জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-সূফির অবদান

al-sufiকাজী আখতারউদ্দিন : রাতের আকাশে আমরা অসংখ্য তারা মিটমিট করতে দেখি— কিছু কিছু তারার নামও আমরা জানি। যেমন— অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিনী, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা থেকে শুরু করে রেবতী পর্যন্ত মোট ২৭টি নাম বাংলায় পাওয়া যায়। কিন্তু আকাশে অসংখ্য তারার মধ্যে কেবল ১০,০০০ তারা খালি চোখে দেখা যায়। আবার এর মধ্যেও কেবল কয়েকশত তারার নামকরণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকেল ইউনিয়ন মোট ৩১৩টি তারার নাম লিপিবদ্ধ করেছে, যার অধিকাংশই আরবি নামের। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের সোনালী যুগে এসব তারার নামকরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে ১০ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-সূফির। আমরা ১৬৫টি তারার আরবি নাম পেয়েছি।

শত শত বছর ধরে নাবিক, ভূপর্যটক ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে তারার আরবি নাম ব্যবহারটি আরব-ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। নয় শতক থেকে পনরো শতক পর্যন্ত যে-সকল বিজ্ঞানী ইসলামিক স্পেন থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্য হয়ে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আরবি ভাষায় কাজ করতেন, তারা বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের উপাদান যোগান দিয়েছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল এর মধ্যে অন্যতম একটি ক্ষেত্র।

বর্তমানে তারার যে আরবি ও আধুনিক নামগুলো পাশ্চাত্যজগতে ব্যবহূত হয়, তা মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-সূফি প্রবর্তিত তালিকা থেকে এসেছে। মধ্যযুগের ইউরোপে তিনি আজোলফি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হোসাইন আবদাল-রহমান ইবনে ওমর আল-সূফি। তাঁর যুগের অন্যতম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বর্তমানে স্বীকৃত। আল-সূফির জন্ম ইরানের রে নগরীতে ৭ ডিসেম্বর, ৯০৩ সালে, মৃত্যু ২৫ মে, ৯৮৬ শিরাজে। তাঁর নামে চন্দ্রপৃষ্ঠে আজোফি নামে একটি জ্বালামুখ এবং ১২৬২১ আল সূফি নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রহের নামকরণ করা হয়। তিনি আরবি ভাষায় লেখাপড়া করেন। বুয়াহিদ শাসকের আনুকূল্যে তিনি তাঁর নিজ দেশ এবং রাজ্যের রাজধানী বাগদাদে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর মন্ত্রক ছিলেন বুয়াহিদ রাজ্যের উজির ইবন আল—আমিদ।

আল-সূফি বিখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির তারার নামের তালিকার একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে তিনি বিভিন্ন ভুল পর্যবেক্ষণ সংশোধন করেন এবং গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমি যেসব তারার নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি সেগুলো তাঁর তালিকায় যুক্ত করেন। আল-সূফি কিতাব সুওয়ার আল-কাওয়াকিব আল-থাবিতা বা দি বুক অফ কন্সটিলেশনস অফ দি ফিক্স্ড স্টার নামে (star cartography) কার্টোগ্রাফি— নক্ষত্র মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যার একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এটি ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়। গ্রন্থটিতে টলেমির ৪৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের সমস্ত কিছু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এর সঙ্গে আছে নিজের আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ।  বিভিন্ন কারণে আল-সূফির পুস্তকটি সাড়া জাগিয়ে তোলে।

আল-সূফির গ্রন্থটি স্পেনের মাধ্যমেই প্রথমে পাশ্চাত্যে পরিচিত হয়। তখন স্পেনে খ্রিষ্টান ও মুসলিম রাজ্যগুলোর পাশাপাশিসহ অবস্থান ছিল। ক্ষমতা কিংবা এলাকা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তখন কোন ধরনের ঠেলাঠেলি ছিল না বরং তারা একে অপরকে সহযোগিতা করতেন। ক্যাস্টিলের খ্রিষ্টান রাজা আলফোন্সো ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন মনোযোগী ছাত্র। তিনি আল-সূফির রচনাটি প্রাচীন স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন, যা লিব্রস দে লান এস্ট্রেলামস দে লা ওছুয়া এসপেরা (১২৫২-১২৫৬) নামে প্রকাশিত হয়। মুুসলিম বিশ্বেও আল-সূফির পুস্তকটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।  ৯৬৪ সালে আল-সূফি আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলী বা ছায়াপথ আন্দ্রোমেদা গ্যালেক্সি চিহ্নিত করেন। এছাড়া তিনি আ্যাাস্ট্রেলেব সম্পর্কে রচনা প্রকাশ করেন এবং এর বিভিন্ন ব্যবহারের কথা জানান— জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, হস্তরেখা, নৌপরিচালনাবিদ্যা, সার্ভে, সময়নিরূপণ, কিবলা এবং সালাত ইত্যাদি।

আল-সূফি চিরদিনের জন্য আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের রীতি পরিবর্তিত করেন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে তিনি তারা এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে উপলব্ধি করার সাধনায় নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন।  হাজার বছর পরও আল-সূফির পর্যবেক্ষণ এবং বিশদ কর্ম এখনো রাতের আকাশ দেখার বিষয়ে আমাদের সহায়তা করে।

এখানে কিছু তারার আরবি নাম দেওয়া হলো: আলজেবার, কিতালফা, আখিরআলনাহর, আল-আক্রাব, আকুবিনবাআল-জুবানা, আল-দাফিরাহ, আল-উজফুর. আল-আনাকআল আর্দ, আলবালদাহ, আলবালি, আলছিবা, আলকর, আলদিবারান, আলদিরামিন, আলিয়াথ, আলহানাহ, আলকালব আলরাই, আল কামর, আইন, আদিব, আলরুবা, আলআওয়াদ, আতিক, আসুজা, বাহাম, বাতনি কাইতুস, বাইদ, বানাত উন— নাআস, আলবোতাইন, কুরসিয়া আল-জাওযা, দানাবাউল-জাদি প্রভৃতি।  

(সূত্র: প্রকৌশলী ও ইসলামী লেখক ড. এ জহুর, জর্জ রবার্ট কেপল (১৯৯৮)— দি নাইট স্কাই অবজার্ভারস গাইড, ভলিউম ১, বুলেটিন অফ দি আই এই উ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্টার নেইমস নং ১। ২৮ জুলাই ২০১৬।)

Advertisements

ক্যান্সারাক্রান্ত আলী বানাতের সর্বস্ব দান

ali banat

কার্টুন-রসঃ ঈদে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব !

FIFA affect on eid 1a

FIFA affect on eid 1b

FIFA affect on eid 1c

মঙ্গলে যাবে নাসার হেলিকপ্টার

mars helicopterমঙ্গল গ্রহে ছোট একটি হেলিকপ্টার পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নাসা। ২০২০ সালে লাল গ্রহটিতে পরবর্তী প্রজন্মের একটি রোভার বসানোর মিশনের একটি অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারটি পাঠাবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি। হেলিকপ্টারটির পাঠানোর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো অন্য গ্রহে এ ধরণের উডুক্কুযান ব্যবহার করবে নাসা, বলা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।

মঙ্গলের পাতলা বায়ুমন্ডলে উড়তে পারবে এমনভাবেই নকশা করা হয়েছে রিমোট নিয়ন্ত্রিত হেলিকপ্টারটি। প্রায় চার পাউন্ড ওজনের কপ্টারটিতে টুইন কাউন্টার-রোটেটিং ব্লেড রয়েছে। হেলিকপ্টারটির বডি একটি টেনিসবলের আকারের সমান। নাসা জানিয়েছে, হেলিকপ্টারটির ব্লেড মিনিটে প্রায় তিন হাজার বার ঘুরবে যা পৃথিবীতে ওড়ানো হেলিকপ্টারের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
নাসা’র জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে মার্স হেলিকপ্টারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মিমি আং এক বিবৃতিতে বলেন, পৃথিবীতে যে কপ্টারগুলো ওড়ানো হয় তার সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪০ হাজার ফুট। পৃথিবীর মায়ুমন্ডলের তুলনায় মঙ্গলের বায়ুমন্ডল এক শতাংশ। তাই আমাদের হেলিকপ্টার যখন মঙ্গলের বায়ুমন্ডলে যাবে এটি ইতোমধ্যেই পৃথিবীর তুলনায় এক লাখ ফুট উচ্চতায় ওড়ার অবস্থায় থাকবে।

নাসার এক কর্মকর্তা বলেন, একটি গাড়ির আকারে রোভারের সঙ্গে জুড়ে রোটরক্রাফটটি লাল গ্রহটির ভূমিতে নেওয়া হবে।
ভূমিতে হেলিকপ্টারটি রেখে কমান্ড দেওয়ার জন্য রোভারটিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হবে। হেলিকপ্টারের ব্যাটারি চার্জ হলে এটির প্রথম স্বয়ংক্রিয় উড্ডয়নের কমান্ড দেবেন পৃথিবীতে থাকা নিয়ন্ত্রণকারীরা।

এক বিবৃতিতে নাসা প্রশাসক জিম ব্রাইডেনস্টাইন বলেন, অন্য গ্রহে হেলিকপ্টার ওড়ানোর ধারণাটি রোমাঞ্চকর। মঙ্গল গ্রহে এ ধরনের উডুক্কুযান কতোটা টেকসই এবং কার্যকর সেটিই হেলিকপ্টারটি দেখাবে বলে জানিয়েছে নাসা।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি আরও জানায় হেলিকপ্টারটির উড্ডয়ন পরীক্ষার জন্য ৩০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পাঁচবারের মতো আকাশে উড়বে হেলিকপ্টারটি।

প্রথম পর্যায়ে খাড়াভাবে উপরে উঠে ১০ ফুট উচ্চতায় প্রায় ৩০ সেকেন্ড ভেসে বেড়াবে হেলিকপ্টারটি। ধীরে ধীরে উড্ডয়নের সময় ৯০ সেকেন্ডে নিয়ে একশ’ গজ পাড়ি দেওয়ানো হবে। হেলিকপ্টারটির লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ দিতে এতে সৌর কোষ রাখা হয়েছে। হিমশীতল রাতে হেলিকপ্টারটি গরম রাখতে এতে একটি উষ্ণতা ব্যবস্থাও রয়েছে।

ফ্লোরিডার কেপ কেনাভেরাল এয়ার ফোর্স স্টেশন থেকে ২০২০ সালেই জুলাই মাসে রোভার মিশন শুরু করার কথা রয়েছে নাসার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মঙ্গলে পৌঁছাবে রোভারটি। গ্রহটিতে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা এবং বাসস্থান শণাক্তকরণের লক্ষ্যেই নকশা করা হয়েছে রোভারটি।

বিভাগ:প্রযুক্তি

ইসলাম নারী মুক্তির একমাত্র সমাধান

তাহনিয়া ত্বরিক : মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারীকে প্রকৃতির অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। নারী কেবলমাত্র একটি সত্তার নাম নয় বরং সে একটি চালিকা শক্তি যাকে ছাড়া পৃথিবী স্তব্ধ-স্থবির। সভ্যতা বিনির্মাণে যুগে যুগে পুরুষের পাশাপাশি নারীও অবদান রেখে এসেছে সমানাংশে। প্রত্যেক যুগেই নারী তার মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা, শ্রম এবং মমতার সংমিশ্রণে গড়ে তুলেছে ভবিষ্যতের বুনিয়াদ। জন্ম দিয়েছে নতুন ইতিহাসের। জাতি গঠনের ক্ষেত্রেও নারীর অবদান এককভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বিনিময়ে কেবলই অবিচার জুটেছে অবলা নারীর ভাগ্যে। প্রাপ্তির খাতায় বেড়েছে শুধুই শূন্যতা। তার চারিধার ঘিরে গড়ে উঠা সমস্যার আকড়, মাকড়সার জালের মত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা, ঝড়-ঝঞ্ঝা মুহূর্মুহু স্থবির করে দিচ্ছে নারীর চলমান গতিকে। পর্যদস্তু করছে নারীর স্থিতিশীল অবস্থানকে। অবস্থার উন্নয়নে, ভাগ্য পরিবর্তনে, সময়ের সাথে সাথে প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন নীতিমালা, হাতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন আইন। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি নারীর অবস্থার। তাই একবিংশ শতাব্দীর আলো ঝলমলে পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও নারী আজ বড় অসহায়। বড় বিপর্যস্ত। আজ আধুনিক বিশ্বের নারী সমাজকে প্রতিটি পদক্ষেপে নানান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বে নারী সমস্যার ভয়াবহ চিত্র

– ইংল্যান্ডে প্রতি ৪ জনে তিন জন মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বেশির ভাগ নির্যাতনকারী হয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা সহকর্মী।
– ভারতের নারী ভ্রুণ হত্যা এবং নারী সন্তান হত্যার জন্য, বিগত শতকে ৫০ মিলিয়ন নারী নিখোঁজ রয়েছে। ২০০০ সালে পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে ১০০০ নারীকে খুন বা Honour Killing করা হয়েছে।
– বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে কমপক্ষে ১২.৫ লাখ অবিবাহিত কিশোরী গর্ভ ধারণ করে।
– সুসভ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি হাজারে ৩০৭ জন নারী সহকর্মীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। সেখানে প্রতি মিনিটে একজন নারী হারায় তার সম্ভ্রম।
– ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮ জন নারী লাঞ্ছনার শিকার হয় এবং ১৪ জন নির্যাতিত হয়।
– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের শতকরা ৫০ জন বিয়ের আগে সতীত্ব নষ্ট  করে এবং ১০ জনে ৫ জনের বিবাহ তালাকে পর্যবসিত হয়।
– সৌন্দর্যের লীলাভূমি ফ্রান্সে ২৪০ টিরও বেশী সেক্সক্লাব রয়েছে।
– নারী দিবসের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়কারী চীনও কন্যা সন্তান রফতানী করে আয় করে ১৫০ কোটি ডলার।
– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০-১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোর আত্মহত্যার চিত্র শতকরা ৭৬ ভাগ।
– অস্ট্রিয়ায় কর্মস্থলে শতকরা ৮০ জনের মত মহিলা জীবনে একবার কিংবা একাধিকবার বিভিন্ন মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– জার্মানীতে কর্মস্থলে শতকরা ৭২ জনের মত মহিলা জীবনে একবার কিংবা একাধিকবার বিভিন্ন মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– লুক্সেমবার্গে জীবনে অন্তত একবার ৭৮% মেয়ের যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– হল্যান্ডেও একই অবস্থা উপরন্তু ৩৬% মেয়েরা রীতিমত ভায়োলেন্সের শিকার হন।
– সম্প্রতি চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার ভারতকন্যা নামধারী জ্যোতি সিং পান্ডে বিশ্বের নির্যাতিত নারীদের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি (সূত্র : ইন্টারনেট)

আমার বাংলাদেশে নারীর অবস্থা : নারী কেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যার বিষবাষ্পে জর্জরিত আমাদের প্রিয় এ জন্মভূমির চারপাশ। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চব্বিশ বছরে এ দেশে পতিতালয় বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার। ২০১২ সালের জানুয়ারী থেকে নভেম্বর মাসে নারী নির্যাতনের কয়েকটি চিত্র নিম্নরূপ, যদিও বাস্তব অবস্থা আরো অনেক বেশি ভয়াবহ :

–    শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার    – ৪৮৫ জন
–    শারীরিকভাবে গণলাঞ্ছনার শিকার – ১৫৬ জন
–    লাঞ্ছনার পর হত্যা     – ১৯০ জন
–    শ্লীলতাহানি     – ১৯০ জন
–    এসিডদগ্ধ     –   ৬১ জন
–    নারী অপহরণ     – ১১৫ জন
–    যৌন নির্যাতন     –  ৩৮ জন
–    গৃহপরিচারিকা হত্যা     –  ১৬ জন
–    নারী ও শিশু পাচার     –  ১৮ জন
–    পতিতালয়ে বিক্রি     –  ১৩ জন
–    উত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা     –  ১৫ জন
–    যৌতুকের কারণে হত্যা     –   ২৮২ জন
–    শারীরিক নির্যাতন     –  ৩৭৮ জন
–    নারী হত্যা     –  ৮৩৫ জন
–    উত্যক্ত     –    ৪৩ জন
–    বাল্যবিবাহ     –    ৮৪ জন

১. শারীরিক সমস্যা

ক. মানসিক নির্যাতন : পরিবার ও পরিবারের বাইরে একজন নারীকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রতিনিয়তই। কোথাও একজন মা, একজন স্ত্রী, ছেলের বউ, কখনো শাশুড়ী, কখনো বোন, কখনো কন্যা হিসেবে এই মানসিক নির্যাতনের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর। এই নির্যাতন যেমন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা হচ্ছে তেমনি নারী কর্তৃকও হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা মুখবুঁজে সহ্য করে পড়ে থাকলেও উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর নারীদের আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে ও বস্তিতে। নিম্নবিত্তরা বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি। কখনো নারী পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে নিরুদ্দেশে পাড়ি দেয় অজানা পথে।

খ. শারীরিক নির্যাতন : মানসিক নির্যাতনের মধ্যেই থেমে নেই নারীদের সমস্যাগুলো বরং উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তিনশ্রেণীর পরিবারগুলোতেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শারীরিক নির্যাতনের ফলাফল কখনো পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঠেকে। সাম্প্রতিককালে ডা: শামারুখ, অভিনেত্রী লোপা ও প্রকৌশলী ইয়াসমিন হত্যার ঘটনা তার নির্মম চিত্র।
গ. পারিবারিক বৈষম্যনীতি : পারিবারিক পরিবেশে নারীকে যেমন চরম লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হতে হয় তেমনি সাদা-কালোর পার্থক্যের কারণেও তাকে অপমান, লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হয়। নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা অধিকাংশ পরিবারগুলোতেই অনুপস্থিত।
ঘ. যৌতুক : যৌতুক সমাজের একটি সংক্রামক ব্যাধি। শিক্ষার হার দ্রুতগতিতে বাড়লেও আধুনিক শিক্ষিত সমাজেই কনেপক্ষের কাছে বরপক্ষ যৌতুক বাবদ আসবাবপত্র, জিনিসপত্র, শাড়ি, স্বর্ণালংকার ও মোটা অংকের টাকা দাবি করে থাকে। বর্তমান সময়ে মেয়ের সুখের জন্য একে গিফট’ নাম দিয়ে বরপক্ষ থেকে কনের বাবার কাছে এ অন্যায় আবদারের প্রচলন শুরু হয়েছে। যাদের সামর্থ্য ন্যূনতম আছে নিজ সন্তানের ভবিষ্যত কল্যাণের কথা ভেবে ধারদেনা করে হলেও যৌতুকের দাবি মিটিয়ে থাকেন। কিন্তু বরপক্ষের প্রত্যাশা আরো বেড়ে যায়। ফলে লাগামহীন এ চাহিদা মিটাতে না পারলে কনের উপর নেমে আসে অত্যাচার, নির্যাতনের স্টিমরোলার। অনেকক্ষেত্রেই তাদেরকে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করতে হয়। দেশীয় আইনে ১৯৮০ ও ২০০০ সালে এ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন পাশ হলেও মিলছেনা প্রতিকার। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের (১১-গ) ধারানুযায়ী যৌতুকের দাবীদারকে অপরাধী গণ্য করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(খ) ধারানুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-, সর্বনিম্ন ৫ বছর এবং একই সঙ্গে অর্থদ-ে দ-িত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)

ঙ. তালাক : তালাক নারী নির্যাতনের রেকর্ডে যোগ করেছে আরেকটি নির্মমতা। প্রতিবছর কয়েক হাজার নারী তালাকপ্রাপ্তা হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কখনো কখনো উপায়হীন হয়ে পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। তালাকের পিছনে অনেক বড় কারণ খুব কমই দেখা যায়। সামান্য কারণেই অনেক সময় তালাকের ঘটনা ঘটে। কথা কাটাকাটি থেকে রাগের বশে তালাক দেয়ার ঘটনা খুব স্বাভাবিক চিত্র।

চ. অনার কিলিং : পরিবার বা বংশের সম্মানহানির দায়ে পরিবারের কোন সদস্যকে হত্যা করাই অনার কিলিং নামে পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই অনার কিলিং প্রচলিত। পাকিস্তান, জর্ডান, লেবানন, মরক্কো, সিরিয়ান রিপাবলিক, এমনকি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানের মতো উন্নত দেশগুলোতেও অনার কিলিং এর খবর পাওয়া যায়। নারীরাই প্রধাণত এই অনার কিলিং এর শিকার।

যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রতি বছর অনার কিলিং এর নামে প্রায় ৫০০০ জনকে হত্যা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার নারীবাদী সংগঠনের এক হিসেব মতে প্রতি বছর ২০,০০০ এর উপর মেয়েকে অনার কিলিং এর নামে হত্যা করা হয়।

অনার কিলিং-এর প্রবণতা গোড়া হিন্দু সমাজে সব থেকে বেশি। সতীদাহ প্রথা ছিল অনার কিলিং এর নিষ্ঠুর চিত্র। ব্রিটিশ আগমনের পর এ অনার কিলিং ভারতে বন্ধ হলেও একবিংশ শতাব্দীতেও ঘটছে এ ধরণের ঘটনা। উত্তর ভারতের ভাগলপুর অনার কিলিং-এর জন্য কুখ্যাত। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

ছ. নারীর অবমূল্যায়ন : পারিবারিক ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই নারীর অবদান, পরিশ্রম, কষ্টকে খাটো করে দেখা হয়। অনেক সময় চাকুরিজীবী মহিলার বেতনের টাকাটাও স্বামী জোর করে নিয়ে নেয়। ন্যূনতম খরচের স্বাধীনতাও তার থাকেনা। এভাবে নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয় পদে পদে।

জ. পরকীয়া : পারিবারিক গ-িতে পর্দাহীনতা, অবাধ মেলামেশা ও মিডিয়ার প্রভাবের কারণে দিন দিন পরকীয়ার হার বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে পরিবারে সৃষ্টি হচ্ছে ভাঙনের এবং বৈধ স্ত্রীরা হচ্ছেন নির্যাতিত।

২. সামাজিক সমস্যা

ক. ইভটিজিং : পথেঘাটে প্রকাশ্যে নারীকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, শিস ও অপমানজনক কথার মাধ্যমে বিরক্ত ও বিব্রত করার নাম ইভটিজিং। বিভিন্ন বয়সের পুরুষের দ্বারা ইভটিজিংএর শিকার নারীরা মানসিক পীড়ন থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এমনকি জীবনের ইতিও ঘটাতে বাধ্য হচ্ছে।

খ. যৌন নির্যাতন : কন্যাশিশু থেকে বৃদ্ধা বয়সী নারীরা পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাস, ট্রেন, গৃহ কোন স্থানই নিরাপদ আর নেই। ভারতে চলন্ত বাসে মেডিকেল ছাত্রীকে পাশবিক নির্যাতন একই সময়ে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে গার্মেন্টস কর্মীকে মাস রেইপের ঘটনায় নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়।

গ. এসিড সন্ত্রাস : পুরুষ তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে না পেরে অধিকাংশ সময়ই নারীদের এসিড নিক্ষেপ করে। এতে অসংখ্য নারীর দৈহিক বিকৃতির মাধ্যমে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে বাধ্য হয়, আবার অনেক সময় ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

ঘ. খুন : দ্বন্দ¡-কলহ, পরকীয়া, লোভ, অ্যাফেয়ার ইত্যাদি নানা কারণে নারীর খুন হওয়ার ঘটনা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঙ. সামাজিক বৈষম্য : আধুনিক সমাজে যদিও নারীকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে তথাপি সুযোগ সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে নারী বৈষম্যের শিকার।

চ. পৃথক শিক্ষাঙ্গন  ও কর্মক্ষেত্রের অভাব : সমাজের নিত্যকার বাস্তবতায় নারীর জন্য পৃথক শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রের দাবী অনিবার্য। কিন্তু এ দুটির অভাব নারীকে নির্যাতন ও বৈষম্যের খোরাক হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফলে ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, শ্লীলতাহানি, রেপ, পারিবারিক অশান্তি, পরকীয়া, তালাক, মান-সম্মানের ভয়ে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এ অবস্থার উত্তরণে সম্প্রতি ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আটসাট পোশাক পরিধানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। বৃটেনের কয়েকটি কোম্পানীর অফিসে মিনি স্কার্ট পরিধানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫% স্কুল ছাত্রী সহশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্তি চায়- যারা তাদের সহপাঠীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার।

৩. অর্থনৈতিক সমস্যা

ক. সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত : অধিকাংশ পরিবারগুলোতে নারীর কোন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। স্বামীরা তাদের আয় থেকে নারীদের প্রয়োজন পূরণের জন্য দেন না। ফলে নারী চাকুরিক্ষেত্রে যেতে বাধ্য হয়।

খ. উপার্জনের ক্ষেত্রে বৈষম্য : চাকুরিক্ষেত্রেও নারী বৈষম্যের শিকার হয় চরমভাবে। একই পোস্ট ও পজিশনে থাকলেও পুরুষের তুলনায় নারীর বেতন কম, সম্মানও পুরুষের ভাগেই বেশি থাকে।

গ. উত্তরাধিকার বঞ্চিত : পিতার সম্পত্তি থেকে ছেলে মেয়ে উভয়ই অংশীদার। কিন্তু ছেলে তার অংশ ষোলআনা পেলেও নারীকে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে নারী তার ন্যায্য অধিকার চাইলে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয় এবং তাকে ছোটলোক, স্বার্থপর ও লোভী আখ্যা দেয়া হয়। এ যেন পাওনাদারকেই চোর উপাধি দেয়া।

নারীর সমস্যার কারণসমূহ

উপরোক্ত সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে এর পেছনের কারণগুলো পাওয়া যায় নিম্নরূপঃ

– ইসলামের সুমহান বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
– মহান আল্লাহ প্রদত্ত নারীর মর্যাদা ও অধিকারের ব্যাপারে অসচেতনতা।
– আল্লাহভীতির অভাব সমাজের ব্যক্তিদের নারীজাতির প্রতি দায়িত্বহীন করে তুলেছে।
– সমাজে নারীর সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থতা।
– মূল্যবোধের অবনতি ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
– সহশিক্ষা ও নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা কাঠামো
– নারীবান্ধব সুস্থ সমাজ গঠনে উদ্যোক্তার অভাব।
– অশ্লীল লেখনী, সিনেমা, পর্ণোগ্রাফির সহজলভ্যতা।
– তথাকথিত নারী স্বাধীনতা ও অযৌক্তিক সমানাধিকার দাবীর মাধ্যমে নারীর কাঁধে দ্বিগুণ থেকে ৪গুণ বোঝা চাপিয়ে দেয়া।
– নিজের সম্মান মর্যাদার প্রতি নারীর উদাসীনতা।

সমস্যার প্রেক্ষিতে ইসলামই একমাত্র সমাধান : আজ থেকে ১৪শত বছর আগে জীবন্ত প্রোত্থিত কন্যাশিশুকে বাঁচাতে আরবের বুকে উদিত হয়েছিল যে আলোকরশ্মির তা আজও আমাদের মাঝে বর্তমান। মহামুক্তির সনদ আল কুরআনের পূর্ণ অনুসরণই নারীকে যাবতীয় সমস্যার আবর্ত থেকে বের করে দেখাতে পারে মুক্তির রাজপথ, এনে দিতে পারে কাক্সিক্ষত শান্তি, কল্যাণ ও মর্যাদা এবং অধিকার। এ লক্ষ্যে ইসলামের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ:

১. গৃহের পরিবেশে নারীর করণীয় : মহান আল্লাহ তায়ালা নারীকে গৃহের শোভা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। নারীদের আসল কর্মক্ষেত্র হল গৃহ। সাধারণত তারা ঘরের মধ্যেই অবস্থান করবে। ঘরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব তাদের। স্বামীর অবর্তমানে তার ঘর-সংসারের প্রতি যত্নবান হয়ে এবং সজাগ দৃষ্টি রাখবে, সন্তান-সন্তুতিদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত করে গড়ে তুলবে। নারীর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এখানে যে সে তার সন্তানদের আল্লাহর দ্বীনের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলবে। তাই তাকে এমন চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে যে, সন্তান তার কোলে দৃষ্টি মেলেই যেন পূর্ণ ইসলামী পরিবেশ দেখতে পায়। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তোমাদের মধ্য থেকে যে বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করবে সে মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করবে।”
অন্য একটি হাদীসে এসেছে- “যে নারী তার স্বামীর সংসারের প্রতি যত্নবান, সন্তানদের আল্লাহভীরু হিসেবে গড়ে তোলে এবং নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে নারী আল্লাহর জান্নাতের যে দরজা দিয়ে খুশি  প্রবেশ করবে।”

ঈমানদার পুরুষগণ তো আমিই দৃঢ়পদে ও স্থিরচিত্তে আল্লাহর পথে সময় দিতে পারবে এবং ঘর-সংসারের দিক থেকে পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। যে নারী তার স্বামীকে এই নিশ্চয়তা দিবে সে নারী সেই সম্মান মর্যাদাই অর্জন করবে, যে মর্যাদা তার স্বামী আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে অর্জন করবে। তবে পারিবারিক জীবনে নারীকে যেন সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে সেজন্য ইসলাম নিম্নোক্ত বিধান দিয়েছে- ঘরই মূল কর্মক্ষেত্র হলেও প্রয়োজনের আলোকে ঘরের বাহিরে যাবে। এক্ষেত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা।

“আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করোনা। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (সূরা আল আহযাব : ৩৩)

মাহরাম পুরুষ ব্যতীত অন্যদের সাথে পর্দা রক্ষা করে চলা। প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা ও এক্ষেত্রে মিহি সুরে কথা না বলা, দৃষ্টিশক্তির হেফাজত করা ও চোখ অবনমিত রাখা, সৌন্দর্য প্রকাশ না করা।

“আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুড়, নিজেদের ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, মালিকানাধীন দাস-দাসী, অধীনস্থ যৌন কামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সূরা আন নূর : ৩১)

নারীর ঘরে অন্যরা অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে- “হে মুমিনগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি তারা যেন অবশ্যই তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের সালাতের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখ এবং ইশার সালাতের পর; এই তিনটি তোমাদের (গোপনীয়তার) সময়। তাই তিন সময়ের পর (অন্য কোন সময়ে বিনা অনুমতিতে আসলে তোমাদের এবং তাদের কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অন্যের কাছে যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের উদ্দেশ্যে তার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রাজ্ঞময়। আর তোমাদের যেমনভাবে তাদের অগ্রজের অনুমতি প্রার্থনা করত। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াত সমূহ বর্ণনা করেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রাজ্ঞময়।” (সূরা আন নূর : ৩১)

২. বহিরাঙ্গনে নারীর অবস্থান ও সীমা : নারীর মূল অংগন তার ঘর হলেও তারা ইসলামের বিপরীত মতামত, আদর্শ ও বিধি বিধানের অসারতা প্রমাণ করে সাহিত্য রচনা করে, পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করবে। পর্দার বিধানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে লিখবে। ইসলামী বিধি-বিধান পালনে অন্যান্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করবে, তাদের ইসলাম অনুশীলনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটাবে, দেশ ও জাতির জন্য স্বীয় মেধা ও শ্রম দিয়ে জাতীয় উন্নতিতে অবদান রাখবে, রাষ্ট্রীয় পরিষদের স্বতন্ত্রভাবে একমাত্র নারীদের দ্বারা নির্বাচিত নারী প্রতিষ্ঠান থাকবে এবং তারা নারীদের স্বার্থ ও ন্যায়সঙ্গত দাবীসমূহ পরিষদের সম্মুখে পেশ করবে। যাবতীয় নারী প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মুসাফিরখানা প্রভৃতি নারীর তত্ত্বাবধানে চলবে। পুরুষদের ক্ষেত্রে পুরুষের তত্ত্বাবধানে চলবে। সামরিক শিক্ষা, সামরিক কার্যকলাপে প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কঠিন দায়িত্ব ইসলাম নারীকে দেয়নি। এসব কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে। কারণ নারীর প্রকৃতিগত কোমলতা ও মায়ের অসীম মমতা। নারীর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার অর্থই হলো আদর্শ সুনাগরিক তৈরির কারখানা থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসা এবং তার নারী প্রকৃতিকে হত্যা করা। তবে যখন তার জীবন, সতীত্ব ও সম্ভ্রম হারানোর আশংকা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি দিয়েছে। সেই সাথে প্রাথমিক চিকিৎসা, নার্সিং বিষয়ে জ্ঞানার্জন ও যুদ্ধাহতদের সেবা করার অনুমতি দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিমালা মেনে চলতে হবে-

– দৃষ্টিশক্তির হেফাজত করবে।
– নিজের সৌন্দর্যকে সুরক্ষিত রাখবে পর্দার আড়ালে।
– পর্দায় আবৃত হলেও নারী এবং পুরুষ একাকী মিলিত হবে না। একাকী দীর্ঘ সফর করবে না।
– মাহরাম পুরুষকে সঙ্গে রাখবে। বর্তমান সময়ের আলোকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ইসলামের এই নীতিমালায় অভ্যস্থ না হওয়ায় এটা মেনে চলা দূরূহ ব্যাপার। যথাসম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। অন্ততঃ রাতে সফর করবে না, সাথে অন্য কোন নারী আত্মীয় হলেও সাথে নিবে, যদি একাকী সফর করতে বাধ্য হয়।

“আর মুমিনদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা আন নূর : ৩১)

“আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।” (সূরা আল আহযাব : ৩২)

“আর যখন নবীপত্নীদের কাছে কোন সামগ্রী চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে; এটি তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র।”

৩. পুরুষের সংযত আচরণ : নারীর চলাফেরায় ইসলাম যেমন নীতিমালা বেঁধে দিয়েছে তেমন পুরুষকেও দিয়েছে দৃষ্টিশক্তির হেফাজত, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা পুরুষের উপর বাধ্যতামূলক নীতি।

“মুমিন পুরুষদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটি তাদের জন্য বিশুদ্ধ নীতি। তারা যা কিছু করে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আন নূর : ৩০)

আপন স্ত্রী কিংবা কোন মাহরাম মহিলাকে ছাড়া অপর কোন মহিলাকে নজরভরে দেখা কোন পুরুষের জন্য জায়েয নয়। একবার নজর পড়া ক্ষমাযোগ্য। আবার নজর দেয়া ক্ষমাযোগ্য নয়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরণের দেখাকে চোখের যিনা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

“মানুষ তার ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে যিনা করে থাকে। দেখা হচ্ছে চোখের যিনা। ফুসলানো কণ্ঠের যিনা। তৃপ্তির সাথে পর নারীর কথা শুনা কানের যিনা। হাত দ্বারা স্পর্শ করা হাতের যিনা। অবৈধ উদ্দেশ্যে পথ চলা পায়ের যিনা। যিনার এইসব অনুসঙ্গ পালিত হওয়ার পর লজ্জাস্থান তাকে পূর্ণতা দান করে কিংবা পূর্ণতা দান করা থেকে বিরত থাকে।” (সহীহ মুসলিম, সহীহ আল বুখারী, সুনানু আবী দাউদ)

৪. মহিলাদের সংযত আচরণ : মহান আল্লাহ বলেন- “মুমিন মহিলাদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজাত করে।”

মহিলারা এমনভাবে পা মেরে চলবে না যাতে তাদের লুকানো সাজ-সৌন্দর্যের লোকেরা জেনে ফেলে। মহান আল্লাহ বলেন- “এবং তারা যেন তাদের পা এমনভাবে না মেরে চলে যাতে তাদের লুকানো সাজ-সৌন্দর্যের কথা লোকেরা জেনে ফেলে। আর মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তওবা কর। আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে।” (সূরা আন নূর : ৩১)

মহিলারা প্রয়োজনে ভিন্ন পুরুষের সাথে কথা বলতে পারেন, কিন্তু মিহি স্বরে বলবে না।

মহান আল্লাহ বলেন- “ওহে নবীর স্ত্রীরা, তোমরা তো অন্য কোন মহিলার মতো নও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না যা অন্তরে ব্যাধি আছে এমন লোককে প্রলুব্ধ করবে, বরং সোজা-স্পষ্ট কথা বল।” (সূরা আল আহযাব : ৩২)

ঘরে বাইরে উপরোক্ত নীতিমালার অনুসরণ নারীর পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে দিতে সক্ষম।

৫. নারী পুরুষের মর্যাদার যথাযথ মূল্যায়ন : ইসলামে নারী এবং পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা পুরুষ হও বা নারী, আমি তোমাদের কারো কাজ বিনষ্ট করবোনা। এটা নারীর প্রকতিগত অবস্থানকে সামনে রেখে ইসলাম তার দায়-দায়ীত্বের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এটা নারীর অবমূল্যায়ন বা পরাধীনতা নয় এটা তার মর্যাদা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই সেদিনও নারী যাদের দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবেই পরিগণিত ছিলনা, তারাই আজ নারী স্বাধীনতা, নারীর সমানাধিকারের শ্লোগান দিয়ে বলে যে, ‘ইসলাম নারীকে বঞ্চিত করেছে।’ প্রকৃতপক্ষে এই অযৌক্তিক সমানাধিকার ও স্বাধীনতা নারীকে পুরুষের মহলে সহজলভ্য করার এক কার্যকরী উপায় মাত্র। ধিক! তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রতি!!

৬. পুরুষকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মূল্যায়ন : ইসলাম পুরুষকে নারীর তত্ত্বাবধায়ক ঘোষণা দিয়ে তার উপর নারীর সমস্ত দায়-দায়িত্বের বোঝা অর্পণ করেছে। দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে পুরুষকে কঠিন জবাবদিহিতারও সম্মুখীন হতে হবে। প্রয়োজনে উদ্ধত নারীকে শাসনের অধিকারও পুরুষের আছে। তবে এই তত্ত্বাবধায়ন সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। দায়িত্ব পালনের ছলে যেন শোষক হয়ে না যায় ইসলাম সে ব্যাপারেও কড়া নজরদারি রাখে।

“পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পূণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর আড়ালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হেফাযত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুন্নত মহান।”

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর যা সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের অনিবার্য শর্ত। সেজন্য নারীকে তার প্রাপ্যদানের সাথে সাথে তাদের উপর পুরুষের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দিয়ে মূলত: ভারসাম্যপূর্ণ বন্ধন সৃষ্টি করা হয়েছে।

৭. সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণ : ইসলাম নারীকে সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছে। আল কুরআন বলছে- “পিতা মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে তা থেকে কম হোক বা বেশি হোক- নির্ধারিত হারে।” (সূরা আন নিসা : ৭)

আমাদের সমাজে নারীর উত্তরাধিকারের ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত। এটা ভয়াবহ পাপ এবং নারীর প্রতি যুলুমেরই নামান্তর। মহান আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।

৮. নারীর যথাযথ মূল্যায়ন : ইসলাম নারীকে যে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে তার সঠিক মূল্যায়নই নারীর যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ইসলামে নারীর মর্যাদা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

মা হিসাবে মর্যাদা : রাসূল (সা.)-কে একজন জিজ্ঞাসা করলেন আমার সর্বাপেক্ষা সদ্ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি জানতে চাইলো, তারপর কে? রাসূল (সা.) বললেন, তোমার মা। লোকটি জানতে চাইলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জানতে চাইলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। (সহীহ বুখারী)
এভাবে ইসলাম পিতার চেয়ে মাতাকে সম্মান-মর্যাদার দিক দিয়ে তিনগুণ বেশি মর্যাদার অধিকারী করেছেন।

কন্যা শিশুর মর্যাদা : যে কন্যা সন্তানের ভাগ্যে জীবন্ত প্রোত্থিত হওয়া অনিবার্য ছিল তার সম্পর্কে ইসলামের ঘোষণা-আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তানকে কিংবা অনুরূপ তিনটি বোনকে লালন-পালন করেছে, শিষ্ঠাচার শিক্ষা দিয়েছে, স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত এদের সাথে সদয় ব্যবহার করেছে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন।”

স্ত্রী হিসাবে মর্যাদা : বিবাহের পর স্ত্রীর সকল ধরণের দায়দায়িত্ব পুরুষের উপর চাপিয়ে ইসলাম স্ত্রীর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে। স্বামীর ব্যাপারে স্ত্রীর মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ মান প্রদান করে ইসলাম মূলত: নারীকে সর্বোত্তম মর্যাদা দান করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন- তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।”

৯. আল্লাহভীতির প্রশিক্ষণ : মহান আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে পুরুষ এবং নারী উভয়ই তাদের সমস্ত সমস্যা দূর করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন- “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছে বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা আন নিসা : ১)

১০. অপরাধ নিরসনে ইসলামী শাস্তি আইন প্রয়োগ : নারী নির্যাতনকারী, নারীর উপর অপবাদ রটনাকারী, ব্যভিচারী ব্যভিচারিনী প্রত্যেকের কুরআনী আইনে শাস্তি নিশ্চিত করলেই সমাজে নারী কেন্দ্রিক যাবতীয় অপরাধের মূলোৎপাটন ঘটবে। যেমন ব্যাভিচারের শাস্তি সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ঘোষণা-“ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের আযাব প্রত্যক্ষ করে।” (সূরা আন নূর : ২)

সতী নারীর উপর অপবাদ আরোপের শাস্তি সম্পর্কে আল কুরআন বলছে- “আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চার জন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” (সূরা আন নূর : ৪)

১১. নৈতিক পবিত্রতা রক্ষায় বিয়ের অনুষ্ঠান : ইসলাম অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করেছে এবং বিয়ের বিধানের মাধ্যমে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সহজাত প্রকৃতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে ও পবিত্র উপায়ে পরিচালনা করার সুযোগ দিয়েছে। তাদের জৈবিক সত্তাকে অস্বীকার না করে কিছু নীতিমালা ঠিক করে দিয়েছে। যেমন- কুরআন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যে, “তোমরা মোহরানা পরিশোধ করে বিবাহের মাধ্যমে তাদের রক্ষক হবে। গোপনে যৌনাচার এবং লুকিয়ে প্রেম করতে পারবে না।” (সূরা আল মায়িদাহ : ৫)

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন উমর (রা.) খুতবাতে বললেন- কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নিভৃতে সময় না কাটায়, কেননা তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয় শয়তান। (আত তিরমিযী)

– অ্যাফেয়ার করা যাবে না।
– প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হলে বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
– নির্জনে কোন স্থানে কোন পুরুষ কোন নারীর সাথে সাক্ষাত করবে না।

১২. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বর্জন : ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির প্রয়োজনেই নারী-পুরুষের মধ্যে সহজাত প্রবৃত্তি সৃষ্টি করা হয়েছে যেমন, তেমনি একে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পর্দার মাধ্যমে যাতে সমাজে ফিতনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি না হয়। ইসলাম ঠিক  করে দিয়েছে দৃষ্টির বিধান, চোখের বিধান, কানের ও অন্তরের বিধান, এটাও ঠিক করে দিয়েছে কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলেও যেন পর্দার আড়াল থেকে চাওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার চিত্রই এমন যে, নারী-পুরুষের শিক্ষাঙ্গণ, পরিবহন, কর্মক্ষেত্র সবই এক। এক সাথে অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার ফলশ্রুতিতে পরিবারে ভাঙ্গন, পালিয়ে বিয়ে ও কয়েকদিন পর লাশ হয়ে ফেরার এখন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য আমাদের নিজেদের রক্ষায় নিজেদের পদক্ষেপ নিতে হবে-

– মেয়েদের সার্কেলেই বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ রাখা।
– যাবতীয় প্রয়োজন মেয়ে বান্ধবীদেরকে সাথে নিয়ে সম্পাদনের চেষ্টা করা।
– নিরূপায় হলে কথা বললেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত না বলা এবং অবশ্যই একাকী না যাওয়া।
– হাসি-ঠাট্টা, সৌন্দর্য প্রকাশ মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা।
– অন্তরে আল্লাভীতি সর্বদা জাগ্রত রাখা।

শেষকথা : আধুনিক বিশ্ব নানান আইন প্রণয়ন করেও নারী সমস্যার সামান্যতম সমাধান করতে পারেনি। নারীবাদীরা তাদের মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা দিয়ে মূলত নারীকে কেবল ভোগের পণ্যে পরিণত করেছে। তাদের সমস্যাবলীর কোনরূপ সমাধান না করেই আকুণ্ঠ সমস্যার কঠিন আবর্তে তাদেরকে নিক্ষেপ করেছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথই হচ্ছে মহান স্রষ্টা প্রদত্ত নারীজাতির মান-সম্ভ্রমের গ্যারান্টি ইসলামী জীবন বিধান, ইসলামী নারীনীতিও ইসলামী দিক নির্দেশনার হুবহু অনুসরণ।

সমাজের সমস্ত অশ্লীলতা, অনৈতিকতা, নারীদের সকল সমস্যা প্রতিরোধ ইসলামের রয়েছে নিজস্ব বিধি বিধান। একমাত্র এই বিধি বিধান সমাজে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নারী জাতি ফিরে পেতে পারে তার কাক্সিক্ষত মুক্তি ও স্বাধীনতা যা মানব রচিত কোন আইনের দ্বারা অর্জন করা সম্ভবপর নয়। আর নারীকে যারা কঠিন সমস্যার মধ্যে ঠেলে দিয়ে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করেছে তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহর ঘোষণা-

“নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকত, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ বড় মেহেরবান, পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয় সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে। আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকত। তাহলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতেনা। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, পবিত্র করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও জ্ঞানী।” (সূরা আন নূর : ১৯-২১)

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সামুদ্রিক শক্তির ব্যবহার

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক নিবিড়। আবার প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এ কারণে প্রচলিত জ্বালানি উৎসের পাশাপাশি বিকল্প বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

আমাদের দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিমালায় জ্বালানির মূল উৎস হিসেবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়োফ্লুয়েল, জিয়োথারমাল, নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার বা টাইডাল ইত্যাদিকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির উৎস হিসেবে এনার্জি মেটেরিয়াল নিয়ে সারা বিশ্বে গবেষণার কাজ চলছে। কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পাওয়া গেছে। আমাদের দেশেও জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে এনার্জি মেটেরিয়াল নিয়ে গবেষণা ও এর প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এজন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে। তবে এর জন্য পরিকল্পনা ও পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে।

অনেকে বলে থাকেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎয়ের সফলতার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ার বা টাইডাল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি সেভাবে ভাবা হচ্ছে না।

এটি আমাদের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্টি হতে পারে। সরকারকে সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে এ পরিকল্পনাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এ ধরনের উৎস যেমন আমাদের দেশে আছে, তেমনি একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পরিবেশও রয়েছে। তবে কীভাবে টাইডাল এনার্জি বা পাওয়ারকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সেই বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেরই তেমন কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই।

কাজেই এটির প্রক্রিয়াগত বিষয়টি জানার প্রয়োজন রয়েছে। চাঁদের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে তখন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পানির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জোয়ারের সৃষ্টি হয়। প্রতি সাড়ে ১২ ঘণ্টা পরপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় জোয়ারের সৃষ্টি হয়।

এ জোয়ারের কারণে ফুলে-ফেঁপে ওঠা বেশি পরিমাণ পানির মধ্যে স্থিতিশক্তি জমা থাকে। আবার আশপাশের এলাকা থেকে এ জায়গায় বিভিন্ন উৎস থেকে পানি এসে জমা হতে থাকলে তাতে প্রচুর পরিমাণে গতিশক্তিও থাকে। সবচেয়ে মাজার বিষয় হচ্ছে, চাঁদ যদি ধ্বংস হয়ে না যায় তবে এ শক্তিও ধ্বংস হবে না। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে যতদিন ঘুরতে থাকবে এ শক্তিও ততদিন বিদ্যমান থাকবে।

যখন পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে বা বেড়ে যায় তখন এটিকে যে কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটকে রাখতে হবে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুসারে এ পানিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দিলে তাতে প্রচুর পরিমাণে গতিশক্তির উদ্ভব ঘটবে।

এ গতিশক্তির সাহায্যে টারবাইনকে ঘোরানো হলে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে পানি যখন নেমে যায় বা ভাটার সৃষ্টি হয় তখনও এতে যে গতিশক্তি থাকে তাকে কাজে লাগিয়েও বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে টারবাইনগুলো নদী বা সমুদ্রের তলদেশে বসাতে হবে, যাতে করে টারবাইনগুলো দুই দিকেই ঘুরতে পারে। এ ধরনের পদ্ধতিকে টাইডালস্ট্রিম জেনারেটর বলা হয়ে থাকে।

জোয়ার ও ভাটার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও পানিকে আটকে রাখার ও তাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দেয়ার বিভিন্ন প্রক্রিয়া পৃথিবীতে রয়েছে, তবে এ প্রক্রিয়াকে কীভাবে সহজীকরণ করে আমাদের দেশের উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা হতে পারে।

আবার এ আটকে রাখা পানির মধ্যে কীভাবে স্রোতের গতি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি করা যায় সেই ধরনের সিস্টেম বা পদ্ধতির বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। যেমন বর্তমানে ডাইনামিক টাইডাল পাওয়ার পদ্ধতির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এ পদ্ধতিটি যৌথভাবে ১৯৯৭ সালে ডাচ প্রকৌশলী কিস হালস্ বারজেন এবং রব স্টেইন আবিষ্কার করেন। এ ধরনের পদ্ধতিতে কোনো ব্যারাজ নির্মাণ না করে সমুদ্রের উপকূলের সঙ্গে ২০-৩০ কিলোমিটার লম্বা টি-বাঁধ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ১৫ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু এ পদ্ধতিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রক্রিয়াগতভাবে জটিল, তবে ব্যারাজ বা ডাইনামিক টাইডাল পদ্ধতি দুটিকে কীভাবে সহজে ও স্বল্প খরচে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হতে পারে।

এ দুটোর বিকল্প প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও গবেষণার মধ্যে আসতে পারে। বিভিন্ন দেশ টাইডাল পাওয়ারকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছে। ফ্রান্স বড় ধরনের ব্যারাজ নির্মাণ করে এর রান্স টাইটেল পাওয়ার স্টেশন থেকে ২৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সিহ্হা টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট থেকে ২৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার জিয়াংজিয়া, জিনডু উলডলমক, গাংওয়া আইল্যান্ড এবং একই দ্বীপের অন্য পাশে টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গুজরাটে ৫০ মেগাওয়াটসম্পন্ন টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশে সমুদ্র উপকূল রয়েছে তারাও এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং নতুন নতুন প্রকল্প স্থাপন করে চলেছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকলেও এখনও পর্যন্ত সেভাবে বিষয়টি ভাবা হয়নি।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য এ ধরনের টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট গড়ে তোলার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের যেসব নদ-নদীর মোহনাগুলো বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেখানে এ দুই পদ্ধতির যে কোনো একটি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেহেতু জোয়ারের উচ্চতা ও তার প্রবাহ আমাদের দেশের সামুদ্রিক ও নদীবহুল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম, সেহেতু এটিকে কীভাবে স্ট্রাকচারাল বা গঠনগত উন্নয়নের মাধ্যমে বা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে গতিশীল করা যায় সে বিষয়টি সমুদ্রবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের ভাবতে হবে।

তাদের সঙ্গে প্রকৌশলীদের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলে এটিকে আরও কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী করে তুলতে হবে। তবে ধারণা করা হয়, উইন্ড টারবাইনের মতো ছোট আকারের বহুসংখ্যক টাইডাল পাওয়ার জেনারেটর বসিয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আমাদের দেশে সন্দ্বীপের জোয়ারের পানির উচ্চতা ২-৭ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া এর স্রোতের গতিও যথেষ্ট ভালো থাকায় এটি টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বলে বিবেচিত হয়েছে।

তবে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে তা যাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি না করতে পারে সে বিষয়টিও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। এ ধরনের টাইডাল পাওয়ারপ্লান্টের সুবিধা হল এতে কোনোরকম দূষণ সৃষ্টি হয় না। বর্তমান সময়ে দূষণের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় তা কমানোর ক্ষেত্রে ফসিল ফুয়েল বাদ দিয়ে এ ধরনের পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অন্যদিকে সমুদ্রের ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের বিষয়টি নিয়েও ভাবা হচ্ছে, যা ওয়েভ পাওয়ার নামে পরিচিত। বিষয়টিকে সহজভাবে বলা যায়- যখন সমুদ্রের পানির ওপর দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, তখন স্থির পানির মধ্যে তরঙ্গ বা ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।

বায়ুর এ শক্তি পানিতে পরিবাহিত হয়ে সেখানে গতিশক্তির সৃষ্টি করে। এ গতিশক্তিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে যে প্রান্ত থেকে ঢেউ বা স্রোত সৃষ্টি হচ্ছে তার আড়াআড়িভাবে অনেক ছোট ছোট ওয়াটার টারবাইন স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা থাকে।

যখন ঢেউ ওয়াটার টারবাইনের ওপর আছড়ে পড়ে তখন গতিশক্তির কারণে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ঢেউয়ের গতি, দৈর্ঘ্য ও পানির ঘনত্বের ওপর ওয়েভ এনার্জির কম-বেশি হওয়া নির্ভর করে। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমা ও বিভিন্ন স্রোতবাহী নদীর ম্যাপিং বা মানচিত্র শনাক্ত করে ওয়েভ এনার্জি উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন স্থান, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও বান্দরবান অঞ্চলের হাওর এলাকায় ওয়েভ এনার্জি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

সমুদ্রের জলসীমার নিচে ওয়াটার টারবাইন স্থাপন করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার না করে ফ্রি এনার্জি ধারণার মাধ্যমে কৃত্রিম স্রোত সৃষ্টি করেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগালে পেলামিস ওয়েভ জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ কারণে পোর্তোর উত্তরে সি বিচে সাগরের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত অনেক পেলামিস ওয়েভ কনভার্টার স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের ওয়েভ এনার্জি ব্যবহারের ফলে ফসিল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ৬০ হাজার টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ থেকে পরিবেশ রক্ষা পাবে। এছাড়া সমুদ্রে ভাসমান ওয়াটার টারবাইন ব্যবহার করেও বড় বড় জাহাজ ও সমুদ্রাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

পশ্চিম সুইডেনের লাইসেকিলে সমুদ্রের মধ্যে বয়া কনভার্টার ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়াও বর্তমান সময়ে ১৫-২০ ধরনের বিভিন্ন টেকনোলজি ব্যবহার করে ওয়েভ এনার্জি ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকেও এ সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। এখন দরকার সমুদ্রের জলসীমা ও জলস্রোতকে কেবল সৌন্দর্যের উপকরণে পরিণত না করে বাণিজ্যিক সম্পদে রূপান্তরিত করা। আর এটি যদি সম্ভব হয়, তবে টাইডাল ও ওয়েভ এনার্জির মাধ্যমে আমাদের দেশ বিদ্যুতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে সক্ষম হবে, যা আমাদের উন্নত রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ইমাম বোখারী (রহ.) এর শেষ প্রার্থনা

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী :“হে খোদা! এখন যদি আমার দুনিয়াতে থাকা তোমার নিকট কল্যাণকর না হয় তাহলে আমাকে তুলে উঠিয়ে নিয়ে যাও।“ সময়টা জোহরের পরে। দুনিয়ার মানুষের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে ইমাম বোখারী এ দোয়া করেন এবং মাগরিব ও এশা এর মধ্যে দোয়া কবুল হয়। হঠাৎ তার শরীর হতে প্রচুর ঘাম নির্গত হতে থাকে এবং এশার নামাজের পর আশেখে রসুল আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যান। ঈদুল ফিতরের চাঁদ রাত। তাঁর বয়স হয়েছিল ১৩ দিন কম ৬২ বছর। হিজরী ২৬৫ সাল। ‘সমরখন্দ’ হতে তিন মাইল দূরে ‘খরতং’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। হিজরী ১৯৪ সালের ১৩ শাওয়াল তার জন্ম। তাঁর কোন সন্তান ছিল না। একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি শাদীও করেননি। তাঁর নাম মোহাম্মদ; উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। পিতার নাম ইসমাঈল। বোখারার অধিবাসী ছিলেন বলে আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ বোখারী নামেই তিনি ইতিহাসে খ্যাত।

তাঁর বংশ পরিচিতি :মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরা ইবনে বরদাজবে। তিনি পারস্য বংশোদ্ভূত মজুসী বা অগ্নি উপাসক ছিলেন। বরদাজবের পুত্র মুগীরা বোখারার শাসনকর্তা ইয়ামান জুফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইমাম বোখারীর পিতা ইসমাঈল হজরত ইমাম মালেকের শাগরিদ ছিলেন। তিনি হাম্মাদ ইবনে জায়দ ও ইবনুল মোবারকের কাছ থেকেও হাদীস শ্রবণ করেন। 

বর্ণিত আছে যে, শৈশবে ইমাম ‘নাবীনা’ অর্থাৎ অন্ধ ছিলেন। তাঁর মায়ের দোয়ায় আল্লাহ তাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেন। শৈশবেই তিনি পিতাকে হারান, মা তার লালন পালন করেন। প্রথম দিকে তিনি অর্থশালী ছিলেন। পৈত্রিক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন।

ইমাম বোখারীর (রহ.) মধ্যে হাদীস হিফজ করার আগ্রহ দশ বছর বয়স হতেই শুরু হয়ে যায়। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ ধীশক্তির অধিকারী। খোদা প্রদত্ত এ মেধা-প্রতিভা খুব কম লোকেরই ভাগ্যে আসে, দুনিয়ার ইতিহাসে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তাঁর ছয় লাখ সহীহ হাদীস সনদসহ মুখস্থ ছিল। তিনি এসব হাদীস সংগ্রহের জন্য হেজাজ, ইরাক, ইয়েমেন, খোরাসান, মিশর, সিরিয়া প্রভৃতি শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, পাহাড়ে, জঙ্গলে এবং যেখানেই জানা গেছে যে, কোন বুজর্গের নিকট হাদীস আছে, তাদের কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করার জন্য হাজার হাজার মাইল পদব্রজে সফর করেছেন। আরবের ভীষণ গরমে তাকে এসব দূরবর্তী স্থান ও দুর্গম এলাকা সফর করতে হয়েছে।

কথিত আছে যে, এসব স্থান সফরকালে কোন কোন সময় তাঁর প্রসাব রক্ত আকারে বের হতো, কিন্তু তিনি তা পরোয়া করতেন না, হাদীস সংগ্রহের নেশায় তিনি বিভোর ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি ছয় লাখ হাদীস সংগ্রহ করেন এবং মুখস্থ হয়ে যায়।
১৬ বছর বয়সে ইমাম বোখারী (রহ.) ইমাম অকী ও ইবনুল মোবারকের কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। অতঃপর মায়ের সঙ্গে হজের জন্য গমন করেন এবং হেজাজে শিক্ষা লাভ করেন এবং সেখানে ৬ বছর অবস্থানের পর প্রত্যাবর্তন করেন।

তাঁর হাদীস সংকলনে আত্মনিয়োগ করার ঘটনানাটিও বিস্ময়কর। ৬ লাখ হাদীসের জখীরা ছিল তাঁর সামনে এবং ১৬ বছর সময়ের মধ্যে হাদীস সংকলনের কাজ সমাপ্ত করেন। এ সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি কখনো মদীনার মসজিদে নববীতে বসে এবং কখনো খানা-ই-কাবায় বসে হাদীস সংকলন করতেন এবং এ কাজে তিনি অত্যন্ত সতর্কনীতি অনুসরণ করেন। এ সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মোহাদ্দেসীন লিখেছেন যে, প্রত্যেক হাদীস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ইমাম বোখারী গোসল করতেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তেন, ইস্তেখারা করতেন এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। এভাবে তিনি কিতাব সম্পূর্ণ করেন।
আল্লামা খতীব বাগদাদী তাঁর বিখ্যাত ‘তারিখে বাগদাদে’ ইমাম বোখারী (রহ.) এর অসাধারণ মেধা-প্রতিভা এবং ইমাম বোখারী (রহ.) বিদ্বেষী এক শ্রেণীর আলেমের জালিয়াতির এক অদ্ভুত কাহিনী লিখেছেন। যা সংক্ষেপে এই যে, যখন তিনি বাগদাদে গমন করেন তখন ‘সাজেশী উলামা’ দলের লোকেরা তাঁর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি সূকৌশল অবলম্বন করেন। তাদের মধ্যে দশ জন দশটি হাদীস গলদ মুখস্থ করে বিভিন্ন সময় ইমাম বোখারীর (রহ.) সামনে পাঠ করেন। ইমাম সাহেব পঠিত সবকটি হাদীস বিকৃত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর সনদ সহকারে প্রত্যেকটি ‘রেওয়ায়েত’ (বর্ণনা) মূল মতন (এবারত) সহ পেশ করেন, যাতে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও অবাক ও বিস্মিত হয়ে যায়।

অত্যন্ত সতর্ক ও গুরুত্ব সহকারে ইমাম সাহেব কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা হাদীসগুলোর সংখ্যা চার হাজারের কিছু বেশি, যা সংক্ষেপে ‘বোখারী শরীফ’ নামে বিশ^খ্যাত। তিনি সমকালীন এক হাজার আশি জন মোহাদ্দেসীরনের কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। খোদ তাঁর কাছ থেকে এক লাখ লোক হাদীস শ্রবণ করেন। আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম বোখারীর (রহ.) ছয় লাখ হাদীস মুখস্থ ছিল এবং এ ছয় লাখ হাদীসের জখীরা সামনে রেখে হাদীস সংকলন শুরু করেছিলেন। কিতাব সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুঈন এবং ইবনুল মাদিনীর সামনে পেশ করেন এবং তাঁরা সবাই প্রশংসা করেন এবং বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐক্যমত পোষণ করেন, তবে চারটি হাদীস নিয়ে বিতর্ক থাকে। ইবনে হাজার বলেন, বিতর্কিত এ হাদীসও সত্য।

সে যুগের মোহাদ্দেসীনে কেরাম সর্বসম্মতভাবে বলেছেন যে, ‘আছাহ হুল কুতুবে বাদা কিতাবিল্লাহি আছ ছাহীহুল বোখারী’। অর্থাৎ কোরআন হাকীমের পর বিশুদ্ধতম কিতাব সহীহ বোখারী। সহীহ বলতে কেবল লিখিত আকারে সহীহ বা বিশুদ্ধতম নয়, এ কিতাবের ভাব-ভঙ্গি ও সাহিত্যের দিক থেকেও অতি উত্তম, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। বিখ্যাত বৈয়াকরণ আল্লামা রাজি (৬৮৬) বলেন; ‘খাটি আরবী জানতে হলে কোরআন, অতঃপর সহীহ বোখারী এবং হেদায়া পড়তে হবে।’ এ স্বীকৃতি সত্য ও বাস্তবতার স্বীকৃতি। বস্তুত সকল দিক বিবেচনায় সহীহ বোখারী এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি। কোরআন এর ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোর পর সর্বাধিক ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং অহরহ হচ্ছে বোখারী শরীফের। হাদীস শাস্ত্রে ‘আমীরুল মোমেনীন’ সহ আরও বহু উপাধিতে ভ‚ষিত এ মহান হাদীস বিশারদের শেষ জীবনে নিজের দেশেই নানা বিপদ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ‘খালকে কোরআন’ অর্থাৎ কোরআন ‘কাদীম’ এ না ‘হাদেস’ এ বিষয়ে ইমাম সাহেবের মত ছিল কোরআন ‘কাদীম’ অর্থাৎ সৃষ্ট নয়, আদি। এ বিষয়ে ইমাম জুহলীর সাথে তাঁর মত বিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি ইমাম সাহেব সম্পর্কে শাসকের কান ভারি করেন বলেও অভিযোগ আছে। অতঃপর বোখারার শাসকের সাথে তাঁর মন কষাকষি হয়। বোখারার শাসক ইমামকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। ইমাম সাহেব সেখান হতে সমরখন্দ চলে যান। সেখানে তিনি আল্লাহর দরবারে যে প্রার্থনা করেন তা এবং ঈদ রজনিতে তাঁর ইন্তেকাল হওয়ার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে।