতুরী বাজারের একটি ছাত্রী হোস্টেলে বাস করা নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ভর্তি কোচিং উপলক্ষে প্রথম হোস্টেলে উঠি। প্রথমদিকে কোচিং ক্লাস করতে যাওয়ার সময় হোস্টেলের গেটে ৫-৬ জন কম বয়সী ছেলে পথ আটকে বসে থাকতো। অনেক কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে কোচিং এর গেট পর্যন্ত পৌঁছতে আরেক দফা হয়রানির শিকার হতে হতো ফুটপাতের হকার ও পথচারীদের দ্বারা। প্রথম একবছর ফার্মগেটের ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে যেতে কেটেছে অপরিচিত ব্যক্তিদের ধাক্কা ও কটূক্তি শুনে। কখন যে শরীরে ধাক্কা দিয়ে অবুঝের মতো চলে যেতেন বুঝতেই পারতাম না। প্রায়সই হোস্টেলে ফিরে অনেক কান্না করতাম। মনে হতো পুরো শরীরটাই যেন নোংরা হয়ে গেছে। যেখানে ধাক্কা খেতাম সেই স্থানটা পানি দিয়ে বারবার ধুয়েও যেন স্বস্তি পেতাম না। এরপরই স্থির করতাম এই শহরেই থাকবো না। রাগে দুঃখে বাবাকে ফোন দিয়ে বলতাম বাবা আমি এখানে থাকতে চাই না। আমাকে এসে নিয়ে যাও। আমি ঢাকাতে আর পড়বো না। বাবা বলতেন মামনি, পরিবেশ পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনাটাও একধরনের পরীক্ষা। একপর্যায়ে মোটা ও শক্ত মলাটের একধরনের ব্যাংকের ডায়রি ব্যবহার করা শুরু করি। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় যেভাবে বুকের সামনে বই আগলে রাখতাম ঠিক একই ভাবে ডায়রি ব্যবহার শুরু করি। যেন কোনো অপরিচিত পথচারী ধাক্কা দিলে বরং সে নিজেই ব্যথা পায়। এভাবে আরও কতোদিন শক্ত মলাটের ডায়রি ব্যবহার করতে হবে জানি না।

নারী অধিকারকর্মী কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, ২০১৪ সালে একটি ‘বেইজ লাইন সার্ভে’ করা হয়। ২০১৭ সালে ‘নারীর সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনা’- শিরোনামে বেসরকারি সংস্থা একশন এইড-এর প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায় হয়রানির নানা চিত্র। নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাস্বল্পতার কারণে নারীবান্ধব নগর কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, মার্কেট, পরিবহন ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, পার্ক ইত্যাদি গণপরিসরে নারীদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ও বিচরণ যথেষ্ট সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। আরো হতাশার দিক হলো- একজন নারী কিন্তু একাধিকবার একাধিক ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যেমন গড়ে একজন নারী তিন মাসে ৪ থেকে ৫ বার অশোভন আচরণের সম্মুখীন হয়েছেন, একইভাবে ৪ থেকে ৫ বার অপরিচিতের কাছ থেকে কুপ্রস্তাব পেয়েছেন। এবং ২ থেকে ৩ বার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের মতো হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। যৌন হয়রানি বা নির্যাতন কোনো বিশেষ বয়সের নারীর ক্ষেত্রেই ঘটে না। কিশোরী বা প্রাপ্ত বয়স্ক সব বয়সের নারীর ক্ষেত্রেই এটা ঘটতে পারে।

সুমাইয়া খাতুন সুমী। পেশায় একজন ব্যাংকার। থাকেন পল্টনে। চাকরি করেন গাবতলীর একটি ব্যাংকে। পল্টন বাসস্ট্যান্ড থেকে ওয়েলকাম নইলে অন্য বাসে চড়ে গাবতলী যান। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে নিরাপদ রাস্তা পারাপারের জন্য তিনি গাবতলীর আন্ডারপাস ব্যবহার করতেন। কিন্তু অপর্যাপ্ত আলো এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি তা ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছেন।

সুমাইয়া খাতুন বলেন, পর্যাপ্ত আলো না থাকায় গাবতলী আন্ডারপাসের ভেতরে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আনাগোনা বেশি। একদিন আন্ডারপাস দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সেখানে বসে নেশা করছিল। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে খারাপ কথা বলে। আন্ডারপাসের ভেতরে পরিবেশ ভালো না হওয়ার কারণে মেয়েরা এই আন্ডারপাস ব্যবহারও কম করে। এরপর থেকে তিনিও আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে গাবতলীর আন্ডারপাস ব্যবহার করেন না। ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পারাপার হন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নারীর চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আসে না। এর কারণ নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়নে নারীর অংশগ্রহণ কম। ফলে নারীবান্ধব নগর কাঠামো তৈরি হয়নি।

ঢাকা শহরে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া দরকার এ প্রসঙ্গে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্‌ কবীর বলেন, দেশে জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। স্কুল-কলেজের মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার জন্য কোনো পাবলিক গাড়ি নেই। স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য বাথরুমের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বাথরুম নোংরা হওয়ার কারণে মেয়েরা তা ব্যবহার করা এড়িয়ে যায়। গার্মেন্টস কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফুটপাতে যে সব নারী, মেয়ে, শিশু অবস্থান করেন তাদের পাবলিক টয়লেট নেই। এর ফলে ইউরিন ইনফেকশনে  ভোগেন তারা।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ঘরে নারী যেমন সুরক্ষা পাবে, তেমনি নারী ঘরের বাইরে সুরক্ষা পাবে। তাদের কেন্দ্রে রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। যেমন- কর্মস্থল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নারী যাবেন তার যাতায়াতের নিরাপত্তার জন্য রাস্তাঘাট, ফুটপাত, পরিবহন কতখানি নিরাপদ। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর চলাচলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট- রিকশা, বাস, টেম্পো, সিএনজি। সিএনজি, বেবিট্যাক্সি মেয়েদের চলাচলের জন্য কতটা নিরাপদ তা ট্রাফিক পুলিশকে দেখতে হবে। বাসে ড্রাইভার, হেলপার মেয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে কিনা তাও ট্রাফিক পুলিশেরই দেখার দায়িত্ব। এ ছাড়া মেয়েদের জন্য আলাদা বাসের পরিমাণ বাড়ানো দরকার। নইলে সাধারণ বাসে মেয়েদের আগে ওঠার ব্যবস্থা করা এবং তাদের সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ কমানোর দায়িত্ব পরিবহন ম্যানেজমেন্টের।

ব্র্যাক-এর জেন্ডার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর নিশাত সুলতানা বলেন, সম্প্রতি আমরা ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনা মুক্ত সড়ক’- শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। যেখানে দেখা গেছে গণপরিবহনে শতকরা ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।

ব্র্যাক’র সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হোসেইন বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতার অংশ হিসেবে আমরা গাজীপুর, টাঙ্গাইল মহাসড়কের আশেপাশের ১০০ টি স্কুলে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এসব স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানি সম্পর্কে তথ্য জানানো ও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।  ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাস গবেষণাকর্মটি পরিচালিত হয়। ৪১৫ জন নারী এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। মূলত ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় নগর, উপনগর এবং গ্রামাঞ্চল এই তিন অঞ্চলের নিম্ন ও নিম্ন মধ্য আয়ের পরিবারের নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়।

গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক এবং অন্যান্য যৌন হয়রানির শিকার হন। এরমধ্যে ৬৬ শতাংশ নারী জানায়, ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারাই নারীরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ৩৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা ১৯-২৫ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। গণপরিবহনে নারী নির্যাতনে কারণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা, তদারকির (সিসিটিভি ফুটেজ মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা) অভাবে নারীদের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহন ব্যবহারকারী উত্তরদাতারা বলেন, শারীরিক যৌন হায়রানির মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করা, চিমটি কাটা, কাছে ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে ধাক্কা দেয়া, নারীদের চুল স্পর্শ করা, কাঁধে হাত রাখা, হাত, বুক বা শরীরের অন্যান্য অংশ দিয়ে নারীর শরীর স্পর্শ করা ইত্যাদি। এসব ঘটনায় ৮১ শতাংশ নারী চুপ থাকেন। ৭৯ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সরে আসেন।