বাচ্চাদের জ্বর হলে করণীয়…

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

child fever infographics

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রসঙ্গঃ কর্পোরেট কালচার

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

জহিরুল মোঃ ইমরুল কায়েস : বেসরকারী কোম্পানী পরিবেশে ‘কর্পোরেট কালচার’ একটি জনপ্রিয় টার্ম। কোন বেসরকারী কোম্পানীতে কর্পোরেট কালচার আছে কী – নেই তার সুস্পষ্ট মানদন্ডের বিধান না থাকলেও শুধু ইশারা আঙ্গিকে এক চাকুরীজীবী আরেক চাকুরীজীবীকে বুঝাতে চান তাঁদের নিজ নিজ কোম্পানীর কর্পোরেট কালচারের বর্তমান অবস্থা বা তার আনুসঙ্গিক বাতাবরণের নমুনা। যে কোন কোম্পানীর কর্পোরেট কালচার ইতিবাচক হলে সে কোম্পানীর ব্যবসায়িক সুনাম দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর তরতর করে কোম্পানীর ডালাপালাও মেলে। কোম্পানীর পুঁজি ও পরিশোধিত মূলধন যত জাঁকালো হোক না কোন সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর কাজের যথাযথ পরিবেশ না থাকলে সে কোম্পানী বেশী দূর এগোতে পারে না। কালের পরিক্রমায় সে কোম্পানী হোঁচট খাবেই খাবে। আর, একটি ছোট বা মাঝারী মাপের কোম্পানীতে কাজের পর্যাপ্ত পরিবেশ থাকলে কোম্পানীর কর্মচারীরাই অনুবন্ধী কোম্পানীর দ্রুত উন্নয়নে নিজেকে সঁপে দিবে। আর সে ছোট কোম্পানীগুলো বড় মাপের হতে চাইলে বাধারও সম্মুখীন হয় না। অর্থাৎ একটি কোম্পানীর উন্নতি অবনতি হওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা আধুনিক পরিভাষায় ‘কর্পোরেট কালচার’ বিরাট ভূমিকা পালন করে। আসুন, একটু জেনে নেওয়া যাক কর্পোরেট কালচার আসলে কী এবং কেন?

১৯৬০ এর দশকে প্রাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অনুসন্ধান মূলক কাজে সহায়তার জন্য নানাবিধ সংস্থার জন্ম হয়। ব্যবসার মধ্যে পেশাদারিত্বমূলক সাংস্কৃতিক সচেতনতা বাড়ানোই ছিল মূলত এ সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য। কালক্রমে ১৯৮০ দশকের শুরুতে ‘কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি আত্মপ্রকাশ করে। আর ৯০ এ দশকে এসে কর্পোরেট কালচারটি পশ্চিমা বিভিন্ন বেসরকারী কোম্পানীর কর্মপরিবেশে পরিচিতি লাভ করে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশেও ’কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে কর্পোরেট সেক্টরে স্থান করে নেয়। কোম্পানীর প্রকৃত চরিত্র বুঝানোর জন্য এবং তা সবার নিকট বোধগম্য করার জন্য কোম্পানীর পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সমাজতত্ত্ববিদ ও শিক্ষাবিদ দ্বারা এই ’কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি বহুলভাবে ব্যবহৃত ও প্রচারিত হয়।

প্রথম থেকেই ’কর্পোরেট কালচার’ শুধুমাত্র সচরাচর সাধারণ বিশ্বাস বা আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কোম্পানীর ভিত্তি, পণ্যের মানদন্ডের পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা কৌশল, কর্মচারীদের যোগাযোগের ক্ষেত্র বা পরিবেশ, মালিক-কর্মচারী সম্পর্ক, কাজের পরিবেশ, কোম্পানীর মনোভাব,কোম্পানীর দৃষ্টিলব্ধ লোগো বা চিহ্ন, কোম্পানীর ট্রেডমার্ক, মিশন স্টেটম্যান, কোম্পানীর নীতিমালা, কর্মীদের জন্য প্রণোদনা ও পুরস্কার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, কর্মচারীদের টিমবিল্ডিং গঠনে সহায়তা প্রদান, এমনকি কোম্পানীর সিইও’র সামগ্রিক আচরণ বিধিও কর্পোরেট কালচারের অর্ন্তভূক্ত হয়। আর,২০১৭ সালে এসে কর্পোরেট কালচার শুধূমাত্র কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালনা পর্ষদ বা কোম্পানীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। মূলত এখন কর্পোরেট কালচার বলতে জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব, আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কোম্পানীর আকার বা পণ্যের গতি-প্রকৃতিসহ ইত্যাদিকে বুঝায়।

কর্পোরেট কালচার হলো,কোম্পানীর কর্মচারী এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এমন নৈতিক আচরণ ও বিশ্বাসকে বোঝায় যে আচরণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর ব্যবসায়িক লেনদেন ও যোগাযোগ পরিচালিত হয়। কর্পোরেট কালচার আসলে পুরোপুরি সজ্ঞায়িত কোন বিষয় নয়, সে হিসেবে এটি এমনই হতে হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কর্পোরেট কালচার বলতে এমন এক সংস্কৃতিকে বুঝায় যে পরিবেশের মাধ্যমে কোম্পানী এমন লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাঁদের সংমিশ্রীয় বৈশিষ্ট্যগুলো সময়ের সাথে সাথে সাংগঠনিকভাবে কোম্পানীর কল্যাণার্থে বিকশিত হয়।

মূলতঃ কর্পোরেট কালচার হল “একটি কোম্পানীর ব্যাপক মূল্যবোধ,বিশ্বাস ও মনোভাবের প্রতিফলন। যে অনুচিন্তার মাধ্যমে কোম্পানীর বৈশিষ্ট্যকে চরিত্রাঙ্কণ করে আর সেভাবে চর্চার নির্দেশনা দেয়।” এ সংমিশ্রীয় এবং সমন্বিত বৈশিষ্ট্যগুলিই একটি ফার্ম বা কোম্পানীর কর্পোরেট কালচারে পরিণত হয়। অনেক কোম্পানীতে কর্পোরেট কালচার বলতে ড্রেস কোড, দৈনন্দিন কর্মঘন্টা, কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা, কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি, বার্ষিক টার্নওভার, অফিস সেটআপ, মক্কেলগণের সন্তুষ্টি, অপারেশনসহ নানান দিক বিবেচিত হয়।

কর্পোরেট কালচারের জন্য গুগল বেশ সুপরিচিত। গুগল কর্মচারীদের জন্য টেলিকমিউটিং (বাসা বা যেকোন জায়গা থেকে কাজ করার সুবিধা),ফ্লেক্স টাইম (নিজের মতো করে কর্মঘন্টা ঠিক করে কাজ করা), পরিবারের সদস্যদের টিউশন ফি পরিশোধ, কর্মচারীদের জন্য বিনামূল্যে লাঞ্চ, অন সাইট ডাক্তারের ব্যবস্থা, কর্মচারীদের জন্য মটর ওয়েল ও গাড়ীর ফিটনেস সুবিধা প্রদান, ম্যাসাজ ও হেয়ার স্টাইল সুবিধাসহ ন্যূনতম ১০০টি সেবা প্রদান করে। কর্পোরেট কালচারের জন্য টুইটার, এডেলম্যান, ফেসবুক, সাউথ্ওয়েষ্ট এয়ারলাইন্স, সেভরণ, এ্যাপেল কিংবা নাইকির মতো বড় বড় কোম্পানীগুলোর নাম একদম প্রথম দিকে। ফোর্বসের অনুসন্ধানকারীরা উপরোক্ত কোম্পানীগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনা সাপেক্ষে কর্পোরেট কালচারের এ তালিকা বিন্যস্ত করেছেন। কর্পোরেট কালচারের জন্য উপরোক্ত নামগুলি যেমনি বিখ্যাত তেমনিভাবে খারাপ দাপ্তরিক পরিবেশের জন্য ওয়াশিংটনের সিয়াটলে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের খ্যাতিও বিশ্বব্যাপী।

আমাজনের নিজস্ব কাজের পরিবেশ খুব অগোছালো। যেমন তারা ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের (৩৮ ডিগ্রী সে.) মধ্যে কর্মচারীদের কাজ করান, মালামার চুরি হওয়ার ভয়ে ওয়্যারহাউজের দরজা গুলো বন্ধ করে রাখেন। আলো বাতাসহীন এ অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে আমাজনের কর্মচারীরা প্রায় সময়ই পানিশূন্যতা ও অবসন্নতা রোগে ভোগেন। কিছু কিছু ওয়ার্কারদেরকে তারা ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ডেলিভারী পণ্যের ট্রলি সমেত ক্লায়েন্টদের নিকট পাঠান,সময়মত পণ্য ডেলিভারী করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে তারা লাঞ্ছিত ও ভর্ৎসনা করতে পিছপা হন না। এছাড়া সহযোগিদের মধ্যে অকল্যাণকর কাজের প্রতিযোগিতা সৃষ্টিকরণ, ব্যবস্থাপনায় অস্বাভাবিকতা, অবসর সময় কিংবা মধ্যরাত্রেও কর্মবন্টন, উদ্দীপনামূলক কর্ম পরিকল্পনার পরিবর্তে সমালোচনা মূখর কর্পোরেট কালচার এ কোম্পানীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আরো অনেক অনেক বদ কালচার আছে বিশ্বখ্যাত এ জায়ান্ট ই-কমার্স কোম্পানীটির। সেজন্য উক্ত কোম্পানীতে যারা অতীতে কাজ করেছিলেন এবং বর্তমানেও যারা কাজ করেন প্রায় কর্মচারীই আমাজনকে তাঁদের নিজের কোম্পানী বলে মনে করেন না। প্রভুত্ববাদী আচরণের জন্য আমাজনের খ্যাতি এখন বিশ্বজোড়া। কর্মচারীদের প্রতি এহেন আচরণ আমাজনকে সাফল্য বা ব্যর্থতার কোন পথে নিয়ে যায় তা সময়েই বলে দিবে। এজন্য কর্মচারীরা সুযোগ পেলেই এ কোম্পানী ত্যাগ করেন।

সুতরাং আপনি যদি আপনার কর্মীদের অনুপ্রাণিত ও সেবা প্রদান করতে চান তাহলে আপনার কর্মক্ষেত্রের কর্পোরেট কালচার সমৃদ্ধি করুন। কর্পোরেট কালচারের সমৃদ্ধি ঘটলে কর্মচারীদের মনে অধিকার জন্মায়। যে অধিকারের বলে কোম্পানীর প্রতি তাদের আনুগত্য বৃদ্ধি পায় এবং কোম্পানী পরিবর্তনের মানসিকতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্রাস পায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যৌনদাসীদের প্রথম ভিডিও প্রকাশ

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

chinese comfort women for japaneseদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাধ্যতামুলকভাবে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল অসংখ্য নারীকে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের মাঝ থেকে সেনারা শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো এদের কাউকে। এদেরকে বলা হতো ‘কমফোর্ট ওমেন’ বা স্বস্তি দেয়া নারী।

এমনই কিছু যৌনদাসীর প্রথম ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই ভিডিওটি ১৮ সেকেন্ডের। ফুটেজটি দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অর্থায়নে কিছু গবেষক পেয়েছেন সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন ইউএস আর্কাইভে। এটি চীনে ধারণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এতে দেখা যায়, লাইনে দাঁড়ানো বেশ কিছু নারীর সঙ্গে কথা বলছে এক চীনা সেনা সদস্য। তার উদ্দেশ্য কি তা বোঝা যায় নি। তবে ১৯৪৪ সালে মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল কোরিয়ার সাত জন নারীকে। তাদের সঙ্গে সেনা কর্মকর্তা কথা বলছেন তাকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর একজন চীনা ক্যাপ্টেন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীদের দাবি, জাপানের সেনাবাহিনীর সদস্যদের মনোরঞ্জন করতে দুই লাখ নারীকে জোর করে ঠেলে দেয়া হয়েছিল পতিতালয়ে। আর এতে যারা থাকতেন তাদেরকে বলা হতো কমফোর্ট ওমেন। এসব নারীর বেশির ভাগকে নেয়া হতো কোরিয়া থেকে। এছাড়াও ছিলেন চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের নারী, যুবতীরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনাবাহিনীর জন্য নারীদের জোরপূর্বক যৌনদাসী বানানো হয়েছিল এর স্বপক্ষে ফটোগ্রাফ রয়েছে। আছে জীবিতদের সাক্ষ্য। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া যে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে তার গবেষকরা বলেছেন, এই ফুটেজটি চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে ধারণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সেনারা। ইউনান প্রদেশটি তখন ছিল জাপানের অধীনে।

নারীদের এভাবে জোর করে যৌনদাসী বানানোর বিষয়ে জাপানের ক্ষমা না চাওয়া ও ক্ষতিপূরণ না দেয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কে টান পড়েছে। ২০১৫ সালে দেশ দুটি একটি ঐকমত্যে আসে। তার অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষা চায় টোকিও। একই সঙ্গে নির্যাতিতদের ১০০ কোটি ইয়েন দিতে রাজি হয়। তারপরও এর উত্তাপ রয়েছে।

সম্প্রতি বুশানে জাপানের কনসুলেটের সামনে একটি ‘কমফোর্ট ওমেন’-এর মূতি বসায় জাপান। এ নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়োজিত জাপানের রাষ্ট্রদূতকে সাময়িক সময়ের জন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

থাইল্যান্ডের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল রামবুটান

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

rambutan fruit 2

কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে লাল। দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো। খোসা ছাড়ালে ভেতরের অংশটা লিচুর মতো। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। থাইল্যান্ডের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় এ ফলের নাম রামবুটান।

বিদেশি এ ফল চাষে সফলতা পেয়েছেন নরসিংদীর শিবপুরের কৃষক জামাল উদ্দিন। তাঁর এ সফলতা আশা জাগিয়েছে এলাকার অন্য কৃষকদের মনে। অধিক লাভজনক আর নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর দৃষ্টিনন্দন এ ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে স্থানীয় কৃষকরা। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পেলে আগামী দিনে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুনত্ব যোগ করতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় এ ফল রামবুটান।

কৃষি বিভাগ বলছে, নরসিংদীর উঁচু বা টিলা এলাকার মাটি রামবুটান চাষের জন্য উপযোগী। এখানে রামবুটান চাষে নতুন দুয়ার খোলার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কামারটেক বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে কৃষক জামাল উদ্দিনের বাড়ি অষ্টাআনী গ্রামের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। জামাল উদ্দিন একজন আদর্শ কৃষক। তিনি লটকন, মাল্টা, কলম্বো লেবু, থাইল্যান্ডের পেয়ারা, কাঁঠাল, আমসহ বিভিন্ন প্রকারের ফলের পাশাপাশি সবজি, মাছ ও ধান চাষ করেন। এর সঙ্গে যোগ করেছেন রামবুটান। তাঁর আধা পাকা বাড়ির সামনে বিভিন্ন ফল ও ফুলের বাগান। তিনি শোনান বিদেশি ফল রামবুটান চাষের গল্প।

কাজের সন্ধানে প্রথমে মালয়েশিয়া ও পরে ব্রুনাই যান জামাল উদ্দিন। ২০০৬ সালে দেশে ফেরার সময় অন্য জিনিসের সঙ্গে এক কেজি রামবুটান ফল নিয়ে আসেন। সে ফলের বীজগুলো তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে রোপণ করেন। পরে এ থেকে চারাও জন্মায়। প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর লটকন বাগানের ভেতরেই ১৭টি রামবুটানের চারা রোপণ করেন। এর মধ্যে ১০টি চারা মারা যায়। বাকি সাতটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে।

২০১২ সালে প্রথমবারের মতো এর মধ্য থেকে একটি গাছে ফুল আসে। আনন্দে মন ভরে যায় তাঁর। সেই গাছে অল্প পরিমাণে ফল ধরে। কিন্তু পরের বছরই ওই গাছটি থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকার রামবুটান বিক্রি করেন। তৃতীয় বছর ফলন ধরে তিনটি গাছে। আর এ থেকে তিনি বিক্রি করেন প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল। পরের বছর বিক্রি হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকার রামবুটান। আর চলতি বছর পাঁচটি গাছ থেকে লক্ষাধিক টাকার ফল বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।

জামাল উদ্দিন বলেন, প্রথম প্রথম স্থানীয় বাজারে এ অপরিচিত ফলের কদর ছিল না। ধীরে ধীরে এর পরিচিতি বাড়ায় ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে ফলটির। ঢাকা থেকে পাইকাররাও রামবুটান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বিদেশি ফলটি স্থানীয় বাজারে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজি এবং প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নরসিংদীর শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুল হক জানান, রামবুটান ফলটি লিচু পরিবারের। আদি নিবাস মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। ফলটির ওপরে হালকা চুলের মতো রয়েছে। যা দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো। মালয় ভাষায় ‘রামবুট’ শব্দের অর্থ চুল। তাই অনেকে একে হেয়ারি লিচু, কেউ কেউ ফলের রানিও বলেন। ফলটির ভেতরে লিচুর মতো শাঁস থাকে। খেতে সুস্বাদু ও মুখরোচক। রয়েছে ওষধি গুণ।

রামবুটান ফলের শত্রু বাদুড়, ইঁদুর ও পাখি। এ জন্য গাছে জাল দিয়ে পেঁচিয়ে দিতে হয়। আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত গাছে ফল থাকে। গাছভেদে ৫০ থেকে ১০০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

জামাল উদ্দিনের এ অভিনব প্রচেষ্টা এলাকার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে উৎসাহ। অনেকে এ ফলের গাছ দেখতে জামালের বাড়িতে আসে। এলাকার অনেক চাষি এ ফল চাষে আগ্রহী। স্থানীয় নার্সারিগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে রামবুটানের চারা।

জামাল উদ্দিনের প্রতিবেশী মজনু মিয়া বলেন, ‘রামবুটান চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জামাল উদ্দিন। তাঁর সফলতা দেখে আমারও রামবুটানের বাগান করার ইচ্ছা জেগেছে। এরই মধ্যে বেশকিছু সংখ্যক চারা লাগিয়েছি। এ বছর একটি গাছে ফল এসেছে। সেই গাছ থেকে ১০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছি। ’

আরেক কৃষক আবু সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘খরচের তুলনায় রামবুটান চাষ লাভজনক হবে বলে আশা করছি। ’

শিবপুরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তেজেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, ‘জামাল উদ্দিনের সফলতা দেখে এলাকার কৃষকরা রামবুটান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাচ্ছি এটা যাতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং সবাই যেন জামাল উদ্দিনের মতো সফলতা অর্জন করতে পারে। ’

নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক লতাফত হোসেন বলেন, ‘এখানকার উঁচু বা টিলা জমিতে রামবুটান চাষ বেশ সম্ভাবনাময়। এখানে রামবুটান চাষে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। আশা করি, শিগগিরই লটকনের পর নরসিংদীর রামবুটান রাঙাবে দেশবাসীকে। ’

শেষ বিকেলের মেয়ে – পর্যালোচনা

অগাষ্ট 20, 2017 মন্তব্য দিন

shes bikeleyer meyeরায়হান আতাহার : “শেষ বিকেলের মেয়ে” উপন্যাসটি জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস, যা ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের মূল চরিত্র কাসেদ যে কি না পেশায় একজন কেরানি। সাথে টুকটাক কবিতা লেখার অভ্যাস আছে তার। বৃদ্ধা মা আর এক দূর সম্পর্কীয় অসহায় বোন নাহারকে নিয়ে তার সংসার।

জাহানারা নামের একটি মেয়েকে কাসেদ ভালোবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। মাঝে মাঝে জাহানারাদের বাড়িতে যায় সে।

জাহানারার জন্মদিনে কাসেদের সাথে পরিচয় হয় জাহানারার কাজিন শিউলির সাথে। শিউলির হাসি-খুশি ব্যবহার ও উচ্ছ্বলতা কাসেদের ভাল লাগে। কোন এক পর্যায়ে শিউলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে সে। কিন্তু শিউলি আরেকজনের বাগদত্তা। তাই তাকে নিরাশ হতে হয়।

ওদিকে শিউলি ও জাহানারার সেতার মাস্টারকে নিয়ে জাহানারা ও কাসেদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি থেকে দূরত্ব তৈরি হয়।

এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র সালমা। সম্পর্কে কাসেদের আত্নীয়া সে। ছোটবেলা থেকে সালমা কাসেদকে ভালোবাসতো। কিন্তু কাসেদ বুঝতে পারেনি। ফলে সালমার বিয়ে হয়ে যায় অন্য এক জায়গায়। অনেক বছর বাদে যখন দুজনের দেখা হয় তখন সালমার কোলে ফুটফুটে একটি মেয়ে। কিন্তু বিবাহিত জীবনে সালমা সুখী ছিল না সে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে সালমা কাসেদের সাথে দূরে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তখন কাসেদ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

অন্যদিকে অফিসের হেড কেরানি মকবুল সাহেবের মেজো মেয়ের প্রতিও দুর্বলতা ছিল কাসেদের। কিন্তু তার অফিসের বসের সাথে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সরে আসতে হয় তাকে।

এভাবে একাধিক মেয়ে আসে কাসেদের জীবনে। কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত কাসেদ বুঝে উঠতে পারে না কি করবে। এমতাবস্থায় কাসেদের মা মারা যান। ওদিকে নাহারেরও বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ফলে কাসেদ একেবারে একা হয়ে যায়।

হঠাৎ একদিন শেষ বিকেলে তার দরজায় কড়া নেড়ে হাজির হয় মেয়ে। ঔপন্যাসিক এই মেয়েকেই “শেষ বিকেলের মেয়ে” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু কে ছিল সেই মেয়ে? নাহার!

এটি যেন রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ব্যয় করি

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

দেখা হয় নাই শুধু চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু এক পা ফেলিয়া

একটি ধানের শীষের উপর

একটি শিশির বিন্দু।

জহির রায়হানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত প্রোপাগান্ডা

অগাষ্ট 20, 2017 মন্তব্য দিন

http://egiye-cholo.com/zahir-raihan/

রাহমান রাদ : ”জহির রায়হান তো এক বিখ্যাত সাংবাদিক আছিল, বুঝলা? ফিল্মও ভি বানাইত। একাত্তর সালে গণ্ডগোলের সময় আওয়ামিলিগ নেতারা যখন পলায়া গিয়া কলকাতায় খারাপ পাড়ায় আকামকুকাম করতেছিল, তখন এই ব্যাটা হেইডি ভিডু কইরা একটা ফিল্মই বানায়া ফেললো। হের কাছে আরও তথ্য আছিল, ফাঁস কইরা দিতে চাইছিল। হ্যাঁর লাইগাই তো শেখ মুজিবে দেশে ফিরাই তারে গুম কইরা ফেললো। আহারে, বড় ভালো লোক আছিল!”

”এই যে আজ কিছু লোক গোলাম আজম সাহেব, নিজামী সাহেবদের বিরুদ্ধে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্যতম অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালায়, আসল সত্যটা জানলে তো এদের পেট খারাপ হয়ে যাবে। আসল সত্যটা হচ্ছে, একাত্তরের গণ্ডগোলের সময় আসলে ভারতীয় সেনারা মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে খুন, ধর্ষন করে পাকিস্তানী সেনাদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের পর দেশে ফিরে যাবার সময় তারা সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। জহির রায়হান এসব জানতেন। তার কাছে সব প্রমান ছিল। আর সেগুলো ফাঁস করে দিতে চেয়েছিলেন বলেই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” এর এজেন্টরা তাকে গুম করে ফেলে। নইলে স্বাধীন দেশে একটা জলজ্যান্ত মানুষ কিভাবে গুম হয়ে যাবেন?”

প্রথম প্যারাটা ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হামিদ স্যার “সময়ের প্রয়োজনে” পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন। আর দ্বিতীয় প্যারাটা ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় “কিশোর কণ্ঠ” পাঠচক্রে শিবিরের এক সফেদসৌম্য চেহারার এক আদিম বর্বর পাষণ্ডের মুখে শোনা। অনেক দিন পর্যন্ত কথাগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। তারপর একদিন “সময়ের প্রয়োজনে” গল্পটা পড়লাম। অনেকক্ষন চুপচাপ বইটা জড়িয়ে ধরে বসেছিলাম সেদিন। চোখের পানিতে পাতাগুলো ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে যে কত অসংখ্যবার গল্পটা পড়েছি, ইয়ত্তা নেই। মুসলিম বাজার বধ্যভূমিটার উপর বিশালকায় মসজিদটা কিংবা পাশেই ওই শাদা পানির পাম্পটা- কত দিন গিয়ে পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছি, নিজেও জানি না। জহিরের কথা মনে পড়তো- ওই যে হালকা গড়নের সদা হাস্যোজ্জল মানুষটা, পকেটে মাত্র ছয় আনা নিয়ে একটা রঙিন সিনেমা বানিয়ে ফেলার সাহস করতো যেই বিস্ময়কর জাদুকর… সেই জহির রায়হানের কথা…

হাতের কাছে যা আছে, তাই দিয়েই সিনেমা বানাবো- এই ছিল মানুষটার মন্ত্র। অসম্ভব প্রতিভাধর ছিল, যা চাইতেন, নিখুঁত দক্ষতায় সেটা নামিয়েও আনতেন তিনি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে “জাগো হুয়া সাভেরা” দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখা সেই ছেলেটা তার পরের ১৩ বছর উপহার দিয়ে যান ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু : ১৯৬৪), ‘বাহানা’ (১৯৬৫), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) আর ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)’র মতো অসামান্য সব চলচ্চিত্র। অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে এই সময়টাতেই একে একে প্রকাশিত হয় শেষ বিকেলের মেয়ে, আরেক ফাগুন, বরফ গলা নদী, আর কত দিন-এর মতো কালজয়ী সব উপন্যাস আর সূর্যগ্রহন (১৩৬২ বাংলা), তৃষ্ণা (১৯৬২), একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০) কয়েকটি মৃত্য এর মত অভূতপূর্ব সব গল্পগ্রন্থ। ৭০’রের শেষদিকে তার উপন্যাস “আর কত দিন” এর ইংরেজি ভাষান্তরিত চলচ্চিত্র “লেট দেয়ার বি লাইট”-এর কাজে হাত দেন জহির। কিন্তু একাত্তরের সেই অভূতপূর্ব বিভীষিকা থামিয়ে দেয় সব!

একাত্তর জহিরের জীবনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক বিচিত্র সমীকরণের সামনে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা প্রথম ১০ জনের একজন ক্র্যাক জহির রায়হান একাত্তরের পুরো সময়টা প্রাণ হাতে করে ছুটে বেড়িয়েছেন রক্তাক্ত বাঙলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি আর আদ্দিকালের একটা ক্যামেরা সম্বল করে বানিয়েছেন গণহত্যার উপর নির্মিত পৃথিবীর ইতিহাসের অবিসংবাদী সেরা পাঁচটি ডকুমেন্টরির একটি “স্টপ জেনসাইড” (নিজস্ব মতামত)। তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানীদের বর্বরতা আর নৃশংসতার এক অনবদ্য উপাখ্যান। “বার্থ অফ আ নেশন” ছিল তার সৃষ্টি, বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ আর আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ এর পেছনের কুশীলবও ছিলেন তিনি। একাত্তরের রক্তাক্ত জন্মইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায়ের খবর জানা ছিল তার, তাই দেশে ফেরার পর যখন বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করলেন, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি করেনি আলবদরের ঘাতকবাহিনী।

এ বি এম খালেক মজুমদার ছিল ৭১-এর কুখ্যাত আল বদর কমান্ডার। জহির রায়হানের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে কালো কাপড়ে চোখ বেধে তুলে নিয়ে যাবার সময় তাকে চিনে ফেলেছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার। সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে পান্না বলেছিলেন,

যখন ওকে (শহীদুল্লাহ কায়সার) অন্ধকার ঘর থেকে টান দিয়ে আমার সঙ্গে বারান্দায় নিয়ে এলো, পেছন থেকে ওর হাতটা ধরে আমিও বারান্দায় গেলাম। গিয়ে তাড়াতাড়ি সুইচটা অন করে দিলাম। সব আলো হয়ে গেল। সবার মুখে মুখোশ। আমার ননদ পাশ থেকে দৌড়ে এলো। ও তখন সন্তানসম্ভবা। উপায়ান্তর না পেয়ে একজনের মুখের কাপড়টা টান দিয়ে খুলে ফেলল। সে-ই ছিল খালেক মজুমদার (এ বি এম খালেক মজুমদার)

দেশে ফিরে দাদার নিখোঁজ হবার খবর পেয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন পাথরকঠিন মানুষ। দাদাই যে ছিল তার সবচেয়ে বড় আপনজন! দাদা আর নেই এটা তাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করানো যায়নি। উদ্ভ্রান্তের মত খুঁজতে শুরু করেন দাদাকে। কয়েক দিনের মাথায় বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন তিনি। জহির ছিলেন এই কমিটির চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের বাশারত আলী। প্রতিদিন শত শত স্বজনহারা মানুষ আসতেন এই কমিটির অফিসে। জহিরের এই ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিশন প্রথমেই খালেককে গ্রেফতার করাতে সক্ষম হয়। খালেককে গ্রেফতার করাবার পর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ শক্তির ব্যাপারে প্রায় সব তথ্যগুলো তিনি গুছিয়ে এনেছেন। এখন শুধু জাতির সামনে উন্মোচনের অপেক্ষা। এরপর আর জহিরকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুকি নিয়ে চায়নি নিজামি-মুজাহিদের আলবদর কিলিং স্কোয়াড…

হঠাৎ একদিন সকালে একটা ফোন পেলেন জহির রায়হান। সেদিন ছিল ৩০ জানুয়ারী। এর কয়েকদিন আগ থেকেই রফিক নামের এক ব্যক্তি জহিরকে আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে, শহিদুল্লাহ কায়সার বেঁচে আছেন। তাকে জীবিত পাওয়া যাবে। জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির বহু বার এই রফিককে ফ্রড এবং ধাপ্পাবাজ বলে জহিরকে বোঝাতে চাইলেও দাদার শোকে পাগল প্রায় জহির তাতে কর্ণপাত করেননি। এটাই তার কাল হয়েছিল। দাদাকে শুধু একটাবারের জন্য ফিরে পেতে পৃথিবীর সবকিছু দিতে রাজি ছিলেন জহির। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল ঘাতকেরা! রফিককে ৩০শে জানুয়ারির পর আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি।

সেদিন সকালে ‘মাস্তানা’ নামে এক বিহারী নৃত্যপরিচালক তাকে ফোন দিয়ে জানায়, তার বড় ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারসহ আরও কিছু বুদ্ধিজীবীকে মিরপুরে বিহারীরা আটকে রেখেছে। যদি সেই দিনের মধ্যে তিনি নিজে উপস্থিত না হন, তবে তার ভাইকে আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু মিরপুর তো বিহারীদের দখলে। কীভাবে তিনি সেই মৃত্যুপুরীতে যাবেন? কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেইদিনই বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব মইনুল হোসেন চৌধুরী সশরীরে এসে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন মিরপুরের বিহারীদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করে মিরপুর স্বাধীন করতে। সে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী পুরো মিরপুর ঘিরে রেখেছিল। জহির ফোনটা রেখে বেরিয়ে গেলেন। সকালের নাস্তাটা ওভাবেই পড়ে রইল, ওই তার বেরিয়ে যাওয়া…

মিরপুর বিহারী এবং পাকিস্তানী সেনাদের দখলে থাকায় সেখানে সিভিলিয়ানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবিরসহ বাকিরা আর জহিরের সাথে মিরপুরে ঢুকতে পারেননি, সেনাদের কন্টিনজেন্টে একমাত্র সিভিলিয়ান ছিলেন জহির। সেনারা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিরপুর। এর মধ্যে মিরপুর সাড়ে এগারো নম্বর ধরে ১২ নম্বর সেকশনের দিকে যে দলটি গিয়েছিল তাতে ছিলেন জহির। দলটিতে ছিল প্রায় ৪৫-৫০ জন সেনা। গাড়িগুলো মিরপুর সাড়ে এগারো হতে ধীরে ধীরে মিরপুর ১২-এর দিকে অগ্রসর হতে হতে শাদা পানির ট্যাংকটার সামনে এসে থামে। হঠাৎই সকাল এগারোটার দিকে আচমকা কয়েকশো বিহারী এবং সাদা পোশাকের ছদ্মবেশে থাকা পাকিস্তান সেনারা ভারী অস্ত্র এবং ড্যাগার কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এই দলটির উপর হামলা করে। প্রথমে ব্রাশফায়ারেই লুটিয়ে পড়েন জহির, একটু পর বিহারিগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে জানোয়ারের হিংস্রতায় কুপিয়ে, খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করে প্রায় সবাইকে। তারপর কোপাতে কোপাতে লাশগুলো টেনে নিয়ে যায় মুসলিম বাজারের নুরী মসজিদের পেছনের ডোবার দিকে। বাঙলা ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারের খন্ডবিখন্ড দেহ পড়ে থাকে এক কচুরিপানা ভরা ডোবায়…

*

২৮ টা বছর ওরা জহিরের মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। একটা মিথ্যা একশবার বললে ধ্রুব সত্যের মতো শোনায়। ২৮টা বছর ধরে ওরা সত্যপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে শুনিয়েছে,

”একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আল-বদরেরা কোন গণহত্যা চালায়নি, সব করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা নাম ধারন করে। আওয়ামীলীগ নেতারা কলকাতার বেশ্যালয়ে ফুর্তি করেছে একাত্তরের নয়মাস, এই সকল তথ্য আর প্রমান জহির রায়হানের কাছে ছিল, তাই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” তাকে গুম করে ফেলে…”; ২৮টা বছর নিজামি-মুজাহিদ আর গোলাম আজমের মতো নিকৃষ্ট কীট এই জঘন্যতম মিথ্যাচার করে গেছে বিরামহীন, একটা দেশের জন্মপরিচয়কে মুছে ফেলতে চেয়েছে নিকৃষ্টতম ষড়যন্ত্রে…

তারপরই ১৯৯৯ সাল এলো…

১৯৯৯ সালে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে আবিষ্কৃত নূরী মসজিদ সম্প্রসারণ কাজ চলবার সময় শ্রমিকেরা মাটির সামান্য নিচে কংক্রিটের স্লাব দিয়ে মুড়ে দেওয়া একটা কুয়োর সন্ধান পায়। নির্মাণশ্রমিকরা কৌতূহলবশত স্লাবটা ভেঙ্গে ফেলার সাথে সাথে বেরিয়ে আসে ২৮ বছরের পুরনো নির্মম ইতিহাস। তিনটি মাথার খুলি এবং বেশকিছু হাড়সহ কাপড়চোপড় বেরিয়ে এলে শ্রমিকেরা ভয় পেয়ে যায়। আবিষ্কৃত হয় ৭১-এর এক অকল্পনীয় নির্মমতার ইতিহাস, কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫০০০ শহীদের শেষ ঠিকানা, মুসলিম বাজার নূরী মসজিদ বধ্যভূমি…

পরের দিন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপারটা হাইলাইট হলে সাড়া পড়ে যায় শহীদদের স্বজনদের মাঝে। খবরটা পৌঁছে যায় বাবার খোঁজে পাগলপ্রায় পুত্র অনল রায়হানের কাছেও। তৎকালীন ভোরের কাগজের রিপোর্টার জুলফিকার আলি মানিক এই খবরটি কাভার করছিলেন। অনলের সাথে কথা বলবার পর তিনি জোরে সোরে অনুসন্ধান শুরু করলেন। সম্মিলিত অনুসন্ধানে পাওয়া গেল ৩০ শে জানুয়ারির সেই যুদ্ধে উপস্থিত থাকা এক সেনাসদস্যের। আমির হোসেন নামের এই সৈন্য সেইদিনের সেই দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন…

আমাদের সাথে যে সাংবাদিক ছিলেন, তিনি কালো মতো একটা প্যান্ট পরেছিলেন। সাদা জামা এবং তার ওপর হলুদ রঙের সোয়েটার ছিল তার গায়ে। আমাদের উপর যখন হামলা হয়, তখন দেখলাম বুকে হাত চেপে ধরে-ওখানে একটা দেয়াল ছিল, তার গায়ে পড়ে গেলেন। দেখলাম, ওনার কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তারপর আমি কিছুদূরে একটা গাছের পেছনে আশ্রয় নিয়ে দেখি কয়েকশো বিহারী ড্যাগার আর কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসল। তারপর তারা মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলো কোপাতে কোপাতে টেনে পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর আর আমি সেই লাশগুলোকে খুঁজে পাইনি।

১৯৯৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জুলফিকার আলি মানিকের প্রতিবেদন ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান’’ হইচই ফেলে দেয় সর্বত্র। এদিকে একই বছরের ১৩ আগস্ট সাপ্তাহিক ২০০০ এ (বর্ষ ২ সংখ্যা ১৪) বাবার নিখোঁজরহস্য উন্মোচন করে প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হানের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন পিতার অস্থি’র সন্ধানে

অস্কার পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ। উপস্থাপকের দিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ, টানটান উত্তেজনায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। উপস্থাপকের ঠোঁটে রহস্যের হাসি। শেষ পর্যন্ত সেরা চলচ্চিত্রের নাম ঘোষিত হল, মনোনয়ন পাওয়া গুণী পরিচালকদের বিশ্বসেরা সব চলচ্চিত্রকে পেছনে ফেলে সকলের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ঘোষিত হল Mirpur-The Last Battlefield এর নাম। সেরা স্ক্রিপ্ট, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি,সেরা সঙ্গীত সহ আরো ছয়টি বিভাগে অস্কার জিতলো মুভিটা, এর মধ্যে সেরা পরিচালকও ছিল। সেরা স্ক্রিপ্টরাইটারের অস্কারে ঘোষিত হল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম, সেরা সঙ্গীত পরিচালকের ক্যাটাগরিতে অস্কার পেলেন প্রথিতজশা সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ, আর সেরা পরিচালকের নামটা উচ্চারন করতে গিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন উপস্থাপক… তারপর হঠাৎ গমগমে গলায় উচ্চারন করলেন, অ্যান্ড দ্যা অস্কার গোজ টু দ্যা ওয়ান অ্যান্ড অনলি, জহির রায়হান…

অপেক্ষায় হাস্যোজ্জ্বল উপস্থাপক, অপেক্ষায় অস্কারের ঝলমলে মঞ্চ, অপেক্ষায় পৃথিবী। শহীদুল্লাহ কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হানদের অপেক্ষায় মহাকাল। কোথায় ওঁরা? কোথায়?

তথ্যসুত্র-

  1. ডেথ অফ আ জিনিয়াস
  2. জামাতে মওদুদীর খালেক মজুমদারঃ এ ঘাতককে চিনে রাখুন
  3. জহির রায়হানঃ হারিয়ে যাওয়া এক সুর্যসন্তান
  4. জহির রায়হান : অন্তর্ধান বিষয়ে ১৯৭২ সালের একটি লেখা
  5. লেট দেয়ার বি লাইট
  6. জহির রায়হানের ছেলে অনিল রায়হানের প্রতিবেদন- পিতার অস্থি’র সন্ধানে