পাঠ ও পাঠাগার

আতাউর রহমান :পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত লেখক শ্রীমণিশংকর চ্যাটার্জি (শংকর) একদা কৌতুকচ্ছলে লিখেছিলেন,‘আমাদের কলকাতায় প্রচুর মুখার্জি আছে, চ্যাটার্জি আছে, ব্যানার্জি আছে; কিন্তু কোনো এনার্জি নেই।’ তাঁর অনুসরণে বলা যেতে পারে—আমাদের ঢাকায় বনেদি-বেবনেদি এলাকানির্বিশেষে সেলুন আছে, বেলুন আছে, লন্ড্রি আছে, ফাউন্ড্রি (ঢালাইয়ের কারখানা) আছে; বিদ্যালয় আছে, চিকিৎসালয় আছে; বিফ-বার্গার আছে, ঔষধাগার আছে, কিন্তু (অতীব দুঃখের বিষয়) কোনো পাবলিক পাঠাগার নেই। সাম্প্রতিক মার্কিন মুলুক সফরকালে ব্যাপারটা প্রায়ই আমার মনের কোণে উঁকিঝুঁকি মারত।

তা আমি ‘পাঠাগার’ শব্দই–বা ব্যবহার করছি কেন? তৎপরিবর্তে লাইব্রেরি শব্দ তো অধিকতর সুপরিচিত আর শোনায়ও সুন্দর। আমাদের দেশের এক লোক কলকাতায় গিয়ে সবজির দোকানে ‘বাইগন দাও’ বলতেই ‘ঘটি’ দোকানদার বলে উঠল,‘বাইগন বলছ কেন? বেগুন বলো। সেটা সুন্দর শোনায়।’ বাঙাল তখন খেপে গিয়ে বলেছিল,‘সুন্দরই যখন শুনবার চাও তখন “প্রাণেশ্বরী” বললেই পারো, আরও বেশি সুন্দর শোনাইব।’ বাঙালির রসবোধের প্রশংসা করতেই হয়!

সে যা হোক। নিউইয়র্ক নগরী যে পাঁচটি ‘বরো’ তথা অঞ্চলে বিভক্ত, তার প্রতিটিতেই প্রায় হাঁটা দূরত্বে একাধিক পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত, যদিও ওখানে হেঁটে চলাফেরা করে খুব কম লোকই। তো ব্রঙ্কস বরোর বৃহৎ পাবলিক লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়তে গিয়ে বেশ খানিকটা হোঁচট খেতে হলো—পত্রিকাগুলো টেবিলের ওপর রাখা নেই, সহকারী লাইব্রেরিয়ানের ড্রয়ারে। ওঁর কাছ থেকে পাঠান্তে ফেরত প্রদানের নির্দেশনাসহ পত্রিকার প্রাপ্তি ঘটল। আমার উৎসুক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন,‘টেবিলে রাখলে না বলে নিয়ে চলে যায় যে।’ এবার আমার বিস্মিত হওয়ার পালা। আমেরিকার মতো জায়গায়, যেখানে একটা দৈনিকের দাম ৫০ সেন্ট থেকে বড়জোর ২ ডলার, সেখানে যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেটা স্বকর্ণে ঘোড়ার মুখ থেকে না শুনলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো বৈকি।

কিন্তু আরও বিস্ময় বুঝিবা অপেক্ষায় ছিল। ওখানকার পাবলিক লাইব্রেরিগুলোতে স্বভাবতই শতকরা ৯০ ভাগ বই থাকে ইংরেজি ভাষার, অবশিষ্ট ১০ ভাগ থাকে পৃথিবীর অন্যান্য প্রধান কয়েকটি ভাষার। বাংলা ভাষারও একটা সেকশন আছে। তো কুইন্স বরোর বৃহৎ পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা গেল, বাংলা সেকশনে উভয় বাংলার শখানেক বইয়ের মাঝখানে এই ক্ষুদ্র লেখকের একখানা কেতাবও সগৌরবে বিরাজ করছে। ইংরেজি ভাষায় একটা কথা আছে,‘নো ম্যান ইজ আ হিরো টু হিজ ওয়াইফ’—কোনো পুরুষই তার স্ত্রীর কাছে হিরো নয়। জনৈক বিখ্যাত লেখকের স্ত্রীকে নাকি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর স্বামীর কোন বইটি তাঁর সবচেয়ে ভালো লাগে; তদুত্তরে তিনি জানালেন,‘ওঁর চেক বইটি।’ আমি তাই অতঃপর সফরসঙ্গিনী সহধর্মিণীকে উপহাসচ্ছলে বললাম,‘দেখো গিন্নি, তুমি ও তোমার সরকার আমার তিন দশকের সাহিত্য-সাধনার প্রকৃত মূল্যায়ন না করলেও মার্কিন সরকার কিন্তু ঠিকই করেছে, ওদের লাইব্রেরিতে আমার বই রেখেছে।’ আসলে বন্যার তোড়ে বৃক্ষরাজির সঙ্গে খড়কুটোও ভেসে আসে।

ফিরে আসি ঢাকায় অঞ্চলভিত্তিক পাবলিক লাইব্রেরির ব্যাপারটায়। পাবলিক লাইব্রেরিটা হাঁটা দূরত্বে হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আমাদের ঢাকায় শাহবাগের কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাতায়াত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। আর কষ্ট করে ওখানে পৌঁছালেও যে বসার জায়গা ও যথাস্থানে ঈপ্সিত বই পাবেন, সে ব্যাপারে আপনাকে কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছি না। সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পিএসসিসহ প্রায় সব সরকারি দপ্তরে ছোট-বড় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত আছে। কিন্তু ওগুলোতে ম্যাঙ্গো-পাবলিক তথা আমজনতার প্রবেশাধিকার নেই; আর যাঁদের জন্য লাইব্রেরি, তাঁরা কদাচিৎ ওখানে পদধূলি দেন। আমার ইচ্ছে হয় বলি,ওগুলোকে বাইরে বের করে নিয়ে এলে প্রায় নিখরচায় অঞ্চলভিত্তিক পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা হয়ে যেত এবং বিমুক্ত জায়গাগুলো অফিসের অন্যান্য কাজে লাগত। কিন্তু জানি, এবংবিধ প্রস্তাব সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের ভাষায় বন্ধ্যাগমনের ন্যায় নিষ্ফল হবে।

বাকি রইল ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। পৃথিবীখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেন যথার্থই বলেছেন,‘যাঁর বাড়িতে একটি লাইব্রেরি আছে, মানসিক ঐশ্বর্যের দিক দিয়ে সে অনেক বড়।’ স্রষ্টার কৃপায় বর্তমানে এ দেশে বিত্তশালী লোকের অভাব নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত লাইব্রেরির ব্যাপারে তাঁদের অধিকাংশের জীবনে বোধ করি মুজতবা আলী সাহেবের গল্পটিই প্রযোজ্য: নব্য ধনীর স্ত্রী বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে স্বামীর জন্য একটি উপহার কিনতে গেছেন। সেলসম্যান এটা দেখায়, ওটা দেখায়, কিছুই তাঁর পছন্দ হয় না, সবই তাঁর স্বামীর আছে। অবশেষে সেলসম্যান বইয়ের কথা বলতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘বইও ওঁর একটা আছে।

তা কম্পিউটারের কল্যাণে আমেরিকায় বহু বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। চেইন বুকস শপ ‘বর্ডারস’ তো গেছেই, ‘বার্নস অ্যান্ড নোবল’ও যাওয়ার পথে। তবে যে শাখাগুলো আছে, সেগুলোর অধিকাংশেই গ্রাহক যতক্ষণ খুশি বসে থেকে বই পড়তে ও ভিডিও দেখতে পারেন, চাই তিনি বই প্রভৃতি কিনুন আর না কিনুন। বিলেতের বিখ্যাত বইয়ের দোকান ‘ফয়েলস’-এও দেখেছি অবস্থা তদ্রূপ। অথচ আমাদের এখানকার যত্রতত্র ‘লাইব্রেরি’ নামধারী বইয়ের দোকানগুলোতে তেমন ব্যবস্থা নেই। ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে কিছুদিন ‘এটসেটরা’ (etc) নামে এরূপ একটা দোকান চলেছিল,ওখানে মাঝেমধ্যে গিয়ে বই পড়া ও বই কেনা হতো। বোধ করি লাভজনক হয়নি বিধায় ওটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আমরা আর্থিক লাভটাকেই সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখি কিনা।

যাকগে। শেষ করছি লাইব্রেরি-সংশ্লিষ্ট একটি চুটকিলা দিয়ে গভীর রাতে একজন লাইব্রেরিয়ান যখন নিদ্রামগ্ন, তখন তাঁর কাছে একটা টেলিফোন এল। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘লাইব্রেরি কখন খোলে?’ প্রত্যুত্তরে তিনি বিরক্তি সহকারে বললেন, ‘সকাল ১০টায়। কিন্তু এত গভীর রাতে আমাকে এই প্রশ্ন করার মানে কী?

‘১০টার আগে খুলবেন না?’ প্রশ্নকারী হতাশ কণ্ঠে পুনরায় প্রশ্ন করলেন। ‘কিছুতেই না,’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু আপনি ১০টার আগে কেন লাইব্রেরির ভেতরে যেতে চান?

‘আমি ভেতরে যেতে চাই না,’ প্রশ্নকারী এবারে বললেন, ‘আমি বাহির হতে চাই।

পুনশ্চ: মরুভূমিতে মরূদ্যানের মতো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেবের ভ্রাম্যমাণ পাবলিক লাইব্রেরির কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

আতাউর রহমান: রম্য লেখক ৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ৷

Advertisements

বিনিয়োগ শিল্পায়নে কেইপিজেড

KEPZশফিউল আলম : দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তুত চট্টগ্রামে অবস্থিত কোরিয়ান রফতানি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প জোন- কেইপিজেড। ইতোমধ্যে এ বিশাল শিল্পাঞ্চলে আংশিক বিদেশী বিনিয়োগে শিল্পায়ন হয়েছে। কেইপিজেড হচ্ছে দেশের প্রথম ও একক কোন বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত শিল্প এলাকা। বন্দরনগরীর অদূরে কর্ণফুলী নদীর মোহনা ও চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা এলাকায় এটি গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নামীদামী প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের উদ্যোগে এটি বিনিয়োগ শিল্পায়নের বিপুল সম্ভাবনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। ইয়াংওয়ানের কর্ণধার বয়োবৃদ্ধ কোরীয় শিল্পপতি কিহাক সানের উদ্যোগে কেইপিজেড ছাড়াও অনেক আগে থেকেই চট্টগ্রাম ও ঢাকা ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানাসমূহ ঈর্ষণীয় সাফল্যের সাথেই পরিচালিত হয়ে আসছে। কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৯ সালে ২ হাজার ৪৯২ একর উঁচু-নিচু টিলাময় বিস্তীর্ণ ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার হস্তান্তর করে। পরিবেশ অধিদপ্তর কেইপিজেডকে ছাড়পত্র দেয় ২০০৯ সালে। সেখানকার অপরূপ পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও নিটোল প্রকৃতিকে অটুট রেখেই দক্ষিণ এশিয়ায় নীরবে উন্নয়নের মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে এই শিল্পাঞ্চলটি। কেইপিজেডের মূল কোরীয় কোম্পানি ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে সর্বপ্রথম বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। ইয়াংওয়ান ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কারখানা স্থাপন করে। বর্তমানে দেশে কোরীয় কোম্পানিটির ১৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিকের। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশে ইয়াংওয়ানের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন রয়েছে।

কেইপিজেড শিল্প-কারখানা স্থাপনের সক্ষমতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করলে অন্তত ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ভাগ্য হবে সুনিশ্চিত। কেইপিজেডে ইতোমধ্যে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। এর প্রথম কারখানা কর্ণফুলী স্যুজ ফ্যাক্টরিতে এখন ১৮ হাজার শ্রমিক কর্মরত। তাদের মধ্যে ১৫ হাজারই আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা। পরিকল্পিত এই শিল্পাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি ডলার এবং একশ’ শিল্প-কারখানা স্থাপনে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে কেইপিজেড কোম্পানির। বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী রফতানি বাবদ বার্ষিক আয়ের টার্গেট রয়েছে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের। কেইপিজেড ছাড়াও আনোয়ারা এবং এর আশপাশ এলাকার পটিয়া, কর্ণফুলী, বাঁশখালীতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন হবে প্রসারিত। বিশ্বমানের এই রফতানি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পাঞ্চলটি গত প্রায় ১৬ বছরে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা হয়েছে। কেইপিজেড পরিপূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সেখানে নিজস্ব জেটি-বার্থ, আইটি পার্ক, স্কুল-কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভাষা শিক্ষা ও রিসার্চ সেন্টার, টেকনিক্যাল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। এরজন্য কারিগরি নকশা তৈরি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা হিসেবে যুক্ত হচ্ছে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ, টেলিকম সুবিধা, ব্যাংক, কাস্টমস, সিএন্ডএফ, শিপিং এজেন্ট, ট্রাভেল এজেন্টসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট সেবাসমূহ। বিদেশী বিনিয়োগকারী, নির্বাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন সুবিধা, ১৮ হোল গালফ কোর্সসহ অন্যান্য বিনোদন পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। সময়ের হাত ধরে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে আরও সেবা-সুবিধা প্রদান করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও কোরিয়া সরকারের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে ইপিজেড আইন ১৯৯৬ অনুসারে ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন কোরিয়া বাংলাদেশে একটি ইপিজেড স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে রেজিস্ট্রেশন করে। ক্রয় ও মালিকানা সম্পর্কিত নিয়ম-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ১৯৯৯ সালের আগস্টে কোরিয়ান ইপিজেডকে ভূমি হস্তান্তর করে সরকার কোরিয়ান ইপিজেডকে একটি শিল্প জোন হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরআগে ১৯৯৮ সালে সরকার প্রায় আড়াই হাজার একর পাহাড়ি ভূমি কোরীয় কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দ প্রদান করে। পরিবেশ ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী মোট জমির ৫২ শতাংশ বনায়ন, জলাধার সৃজন ও উন্মুক্ত এলাকা হিসেবে থাকবে। এসব শর্তের নিরিখে ৮২২ একর ভূমিতে ২০ লাখ গাছপালা লাগানো হয়েছে। ৪৭০ একর জায়গায় ১৭টি জলাধার ও উন্মুক্ত এলাকায় ঘাস লাগিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনোদনের জন্য গলফ কোর্স তৈরি হয়েছে।

অবশিষ্ট ১ হাজার ২০০ একর ভূমিতে রাস্তাঘাট ও শিল্প-কারখানা স্থাপনের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ সম্পন্ন হতে চলেছে। সেখানে পাখ-পাখালী ও জীবজন্তুর বিচরণের মধ্যদিয়েই কল-কারখানার চাকা ঘুরছে। যা দেশে একটি ব্যতিক্রমী শিল্প এলাকা। কেইপিজেডে এখন পর্যন্ত ২৪টি কল-কারখানার উপযোগী ভবন নির্মিত হয়েছে। এর আয়তন প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট। মূল পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে একশ’ একর জমিতে তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প (আইটি), ১৪০ একর জমিতে টেক্সটাইল-শিল্প, ৫০ একর জমিতে ওষুধ শিল্প গড়ে তোলা হবে। তাছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, মাঝারি শিল্প গড়ে উঠবে। এরজন্য অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ব্যয় হবে ২০ কোটি ডলার। এরফলে বিনিয়োগ আশা করা হচ্ছে ১২০ কোটি ডলারের। আর বার্ষিক পণ্য রফতানি আয়ের টার্গেট রাখা হয়েছে সোয়া একশ’ কোটি ডলার। কেইপিজেডে শিল্প স্থাপনে কোরীয় শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্যামসাং আগ্রহ ব্যক্ত করেছে বলে শিল্পোদ্যোক্তারা জানান। তারা কেইপিজেডে ২শ’ একর ভূমি চায়। তাছাড়া আরও কয়েকটি নামকরা প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনে আগ্রহী।

ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর পক্ষে অধিকাংশ ব্যাংকার

অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি- দীর্ঘদিন ধরে এমন সমালোচনা করে আসছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে। বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরতরাও মনে করেন, ব্যাংকের সংখ্যা কমানো দরকার। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে দেশের ৭২ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তারা এমন মত দিয়েছেন। ১৭ শতাংশ ব্যাংকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। আর ১১ শতাংশ বলেছেন, যা আছে ঠিক আছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘ব্যাংক একীভূত ও অধিগ্রহণ :প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এ গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। বিআইবিএমের অধ্যাপক ও পরিচালক মো. মহিউদ্দিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দল গবেষণাপত্রের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। জরিপে দেশে ব্যাংক একীভূত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে সুশাসনের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন ব্যাংকাররা। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের নিয়মবর্হিভূত নানা সুবিধা গ্রহণ, রাজনৈতিক দুর্বলতা, মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া, নেতৃত্ব ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের কারণে একীভূত না হওয়ার মূল কারণ বলে জরিপে উঠে এসেছে।

সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কিছু মালিকের কারণে কিছু ব্যাংকে পেশাদার ব্যাংকাররা কাজ করতে পারছেন না। নতুন করে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে মালিকদের আরও বেশিদিন থাকার সুযোগ করে দিলে পেশাদার ব্যাংকারদের পক্ষে এসব কাজ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিচালকদের দুই মেয়াদে ছয় বছরের পরিবর্তে তিন মেয়াদে নয় বছর এবং এক পরিবার থেকে দু’জনের পরিবর্তে চারজন পরিচালক করার উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, আইনটি পাস হলে ভালো ব্যাংকও খারাপ হয়ে যাবে। আইন সংশোধনের এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, সবাইকে আরও সোচ্চার হতে হবে। এ আইন যেন পাস না হয় সে জন্য তিনি নিজে মাঠে নামবেন, লেখালেখি করবেন বলেও আহ্বান জানান তিনি। ব্যাংক একীভূতকরণ বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশে ব্যাপকহারে ব্যাংক একীভূত হচ্ছে। সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বড় হওয়ার জন্য মার্জার করে। তবে আমাদের এখানে ছোট ব্যাংকগুলোর ধারণা একীভূত হলে বৃহৎ প্রতিষ্ঠান তাদের খেয়ে ফেলবে। আবার একীভূত হলেও ভালো কিছু হবে না। যেমন বিডিবিএলের ক্ষেত্রে যা হয়েছে। দুটো খারাপ প্রতিষ্ঠান মিলে নতুন একটি বড় খারাপ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে বলে তার পর্যবেক্ষণ।

কর্মশালায় কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, খারাপ ব্যাংক একীভূতকরণ একটি ভালো পদ্ধতি। তবে মার্জার হলেই খেলাপি ঋণ কমবে না। কেননা, একীভূত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন হয় না। এসব বিষয় লক্ষ্য রেখে একীভূতকরণ নীতিমালা করা উচিত।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, দেশে ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ। সুশাসনের অভাবও এখানকার ব্যাংকগুলোর জন্য বড় সমস্যা। তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূতের ধারণা দেশে কিছুটা নতুন। তবে মার্জারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রস্তুত।

বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, একীভূতকরণ সবসময় খারাপ হয় না। এর ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে হবে। বিশ্বায়নের অংশ হতে হলে মার্জারে যেতে হবে। আরেক সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারাই দায়ী তেমন নয়। এ জন্য সরকারের প্রভাবশালীদেরও দায় রয়েছে। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী বলেন, দেশে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বহির্গমন নীতিমালা (এক্সিট পলিসি) থাকা দরকার। কোনো ব্যাংক খারাপ করলে যেন তাকে এ নীতির আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম : মানবসেবায় ১১২ বছর

anjuman mufidul islam vanসজীব মিয়া : মৃতদেহের কোনো নাম পরিচয় নেই, দেহ গ্রহণ করতেও আসেনি কোনো আত্মীয়স্বজন—সেই মৃতদেহের সৎকার করতে একমাত্র ভরসা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।  বছর দুই আগে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজে প্রতিষ্ঠানটির গেন্ডারিয়া কার্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বেওয়ারিশ লাশ দাফনের চিরচেনা প্রতিষ্ঠানটি আরও যে কত রকম সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত, তার কিছুটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল গেন্ডারিয়ার অক্ষয় দাস লেনে যাওয়ার পর।

এখানেই রয়েছে ছেলেমেয়েদের জন্য দুটি এতিমখানা, নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এতিমখানায় কয়েক শ এতিম শিশু-কিশোর যেমন বেঁচে থাকার ভরসা পেয়েছে, তেমনি আঞ্জুমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেয়ে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখছে এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।

অনেকেই মনে করেন, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কোনো ব্যক্তির নামে একটি সেবা সংস্থা। আসলে তা নয়। আঞ্জুমান অর্থ সংগঠন, মুফিদুল হচ্ছে জনসেবা আর ইসলাম অর্থ শান্তি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের অর্থ দাঁড়ায়—ইসলামি জনসেবামূলক সংস্থা।

গত ২২ অক্টোবর ফকিরাপুলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের অস্থায়ী কার্যালয়ে কথা হলো নির্বাহী পরিচালক ইলিয়াস আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘জনসাধারণের দানের অর্থে পরিচালিত হয় আঞ্জুমানের সব উদ্যোগ। একটি ইসলামি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুর সে লক্ষ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটি আজও সরে যায়নি। সুবিধাবঞ্চিত মুসলিম শিশুদের মূলধারায় প্রতিষ্ঠা করাসহ অসহায় মানুষের পাশে থাকাই আঞ্জুমানের লক্ষ্য।’

১১২ বছর ধরে মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের গোড়াপত্তন হয়েছিল কলকাতায়, ১৯০৫ সালে। ইসলামি জনকল্যাণমূলক সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল পিছিয়ে পড়া মুসলিম ছেলেমেয়েদের শিক্ষা–সামাজিক–সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে নেওয়া। এসব কাজের সঙ্গে সরকারের কাছ থেকে একটি বাড়তি দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম, সেটা বেওয়ারিশ লাশ দাফনের। দিনে দিনে এই বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কাজটিই মানুষের কাছে তাদের পরিচিতি এনে দেয়।

জনকল্যাণমূলক এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি ছিলেন ভারতের গুজরাট রাজ্যের সুরাটের শেঠ ইব্রাহীম মোহাম্মদ ডুপ্লে। গত ১১২ বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সমাজের অনেক খ্যতিমান মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুর, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্ব।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় গেন্ডারিয়ায় তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হতো কলকাতার শাখা হিসেবে। ১৯৫০ সালে ঢাকা আঞ্জুমানের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। কাজ শুরু করে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ঢাকায় প্রথম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী।

স্বাধীনতার পর আঞ্জুমানের প্রধান কার্যালয় চলে আসে কাকরাইলে। রাজধানীতে গেন্ডারিয়া ও কাকরাইল বাদে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের আরেকটি কার্যালয় উত্তর মুগদাপাড়ায়। ঢাকায় এই তিনটি কার্যালয়ের মাধ্যমেই রোগী ও লাশ পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা, বেওয়ারিশ লাশ দাফনের সেবা দিয়ে থাকে আঞ্জুমান। মুগদাপাড়ার কার্যালয়টিকে বলা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সেবাকেন্দ্র। এ ছাড়া এখানে রয়েছে দাফন সেবাকেন্দ্র। লাশ বহনের জন্য ফ্রিজিং গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রতিষ্ঠানটির বাহনসংখ্যা ৪০।

বর্তমানে কাকরাইল কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। পুরোনো জায়গায় কাজ চলছে বহুতল ভবন নির্মাণের। নতুন ভবনে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবে বলে জানালেন নির্বাহী পরিচালক। রাজধানীর তিনটি কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা ও প্রধান কার্যালয় মিলে আঞ্জুমানের মোট কর্মীর সংখ্যা ১৯৬।

নীরবে, নিভৃতে বছরের পর বছর মানব কল্যাণে কাজ করে চলছে সংগঠনটি। রোগী পরিবহন, বেওয়ারিশ লাশ দাফন, এতিমদের শিক্ষা–সহায়তা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—নিষ্ঠা আর আন্তরিকতা দিয়ে করে চলেছে এসব সেবাকাজ। অথচ আত্মপ্রচার নেই, নেই আত্মশ্লাঘাও। এ এক বিরল উদাহরণ।

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে এতিমদের পাশে

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের চারটি এতিমখানা রয়েছে। এই এতিমখানাগুলোর মধ্যে একটি ছেলেদের, বাকি তিনটি মেয়েদের জন্য। গেন্ডারিয়ায় দুটি, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের পাথালিয়ায় আছে একটি করে। এই এতিমখানায় আছে প্রায় ৩০০ জন এতিম শিশু। এতিমখানার শিশুদের শিক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গেন্ডারিয়া ও মগবাজারে দুটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোপীবাগ ও মগবাজারে দুটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আদাবরে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এসব প্রতিষ্ঠানে গরিব ও দুস্থ পরিবারের সন্তানেরাও পড়াশোনার সুযোগ পায়।

ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘নিম্নমাধ্যমিক পাসের পর এতিম শিশুদের কারিগরি বিষয়ে পড়ানো হয়। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর লক্ষ্য কর্মমুখী শিক্ষায় গড়ে তোলা। এতিমখানা থেকে বেরিয়ে গিয়ে যেন এতিমরা মূলধারায় কাজের সুযোগ পায়, সে পথই তৈরি করার চেষ্টা।’ তবে কেউ যদি সাধারণ শিক্ষায় আগ্রহী হয়, তবে তা নিজের ব্যয়ভার বহন করে পড়াশোনা করতে পারে।

অসহায় মানুষের জন্য আরও উদ্যোগ

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সে কাজটি ভালোভাবেই করছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু এই মানবিক বিপর্যয়ে নয়, আঞ্জুমান মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সব সময়। দরিদ্র মানুষকে কর্মমুখী করার জন্য আঞ্জুমানের রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প। রয়েছে দুস্থ বয়স্ক ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা। দুর্যোগের সময় সরকারকে সহায়তা ও গরিব-নিঃস্ব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ ও ত্রাণ বিতরণের কাজও নিয়মিত করে প্রতিষ্ঠানটি। সঙ্গে চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসনের কাজেও তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। বছরের বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ইউনিটের মাধ্যমে করা হয় সুন্নতে খতনা ক্যাম্প। এ ছাড়া বিশ্ব ইজতেমার সময় মুসল্লিদের চিকিৎসাসেবাও দেয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।

আদর্শ ছড়িয়েছে সারা দেশে

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ব্যবস্থাপনা পরিষদের মাধ্যমে। চার বছর মেয়াদি ৬৯ জনের এই ব্যবস্থাপনা পরিষদ গঠিত হয় ৩০০ সদস্যের মধ্য থেকে। এছাড়া রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড। আধুনিক আঞ্জুমানের রূপকার মনে করা হয় এর সাবেক সভাপতি এ বি এম জি কিবরিয়াকে। বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ১৯৯৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন করেন। তাঁর অবসরের পর এখন সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব শামসুল হক চিশতী। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হয় আলাদা কমিটির মাধ্যমে। শিক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে যেমন একটি কমিটি, তেমনি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্যও রয়েছে আলাদা কমিটি। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই রাজধানীর কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হয়। আঞ্জুমানের জনসেবামূলক কাজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ৪৭টি জেলায় রয়েছে শাখা। এর মধ্যে ২৭টি জেলায় সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এই শাখাগুলো পরিচালনা হয় স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে। তবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নিয়মনীতি অনুসরণ করেই তাদের কাজ করতে হয়।

আঞ্জুমান চলে দানের টাকায়

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের আয়ের প্রধান উৎস দুটি—জাকাত ও সাদকা। এছাড়া এককালীন অনুদান হিসেবে রয়েছে ‘ট্রাস্ট ফান্ড’। যে কেউ চার লাখ টাকার বেশি দান করে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে পারেন। এ অর্থ ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসাবে রাখা হয়। যার লভ্যাংশ থেকে ২০ শতাংশ মূলধনের সঙ্গে যোগ হয় আর বাকি ৮০ শতাংশ দাতার ইচ্ছা অনুযায়ী খরচ করা হয়। বর্তমানে আঞ্জুমানের ১১১টি ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কিছু দোকান রয়েছে, সেখান থেকে ভাড়া বাবদ আয়ের টাকাও খরচ হয় নানা উদ্যোগে।

এ ছাড়া লাশ দাফনের জন্য সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম পেয়েছে ৫৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

জনহিতৈষী কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৬ সালে পেয়েছে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, ২০০৪ সালে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্মৃতি স্বর্ণপদক, ২০০৫ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নগর পদকসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। এসব পুরস্কার ও সম্মাননা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের উদ্যোক্তাদের হয়তো অনুপ্রাণিত করে। তবে মানবিক সেবার আদর্শ হয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম কাজের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বয়ে নিতে চান তাঁরা ।

ইন্টারনেটে এক মিনিটে যা ঘটে…

1 minute in internet

খুশীর কারণ হয় যখন…

বিভাগ:কৌতুক, সমাজ

‘সৌদির রাজ পরিবারকে যতটা ভদ্র মনে করা হয়, বাস্তবতা উল্টো’

al-waleed & amirah 3সৌদি আরবের রাজ পরিবারের সদস্যরা এখন নানান অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এতদিন না থাকলেও বর্তমানে সৌদি আরবের রাজ পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনেকটা প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

ব্যবসায়ী বিলিনিয়র আলওয়ালিদ বিন তালালসহ ১১ যুবরাজ, চার মন্ত্রী এবং সাবেক আরও ১০ মন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনার পরপর ইয়েমেন সীমান্তের কাছে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন এক যুবরাজ।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে বোমা ফাটিয়েছেন দুর্নীতির দায়ে সম্প্রতি আটক হওয়া সৌদি যুবরাজ আল ওয়ালিদ বিন তালালের সাবেক স্ত্রী আমিরা বিনতে আইডেন বিন নায়েফ। জানিয়েছেন, সৌদির রাজ পরিবারকে বাইরে থেকে যতটা ভদ্র ও ধর্মভীরু বলে মনে হয়, বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। এক কথায় বলতে গেলে এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করেন না।

আমিরা জানান, জেদ্দা শহরকে এরা দাস বাজারে পরিণত করেছেন। সেখানে অল্প বয়সী নারী বিক্রি থেকে শুরু করে মদ, সেক্স পার্টির মতো সব রকম ব্যভিচারই হয়ে থাকে। পুলিশ এসবের ব্যাপারে অবহিত থাকলেও শুধুমাত্র চাকরি হারানোর ভয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় না। কেননা, শহরের সব অপরাধের পেছনে সৌদি রাজ পরিবারের সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

সম্প্রতি হেলোউইন পার্টির উদাহরণ তুলে আমিরা বলেন, সেই পার্টিতে সর্বসাকুল্যে দেড়শ’ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। যাদের ভেতরে কূটনৈতিক কর্মকর্তারাও ছিলেন। সেখানে সেদিন যা হয়েছে তা বাইরের দেশের কোনো নাইট ক্লাবের থেকে আলাদা ছিল না। সৌদি আরবে মদ নিষিদ্ধ হলেও সেই পার্টিতে তরল পদার্থটির বন্যা বয়ে গিয়েছিল। সেই ডিজে পার্টিতে ওয়াইন, জুটিদের নাচ, নানান ধরনের পোশাক পরা সবই হয়েছিল।

সৌদি আরবে দাসপ্রথা এখনও রয়েছে জানিয়ে আমিরা বলেন, রাজপরিবারের কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি সেখানে দাস বিক্রি করে থাকেন। আর এসব দাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আনা হয় শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়া থেকে। যেসব শিশুকে এখানে বিক্রি করা হয় তারা কখনই মালিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোথাও যেতে পারে না। এমনকি এশিয়ার দাসীরা প্রায় ক্ষেত্রেই নিজেদের বন্দি বলেই মনে করেন। তাদের উপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়।

উল্লেখ্য, আমিরা তালালের সাবেক স্ত্রী- যুবরাজের কর্মকাণ্ডের কারণে আগেই সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন।